ভারত-চিন বিবাদ কি সামরিক মহড়াতেই সীমিত থাকবে?

সত্যব্রত ঘোষ

 


লেখক প্রবন্ধকার, চলচ্চিত্রবেত্তা

 

 

 

 

গত বছর মামাল্লাপুরম শীর্ষবৈঠকে চিন চেয়েছিল ১৬টি দেশের মধ্যে চালু মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (RCEP)-তে ভারত সাক্ষর করুক। মোদিরও ইচ্ছা ছিল ‘ভারসাম্য মেনে’ ভারত RCEP-তে শরিক হোক। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতীয় উৎপাদক এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলির জন্য ভারত শেষ অবধি এই চুক্তিতে সাক্ষর করেনি। দুই দেশের সামরিক ক্ষেত্র ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর প্রতিও আগ্রহ ছিল চিনের রাষ্ট্রপতির। কিন্ত ভারতের আপত্তি থাকায় সেই আগ্রহ উবে যেতে সময় লাগেনি।

ভারতের আপত্তির কারণ হল, চিন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে কৌশলগত বোঝাপড়া রয়েছে, তাতে ভারতের সুরক্ষা নিশ্চিত করাটা এক চ্যালেঞ্জ বিশেষ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে চিন যে পরিমাণে বিনিয়োগ এবং প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে, ভারতের তা নিয়েও মাথাব্যাথা আছে। অন্যদিকে, ভারত ক্রমশ আমেরিকার দিকে কৌশলগত কারণে ঝুঁকে পড়েছে বলে চিনও অখুশি। এর ফলে উচ্চতর প্রযুক্তি এবং অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক হাতিয়ার পেতে ভারতের সুবিধা হবে। কোভিড অতিমারি ঘটবার আগে থেকেই ভারত-চিন সম্পর্কে অবিশ্বাস বেড়েছে বই কমেনি।

এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্প্রতি যে দ্বন্দ্বটি শুরু হল, তার কারণ ভারতীয় সেনার দায়িত্বে ন্যস্ত দুটি রাস্তার নির্মাণ। একটি প্যাংগং লেক ঘিরে এবং অন্যটি গালওয়ান উপত্যকায় দারবুক-সাইয়ক-দৌলত বেগ ওল্ডি রোড সংযোগকারী। ভারতীয় সেনার এই পথনির্মাণগুলি যে চিন চাইছে না, তা বোঝা গেল মে মাসের প্রথম দিকে। চিনের সৈন্যবাহিনী প্যাংগং সো এবং গালওয়ান উপত্যকার তিনটি অবস্থানে ছাউনি বানায় এবং অস্ত্র মজুত শুরু করে। প্যাংগং-এর উত্তরে (যেখানে ‘ফিঙ্গার ৪’ থেকে ‘ফিঙ্গার ৮’-এর পুরো এলাকাটি চিনের দখলে আছে), গালওয়ান উপত্যকার (প্যাট্রলিং পয়েন্ট ১৪ এবং প্যাট্রলিং পয়েন্ট ১৫) আর গোগরা উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকা। ভারতীয় সেনারা বারবার হুমকি, পাথর ছোড়া এবং হাতাহাতি করা সত্ত্বেও চিনের সেনাদের হঠানো যায়নি। এরকম একটি হাতাহাতির ভিডিও প্রকাশ্যে এলে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান দাবি করেন সীমান্ত পরিস্থিতি “সাধারণভাবে স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে আছে”।

মেজর জেনারেল পর্যায়ে দুটি সামরিক বৈঠকের পর লাদাখে ডি-এসকেলেশন অর্থাৎ, দুই দেশের সৈন্যরা ধাপে ধাপে নিজেদের যুযুধান অবস্থান কমায়। বৈঠকগুলি থেকে যে সঙ্কেত পাঠানো হয় তাতে ভারত-চিন সীমান্তে লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC)-এর দুইদিকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর নিযুক্তি বাড়তে থাকে।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এই সীমান্তবিবাদকে ঘিরে নতুন এক আখ্যান রচনা করতে চায়। ভারত সরকারকে এই বিষয়ে স্পষ্ট এক বক্তব্য পেশ করবার দাবি জানিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং-কে রাহুল গান্ধি টুইটের মাধ্যমে প্রশ্ন করেন, “সত্যি বলুন তো, চিন কি লাদাখে ভারতীয় অঞ্চল দখল করে নিয়েছে?”

যদিও সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি, অতিমারির সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাতে অতিমারি ঘিরে ভূ-রাজনীতি তুঙ্গে উঠেছে। যেহেতু য়ুহানকে করোনা ভাইরাসের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাই পৃথিবী জুড়ে এই মতটি ব্যাপকভাবে আলোচিত যে চিনের রাষ্ট্রপতি স্বয়ংপ্রবৃত্ত হয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ বিষয়ে তথ্যাদি লুকোচ্ছেন। জলঘোলা হওয়ার একটি কারণ আমেরিকা আর চিনের রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি ভেস্তে যাওয়া। ‘মনুষ্য নির্মিত এই বিপর্যয়’-এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি তৈরির জন্যেও দাপাদাপি করছেন ট্রাম্প। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেলকে চাঁচাছোলা ভাষায় চিনের সাগরেদ বলে নিন্দাও করেছেন।

করোনা অতিমারির জন্য বৈশ্বিক যে পরিবর্তনটি টের পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আমেরিকা আর চিনের নতুন একটি ঠান্ডা যুদ্ধের সূত্রপাতের দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে চলেছে। এই যে আলোড়ন তা যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর লড়াইয়ের দিকে না গিয়ে অর্থনৈতিক দড়ি টানাটানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের প্রেক্ষাপট থেকে বলা যেতে পারে যে মোদির বিদেশনীতি সব দেশের সঙ্গেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখবার পক্ষপাতী— সে আমেরিকাই হোক বা চিন। কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে করোনা অতিমারি ঘিরে এবং আমেরিকা-চিন বাণিজ্য সম্পর্কের অবনতি ঘটবার নেপথ্যে চিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিষয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে ভারত আর আমেরিকা দড়ির একদিকটাই ধরে থাকবে।

ইতিমধ্যে চিন নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নিজের অর্থনীতিকে ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি সুপারপাওয়ার হয়ে ঊঠবার রাস্তা বানাচ্ছে। বহু বছর ধরে পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে অর্জিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি আহরণ করে চিন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ সমৃদ্ধ দেশ হয়েছে। গ্লোবাল সাপ্লাই চেনে নিজের দখল রেখে চিনের রাষ্ট্রপতি এবার সামরিক দিক থেকেও দ্বিতীয় শক্তিশালী দেশ হিসেবে চিনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।

ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (UNCTAD)-এর হিসেবমত করোনা অতিমারির কারণে সমগ্র বিশ্বের দুই ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে চলেছে। পরিবর্তনশীল এই অবস্থার মধ্যে চিন দ্রুত নতুন স্বাভাবিকত্ব তৈরি করে বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা সহায়তা এবং সরবরাহের প্রকট অভাবের দরুন যে ফাঁকা জায়গাটা সৃষ্টি হয়েছে তা ভরাট করতে চাইছে। এই প্রেক্ষিতে গত ৪ঠা মে নন-অ্যালালাইনড মুভমেন্ট সামিটে নরেন্দ্র মোদির দাবীটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, স্বদেশে যথেষ্ট চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভারত চিকিৎসা সরবরাহ করছে ১২৩টি সহযোগী দেশকে, যার মধ্যে ৫৯টি নন-অ্যালালাইনড মুভমেন্ট-এর সদস্য দেশ রয়েছে।

বর্তমান সঙ্কটে বৈশ্বিক ব্যবস্থার রাশ বুকনিসর্বস্ব রাষ্টবাদীদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি যথেষ্ট, যারা বাণিজ্য অনুমোদনের তত্ত্বগুলি না মেনে নিজেদের যুক্তিবোধকে জনপ্রিয় ধারণার ভিত্তিতে চালিত করেন। তাই ভারসাম্য রাখা অতীব প্রয়োজন। আমরা এখন যে সন্ধিস্থলে অবস্থান করছি যেখানে এগোতে হলে হয় নতুন করে স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নাহলে এমন এক ব্যবস্থার পত্তন করতে হবে যেখানে কোনও দেশই অন্য দেশের তুলনায় বেশি সমান নয়।

গ্লোবাল কমপিটিটিভ ইনডেক্স-এর নিরিখে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই সবচেয়ে প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন দেশ যার হাতে ইনফরমেশন টেকনোলজি পরিষেবা, ঔষধপ্রস্তুতি, বায়োটেকনোলজি এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজমের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবার সুবিধাগুলি বর্তমান। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ইনভেস্ট ইন ইন্ডিয়া’ প্রয়াসগুলির সুবাদে ভারতকে এখন বাজার সংস্কারের কাজে হাত দিতে হবে। এই দেশে পরিকাঠামোগত সংস্কারের একান্ত প্রয়োজন। সঙ্কটকালেও যদি মতি না ফেরে, তাহলে আর তা ফিরবে না।

কোভিড-১৯ বুঝিয়ে দিয়েছে চিন সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিতভাবেই এমন একটি দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না, যারা সব কাজ আড়াল রেখে করে। ৩৫ বছর আগে ভারত আর চিনের অর্থনীতিতে রপ্তানির পরিমাণ সমান ছিল। ইতিমধ্যে চিনের বৃদ্ধি ব্যাপক হারে ঘটেছে বাজার অনুকূল প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলি করেছে বলেই। ভারতের সঙ্গেও বাণিজ্য পরিমাণ বেড়েছে, যদিও বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চিনেরই বেশি।

আত্মনির্ভর ভারত-এর স্লোগানে মগ্ন না থেকে আমেরিকা বরং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চিনের সম্পর্কের অবনতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করলে বহুজাতিক সংস্থাগুলি ভারতকেই বিকল্প গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করবে। এখন এটাই দেখার, বিশ্ব অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থ ও দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে চিন ও ভারত নিজেদের মধ্যেকার দূরত্ব কমাতে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...