মাননীয় ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়…

সোহম দাস

 

আরেকটা জন্মদিন পার করলেন। আরও করবেন। আপনি কেমন আছেন এটা জিজ্ঞাসা করে আপনাকে বিব্রত করব না। আসলে অনুমান করার ক্ষমতাটা এখনও মরে হেজে যায়নি আমাদের, এটুকুই বলতে পারি আপনাকে। বাকিটুকু নীরবতা থাক।

যাইহোক, সরাসরি কিছু কথায় আসি! আপনার দ্বিশতবর্ষ হবে, জানেন তো? প্রস্তুতি, উঁহু, সেই অর্থে চোখে পড়েনি। চোখে পড়ে না। পড়বে হয়তো। আরও কদিন যাক। অবশ্য আপনার দ্বিশতবর্ষ পালন হবে কী হবে না, সেটা এখানে বিষয় নয়! বিষয়টা অন্যখানে। আপনি কন্যাশ্রী, মাজী কন্যা ভাগ্যশ্রী, বেটি বাঁচাও বেটি পড়হাও এই নামগুলো শুনেছেন? শোনেননি। কী করে শুনবেন, আপনি তো এখনও আটকে আছেন সেই আঠেরোশো ছাপ্পান্নয়। ২৬শে জুলাইয়ের ঘোষণায়। জন গ্রান্টের পাস করা আইনে। সাঁইত্রিশ হাজারের বিরুদ্ধে নেমে নশো সাতাশিকে সম্বল করে জিতে গেলেন আপনি। অভিনন্দন। শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন আর কালীমতি দেবী — আপনার লড়াইয়ে ওরা প্রথম যোদ্ধা। পরের দশবছরে বিরাশি হাজার টাকা খরচা করে ষাটখানা এমন অনুষ্ঠান পার করালেন! ধারদেনায় ডুবে গিয়েছেন তখন! তবু একটা স্ট্যাটিস্টিক্স বলছে, প্রথম পঞ্চান্ন বছরে বিধবাবিবাহের সংখ্যাটা মাত্র পাঁচশোয় আটকে! ঈশ্বরবাবু, আপনি সত্যিই কি জিতলেন?

ছোট্ট মেয়েটা বুঝলেন, নামটা ভারি সুন্দর ছিল। দেখতেও। মাধ্যমিক পাশের পর ওর বাবার মনে হল, অনেক পড়েছে। ছাঁদনাতলা, নহবত। এই কদিন আগে অ্যাসিড। খাদ্যনালী বেয়ে পাকস্থলী। আইন আইনের কাজ করবে কিনা জানি না। তবে ধারদেনা ওর বাবাও করেছিল, অনেক টাকার, আপনারই মতো! পার্থক্যটা কী, সেটা আপনি বুঝে নিতে পারবেন! মেয়েটা সবকিছু শুধে দিয়ে গেল! আরেকজন এরকমই কমবয়সে বিয়ে হওয়া, বর্ধমানের ধনী গয়না-ব্যবসায়ীর মেয়ে। ’৭৫-এ ওর বিয়ে যখন দিল ওর বাবা, তখন ওর বয়স মাত্র চোদ্দ। ক্লাস নাইনে পড়ত। কলকাতার গড়িয়াহাটের আরেক ব্যবসায়ী বাড়িতে বউ হয়ে এল। বাইশ বছরের মেয়েটাকে স্রেফ পিটিয়ে শেষ করে দিল স্বামী-শ্বশুর! কোর্ট-কেস চলেছিল, অনেকদিন! কলকাত্তাইয়া ব্যবসায়ী বাড়িটাকে একদম শেষ করে দেওয়া একটা মামলা — সেসব তো ঠিক আছে! একটা তথ্য আপনাকে জানিয়ে রাখি, যেবছর ওর বিয়ে দিয়েছিল ওর বাবা, সেবছরটাকে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ ঘোষণা করেছিল ইউনাইটেড নেশনস। যাক গে, ওই মেয়েদুটো তো নাহয় বেশিদূর পড়াশোনা করেনি! আরেকজনের কথা আপনাকে বলি! এমএ পাশ! এই বছর দুয়ের আগের ঘটনা। যাদবপুরের বাংলার ছাত্রী ছিল। বছর তেইশ বয়স। সারা শরীর জুড়ে ‘পৌরুষযাপনে’র অঙ্গীকার। পুলিশ প্রথমে কেস নিতে চায়নি। নিষ্পত্তি নেই!

আরও কয়েকটা বলি আপনাকে! প্লিজ, একটু ধৈর্য ধরে শুনবেন! আপনারই জেলার ঘটনা। কেরোসিন ঢেলে গায়ে আগুন দিয়ে মারল শ্বশুরবাড়ির লোকজন! কেন জানেন? শাশুড়ি ঠাকরুনের সাধের মধুচক্রে নামতে চায়নি মেয়েটা, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল! কিংবা ওই কালো মেয়েটা। এও আপনারই জেলার। মেদিনীপুর। পূর্ব-পশ্চিমের ভেদাভেদটা এখানে আর অন্তত জরুরি নয়! রংটা কালো, তার ওপর আবার মেয়ের মা! অতএব, সেই একই পন্থা! কেরোসিন, দেশলাই, এবং! ওহ, আগুন বলতে মনে পড়ল, আরেকজনের কথা আপনাকে বলি! হয়তো বলাটা সমীচীন হবে না, তবুও। এই বাংলারও ঘটনা না! তাও বলি! এক রাজপুত রমণী! নাহ না, মোগল-রাজপুত-মহারাণা এসব ইতিহাসের ভারিক্কি নামগুলোর আশেপাশে তিনি নেই! তিনি এই ক’বছর আগের একটা নিমিত্ত মাত্র। আঠেরো বছরের মেয়ে। সাতমাসের বিবাহিত জীবন। তারপর জ্বলন্ত চিতা। হিসেব বলছে, স্বাধীন ভারতে এটা নাকি চল্লিশতম সতীদাহের ঘটনা! ‘নষ্টে মৃতে প্রপ্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ’। ঈশ্বরবাবু, আপনি যেন কতগুলো মেয়েদের স্কুল করেছিলেন নিজের টাকায়? সাত বছরে পঁয়ত্রিশটা, না? মানে বছরে গড়ে পাঁচটা করে! ওই যে যাদবপুরের ছাত্রীটির কথা বললাম, এমএ পাশ, আরেকজন এমএ পাশকে আপনার মনে পড়ে? চন্দ্রমুখী বসু, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির প্রথম এমএ পাশ ছাত্রী! তাকে সেই ক্যাসেল’স ইলাস্ট্রেটেড ওয়ার্কস অফ শেক্সপিয়ার উপহার দিলেন, মনে আছে আপনার?

না, না, না, আপনাকে আমি একবারও অসম্মান করছি না, ভুল ভাববেন না আমাকে। আপনি মুখের সামনে জুতো দেখলে পালটা জুতোটা দেখাতে পারতেন। শুধু আপনাকে ছাড়া এই কথাগুলো কাকে বলব ভেবে পেলাম না! আসলে জাত হিসাবে আমরা যে বড় সুবিধের নই, সে তো আপনি বুঝেইছিলেন! নয়তো কী আর দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেন, যে এরকম জানলে কখনওই বিধবাবিবাহের ব্যাপারে হাতই দিতাম না! কিছু মনে করবেন না, শুধু কয়েকটা স্ট্যাটিস্টিক্সকে খাড়া করে আপনার হারা-জেতার হিসেব করলাম বলে! এই যে নামগুলো বললাম, এর বাইরেও, আরও নাম! আমাদের বাড়ির ভেতরেই থেকে যাওয়া যত মরবিডিটি! ওই মরবিডিটিটা খেয়ে ফেলছে আমাদের! বিশ্বাস করুন, এখানে আপনি কোত্থাও নেই, একটুও নেই!

তবু ভরসা জাগে জানেন তো! অ্যাসিডের কথা বলছিলাম, গোটা ভারতবর্ষে যত অ্যাসিড-আক্রমণ হয় পশ্চিমবঙ্গে হয় তার তিরিশ শতাংশ! কলকাতার সেই বীরাঙ্গনাটি, প্রতিবেশিনীকে স্বামীর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের মুখে এসে পড়েছিল জ্বলন্ত আশীর্বাদ! এখন নিজের দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন দিব্যি! র‍্যাম্পওয়াক! ওই রাসায়নিকের স্নেহ ঝরে পড়া আরেকটি মেয়ে, দক্ষিণ ২৪ পরগণার! একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে! বীভৎসভাবে কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় ঠিকরে বেরোয় আত্মবিশ্বাস। আয়নায় তাকাতে ভয় লাগে না তার। হাসিমুখে নিজের আত্মপ্রতিকৃতিকে তুলে ধরার স্পর্ধা। কিংবা ধরুন ওই রাজস্থানেরই ষাট বছরের বৃদ্ধা যিনি স্বেচ্ছায় সতী হতে চেয়েছিলেন, তাঁকে আটকে দেওয়ার সচেতনতা। এই দুটোর কোথাও কি এখনও থেকে যান আপনি, ঈশ্বর?

ওহ, আপনার একটা উপাধি ছিল, না? মাফ করবেন, ওই নামটায় ডাকার মতো মুখ মরে গেছে অনেকদিন! ভালো থাকবেন! আর হ্যাঁ, বিলেটেড হ্যাপি বার্থডে!

 

(আক্রান্ত সকলেরই নাম গোপন রাখা হল)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...