ত্রয়ী দাস

ত্রয়ী দাস | দুটি কবিতা

দুটি কবিতা

 

ঘাটের কথা

লাল সিঁড়ি দিয়ে ছেলেরা এইমাত্র নেমে গেল গঙ্গায়।
কেউ কেউ ঝাঁপ দিল বুক চিতিয়ে।
খর্বাকার এক বৃদ্ধ ন্যুব্জ হল মা গঙ্গার সামনে।
গতজন্মের স্মৃতির মতো। গঙ্গার জল ঝোলাটে।

 

ছানিপড়া বৃদ্ধার মাছের মতো চোখ।
বুকের আঁচল গড়িয়ে পড়েছে। অলঙ্ঘন।
ঘাটের ছায়ায় কেউ বসে নেই খঞ্জনী নিয়ে।
সাদা তিলক সেঁটে গেছে দেওয়ালে পোস্টার হয়ে।

 

যুবতীর গোপন হর্ষ ভেঙে গেছে। স্নান হবে না আর।
চটুল যুবক শিস বাজাচ্ছে না।
ভ্রূ-কুঞ্চন বলে দিয়েছে। পোষাচ্ছে না টুকি খেলা।

 

জাল ফেলেছে। মধু মাঝির নৌকা।
ছাউনির নিচে ফুটছে গরম ভাত।
ফুটুক। শুয়ে থাকবে চিৎ হয়ে। কথা আছে আকাশের সাথে।

 

একটু দূরে আত্মারা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে। খেলার নাম অলাতচক্র।
বৃষ্টি শুরু হল। আড়াল নেই। তাই নিভে যাবে।
এসেছিলাম। দেরি হল। চলে যাব।

 

মাঝরাতের হ্যাল

বহুদিন পর লিখছি। সাদা পাতার থলথল পেট আমার দিকে তাকিয়ে। চিড়তে চাইছি কৌতূহলে। সেই অসম্ভব যন্ত্রণা আমায় ছিঁড়ে দিচ্ছে। মায়া। বেকাবু নীল রঙের মাছ। বুকের মধ্যে খেলা করছে। গলার মধ্যে জড়োসড়ো। তীব্র সেই ছটফটানি! এইমাত্র এক্ষুনি হয়তো ঝাঁপ দেবে। চোখ সেই একমাত্র ড্রেন। মুক্তি দেয়।

 

রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন। রোদচশমা চোখে। মুচকি হাসি। জ্বর নেই এমন সকাল। জীবনানন্দ দাঁড়িয়ে আছেন। বনলতাকে ফেলে এসেছেন। দূর দারুচিনি দ্বীপে। এত দূর হেঁটে না এলে শুনতে পারবেন না “এত দিন কোথায় ছিলেন?” সব হাঁটা থেকে যাওয়া নয়। ট্রামের ঘর্ষণ জানে।

 

সারারাত বৃষ্টি হল। ভোরবেলা দরজায় শান্ত হরিণীর পা। লেখো না কেন! আধকাটা বাক্য, ভেসে যাওয়া ঘুড়ির লাশ, চিলেকোঠার বন্ধ জানালা, তারের উপর কাক। ছাদের ভিজছে ভাঙা টব। ক্রমশ ঝাপসা। অস্পষ্ট। অন্ধকার। সন্ধে নামল। এত ইমেজারি রাখব কোথায়! তার চেয়ে নয়নতারা! একা অসুখ তোমায় মানায়!

 

আমায় রেখে এসো সেই বিকালে। ফুটপাথ নাচছে। “সাদা সাদা কালা কালা”। বসন্তকালে বলতে পারেনি বলে বৈশাখ এখনও নাচছে। বলে দিলে কি ছুটি হয়ে যায়!

 

যাচ্ছে এক্ষুনি যা ছিল। অন্ধযোনি, উড়ালপুল, পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। আরেকটু পরে বৃষ্টি নামবে বোধহয়। কোথাও একটা সিন চলছে। প্লাস্টিকের গর্ভ ভরে যাচ্ছে জলে। কাগজের ঠোঙা মরে যাচ্ছে।

 

জল তবু জল একাকী। ডিম্বাণুর সাথে খেলা করে মাছের পোয়াতি পেটে। তেষ্টা নেই! অধিক জলের লোভ তবু। তুমিও আমারই ভাবনার ডিম্বাণু। স্থাপত্যবিদ্যা শিখি ও শেখাই। গর্ব ও বিভ্রমে কথা নিভে যায়।

 

স্বপ্নে দেখি একটা সাদা হাসপাতাল। শুয়ে আছি। চারদিকে নিথর শব। কিছুক্ষণ পর আমাকেও তুলে নেওয়া হবে বোধহয়। আত্মারা, ভয় পাবেন না।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...