প্রসঙ্গ, শিক্ষা: মূল সমস্যা আড়াল করে হইচই করার মানে হয় না

অরিন্দম

 

 


প্রতিবারের মতন এইবারের উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টও শিক্ষায় পুঁজিবাদী কুফলকে সামনে নিয়ে এসেছে। ত্রিশ বছর আগে যা ছিল তার চেয়ে গুণগত মানে পরিবর্তন ঘটে গেছে। আজকে সমাজজীবনে পুঁজিবাদের ছায়া অনেক বেশি বিস্তৃত ও বুদ্ধিজীবী মহলে মান্যতাপ্রাপ্ত। বুদ্ধিজীবী মহল পুঁজিবাদের দু-একটি খামতি মানে ছ্যাঁদা রিপু করতে ব্যস্ত। কিন্তু ওই কাপড় দিয়ে যে আর লজ্জানিবারণ সম্ভব নয় সেটা বুঝতে পারছে না। অথচ তলে তলে আর্থিক সঙ্গতিহীন পরিবারের সন্তানদের লাথি মেরে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে ফেলে দেওয়ার আয়োজন সম্পূর্ণ। শোকেসে দু-একটা গরিব পরিবারের কুমিরছানা অবশ্যই থাকবে। যাদের দেখিয়ে বলা হবে “চেষ্টা করলে সব হয়”-গোছের কথাবার্তা। যারা ব্যর্থ তাদের আসলে চেষ্টাই নেই

 

চাকরির জন্য ঘুষ দেওয়া নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেই সম্প্রতি ২০২৪ সালের পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক সংসদ পরিচালিত উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরিয়েছে। তাতে কত শতাংশ পাশ করল, কোনও জেলাতে পাশের শতাংশ কমলে কেন কমল, কোনও জেলাতে প্রথম দশে কেউ না থাকলে তার দুঃখ, ভাল ফল করা ছেলেমেয়েদের সাক্ষাৎকার, তাদের বাবা-মায়েদের গর্বিত মুখ কিংবা গরিব পরিবারের থেকে কোনওক্রমে বেরিয়ে আসা ‘কুমিরছানা’র মতন কয়েকজন ভাল ছেলেমেয়েদের খবর করা নিয়ে কয়েকদিন জেলা, রাজ্যের সব ছাপা বা ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলি মেতে রইল। কিন্তু এই হল্লার পিছনে যে শিক্ষাতে চরম বৈষম্যের মেঘ ঘনীভূত হয়ে গেছে সেটা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আমি সাংবাদিকদের দোষ দিই না। তাঁরা যে সামাজিক পরিবেশের ফল তাতে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ সাংবাদিকের বোধশক্তি এবং অনুসন্ধিৎসার আগ্রহ এতটাই কম যে তা আর বলবার নয়। নইলে এই পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যম আদতে যে কথাগুলি চেপে যেতে চায় সেখানেও কিছু খবর উঠে আসতে পারত। কিন্তু না। একদিকে সংবাদমাধ্যমের মালিকরা শাসকদের কোনও-না-কোনও পক্ষের মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে সরাসরি চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি সাংবাদিকরাও শাসকের বয়ানে নিজের ভাবনাকে বেঁধে ফেলেছেন। আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদদের কথা না বলাই ভাল। বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলি তো চলতি হাওয়ার পন্থী। নকশাল থেকে সিপিএম, তারা মুখে বিপ্লবের কথা বললেও আর বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে না। তারা এখন বাস্তবত গ্যেটের ভাষায় ‘যাহা বাস্তব তাহাই ন্যায়’-এর রাস্তায়। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুঁজিবাদী সঙ্কটকে এড়িয়ে আশু সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। কিছু সংশোধন, কিছু সংস্কারবাদী আন্দোলনের বাইরে তারা ভাবতে চাইছে না। আমি সংশোধন, সংস্কারের বিপক্ষে এমনটা নয়। কিন্তু তার বাইরে তাকাতে হবে। পুঁজিবাদের কুফলকে “পুঁজিবাদের কুফল’’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষা তার বাইরে নয়। ৯১-৯২-এ নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই শাসকগোষ্ঠী শিক্ষায় পরিকল্পনামাফিক বেসরকারিকরণ শুরু করে দিয়েছিল। তার আগে যে শিক্ষা ব্যাপারটি খুব গণতান্ত্রিক ছিল এমনটি নয়, তবু নিম্ন-মধ্যবিত্তদের নাগালের মধ্যে ছিল। নিরুপম সেন-দের ‘উদারনীতির সুযোগ নিতে হবে’ তত্ত্বায়নের পর পশ্চিমবঙ্গেও ৯৬-৯৭ সাল থেকেই উচ্চশিক্ষায় বেসরকারিকরণ শুরু হয়। তারপর এই শতাব্দীর শুরুতে তা প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলে। এই রাজ্যে লক্ষণ শেঠদের উত্তরাধিকারী হিসেবে তৃণমূল সরকার আসার পর তৃণমূল নেতা-বিধায়করাই শিক্ষাতে পুঁজির বিনিয়োগকারী হয়ে উঠলেন। এই চাকরিতে ঘুষ দুর্নীতিতে যা সামনে আসছে। তবে এটাতে খালি তৃণমূল দায়ী এটা বললে মেনে নেব না। তৃণমূল-বাম-কংগ্রেস-বিজেপি সবাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বার্থে এই শিক্ষার বাণিজ্যকরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে। বিএড থেকে ডিএলএড, টেট, নিট, জয়েন্ট এন্ট্রান্স, ক্যাট, জ্যাম, ইউপিএসসি, পিএসসি, এসএসসি সব আপাতদৃষ্টিতে স্বচ্ছ মনে হলেও এসবই প্রথাগত শিক্ষার মূল্য কমিয়ে প্রতিযোগিতার নামে শিক্ষার বাণিজ্যকরণ, মুনাফাকরণ ও দুর্নীতিকরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অঙ্গ। মনে রাখতে হবে প্রতিযোগিতা কোথায় হয়— যেখানে চাহিদা বেশি, জোগান কম। দুর্নীতির উৎসও সেখানে।

তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবারের মতন এইবারের উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টও আরও আরও বেশি শিক্ষায় পুঁজিবাদী কুফলকে সামনে নিয়ে এসেছে। ত্রিশ বছর আগে যা ছিল তার চেয়ে গুণগত মানে পরিবর্তন ঘটে গেছে। আজকে সমাজজীবনে পুঁজিবাদের ছায়া অনেক বেশি বিস্তৃত ও বুদ্ধিজীবী মহলে মান্যতাপ্রাপ্ত। বুদ্ধিজীবী মহল পুঁজিবাদের দু-একটি খামতি মানে ছ্যাঁদা রিপু করতে ব্যস্ত। কিন্তু ওই কাপড় দিয়ে যে আর লজ্জানিবারণ সম্ভব নয় সেটা বুঝতে পারছে না। অথচ তলে তলে আর্থিক সঙ্গতিহীন পরিবারের সন্তানদের লাথি মেরে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে ফেলে দেওয়ার আয়োজন সম্পূর্ণ। শোকেসে দু-একটা গরিব পরিবারের কুমিরছানা অবশ্যই থাকবে। যাদের দেখিয়ে বলা হবে “চেষ্টা করলে সব হয়”-গোছের কথাবার্তা। যারা ব্যর্থ তাদের আসলে চেষ্টাই নেই। মানবসমাজে তো আমরা সচেতনতার মাধ্যমে “যোগ্যতমের বেঁচে থাকার” তত্ত্বকে বদলে পরিবেশটাকে তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ঠ অযোগ্যদের কাছে সহনীয় করে তুলতে চাই। এটাই মার্কসবাদীরা করতে চায়। সেখানে পুঁজিবাদীরা নিজেদের জন্য সব রেখে ঠিক নিচের তলার জন্য কিছুটা রেখে বাকিদের জন্য “যোগ্যতমের বেঁচে থাকার” তত্ত্ব রেখে দিয়েছে। সেখানে ভয়ঙ্কর লড়াই চলছে। সবাইকে ভাবানো হচ্ছে “চেষ্টা করলে সব হয়”। শিক্ষাক্ষেত্রে এটি এখন খোলাখুলি কাজ করছে।

 

ইয়ে চলতা হ্যায়

সমাজের নৈতিকতাকে প্রয়োজন বুঝে চাগানো হয় বা চাপানো হয়। উফ্‌ফ্‌ গত দুই বছর ধরে বাঙালি মধ্যবিত্ত থেকে রবীন্দ্রপ্রেমী-বাম-ডান-রামভক্ত-বাজারি সংবাদমাধ্যম— সবধরনের আঁতেলরা ঘুষ দিয়ে চাকরি নিয়ে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়েছে যেন একটা বিশাল দুর্নীতি হয়েছে। এমন একটা ভাব নিজেরা যেন কোনও দুর্নীতি করেন না বা নিষ্কলুষ সমাজে হঠাৎ একটা কলঙ্ক ধরা পড়েছে। প্রাক্তন বিচারক অভিজিত গাঙ্গুলি পুরো বিচারব্যবস্থার তথাকথিত নৈতিকতাকে উলঙ্গ করে চলে গেলেন তার বেলা চুপ। যে লোকটার নাম না-আইনজীবী না-বিচারপতি হিসেবে বাইশ সালের আগে কেউ জানত না সেই লোকটা একটা দুর্নীতির ঘটনাকে এবং বিচারব্যবস্থাকে সুকৌশলে ব্যবহার করে ভগবান সাজার চেষ্টা করলেন। হঠাৎ করে একটি একটি বাজারি চ্যানেল বিচারপতি থাকাকালীন তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচার করে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর বিজ্ঞাপনের কাজ করল আর তারপরেই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিজেপির প্রার্থী হয়ে গেলেন। এটা যে একটা বড় পরিকল্পনার অংশ সেটা তো পরিষ্কার। এটাই তো চরম দুর্নীতি। আইনজীবী মহলে ওঁর এই কাজ যথেষ্ট নিন্দিত হয়েছে। কিন্তু নিন্দা করে কী হবে! যে রাষ্ট্রব্যবস্থাটাই দুর্নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে সেখানে ওই বেকার ছেলেমেয়েগুলো কী দোষ করেছে যদি একটু সুরক্ষিত জীবনের লোভে ঘুষ দিয়ে থাকে? এটা তো পরিষ্কার চরম বেকারি না থাকলে কেউ ঘুষ দিয়ে চাকরির পেছনে দৌড়ত না। ফলে এই দুর্নীতিও হত না। যে নীতির ফলে এই বেকারত্ব তার জন্য যারা দায়ী তারা এখন ওই তথাকথিত কয়েক হাজার বেকারকে দায়ী করছে যাতে করে এই পচে যাওয়া ব্যবস্থাটাকে সাদা চাদর ও আতর দিয়ে সাফসুতরো দেখানো যায়। ধরুন একইভাবে যেসব বাবা-মা ভবিষ্যতে সন্তানদের সুরক্ষিত জীবনের আশায় প্রচুর টাকা খরচা করে বা ধার করে, কেউ জমি বিক্রি করে (যে-কায়দায় ওই বেকার ছেলেমেয়েগুলি ঘুষের টাকা জোগাড় করেছিল) ছেলেমেয়েকে বিভিন্ন জায়গায় (যার ভিতর কোটা একটা) পাঠাচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং সেন্টারে, তারপর যদি সেই বাচ্চাটি প্রতিযোগিতায় না পেরে মানে অন্যকে হারাতে না পেরে আত্মহত্যা করে— দায় কার? বাচ্চাটির, অভিভাবকের না ব্যবস্থার! বা আত্মহত্যা না করে প্রতিযোগিতায় টনটন হয়ে যদি সেই বাচ্চাটি পড়াশুনো করে কয়েক লক্ষকে টপকে বড় হয়ে ডাক্তার হয়ে ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত করে টাকা তোলবার চেষ্টা করে তখন আপনারা বলবেন ‘ইয়ে চলতা হ্যায়’ বা সফল মানুষ। ডাক্তার হয়েছে পয়সা রোজগার করবে না! তাহলে কোচিং সেন্টার থাকবে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নামে ছাঁটাই থাকবে, প্রতিযোগিতায় প্রথম দশের মধ্যে থাকলে খবরের কাগজে নাম বেরোবে, তারপর বলব প্রতিযোগিতা কত খারাপ, দুর্নীতি কত খারাপ, তাই প্রতিযোগিতায় পেরে না ঊঠে কেউ আত্মহত্যা করলে মায়াকান্না কেঁদে লাভ নেই। যোগ্যতাহীনেরা মরবে ‘যোগ্যতম’-রাই বেঁচে থাকবে। কিন্তু অতিধনীদের জন্য কোনও প্রতিযোগিতা নেই। তারা অর্থ দিয়ে যে কোনও জায়গায় ভর্তি হতে পারে। না, সেটাকে আমরা ঘুষ বলব না। আদানি-আম্বানি-টাটার ছেলেমেয়েরা কোনও প্রতিযোগিতায় নেমেছে শুনেছেন? ওরা একেবারে মালিক হয়ে জন্মায়। তাই ওদের ঘুষ দিতে হয় না, স্বপ্ন ব্যর্থ হলে আত্মহত্যা করে না, অসুস্থ বাবার ওষুধের জন্য টাকা ধার করতে হয় না। পুঁজিবাদে ‘ইয়ে চলতা হ্যায়’।

সাধারণ মানুষের কাছে জীবনে একটু নিশ্চয়তা, সুরক্ষা মানে সরকারি চাকরি। তার জন্য কয়েক হাজার চাকরির জন্য কয়েক লক্ষ পরীক্ষায় বসছে। যেন কয়েক লক্ষ গ্ল্যাডিয়েটরকে রিংয়ে নামিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে যুদ্ধ চলবে যতক্ষণ না সংখ্যাটি ১৫০০০-এ নেমে আসছে। এখানে কোনও নৈতিকতার প্রশ্ন নেই। টাকা ঘুষ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ক্ষমতার যোগাযোগ— সব চলবে। এই লড়াই বাঁচার লড়াই। খাদের ধারে পুরো যুবসমাজকে দাঁড় করিয়ে এখন নৈতিকতার দায়ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জনগণের উপর চাপাবে, এটাই খেলা। অভিনেতা রুদ্রনীলকে মনে আছে? এখন কবিতা লেখেন, বিজেপি দল করেন। হঠাৎ করে বেশ কিছুদিন আগে দেখেছিলাম একদিন তিনি হঠাৎ কারিগরি শিক্ষার হর্তাকর্তাদের একজন হয়েছেন। কী যোগ্যতায় হলেন কেউ প্রশ্ন করেনি। কারণ এই ব্যবস্থায় ‘ইয়ে চলতা হ্যায়’। যোগ্যতা খালি নিচুতলার লোকেদের জন্য। খালি একটু সুস্থ জীবনের লক্ষ্যে চাকরির জন্য উমেদারি (এখনও প্রমাণিত হয়নি) করাটা এত বড় অপরাধ হয়ে গেল?

 

এর সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের সম্পর্ক কী?

হ্যাঁ আপাতদৃষ্টিতে সবই বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই সমাজের দুর্নীতি কীভাবে কাজ করে তারপর সামাজিক মান্যতা পেয়ে তা নৈতিকতার মোড়ক পায় সেটা আলোচনা জরুরি। সরকারি উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিক স্কুলের পড়ূয়াসংখ্যা কমছে আর বেসরকারি সিবিএসই, আইসিএসই স্কুলের পড়ুয়াসংখ্যা বাড়ছে এটা নতুন কথা নয়। আমি এই তথ্য দিয়ে লেখা ভারাক্রান্ত করতে চাই না। কারণ সমস্যাটা আর সরকারি-বেসরকারি স্কুলের মধ্যে নেই। আর কয়েক বছরের মধ্যেই এটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে নিম্নমধ্যবিত্ত বা হাড়হাভাতে পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য সরকারি স্কুল, সঙ্গে মুফতে দুপুরের খাওয়া; আর সঙ্গতিসম্পন্নদের জন্য বেসরকারি স্কুল। সরকারি স্কুলে শিক্ষক কম থাকবে, পরিকাঠামো খারাপ হবে, কম পয়সায় চুক্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হবে। ইতিমধ্যেই ২০০০ টাকার শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গ ঊঠে গেছে। সরকারি বাজেটে ইতিমধ্যেই শিক্ষাখাতে আসল বরাদ্দ কমছে। গরিবদের যেমন পাঁচ কেজি চাল আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে জীবন চলে তেমন তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য দু-কেজি শিক্ষা মুফতে দেওয়া হবে।

আমরা যদি বর্তমানের দিকে তাকাই দেখব দু-একটা গরিব কুমিরছানা বাদে সব ভাল রেজাল্ট করা ছেলেমেয়েরাই মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বছর কুড়ি আগে অবধি এরা পড়ত ব্যক্তিগত সাত-আটটি শিক্ষকের কাছে তারপর গালভরা মিষ্টি নিয়ে তোতাপাখির মতন স্কুলের শিক্ষকদের অবদান নিয়ে মিথ্যে কথা বলত। খবরের কাগজে পড়া এবারের এক মফস্বল শহরের উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকা পড়ুয়ার গল্প শোনাই। সে মাধ্যমিক পাশ করেছে স্থানীয় শহরের বেসরকারি স্কুল থেকে। তারপর হঠাৎ উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হল ওই জেলা শহরের থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে বাবা যে স্কুলে শিক্ষকতা করেন সেই স্কুলে। উচ্চমাধ্যমিকে যেখানে প্রচুর পড়াশুনো করতে হয় সেইসময় সে প্রতিদিন যাতায়াতে ২-৩ ঘণ্টা নষ্ট হবে এমন স্কুলে কেন ভর্তি হল? সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে সে বলে সিলেবাসের বাইরে বিভিন্ন সক্রিয়তার জন্য সে ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সত্যি, না বানিয়ে স্মার্টভাবে মিথ্যে কথা বলছে সেটা আশা করি বুঝতে পারছেন। এবং ওই পড়ুয়াটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ এর উদাহারণ বিচ্ছিন্ন হলে মানা যেত। কিন্তু এই ধরনের বাবা-মা বা ঘনিষ্ঠ পরিচিতরা শিক্ষকতা করেন এমন দূরবর্তী সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়াটা এখন চালু রীতি। কারণ আপনাকে স্কুলে যাওয়ার ঝক্কি নিতে হবে না, উপস্থিতির হার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, পাশাপাশি হাতেকলমে তথা ব্যবহারিক বিষয়ের নম্বর সেটিং-এ পুরো পেয়ে যাবেন। এটা উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফল করা অধিকাংশ পড়ুয়ার চিত্র। স্কুলে উপস্থিতির হার ধরলে এদের বেশিরভাগের পরীক্ষায় বসবার যোগ্যতাই ছিল না। এই প্রতিযোগিতার আবহে এরা এই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে গেছে। তার জন্য যত মিথ্যে কথা বলতে হয় বলব। আপনি কি এটিকে ভবিষ্যতের আরও বড় দুর্নীতির অনুশীলন বলবেন না!

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

যাই হোক, যারা কোটায় পড়তে যায় বা বড় আবাসিক কোচিং ক্লাসে, তাদের সব বেসরকারি স্কুলের সঙ্গে সেটিং থাকে যাতে তাদের স্কুল যেতে না হয়। খালি পরীক্ষা দেবে। কারণ বর্তমানে স্কুলপরীক্ষার গুরুত্ব খালি তার পাশ-শংসাপত্রের জন্য। তবে এটি খালি এলিট এবং সঙ্গতিসম্পন্ন মা-বাবার সন্তানদের জন্য। কারণ এরা কোনও না কোনও বড় কোচিং সেন্টারে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে তার আর স্কুলের শিক্ষার কোনও দরকারই পড়ে না। সেখানে যোগ্য-অযোগ্য শিক্ষকের কী মূল্য আছে বলুন তো! এখন আপনি বলতে পারেন স্কুলশিক্ষা মানে খালি পড়া নয়। আনেকের সঙ্গে নিজেকে মেলানো, সমাজকে জানাবোঝা, সহমর্মিতা তৈরি হওয়া। সে আপনি বলুন তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের শিক্ষানীতি প্রথাগত শিক্ষাকে বাতিল করে কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষার উপর দীর্ঘদিন ধরে জোর দিচ্ছে। নয়া শিক্ষানীতি তো শিক্ষার বাণিজ্যকরণের একটি আদর্শ দলিল। বর্তমানে বেশিরভাগ রাজ্য সরকারি নামী বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের ভর্তির পরীক্ষা নেয়। আর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য সর্বভারতীয় পরীক্ষা আলাদা করে হয়। জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেইন-অ্যাডভান্স), নিট, ক্ল্যাট এইসব ছেড়েই দিলাম। তাহলে দেখা যাচ্ছে এগুলির কোনওটার জন্যই উচ্চমাধ্যমিক পাশ যোগ্যতামান ব্যতিরেকে আর এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। খালি স্থানীয় সরকারি কলেজ, আইটিআই, পলিটেকনিক, বৃত্তিমূলক দক্ষতাবৃদ্ধির প্রতিষ্ঠান যেখানে পড়ুয়াদের জীবনযাপনের থেকে হাজার যোজন দূরে থাকা দায়হীন অতিউচ্চ মাইনের স্থায়ী অধ্যাপক, কম মাইনের মর্যাদাহীন চুক্তি ও আংশিক সময়ের শিক্ষক, দুর্বল পরিকাঠামো, পছন্দের বিষয় মেলা দুষ্কর সেখানে উচ্চমাধ্যমিকের ফল গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকে লড়াই করে মেহনতি ঘর থেকে কিছু কুমিরছানা ঠিকই বেরিয়ে আসে। তাদের কাহিনি রঙিন হয়ে ওঠে পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থার বিজ্ঞাপন হিসেবে। খালি একটা ভয়ঙ্কর তথ্য রাখছি। ২০০৭-০৮ সালে উচ্চশিক্ষায় বার্ষিক গড় খরচ ছিল ১৪৫৩২ টাকা আর ২০১৩-১৪ তে সেটা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ৩০৮৮৭ টাকা।[1]

ওই নিবন্ধটিতেই টেবিল ৮-এর থেকে দেখা যাচ্ছে যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেছে তাদের মধ্যে গরিব-অতিগরিব মাত্র ৯.৭ শতাংশ আর বাকিরা হচ্ছে মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানেরা। আপনাকে এত তথ্য দেখতে হবে না। যে-কোনও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বা আইটিআইতে গিয়ে দেখতে পারেন উচ্চবর্ণ হিন্দু এবং স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর ঘরের থেকে আসা পড়ুয়া খুবই কম, আর দেখবেন যে-কোনও সরকারি নামী ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল কলেজে এর উল্টো চিত্র। ওসব জায়গায় বেশিরভাগই সঙ্গতিসম্পন্ন পরিবারের।

সুতরাং এক গরিব, অতিগরিব বা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান যখন পরিবারের রোজগারের এক-চতুর্থাংশ খরচা করে ডিগ্রি হাসিল করছে তখন এই বেকারির যুগে যেভাবে হোক অন্যদের ঠেলে ফেলে দিয়ে সিভিক পুলিস থেকে শিক্ষক যে-কোনও একটা চাকরি জোগাড় করার চেষ্টার মধ্যে অপরাধ আছে কি? না নেই। যখন পরিবেশটাই দুর্নীতির জন্মদাতা।

 

তাহলে কি পুঁজিবাদ না গেলে কি এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না?

সোজা কথায়— না হবে না। কিছুদিনের জন্য কিছু সংস্কার হতে পারে। শিক্ষা বিচ্ছিন্ন কোনও স্বর্গীয় পবিত্র ব্যপার নয়। শিক্ষকরাও নন। গরিবদের জন্য বিনামুল্যে উচ্চস্তরের শিক্ষা এবং ধনী-অতিধনীদের মাইনে দিয়ে উচ্চস্তরের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।[2] সবার জন্য সামাজিক সুরক্ষা-সহ কাজের বন্দোবস্ত করতে হবে এবং চাকরির বিভিন্ন পদের মধ্যে বিশাল বেতন-বৈষম্য রাখা যাবে না। এসব করলে দুর্নীতিকে কিছুটা পরিমাণে আটকানো সম্ভব। কিন্তু পুঁজিবাদ কি এই কাজ করতে দেবে? বাজার মুনাফা দেখে। এসব কাজ সেখানে বাধা। এক পুঁজিবাদী আইন উত্তরাধিকার কর নিয়েই যা নাকানিচোবানি অবস্থা। সেখানে শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষক দুর্নীতি নিয়ে চিৎকার মধ্যবিত্ত ন্যাকামো মাত্র।

 


[1] Tilak, Jandhyala BG. & Choudhury, Pradeep Kumar. Inequality in Access to Higher Education in India between the Poor and the Rich: Empirical Evidence from NSSO Data.
[2] সৌজন্যে, মার্কসের গোথা ক্রিটিক।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...