মাঠের চৌহদ্দি পেরিয়ে ফুটবল যখন জীবনের ব্যালাড

সূর্য শেখর দাস

 

এই নিবন্ধ আজ যখন প্রকাশিত হবে, ২০১৮-র বিশ্বকাপ কার্যত ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছে । বেশ কিছুদিন গোটা বিশ্ব মোহিত হয়েছে অনবদ্য এক উৎসবে– যেখানে স্পেনের বিরুদ্ধে রোনাল্ডোর অনবদ্য ফ্রিকিক, মেসির নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে সেই অপার্থিব গোল, এমব্যাপির স্বপ্নের দৌড়, ব্রাজিলের সাম্বা উৎসব , উরুগুয়েরর ল্যাটিন আমেরিকান শিল্প, জাপানের হার-না-মানা মনোভাব, ইংল্যান্ডের সিংহবিক্রম, বেলজিয়ামের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ক্রোয়েশিয়ার অবিশ্বাস্য সূক্ষ্মতা, স্প্যানিশ আরমাডার উদ্বেল রূপ গোটা পৃথিবীর তারিফ কুড়িয়েছে, ভুলিয়ে রেখেছে দৈনন্দিন জীবনের নানান সমস্যাকে। কিন্তু ফুটবল শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, শুধুই বিনোদন নয়, ফুটবল খেলার মাঠের বাইরের অসাম্য, অন্যায়, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কখনও হয়ে ওঠে ব্যক্তি মানুষ ও সমষ্টিগত মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও লড়াইয়ের অস্ত্র। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ছড়ানো আছে এমন অনেক কাহিনী। এই নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করছি তার থেকে তিনটি।

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে গ্যারিঞ্চা

চেহারাতে আদৌ কোনও বিশেষত্ব নেই। উল্টে শিরদাঁড়া ইংরেজি বর্ণের S- র মতো বাঁকা। দু’টো পায়ের একটা আবার আরেকটার তুলনায় ৬ সেন্টিমিটার ছোট। এক ডাক্তার তো বলেই দিলেন, এ তো প্রায় বিকলাঙ্গ! এ খেলবে কী! তাহলে কি সারাজীবন ছেলেটি প্রতিবন্ধী হয়েই কাটাবে? আর পাঁচজনের করুণার পাত্র হবে? তবু ছোট্ট ছেলেটির খেলার খুব ইচ্ছে। বাবা চূড়ান্ত মদ্যপ। দাবানলের মতো অভাব ঝলসে দেয়। ঘুপচি একটা ঘরে থাকতে হয়। ভালো আলো -বাতাস খেলে না ঘরে। প্রচণ্ড গরমে সব কিছু ঝলসে যায়। বৃষ্টিতে ভেসে যায় চারপাশ। শূন্য পাকস্থলীতে খিদে তার ধারালো দাঁত দিয়ে কামড় বসায়। কিন্তু একটা ফুটবল পেলেই এ ছেলে সব দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে যায়। এই ছেলেটিকে ঠিকঠাক চিনতে পেরেছিল একমাত্র স্নেহপ্রবণ দিদি রোসা। দিদি নাম দিল গ্যারিঞ্চা। গ্যারিঞ্চা ছোট্টো wren পাখির অপর নাম। ছোট্ট শরীর নিয়ে ছেলেটি কি সুন্দর দৌড়ায়, যখন পায়ে থাকে ফুটবল ! এ যেন এক অনন্য নির্ভার উড়াল!

সেই ‘প্রতিবন্ধী’ গ্যারিঞ্চা সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ dribbler হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ওঁর dribbling বিঠোভেনের সিম্ফনিকে মনে করিয়ে দেয়। পণ্ডিতরা বলবেন পেলে হলেন সর্বকালের সেরা ব্রাজিলিয় ফুটবলার। তবু বহু ব্রাজিলিয়র মতে গ্যারিঞ্চা কোনও অংশে পেলের চেয়ে পিছিয়ে নেই। দু-জনেরই বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটে ১৯৫৮-তে। পেলে চমকে দেন গোল করে, গ্যারিঞ্চা মন্ত্রমুগ্ধ করেন পায়ের সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে।

১৯৬২-র বিশ্বকাপ। তার দু-বছর আগেই ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং সুনামিতে বিধ্বস্ত আয়োজক দেশ চিলি। আকাশে- বাতাসে বিষণ্ণতার বার্তা। অসন্তুষ্ট বিদেশি মিডিয়ার ক্ষোভ প্রকাশ। এরই মধ্যে পেলে দ্বিতীয় ম্যাচেই চোট পেয়ে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেলেন! ইন্দ্রপতন! মারাত্মক ধাক্কা খেল ব্রাজিল। গুঞ্জন শুরু হল… ব্রাজিল কি তাহলে দ্রুত বিদায় নেবে? জোগো বোনিটো বা beautiful game কি থমকে গেল? এই কঠিন মুহূর্তে গ্যারিঞ্চা নিজের জাত চেনালেন। বিপক্ষের ডিফেন্স তছনছ করে গোলের রাস্তা খুলে দিলেন, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গ্যারিঞ্চার করা জোড়া গোল সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে বিস্ময়াবিষ্ট করল। সেমিফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে ওঁর আবার জোড়া গোল। সেই গোল এতই অপার্থিব যে চিলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ খবরের কাগজ এল মারকিউরিও লিখে ফেললো, “What planet is Garrincha from?” ফাইনালে প্রতিপক্ষ চেকস্লোভাকিয়া। গ্যারিঞ্চা ঝড়ে চেকরা উড়ে গেল। সব অর্থেই গ্যারিঞ্চা The Angel With Bent Legs। ম্যাচের ফল ব্রাজিলের পক্ষে ৩-১। গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে তখন সাম্বার প্লাবন। সেই প্লাবনে যাবতীয় হতাশা ধুয়ে মুছে সাফ। কার্যত একক দক্ষতায় পেলেবিহীন ব্রাজিলকে আবার বিশ্বকাপ এনে দিলেন গ্যারিঞ্চা।

১৯৬২-র বিশ্বকাপ গ্যারিঞ্চার বিশ্বকাপ। কার্যত প্রতিবন্ধী হিসেবে যাঁর জীবনটা অন্ধকারে আকীর্ণ থেকে যেতে পারত, তিনি যাবতীয় ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অভিজ্ঞান এঁকে গেলেন। নিজেকে মুহূর্তের জন্যও প্রতিবন্ধী ভাবেননি। হাহুতাশ করেননি। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন। এখানেই গ্যারিঞ্চার শ্রেষ্ঠত্ব। এখানে আরও একটা কথা উল্লেখযোগ্য। গ্যারিঞ্চা নিজে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করেছেন বলে সাধারণ ব্রাজিলিয়দের দুঃখ-দুর্দশা অন্তর থেকে অনুভব করতেন। তাই খেলার ময়দানে নিজের সেরাটুকু দিতে একটুও দ্বিধা করতেন না।

ইউসেবিওর উৎসব

মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছেলে সারাক্ষণ খেলে বেড়ায়।ছেলের বয়স যখন আট, বাবা মারা গেলেন। দারিদ্র ব্ল্যাক মাম্বার মতো ক্রমাগত ছোবল মেরে যায়। পেরেক বিধেঁ গেল পায়ে, তবু ছেলে ফুটবল ছাড়ে না। অনেক সময় কোনও ফুটবলই জোটে না, তখন ভরসা গোলাকৃতি কাগজের মণ্ড। বিদ্রুপ করে শ্বেতাঙ্গরা। ছেলের গায়ের রং যে কালো! পর্তুগিজ উপনিবেশ মোজাম্বিক। এখানেও সাদা- কালোর বিভাজন প্রকট। সুযোগ পেলেই শ্বেতাঙ্গরা অপমানের থুতু কালোদের ওপর ছিটিয়ে দেয়। পুলিশ- প্রশাসন কালো চামড়ার লোকদের ইচ্ছে করে হেনস্থা করে। অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে কালোদের ব্রাত্য করে রাখা হয়। বলার মতো তো একটাই জায়গা… খেলার মাঠ। যেটুকু বেঁচে থাকার অক্সিজেন পাওয়া যায় তা মাঠে-ময়দানেই। ছোট ছেলেটা ভাবে, যা জবাব দেওয়ার সেটা মাঠেই দিতে হবে। মা কোনও তল-কূল খুঁজে পান না। ম্যাড়মেড়ে মোজাম্বিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে আসা মাঠগুলোতে যখন অন্ধকার নেমে আসে অথচ ছেলে বল নিয়ে মশগুল…মা খানিকটা অসহায় বোধ করেন। কী হবে খেলে? তার থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করলে তো কাজে দেয়! তবু ছেলে নাছোড়বান্দা। মাথার মধ্যে কে যেন বলে যায় অপমানের জবাব দিতে হবে তবে সেটা মুখে নয়…

ফুটবল খেলেই দিতে হবে।

সেই ছোট্ট ছেলেটিই ইউসেবিও। ক্ষিপ্রতায় তিনি যেন চিতাবাঘ, তাই তো তিনি black panther নামে পরিচিত। প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার যিনি ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব শ্রেষ্ঠত্বের অভিজ্ঞান এঁকে গেছেন। খেলার মাঠে ছড়িয়েছেন অজস্র মণি-মুক্তো। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফার রেকর্ড বুক বলছে, ইউসেবিও ৬৭৮ ম্যাচে ৬৭৯ গোল করেছেন! এক কথায় অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স! তবে ইউসেবিওর শ্রেষ্ঠ খেলা অবশ্যই ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে। পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল মোজাম্বিক, তাই উনি বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়েই খেলেছেন। তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মহাকাব্যিক জোড়া গোল। ব্যস, ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেল। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ০-৩ গোলে পিছিয়ে পর্তুগাল। ইতিমধ্যেই উত্তর কোরিয়া ইতালির মতো মহাশক্তিধর দলকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছে। তাহলে কি পর্তুগিজদেরও ধ্বংস করবে কোরিয়ানরা? কিছু সাংবাদিক তো রীতিমতো ম্যাচ রিপোর্ট লিখতে শুরু করে দিলেন! সারা জীবন ধরে বহু অপমানে বিদ্ধ হওয়া ইউসেবিও চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতাকেও হার মানিয়ে পরপর চারটে গোল করলেন। আর একটা গোলের রাস্তা করে দিলেন। নিশ্চিত হারা ম্যাচ ৫-৩ গোলে জিতে গেল পর্তুগাল। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হারতে হলেও ইউসেবিও ছিলেন প্রকৃত রত্ন। প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসে পর্তুগাল সবাইকে চমকে দিয়ে পেল তৃতীয় স্থান। সৌজন্য কালো চিতা ইউসেবিও। উনি ৬ ম্যাচে ৯ গোল করে বিশ্বকাপে টপ স্কোরার হলেন। যাবতীয় প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে ফুটবলের জন্মস্থানে ইউসেবিওর অনবদ্য ব্যক্তিগত নৈপূণ্য এক নিশ্চিত মাইলস্টোন। তিনিই প্রথম আফ্রিকান যিনি ইউরোপে খেলে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা করে নেন। আবেদি পেলে, মাইকেল এসিয়েন, দিদিয়ের দ্রোগবা এবং স্যামুয়েল এটুর মতো অনেক আফ্রিকান ফুটবলাররা যে ইউরোপে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন, এক্ষেত্রে পথ প্রদর্শক ইউসেবিওই।

শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ইউসেবিওকে মূল্যায়ণ করা যায় না। ঘরে খাবার নেই, গায়ের রং কালো বলে লোকে অসংখ্য বার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে অপমান করেছে, নিজের জীবনের ওপর চেপে বসা অনন্ত অন্ধকারের পর্বত ঠেলে এনেছেন এক অনি:শেষ আলো। কখনও অজুহাত দেননি। বিবৃতির ফোয়ারা ছোটাননি। নিশ্চুপে নিজের কাজটা করে গেছেন। সাহেবদের ছুঁড়ে দেওয়া অপমানের থুতুর উপযুক্ত জবাব দিয়েছে তাঁর করা গোলগুলো। যা কথা বলেছে ওঁর বিখ্যাত ডান পা। যে ডান পায়ের কল্যাণে ১৯৬৬-র বিশ্বকাপের মঞ্চ হয়ে উঠেছিল অপূর্ব উৎসব মুখর।

মারাদোনার ম্যাজিক

মারাদোনা জন্মেছিলেন এক জঘন্য নোংরা বস্তিতে। সেই বস্তিতে সমাজবিরোধীরা দাপিয়ে বেড়াত। বাবা ছিলেন দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন। এক নিদারুণ শূন্যতা থেকে উঠে এসে দিয়েগো শ্রেষ্ঠত্বের এভারেস্টে উঠেছিলেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় তখন ভয়াবহ স্বৈরাচারী শাসন—হিটলারের লাতিন আমেরিকান সংস্করণ, আর্জেন্টিনার কুখ্যাত স্বৈরাচারী শাসক হর্গে ভিদেলা ক্ষমতায়। ১৯৭৬-১৯৮১, এই শাসনকালে ভিদেলা নিরীহ দেশবাসীকে ক্রমাগত স্বৈরাচারের পাথর দিয়ে থেঁতলে মেরেছেন। ভিদেলার কল্যাণে প্রায় ৩০০০০ আর্জেন্টিনিয় খুন হন বা মারা যান। পিটিয়ে হাড়-গোড় গুঁড়ো করে দেওয়া, ইলেকট্রিক শক দেওয়া, খুন করে লাশ নদীতে বা আটলান্টিক মহাসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া… কার্যত জল-ভাত ছিল। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নিশ্চিত ভাবেই খুন হয়ে যান। এরপর সেই ১৯৮২-র রক্তাক্ত ফকল্যান্ড বা মলভিনাসের যুদ্ধ। ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আর্জেন্টিনার লজ্জাজনক হার।

দারিদ্র পীড়িত শৈশব আর স্বৈরাচারী অত্যাচার নিপীড়িত দেশের মানুষ—দুইয়ের বিরুদ্ধে ফুটবল মাঠে জ্বলে ওঠার নাম মারাদোনা। ১৯৭৯-তে ১৮ বছরের মারাদোনা একার হাতে আর্জেন্টিনাকে যুব বিশ্বকাপ এনে দিলেন। কিন্তু ১৯৮২-র বিশ্বকাপে মারাদোনাকে প্রবল আক্রমণ করা হল। প্রায় প্রত্যেকটি খেলায় অন্যায়ভাবে মারা হল তাকে। শেষ পর্যন্ত মেজাজ হারিয়ে ব্রাজিলের বাতিস্তাকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখলেন। মারাদোনা মাঠ থেকে বিদায় নিলেন। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো আর্জেন্টিনা। মারাদোনার এই প্রস্থান বিশ্বকাপের ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক দৃশ্য। নিপীড়িত আমজনতা বাঁচার জন্য অক্সিজেন খুঁজেছিলো জাতীয় ফুটবল দল থেকে। উল্টে গোটা আর্জেন্টিনার সমাজ এক অবর্ণনীয় বিষাদের সমুদ্রে ডুবে গেলো।
অবশেষে এলো ‘৮৬-র বিশ্বকাপ। এবার আরও তৈরি দিয়েগো। খুঁজে নিয়েছেন নিজের জন্য আদর্শ কর্মভূমি। দক্ষিণ ইতালির নাপোলি ক্লাব হলো তাঁর চারণভূমি। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বিশ্বকাপ নামলেন মারাদোনা। গতবার পিষে দিয়ে দিয়েছিলো ইতালি, তাদেরই বিরুদ্ধে একক প্রচেষ্টায় অনবদ্য একটা গোল করলেন উনি। সেই বিখ্যাত solo run… আজুরিরা পেলো যোগ্য জবাব। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে চমৎকার একটা গোল করলেন মারাদোনা, রেফারি দুর্বোধ্য কারণে গোলটা বাতিল করে দিলেন। যদিও জয়ের গোলের রাস্তা উনিই গড়ে দিয়েছিলেন।

এরপর সেই ঐতিহাসিক আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ। যে ম্যাচের পরতে পরতে রয়েছে ‘৮২-র ফকল্যান্ড যুদ্ধের বারুদের গন্ধ। আগেই লিখেছি, ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনা হার স্বীকার করেছিল ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে। এই হার বহু আর্জেন্টিনিয় মেনে নিতে পারেননি। মারাদোনা নিজেই মানসিক ভাবে রক্তাক্ত হয়েছিলেন। উনি আত্মজীবনী “I am El Diego” -তে লিখেছেন যে বহু আর্জেন্টিনিয় শিশু ওই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। যেভাবে ছোট্ট পাখিদের হত্যা করা হয়, সেভাবেই ব্রিটিশরা নিকেশ করেছিল শিশুদের। অন্তত ৬৪৯ জন আর্জেন্টিনিয়র মৃতদেহ প্রতি মুহূর্তে আর্জেন্টিনা দলকে প্রশ্ন করে গেছে। সেই উত্তরটা দেওয়ার জন্যই ছটফট করছিলেন দিয়েগো। বিপক্ষ প্লেয়ারদের ক্রমাগত আক্রমণে ক্ষত- বিক্ষত শরীরটা আবার নতুন করে জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হল । মারাদোনার প্রথম গোলটা হাত দিয়ে করা, যা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তারপর সেই দ্বিতীয় গোল যা বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বকালের সেরা গোল। নিজেদের অর্ধ থেকে ৬৬ গজ দৌড়ে ছ’জন ইংরেজ কে dribble করে এই গোল ফকল্যান্ড যুদ্ধে যাবতীয় নিহত আর্জেন্টিনিয়দের প্রতি প্রকৃতই শ্রদ্ধার্ঘ। উড়ে গেল ইংরেজরা, আর্জেন্টিনার আকাশে যেন উঠল নতুন স্বাধীনতার সূর্য, অত্যাচারী ভিদেলার ছবি মুছে গেল। অপ্রতিরোধ্য মারাদোনা, অদম্য আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬৬ গজ দৌড়ে করা দিয়েগোর এই গোল শুধু বিশ্বকাপের মঞ্চে কেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। যুদ্ধে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া বহু মানুষ আবার নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ পেলেন। একটা ফুটবল ম্যাচ শেষপর্যন্ত বহু মানুষের জীবনের ভাষ্যকার হয়ে উঠল। সৌজন্য সেই মারাদোনা। সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে দু’টো অনবদ্য গোল করলেন উনি। বিশেষ করে দ্বিতীয় গোলটা যেন মাইকেল Angelor শিল্প সত্তায় উদ্ভাসিত। তারপরে ফাইনাল, যেখানে মারাদোনার দুর্দান্ত পাসে গোল করলেন বুরুচাগা, আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্ব-চাম্পিয়ন হল। স্বাভাবিক ভাবেই মারাদোনা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের সম্মান পেলেন। ফুটবলের মতো টিম গেমে একজন একক দক্ষতায় বিশ্বকাপ এনে দিচ্ছেন, মারাদোনা সত্যিই অনন্য।

শুধু কি শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে আর্জেন্টিনার মহানায়ক-কে মূল্যায়ন করা উচিত হবে? না। ছিবড়ে হয়ে যাওয়া দেশের অনন্ত প্রত্যাশার চাপ নিয়ে খেলা, জীবনের কার্যত শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশের জন্য লড়াই করা, অসহ্য যন্ত্রণাকে হাসি মুখে মেনে নেওয়া… এইসব কিছু শুকনো রুটির মতো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না। নাপোলিতে যখন খেলেছেন তখন সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস।… নাপোলি ফুটবল ক্লাব ইতালির দক্ষিণে নেপলসে অবস্থিত। মারাদোনা যখন খেলতেন তখন দক্ষিণ ইতালি, উত্তর ইতালির চেয়ে আর্থিকভাবে রীতিমতো পিছিয়ে ছিল। কর্মসংস্থান, পানীয় জল থেকে শৌচাগার… পরিকাঠামোগত দিক থেকেও পিছিয়ে ছিল দক্ষিণ ইতালি, নেপলস। নেপলস যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা! সব জায়গায় ধাক্কা খাচ্ছে সাধারণ মানুষ, জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষ একটা ফুটবল ক্লাবকে ধরে বাঁচতে চাইছে। সেই সময় উত্তর ইতালির ক্লাবগুলো আর্থিকভাবে রীতিমতো সমৃদ্ধ ছিল। জুভেন্টাস, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, এরাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেরা টুর্নামেন্টগুলো জিতত। কারণ এরা বিশ্বের বিখ্যাত ফুটবলারদের অর্থের জোরে খেলাতে পারত। টাকার অভাবে পিছিয়ে পড়ত নাপোলির মতো ক্লাবগুলো। মারাদোনার ম্যাজিকে নাপোলি ইতিহাস তৈরি করল। তুলনামূলক ভাবে গরিব দক্ষিণ ইতালির এই ক্লাব প্রথম বারের জন্য Scudetto বা ইতালিয় লিগ জিতল ১৯৮৬-৮৭ মরসুমে । এছাড়া মারাদোনার দৌলতে আরও অনেক সাফল্য পেয়েছে নাপোলি। একটা নড়বড়ে টিমকে কীভাবে নেতৃত্ব দিয়ে প্রায় একার হাতে সাফল্যের আলোকবৃত্তে নিয়ে যেতে হয় তার সার্থক দৃষ্টান্ত এই কিংবদন্তি আর্জেন্টিনিয়।

শেষ পাত…

ফুটবল খেলায় আজকে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। অমুক ক্লাব থেকে তমুক ক্লাবে আনার জন্য ইউরোপে খেলোয়াড়দের কয়েক শ কোটি টাকার বিনিময়ে কেনা হয়। কিন্তু ফুটবল শুধু টাকার খেলা নয়। গ্যারিঞ্চা, ইউসেবিও বা মারাদোনার মতন খেলোয়াড়ের উদাহরণ প্রমাণ করে যে শারীরিক, সামাজিক, আর্থিক সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে একজন মানুষের দক্ষতাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আবার সেই ব্যক্তি মানুষের দক্ষতা যখন নানান সমস্যায় জর্জরিত দেশকে ফুটবল বিশ্বের সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যায়, তখন সেই দক্ষতা শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তির উৎকর্ষের পরিচয় দেয় না, তা হয়ে ওঠে গোটা দেশের মানুষের ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দের উদযাপন।

আগেই বলেছি, এবারের বিশ্বকাপ একদম শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাকি শুধু ফাইনাল। বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি , উরুগুয়ে, ইংল্যান্ডের মতো ফেভারিট দলগুলো,শুধু টিকে রয়েছে ফ্রান্স … আর জীবন যুদ্ধে এক অনন্ত আশাবরীর মতো দাপটের সঙ্গে বেঁচে রয়েছে মাত্র চার মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট ক্রোয়েশিয়া। জনসংখ্যার নিরিখে ক্রোয়েশিয়া আমাদের প্রিয় কলকাতার থেকেও পিছিয়ে। তবু সুতীব্র আত্মবিশ্বাস এবং অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তির জোরে আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছে। নক আউট পর্বের তিনটি ম্যাচেই ১২০ মিনিটের লড়াই লড়তে হয়েছে ক্রোয়েশিয়াকে। লড়াই! লড়াই যে ক্রোটদের জন্মগত।যেমন বর্তমান অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ। চোখের সামনে দেখেছেন কীভাবে সার্বিয়ান জঙ্গিদের হাতে খুন হয়ে যান তাঁর নিরীহ, নিরপরাধ ঠাকুরদা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা শরীর, মদ্রিচের ফুটবলেও রক্ত লেগে যায়। অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সারা মাঠ একা দৌড়ে বেড়ান মদ্রিচ, প্রতিজ্ঞা করেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেই উপযুক্ত জবাব দেবেন।… গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান ঠাকুরদা, মদ্রিচের ডান পা থেকে বেরোনো গোলার মতো শট আর্জেন্টিনার যাবতীয় প্রতিরোধকে চুরমার করে দিয়ে গোলে জড়িয়ে দিয়ে বিখ্যাত জয় এনে দেয়। টাইব্রেকারে মারাত্মক চাপের মুহূর্তে ঠিক গোল করে যান। ওঁর কাছে প্রতিটা দিনই যেন জীবনের শেষ দিন, প্রত্যেকটা ম্যাচই ফাইনাল। জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড ওঁর কাছে যেন gold dust। মৃত্যুও যেন তুচ্ছ এবং ক্যাবলা হয়ে যায় এঁর কাছে। প্রথমে গোল খেয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ছে ক্রোয়েশিয়া, টিমকে উদ্বুদ্ধ করতে জুরি নেই মদ্রিচের। বলকান যুদ্ধের ট্যাংকারে পিষে যায় সমগ্র ক্রোয়েশিয়া, তবু ক্রোটদের আত্মাকে শত্রুরা খুন করতে পারেনি। এঁরা শেষ রক্তবিন্দু লড়াই করে যান। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটার কথা ভাবুন। পায়ের অসহ্য যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়েও মাঞ্জুকিচ জয়ের ঐতিহাসিক গোলটা করে যান। যা ক্রোয়েশিয়াকে প্রথম বারের জন্য বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে দিল। এঁদের সনাতন জার্সি দাবার ছকের মতো। কোচ দালিচ প্রবলতম চাপের মুখেও একজন চ্যাম্পিয়ন গ্র্যান্ড মাস্টারের মতো একটার পর একটা নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেন। ক্রোয়েশিয়াতে ক্যাথলিক এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মধ্যে মারাত্মক বিরোধ। যে বিরোধের মাঝখানে পড়ে গিয়ে প্রতিটা দিন মানসিকভাবে গুলিবিদ্ধ হতে থাকেন গোলকিপার সুবাসিচ। তাই তাঁর জীবনের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় দেশের গোল রক্ষা করা। সেইজন্যই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নলি কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে করতেও মাঠ ছেড়ে চলে যাননি, পেনাল্টি শুট আউটে তাঁর বিশ্বস্ত হাত দেশকে জিতিয়ে দেয়। এসব কিছুর ফাঁকেই পেরিসিচের খেলায় ফুটে ওঠে ক্রোয়েশিয়ার সেই অনবদ্য, আদিগন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যা দেখে জর্জ বার্নাড শ হয়তো কবর থেকে উঠে এসে তাঁর সাহিত্যের ক্যানভাস আবার বর্ণ দিয়ে বর্ণিল করে তুলতে চাইবেন।

এবং ফ্রান্স। তাঁদের সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপ। সাল টা ১৯৯৮।সেই ফ্রান্স বনাম ক্রোয়েশিয়া সেমিফাইনাল। ঘরের মাঠে পিছিয়ে পড়ল ফ্রান্স। আইফেল টাওয়ার চত্বরে তখন বিষণ্ণ বৃষ্টি একাকী ঝরে পড়ে। তাহলে কি ফুটবলের ফরাসি বিপ্লব থমকে গেল?… ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কবিতার গভীরতাকে আবার ফুটিয়ে তুললেন লিলিয়ান থুরাম। সম্মোহিত হল সমগ্র ফুটবল বিশ্ব। ডিপ ডিফেন্স থেকে উঠে এসে থুরাম জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলে দিলেন। তারপর ছোটবেলায় দিনের পর দিন অবহেলার শিকার হওয়া আলজেরিয় শরণার্থীর সন্তান জিদানের ম্যাজিক। জিদানের সেই মহাজাগতিক জোড়া গোল। পতন হল তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের। বহু ফরাসিদের কাছেই তা ফুটবলের জগতে এক বাস্তিল দুর্গের পতন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো সাহিত্যের দেশ ফ্রান্স। তখন পৃথিবী পেল আর এক নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

এবার কী হবে? অদম্য ক্রোয়েশিয়া কি ‘৯৮-র বদলা নিতে পারবে? পারবে বিশ্বকাপ জিতে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করতে? অধিনায়ক মদ্রিচ পারবেন রক্তাক্ত একটা জাতিকে বিশ্ব জয়ের স্বাদ এনে দিতে? নাকি আরও একবার ফুটবলের ফরাসি বিপ্লব ঘটবে? মদ্রিচ, রাকেতিচ, পেরসিচদের বিরুদ্ধে টক্কর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত এমব্যাপি, পোগবা এবং গ্রিজম্যানরা। কে হাসবে শেষ হাসি? প্যারিস কি আবার উদ্বেলিত হবে? নাকি জাগ্রেব জীবনের নতুন রং মাখবে?

আর তো শুধু মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...