হর্ষবর্ধন-এর নতুন কীর্তি অথবা আড়াই বিঘা সমুদ্রে কাঁঠাল ফলার গল্প

দেবব্রত শ্যামরায়

 

কবি হলেন সত্যদ্রষ্টা। মানে কবিরা নাকি সত্যিটাকে দেখতে পান। কথাটা কোথায় যেন শুনে ফেলেছিলাম। মানে বুঝিনি, বোঝার কথাও নয়, কবিতার ব্যাপারস্যাপার এমনিতেই বেশ কঠিন। মানেটা বুঝলাম অনেকদিন পর, যখন দেখলাম সি পি এম-এর জমানার শেষদিকে দলে দলে কবি চেয়ার মোছার জন্য এক টুকরো ন্যাকড়া হাতে নিয়ে দল বদলাচ্ছেন।

সে যাই হোক, অযথা অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বললে লোকজন বিরক্ত হন। আসল কথাটা হল, শুধু কবিরা নয়, লেখকরাও অনেক কিছু দেখতে পান। যেমন ধরুন, হাসির রাজা শিব্রাম চক্কোত্তি। শিব্রামের একটা গল্প ছিল, আমি পড়িনি অবিশ্যি, আমার শোনা গল্প… আপনারা যারা বিদ্বান মানুষ, নিশ্চয়ই পড়েছেন। তবে পুরোটা আরেকবার শুনে রাখলে ক্ষতি নেই। গল্পটা অনেকটা এইরকম —

হষবর্ধন আর গোবর্ধন, দুই ভাই ট্রেনে চেপে দিল্লি যাচ্ছেন। যেতে যেতে দুই ভাই আজকের দিনে বিজ্ঞানের কী কী অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছেন। তা জানা গেল, মোগলসরাই স্টেশনে ট্রেন অনেকক্ষণ দাঁড়াবে। হর্ষবর্ধন বললেন, ‘চ গোবরা, এই ফাঁকে শহরটা ঘুরে দেখে আসি।’ যাওয়ার আগে, যাতে ফিরে এসে নিজেদের কামরাটাকে চিনতে পারেন, তাই কামরার ঠিক সামনে কিছু ঘাসপাতা দিয়ে একটা ছাগলকে দাঁড় করিয়ে রেখে গেলেন (মোগলসরাই স্টেশন চত্বরে কি ছাগলের আধিক্য বরাবরই ছিল? স্টেশনের নাম বদলানোর কারণটা কী? য-ফলাটা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যা-তেও য-ফলা, উপাধ্যায়-এও য-ফলা)। বেশ কিছুক্ষণ পর ঘুরেটুরে এসে তারা দেখেন, ছাগলটা তখনও নিশ্চিন্ত মনে কামরার সামনে বসে ঘাসপাতা খাচ্ছে। দুই ভাই যা বুঝতে পারলেন না সেটা হল, ছাগলটা একই, কিন্তু ট্রেন আলাদা। এর মধ্যে দিল্লির ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেছে আর তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে একটি বিপরীতমুখী হাওড়াগামী ট্রেন। দু’জনে ট্রেনে চড়ে বসে দেখলেন বেশ কিছু নতুন মুখ। ওপরের বাংকের লোকটিকে প্রশ্ন করলেন হর্ষবর্ধন, ‘দাদা, আপনাকে তো আগে খেয়াল করিনি! তা আপনি যাচ্ছেন কোথায়?’ উত্তর এল, ‘কলকাতা যাচ্ছি’। শুনে সোৎসাহে বলে উঠলেন হর্ষবর্ধন, ‘দেকেচিস্ গোবরা, এই হল বিজ্ঞানের আরেক উন্নতি! আমরা কামরার নিচের লোক সবাই দিল্লি যাচ্ছি, আর ঐ উপরের বার্থের লোকেরা কলকাতা যাচ্ছে।’

তাহলে কী দাঁড়াল? এটাই দাঁড়াল সাহিত্যিক শিব্রাম চক্কোত্তিও একজন সত্যদ্রষ্টা। তা না হলে ঐ অতদিন আগে তিনি কী করে বুঝতে পারলেন যে আমাদের দেশে একদিন ঠিক এরকমই একজন হর্ষবর্ধন আসবেন, প্রকৃত প্রস্তাবে যিনি শিব্রামের হর্ষবর্ধন অন স্টেরয়েড, যিনি কালে কালে বিজ্ঞান বিষয়ে নানা যুগান্তকারী মতবাদ দেবেন। আর এই হর্ষবধনের নিজের ভাই না হলেও তাঁর পার্টিতুতো ভাইয়েরা সবাই একেকজন আস্ত গোবর্ধন অর্থাৎ দেশের গাইগরুদের সুখসমৃদ্ধি বর্ধনের জন্য তাঁরা প্রত্যেকে জীবনপাত করছেন।

এই হর্ষবর্ধনের কথাই শিব্রাম বলে গেছেন — সন্দেহটা প্রথম দানা বাঁধে আজ থেকে চার বছর আগে। ডা. হর্ষবর্ধন তখন সবে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন। দ্বিধাহীন চিত্তে জানিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের আদলে আমাদের দেশে স্কুলে তথাকথিত ‘যৌনশিক্ষা’ বা ‘সেক্স এডুকেশন’-এর কোনও দরকার নেই। তেমনই এইডস রুখতে দরকার নেই কন্ডোম, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়া থাকলেই এদেশে আটকে দেওয়া যাবে এইডস-কে। পবিত্র হিন্দু ভারতের এই দর্পিত ঘোষণায় সেদিন চমকে উঠেছিল ব্যাভিচারী পশ্চিমি দুনিয়া। সেই শুরু। হর্ষবর্ধনের ছকভাঙা প্রজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের দায়িত্ব দিলেন। এসেই পদ্মবনে হস্তীযথা তুলকালাম বাধিয়ে দেন হর্ষ। সেবার মুম্বই শহরে বসেছিল ১০২ তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশন। ক্যাপ্টেন আনন্দ বোদাস ও অমেয় যাদবকে দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর পেপার পেশ করান হর্ষবর্ধন, যা থেকে জানা যায় যে ঋষি অগস্ত্য ও ঋষি ভরদ্বাজ দু’জনে মিলে প্রাচীন ভারতেই আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন বিমান তৈরির প্রযুক্তি, রাইট ভাতৃদ্বয়ের জন্ম নিতে তখনও কয়েক হাজার বছর বাকি। এমন এক বিমান বানিয়েছিলেন ঋষিদ্বয়, যা কিনা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যেতে পারত শুধু তাই-ই নয়, এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহেও পাড়ি দিতে পারত সেই যান। প্রমাণ চাই? দেশের অলিতে গলিতে যান, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করুন — কুবেরের পুষ্পক রথের কথা, রাবণের বিমানের কথা, যাতে করে তিনি মাতা সীতাকে হরণ করে পালিয়েছিলেন। এমন কাউকে পাবেন না যে এইসব প্রাচীন উড়োজাহাজের কথা জানে না। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের মুখের কথার চেয়ে বড় প্রমাণ আপনি আর কী চান, মশাই? এইভাবে তুড়ি মেরে প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব যখন প্রমাণ করছিলেন ডা. হর্ষবর্ধন এণ্ড কোম্পানি, তখন সামনের দর্শকাসনে মুখ চুন করে বসেছিলেন ছ’জন নোবেলজয়ী আর চারজন ফিল্ডস মেডালপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী।

তিন বছর পর, এবারেও সেই একই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি। খাব তো খাব আমই খাব! এবার হর্ষের লক্ষ্য বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। মনিপুরের বিজ্ঞান কংগ্রেসে সদ্যপ্রয়াত হকিংয়ের স্মরণে বলতে উঠে হর্ষবর্ধন জানালেন — স্টিফেন হকিং নাকি একবার বলেছিলেন, আইনস্টাইনের E=mc2 সমীকরণের চেয়ে বেদের তত্ত্ব অনেক এগিয়ে। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে হতভম্ব সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র খোঁজার হোমওয়র্ক দিয়ে নায়কোচিত ভঙ্গিমায় দিল্লির বিমান ধরতে এগিয়ে যান হর্ষবর্ধন। দেশজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাহীন, ইংরেজি কাগজের অশিক্ষিত বৃহৎ-লাঙুল ‘সেকু’ সাংবাদিককুল, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, এখনও এই অতলান্ত তথ্যের ‘সোর্স’ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, থই পাচ্ছেন না।

নিন্দুকেরা এত সহজে জমি ছাড়তে রাজি নয়। বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে হিন্দুবিরোধীদের লাগাতার হামলা শুরু হয়েছে। স্টিফেন হকিং-এর ট্রাস্টি নাকি হর্ষবর্ধনের বক্তব্য পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছেন। কী দুঃসাহস! বেদের সঙ্গে নাকি আইনস্টাইনের থিওরির কোনও সম্পর্ক নেই। এত সহজে কি বলে দেওয়া যায় সবকিছু? এই মায়াপ্রপঞ্চময় বিশ্বতরুর শিকড়ে কখন রস জমে, সেই রস কখনই বা ঠেলা মারে কুলকুণ্ডলিনীর মূলে, তা বোঝা কি মুখের কথা? আড়াই বিঘা সমুদ্রে কাঁঠাল কত ফলে সে হিসেব করা গেলে বেদের সঙ্গে E=mc2 মেলানো যাবে না কেন? আচ্ছা, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহারও নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই! হ্যাঁ, হ্যাঁ, ইনি সেই মেঘনাদ সাহা যিনি সত্যেন্দ্রনাথ বোসের সঙ্গে একসাথে মিলে আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতাবাদ’ সর্বপ্রথম জার্মান থেকে ইংরেজিতে তর্জমা করেছিলেন। জানেন কি, এই মেঘনাদ সাহাই আমাদের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে একদা বলেছিলেন, ‘সব বেদে আছে!’ (যদিও ‘সব ব্যাদে আছে’ বলে ছাপা হয় লেখাটা; ছাপার ভুল, য-ফলাকে সবসময় পাত্তা দেবার দরকার নেই) আপনারা বলছেন, স্টিফেন হকিং নাকি যুক্তি ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর বইপত্রে মাঝে মাঝে ‘প্লেফুলি’ ঈশ্বর ও তৎসম্বন্ধীয় টার্ম-এর অবতারণা করলেও, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে খাঁটি নাস্তিক ও ভাববাদী বা অপ্রামাণ্য কোনও কিছুকে অগ্রাধিকার দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তা বেশ! এতই যদি নাস্তিক্যের অহং তাঁর, যে বিজ্ঞানের এমন অনুগত সেবাদাস ছিলেন উনি, সেই বিজ্ঞান ওঁর অসুখ সারিয়ে দিতে পারল না কেন? সারা জীবন ধরে যে ঈশ্বরকে অস্বীকার করে গেছেন উনি, তাঁর হাতেই কেন শেষমেশ সঁপে দিতে হল নিজেকে? ফেসবুক জুড়ে এই সমস্ত চোখা চোখা প্রশ্ন করছেন ভারত-বাংলাদেশের ধর্মবাদীরা, চোখে পড়েছে আপনাদের? বেঁচে থাকলে এসবের কী উত্তর দিতেন প্রোফেসর হকিং? বরং বেঁচে থাকাকালীন, খানিক সুবুদ্ধি হলে একবার ঘুরে যেতে পারতেন এদেশে। কে বলতে পারে, মনে ভক্তি থাকলে, বিনয় থাকলে, গোময় ও গোমূত্রের ধন্বন্তরি চিকিৎসায় হয়তো সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন ওঁকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন ডা. হর্ষবর্ধন।

বেদের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে নামোচ্চারণ করে সম্মান জানানো হল হকিংকে, পরিবর্তে হর্ষবর্ধনকে অপমানিত করার চেষ্টা হচ্ছে। বলার চেষ্টা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এমন একটি মন্তব্য করে প্রতিষ্ঠান ও দেশের জন্য অসম্মান ও টিটকিরি ডেকে এনেছেন ডা. হর্ষবর্ধন। আসলে হিন্দু ভারতের এই পুনরুত্থান সহ্য করতে পারছে না ইহুদি-নাসারা-ইসলামিস্টরা। বেদের বিজ্ঞান, উপনিষদের রসায়ন, মনুস্মৃতির সমাজবিদ্যা উঠে দাঁড়ালে ভাত বন্ধ হয়ে যাবে প্রথম বিশ্বের। তাই প্রথম বিশ্বের দালাল, মেকলের অবৈধ সন্তান যারা, সেই তথাকথিত সেকুলার শিবির কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে এইসব পবিত্র উদ্যোগের। যতদিন না সংবিধান থেকে সরিয়ে দেওয়া যাচ্ছে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামের ম্লেচ্ছ মতাদর্শটিকে, নিকেশ করা যাচ্ছে বেদবিরোধী অব্রাহ্মণ ও অহিন্দুদের, ততদিন এই অপচেষ্টা চলবেই।

‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরি’র লেখক শিব্রাম বেঁচে থাকলে আজ অবশ্য এই নতুন হর্ষবর্ধনের পাশে দাঁড়াতেন না। কিন্তু হর্ষবধনের আজ আর কাউকে দরকার নেই। ছাপ্পান্ন ইঞ্চির প্রধানমন্ত্রী এই মিশনে তাঁর পাশে আছেন, হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধনের ‘মন কি বাত’ একই। অলিখিত রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় সদর্পে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। হিন্দু ভারতে সংখ্যায় ক্রমবর্ধমান খাটালগুলি থেকে গাভীবৃন্দের সমবেত উল্লাসধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...