অটবী ও জারুল

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

তিনতলার ছাদ ছাপিয়েও আরও উঁচুতে জেগে থাকে গাছটা। বাড়ির মাথায় ঝাঁকড়া সবুজ রঙের বিরাট টুপির মতো। সকলেই জানে আশপাশের পাড়ার মধ্যে ওটাই সবথেকে উঁচু জারুল গাছ। কেউ কেউ সন্দেহ করে পিনকোডে সম্ভবত ওর চেয়ে উঁচু জারুল খুঁজলে পাওয়া যাবে না। কারও পক্ষে যেটা জানা সম্ভব নয়, বা কল্পনা করাও হয়তো শক্ত যে ওটা সত্যি সত্যি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জারুল গাছ। ভাবা যায়? বেঢপ, বিতিকিচ্ছিরি বুড়োধুদ্ধুড়ে রংচটা বাড়ির দালান ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা, বছরভর সবুজ পাতা, গরমকালে বেগুনি ফুলে ভরা রোজ যেতে আসতে দেখা জারুল, সে নাকি পৃথিবীর উচ্চতম, বৃহত্তম, সবুজতম?

গাছটা কাজে দেয় অনেকের। যারা বাড়িতে কারা থাকে, কী করে, কী খায়, কী পরে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন তারাও জানে ওটা গাছওয়ালা বাড়ি। কাউকে ঠিকানা বোঝাতে হলে বলে, গাছবাড়ি পেরিয়ে ডানদিকের গলি কিংবা বাঁদিকের ল্যাম্পপোস্ট। বিয়ে/শ্রাদ্ধ/অন্নপ্রাশনের কার্ডেও নাকি একসময় অনেকে লিখে দিত, গাছবাড়ির ডানদিকের গলি ধরিয়া নাকবরাবর তিন মিনিট হাঁটাপথ।

যাদের জানার সুযোগ হয় তারা জানে, গাছ ছাড়াও আরেকটা দেখার মতো জিনিস আছে ও বাড়িতে। না দেখে থাকার উপায় নেই। বাড়ির মেয়ের পাল। দেখা বলতে নাক, চোখ, মুখ, গ্রীবাভঙ্গি দেখার  কথা হচ্ছে না, সে সব দেখতে গেলে কারও নাক খ্যাঁদা কারও চোখা, কেউ ফ্যাটফেটে কেউ অনুজ্জ্বল শ্যাম, চোখ কারও ড্যাবা কারও খুদি। বাড়ির লোকেরা দাবি করে নবজাতক জাতিকার নাকের ভোঁতা আর কপালের উঁচুটায় এখনও নাকি গাঙ্গুলিবাড়ির অব্যর্থ ছাপ খুঁজলে পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা দেখতে চেয়ে দেখা হতে পারে।

দেখার বিষয় বাড়িটায় মেয়েদের প্রতাপ।

বাড়ি জুড়ে কিলবিল, খলখল, খিলখিল, গমগম, জমজম করছে মেয়ে আর মেয়ে। বারান্দায় শাড়ি মেলছে মেয়ে। রান্নাঘরে ফোড়ন দিচ্ছে মেয়ে। ছাদে চু-কিতকিত খেলছে মেয়ে। বাবামায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে পাড়া কাঁপাচ্ছে মেয়ে। টিফিনবাক্স না নিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে মেয়ে। টিফিনবাক্স নিয়ে পেছন পেছন গেট পর্যন্ত দৌড়ে আসছে মেয়ে। ছাদের রেলিং ধরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে মেয়ে। জারুলগাছের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে তরতরিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে মেয়ে। ডালে বাঁধা দড়ির প্রান্তে কাঠের পিঁড়িতে দুলছে মেয়ে। দুলতে দুলতে ক্রমশ মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে মেয়ের বিনুনি আর মেয়ে।

তা বলে কি পুরুষ নেই? আছে। মাথা গুনলে দেখলে হয়তো দু-এক পিস বেশিই বেরোবে, কিন্তু মেয়েদের খলবল আর খিলখিল আর খলবলে তাদের আওয়াজ চাপা পড়ে থাকে। টের পাওয়া যায় খালি গাছের মাথা আর মেয়ে।

****

 

বাথরুম থেকে বেরিয়ে অটবী দেখল বাড়িশুদ্ধু মেয়ে ঘরের ভেতর এসে জুটেছে।

আজ কালরাত্রি। কাজেই নির্ভীককে দেখবে অটবী আশা করেনি, কিন্তু এ দৃশ্য বুক কাঁপিয়ে দিল।

অটবীর শাশুড়ি, জেঠশাশুড়ি, কাকিশাশুড়ি, দুই কাজিন ননদ, কাজিন জা, পিসিশাশুড়ি, অ্যামেরিকায় থাকা পিসতুতো দিদি, দুর্গাপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া খুড়তুতো বোন, জলপাইগুড়িতে বিয়ে হওয়া জেঠতুতো দিদি, দিদির যমজ ছেলেমেয়ের শুধু মেয়ে, যে এখন মায়ের কোলে বুড়ো আঙুল মুখে পুরে ঘুমে অচেতন।

একা সে বাদে অটবীকে দেখে সকলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

অটবীও জানে, ওকে সুন্দর দেখাচ্ছে। বিয়ের লাল কুটকুটে বেনারসি আর রিসেপশনের কটকটে সবুজ, যেটা ট্র্যাডিশনের আর “স্পেশাল অকেশন”-এর বাহানায়, বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি এবং দোকানির যৌথ ঝুলোঝুলিতে অটবী কিনতে রাজি হয়েছিল, দুটোর থেকেই এই শাড়িটা এককোটি গুণ পছন্দ হয়েছিল অটবীর। সাদা, পিওর কটন, পাড়ের কাছটা হালকা গোলাপিসবুজ সুতোর চিকন কাজ। গাঙ্গুলিবাড়ির পরিচিত বাহিনীকে আপ্যায়ন করতে করতে দোকানি আগের খদ্দেরের ফেলে যাওয়া শাড়ির ডাঁই দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার আগে এই শাড়িটার গায়ে একমুহূর্ত হাত রেখেছিল অটবী।

সন্ধেবেলা এ বাড়িতে পৌঁছনোর পর, আশীর্বাদটাদ হয়ে গেলে এই শাড়িটাই নির্ভীকের মা তুলে দিয়েছিলেন ওর হাতে। অটবীর চমকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিলেন, আমারও লাইট কালারই পছন্দ। যাও ছেড়ে নাও। গয়নাটয়না সব ছেড়ে ফেলো। এই গরমে ওগুলো পরে থাকা যায় নাকি… তোমার আরেকটু কাজ বাকি আছে, তারপরেই ছুটি।

এখন সেই কাজের পালা সম্ভবত। ঘরের সাদাকালো দাবার বোর্ড মেঝেতে লালপাড় আসন, আসনের সামনে কাঁসার থালায় জুঁইফুলের মালার ওপর শরীরে দুটি পাতা নিয়ে শুয়ে থাকা একটি ডাল, থালার পাশের দীর্ঘ প্রদীপদানির সলতের মুখে দেশলাই ধরে আছে গুলতি, নির্ভীকের খুড়তুতো বোন।

–ডান! বসে পড়ো অটবীদি।

দেশলাই ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে বলল গুলতি। অটবী আসনে বাবু হয়ে বসল, অটবীর চারপাশে ঘিরে এল সবাই।

আম্মা, নির্ভীকের ঠাকুমা, গাঙ্গুলি বাড়ির ম্যাট্রিয়ার্ক, বললেন, আলো নেভা, আর জানালাটা খুলে দে।

চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হল জারুল গাছ। ফুলে ফুলে ছাওয়া। চাঁদের আলো চকচক করছে পাতায় ডগায়, কাণ্ডের বাঁকে। অটবী চোখ সরাতে পারছিল না গাছের দিক থেকে। কী বিশাল, কী মহান, কী সুন্দর। ক্লান্তি সম্পূর্ণ উধাও অটবীর শরীর থেকে, মস্তিষ্ক সজাগ, ধূপের সুগন্ধ জাপটে ধরে আছে।

আম্মা অটবীর হাতে তুলে দিলেন জারুলের ডাল, পাতা আর ফুল। অটবীর আঙুলগুলো জড়িয়ে দিলেন ডালের গায়ে।

–জারুল, এ আমাদের অটবী। অটবী, এ আমাদের জারুল। আজ থেকে তোমরা দুজন দুজনের বন্ধু হলে।

উলু আর শাঁখের শব্দ অটবীর কান ছাপিয়ে, গাঙ্গুলিবাড়ির ঘর, বারান্দা, ছাদ, জারুল গাছের সারা শরীরে ছেয়ে আকাশে মাখামাখি হয়ে গেল।

****

 

মা বাবা এক সন্তান সেট আপ থেকে এসে এই ঢাকের মতো বাড়িতে অ্যাডজাস্ট করতে যতখানি অসুবিধে হবে ভেবেছিল অটবী, হল না। তিনতলা বাড়ির ভিন্ন তলায় ভিন্ন ভিন্ন সংসার। পুরনো রান্নাঘর ভাগ করে আধুনিক রান্নাঘরসমূহে পরিণত করা হয়েছে।তাদের মধ্যে যাতায়াতের দরজা খোলাই থাকে যাতে এ ঘরের রাঁধুনির নুন ফুরিয়ে গেলে ওই রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসা যায়।একতলায় কমন বৈঠকখানাকে আধুনিক সাজানো হয়েছে, ঘরে নিয়ে যাওয়ার মতো অতিথি না এলে সেখানেই তাকে বসানো হয়।

অটবীর বসার সময় নেই। সকাল আটটায় অফিস বেরোয়, রাত আটটায় ফেরে। নির্ভীক বেরোয় অটবীরই সঙ্গে, ফেরে অটবীর ফেরার ঝাড়া দেড়, কোনও কোনও দিন দু ঘণ্টা পরে। এসে বেশিরভাগ দিনই ল্যাপটপ খুলে বসে। পাগলের মতো খাটে নির্ভীক। তবে বাধ্য হয়ে নয়। খাটুনিটা নির্ভীকের “ছক”-এর অংশ। পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত মুখে রক্ত তুলে রোজগার করবে অন্যের জন্য, তারপর চাকরি ছেড়ে রেস্টোর‍্যান্ট খুলবে। নিজেই নিজের বস্‌। রেস্টোর‍্যান্টের লোকেশন, কুইজিন, লে আউট, এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক পর্যন্ত ছকে রেখেছে নির্ভীক। অটবী প্রথমদিকে হাসত, যবে থেকে বুঝেছে নির্ভীক এই সব প্ল্যানিং কতখানি সিরিয়াসলি করে, বন্ধ করেছে। নির্ভীক অটবীকেও উদ্বুদ্ধ করে ছক কষতে। এত কষ্ট করে রোজগার করছিস, ফিক্সড ডিপোজিটে রেখে নয়ছয় করিস না। ইনভেস্ট কর। অনলাইন গাদাগাদা ক্যালকুলেটর পাবি। হিসেব কষে নে। কত বছর রোজগার করবি, অ্যাপ্রক্সিমেটলি রিটায়ারমেন্টের পর কত বছর বাঁচবি, সেই অনুযায়ী মোটামুটি কত ইন্টারেস্ট লাগবে সেই বুঝে এখন ইনভেস্টমেন্ট করে ফেল। শখের ট্র্যাভেল, শপিং, হসপিটালের বেডভাড়ার একটা স্ট্যাশ রাখ। ইটস নট রকেট সায়েন্স। ইজি।

অটবীর অত হিসেব কষার কথা ভাবলেই ক্লান্ত লাগে। খাওয়াদাওয়ার পর নির্ভীক যখন ল্যাপটপ খুলে বসে অটবী বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। জারুলের ডালপালার ওপারের সংসারগুলোর আবছা নড়াচড়া, আলোছায়া, পুরনো দিনের সিনেমার মতো ঘটে চলে। বারান্দায় এসে পড়া পাতায় আঙুল বোলাতে বোলাতে অটবী বলে, চল আমরা দুজন একটা ছক কষি, জারুল। আমরা কোনও ছক কষব না, এটাই আমাদের ছক, ওকে? পাশের ঘরে ফোনে নির্ভীক হেসে ওঠে। একে একে জানালার আলো নিভে যায়। খালি ছাদের চিলেকোঠার ঘষা জানালার ওপারের আলোটা বাদে।

****

 

ঘরটা অটবী দেখেছিল প্রথমবার ছাদে উঠে। নির্ভীকের যদিও নিজের ঘর ছিল, কিন্তু সে ঘরে ঢুকে সবার মুখের ওপর দরজা দেওয়ার থেকে অনেক সুবিধের ছিল ছাদে উঠে সন্ধের অন্ধকারে, গাছের ছায়ায়, রেলিং-এ হেলান দিয়ে ঘেঁষাঘেঁষি বসা। জারুলের ডাল ঝুঁকে পড়ত দুজনের মাথার ওপর। পাতার সবুজ মোম শরীরে গভীর, স্পষ্ট রেখা অটবীর কপাল ছুঁত। মুখ উঁচু করে পাতার গন্ধ নিত অটবী। কী সুন্দ…

নির্ভীকের ঠোঁট এসে পড়ত ঠোঁটের ওপর। মিনিট দশেকের চুমু এবং ছোঁয়াছুঁয়ির পর্ব সেরে পাশাপাশি রেলিং-এ হেলান দিয়ে বসে সিগারেট ভাগ করে খেত। ছড়ানো ছাদ আর পৃথিবীর ওপর সন্ধে নামতে দেখত। দেখতে দেখতেই একদিন নেমে আসা ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকারের ভেতর দপ করে জ্বলে উঠেছিল আলো। এত মুগ্ধতার আর মগ্নতার মধ্যে খেয়ালই করেনি অটবী। ছাদের কোণের ঘরটা আগে লক্ষই করা হয়নি।

–ওখানে একটা ঘর আছে বুঝি?
–চিলেকোঠা। ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিল নির্ভীক। কমপ্লিট উইথ উন্মাদিনী।

বন্ধ জানালার ওপাশে নড়েচড়ে বেড়ানো ঝাপসা একটা শরীর।

–ওটা কে?
–সবিতাদি। বড়দির ঘরে আলো জ্বালতে এসেছে।

বড়দি যে নির্ভীকের বড়দি নন সেটুকু আন্দাজ করতে পেরেছিল। বড়দি এমনকি নির্ভীকের বাবার বড়দিও নন। বড়দি নির্ভীকের ঠাকুরদার বড় বড়দি।

–মানে তোর বাবার পিসি?
–কারেক্ট।
–মানে আম্মার ননদ?
–কারেক্ট। আম্মার ননদ, বাবার পিসি, মায়ের পিসিশাশুড়ি, আমার গ্রেট পিসিঠাকুমা, গুলতির…

কনুইয়ের গোঁতা মেরে অটবী থামিয়েছিল নির্ভীককে। হাসি থামলে চশমার ওপর ঝেঁপে আসা মসৃণ চুল আঙুল দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলেছিল, কিন্তু আল্টিমেটলি সবার বড়দি।

–এখানেই থেকেছেন সর্বদা?
–উঁহু। বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুরবাড়িতে কী সব ঝাম হয়ে চলে এসেছিল। তারপর থেকে স্পিকটি নট।
–একদম কথা বলেন না?
–আওয়াজও করে না। কমপ্লিট সাইলেন্স। এমনিতে বাকি সব স্বাভাবিক। আই মিন, যদি স্বাভাবিক বলা যায়। আমরা গিয়ে বড়দির ঘরে খেলতাম টেলতাম ছোটবেলায়। কোনওদিন কিছু বলেনি, বকেনি, কিন্তু আদরও করেনি। আমরা যে আছি, ঢুকছি, বেরোচ্ছি, লাফাচ্ছি খাটের ওপর– সেগুলো যেন রেজিস্টারই করছে না। হাসে না, কাঁদে না, রাগে না। জাস্ট থাকে।
–কী করে হল?
–জানি না বস্‌। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ট্রমায় হতে পারে। শিওর নই। আমি জন্মে থেকে এরকমই দেখছি। মোস্ট প্রব্যাবলি বাবাও জন্মে থেকে এরকমই দেখছে। দেখলে আম্মা অন্য কিছু দেখে থাকতে পারে।

অটবীর বিয়েতেও নামেননি বড়দি। বিয়ের পর শাশুড়ি শ্বশুরমশাই অটবীকে নিয়ে গিয়েছিলেন বড়দির ঘরে। অটবীর মনে আছে, ঢুকে ঘরের গুমোট ভাবটা প্রথম টের পেয়েছিল। সব জানালা পাটে পাটে বন্ধ। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন বড়দি। শ্বশুরমশাই বলেছিলেন, বড়দি, এই দেখো আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, অটবী। শাশুড়ি বলেছিলেন, খুব ভালো মেয়ে। আমাদের সৌভাগ্য যে এমন বউ পেয়েছি।

অটবী প্রণাম করেছিল। সবিতাদি বড়দির হাত বাড়িয়ে ধরেছিল, শাশুড়ি হাতে মুঠো করা টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন বড়দির মুঠোয়।তারপর সেই হাত তুলে অটবীর মাথায় ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য বড়দির দৃষ্টি দেওয়াল থেকে সরেনি।

দ্বিতীয়বার অটবী ওই ঘরে গিয়েছিল বাকি সবার সঙ্গে, সবিতাদি নেমে এসে খবরটা দেওয়ার পর। খাটের ওপর ঘুমিয়ে ছিলেন বড়দি। একগোছা ধূসর চুল ভুরু, নাক ছুঁয়ে, ফরসা গালের বেয়ে কোণাকুণি নেমে এসেছে।

খাট তুলে দেওয়া হল কাঁচঢাকা গাড়িতে। আম্মা বললেন যাব। সবাই বিভিন্ন মাত্রায় আপত্তি জানাল। আম্মা গাড়িতে উঠে বসলেন।

ফিরে এলে, খানিকটা সুস্থ হওয়ার সময় দিয়ে অটবী গেল আম্মার ঘরে। আম্মা জানালার পাশে ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন।

–ভেতরে আয়, উঁকিঝুঁকি মারছিস কেন?
–ঘুমোওনি? আমি ভাবলাম এত ধকল গেল…
–ধকল কীসের। গাড়ি চড়ে গেলাম এলাম। দৌড়োদৌড়ি সব তোর দেওর ননদরা করল, আমি বসে বসে দেখলাম। বড়দি চুল্লিতে ঢুকে গেল। কল্পনা করলাম দাউ দাউ করে পুড়ছে। তারপর আবার গাড়ি চড়ে চলে এলাম। দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বস না।

খাট দেখিয়ে বললেন আম্মা।

অটবী দাঁড়িয়ে থাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে চারদিক। আম্মার ঘরটা ওর এ বাড়ির সবচেয়ে প্রিয় ঘর। বড় বড় জানালা। উঁচু খাট। ছড়ানো লেখার টেবিল। টেবিলের ওপর কাগজের ঢিপি। চিৎ বই, উল্টো বই, খোলা পেন। আধখাওয়া চায়ের কাপ। বয়ামে বিস্কুটের গোল মুখে চোখ নাক ঠোঁটের ফুটো দিয়ে ক্রিম দৃশ্যমান। এইরকম ভয়াবহ ডিজাইন কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল কে জানে।

বয়াম খুলে একটা বিস্কুট নিয়ে কামড় বসায় অটবী।

–তুমি বড়দিকে কথা বলতে শুনেছ, আম্মা?
–ডিবেট করতেও শুনেছি।

অটবী হাঁ করল।

আম্মা উঠে গিয়ে শো কেসের সামনে দাঁড়ালেন। আম্মার ঘরের শো কেসটা দেখার বিষয়। ঘরের লম্বা দিকের দেওয়াল জুড়ে কাঠ, কাঁচ মেশানো আলমারি। কত যে জিনিস। কোনওটার সঙ্গে কোনওটার মিল নেই। বই, ডাইরি, চিনেমাটির কাপডিশ, ফুলদানি, ফুলদানিতে প্লাস্টিকের ফুল, ঝিনুক, মাটির পুতুল, ছ্যাতলা পড়া ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি।

একটা ছবি বার করে আনলেন আম্মা। তিন বালকবালিকা, অসামান্য গম্ভীর মুখে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

–ময়মনসিংহের স্কুল ডিসট্রিক্টের ডিবেট সার্কেলের ফরমিডেবল ট্রায়ো। প্রত্যেক কম্পিটিশনে বড়দি ফার্স্ট, বড়দির পরের ভাই অর্থাৎ আমার বর সেকেন্ড, ছোড়দি থার্ড। পাড়ার মেয়ে ছিলাম, ছোট থেকে দেখছি। বড়দি কথা বলা মেশিন ছিল। গান গাইত কী সুন্দর। আমার বাসরে গেয়েছিল। ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে, আমি বনফুল গো, কী মিষ্টি গলা, কী চোখমুখ ঘোরানো।

–কী হয়েছিল গো বড়দির শ্বশুরবাড়িতে?

আম্মা ছবি ঢুকিয়ে রাখলেন শো কেসের ভেতর। কী আবার হবে। ঝগড়া করতে করতে বর থাপ্পড় মেরেছিল, বড়দি খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্রেফ চটি পরে চলে এসেছিল। আমরা বলেছিলাম, একটা চড় মেরে এলে না কেন? বড়দি বলেছিল, এক সপ্তাহ আগে মহাত্মার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছি, না হলে মেরেই আসতাম। শ্বশুরবাড়ি খুব তড়পেছিল, আর ঘরে নেবে না। বড়দি বলেছিল, নিলেও যাব না।

ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় বছরখানেক পর। আম্মা ভুরু কোঁচকালেন। জানুয়ারি, উঁহু, ডিসেম্বর, তখনও আমার কাছের কলেজে ট্রান্সফার হয়নি, ফিরতে রাত হয়েছিল। কাজেই সন্ধের ঘটনাটা মিস করে গিয়েছিলাম।

–কী ঘটনা? অটবী উত্তেজনায় আরেকটা ক্রিম বিস্কুট বার করে।

বড়দির বর সন্ধেবেলা পাঁড় মাতাল হয়ে বাড়িতে এসে উপস্থিত। কোথায় কমলিনী, বার কর, বাড়ি নিয়ে যাব, চরম হুজ্জোৎ। বাড়ির লোকেরা শান্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, পাড়ার লোকজন জড়ো হয়ে তাড়ায়। খুন করে ফেলব হুমকি দিতে দিতে সে বিদায় হয়।

পরের দিন সকালে তাকে আবিষ্কার করা হয়, বড়দির তিনতলার ঘরের জানালার ঠিক নিচে। দালানে হাত পা ছেতরে পড়ে আছে। শান বাঁধানো উঠোনে ঘিলু আর রক্ত মাখামাখি, বিস্ফারিত চোখ, হাঁ মুখ। শরীরের পাশে একখানা আধহাত লম্বা শান দেওয়া ছোরা।

–ছোরা?
–কেউ জানে না, রাত কটায়, সম্ভবত মাঝরাতের পর বড়দির বর ফিরে আসে। দেওয়ালের গায়ের পাইপ বেয়ে বড়দির ঘরে ওঠার চেষ্টা করে। মতলব খারাপ ছিল, ছোরাটা তার প্রমাণ। পাইপ বেয়ে উঠতে গিয়ে পা পিছলে আলুরদম হয়ে সম্ভবত ওই পরিণতি।
–থানাপুলিশ হয়নি?
–হবে না? থানাপুলিশ, পাড়াবেপাড়ার লোক। হইহই কাণ্ড রইরই ব্যাপার।

পুলিস এসে বডি দেখল। তিনতলায় উঠল। বড়দির ঘরের জানালা বন্ধ। বড়দি চুপ, স্থির। পুলিশ নরমগরম নানারকমভাবে জেরা করার চেষ্টা করল, কিছুতেই কিছু কাজ দিল না। বৃষ্টির রাত ছিল, জলের পাইপে শ্যাওলা ছিল, পিছলে পড়ে মৃত্যু। তদন্তের কিছু ছিল না। পুলিস চলে গেল। বড়দি আর কথা বলল না।

আম্মা, আম্মার পেছন পেছন অটবী, ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি ধরল। বড়দির ঘরে এখনও চাবি পড়েনি। ঘরটা কীভাবে ইউটিলাইজ করা যেতে পারে আলোচনা চলছে।

অটবী বলল, বাবা লোকটার কিছু প্রতিহিংসা। ওই ঝড়জলের রাতে অত কষ্ট করে পাইপ বেয়ে উঠেছে। বড়দি তো তখনও রাস্তায়টাসতায় বেরোতেন নিশ্চয়, তখন চাইলে ক্ষতি করতে পারত। জানালা যে খোলা থাকতে না পারে মাথায় আসেনি?

আম্মা অটবীর দিকে তাকালেন না। বড়দির জানালা সেদিনের আগে কোনওদিন বন্ধ থাকত না। বড়দি ক্লস্ট্রোফবিয়া ছিল। ঝড় জল ঝঞ্ঝা নির্বিশেষে বড়দি জানালা খুলে শুতেন। খালি সে রাতে….. আর তারপর থেকে কোনও রাতে বড়দি আর জানালা খোলেননি।

আম্মা জানালা খুলে দিলেন। মেঝেতে এসে পড়া রোদের চৌখুপিতে সন্তর্পণে, এত বছর পর, ছায়া ফেলে দাঁড়াল জারুল।

****

 

গোলযোগ বাধল বড়দির শ্রাদ্ধের ধুমধাম নিয়ে।

শ্রাদ্ধে এত ধুমধাম করলে লোক হাসবে। বলবে, আশ্রিতা বিদায় হয়েছে বলে বেঁচেছে, হ্যানাত্যানা। যুক্তি দিল খাটে কোলবালিশ পেঁচিয়ে আধশোয়া আগের জেনারেশনের কেউ কেউ। লোক খাওয়ানোর দরকার নেই। প্যাকেট সিস্টেম করে দাও।

চেয়ারের হাতলে আর টেবিলের কিনারায় ঝুলে থাকা নতুন প্রজন্ম মুখচোখ ঘুরিয়ে বলল, প্যাকেট! এ কি পয়লা জানুয়ারির পিকনিক নাকি! আমাদের বাড়ির কোনও শ্রাদ্ধে কোনওদিন প্যাকেট হয়েছে? ফ্যামিলির একটা মানইজ্জত নেই?

গুলতি এসেছে কলেজ থেকে। ছুটির যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার করাই আপাতত একমাত্র লক্ষ্য।

–অনেএএএক দিন গেট্টু হয়নি। সেই অটবীদির বিয়ের পর থেকে। অটবীদি, তুমি অলরেডি বোর হয়ে গেছ কি না বলো তো, অনেস্টলি। খালি অফিস আর বাড়ি আর ভাত আর ডাল আর আলুপোস্ত আর অফিস, বোর হয়ে অটবীদি পালাবে তখন বুঝবে মজা।

নির্ভীক অটবীর হাত বগলদাবা করল। হাসির ভেতর, আঙুলে গাড়ির চাবি দোলাতে দোলাতে ঘরে ঢুকল শুভজিৎ।

–কে এত বোর হয়ে পালাচ্ছে? গুলতির গা ঘেঁষে দাঁড়াল শুভজিৎ।

এই তো একজন বাইরের লোক পাওয়া গেছে, প্রতিবাদোদ্যত শুভজিৎকে হাত তুলে থামিয়ে নির্ভীক প্রশ্ন করল, ওয়েল, শুভজিৎ, তুমি যদি দেখতে শ্রাদ্ধবাড়িতে মাইক বাজিয়ে মাছমাংসের বন্যা বইছে, তুমি পিএনপিসি করতে কি করতে না?

–করলেই বা কি? লোকের কথা শুনে কেউ কোনওদিন বড়লোক হয়েছে? লোকে তো অনেক কিছুই বলে, বড়দির সম্পর্কেও বলত, তাতে কী এসে গেছে?
–আঃ গুলতি, তুই একটু থাম তো।

শুভজিৎ মুখ গম্ভীর করে বলল, ওয়েল, আই উইল বি অনেস্ট। আমি জেনারেলি যা করে থাকি তাই করতাম।

–কী সেটা?
–গুলতি যা বলে, অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিতাম।

হাসিতে ফেটে পড়ল ঘর। অটবীর চোখ গুলতির মুখে রাখা ছিল। হাসির বদলে চোয়াল শক্ত হতে দেখল অটবী।

****

 

লাস্ট ব্যাচে এক কামড়ে ভাজা তোপসের মুণ্ডু মুখে চালান করে নির্ভীক জিজ্ঞাসা করল, তারপর গুলতি, তোদের প্ল্যান কী? কেরিয়ারটেরিয়ার নিয়ে কী ভাবছিসটাবছিস?

অটবী বলল, ব্যস, শুরু হল ছক।

–দাদা, সর্বক্ষণ বুড়োদের মতো কথা বলিস না তো, প্ল্যান আবার কী? লুচি সাধতে আসা ছেলেটার দিকে মাথা নাড়ল গুলতি। আপাতত দুর্গাপুর ফিরে যাওয়ার প্ল্যান আমার। ব্যস।

মাছের কাঁটা সন্তর্পণে দাঁতের ফাঁক থেকে বার করে গুছিয়ে থালার পাশে রাখল নির্ভীক। একটা প্ল্যান জরুরি রে। না হলে দেখবি সব ছড়িয়ে একাকার হয়ে গেছে, কিছু আর কন্ট্রোলে নেই।

–তোমার নতুন চাকরি কেমন লাগছে? নির্ভীক শুভজিতের দিকে আক্রমণ শানাল।
–ও তো বলছে বাইরে যাবে পিএইচডি করতে। লুচির ছেলেটার দিকে একটা আঙুল তুলল শুভদীপ।
–তাই নাকি? নির্ভীক চোখ বড় করে বোনের দিকে তাকাল। বলিসনি তো?
–তোমার নতুন অফিস কেমন চলছে শুভজিৎ? আগের মাসে জয়েন করলে তো বোধহয়, তাই না? নির্ভীকের হাত থেকে গুলতিকে বাঁচানোর একটা অ্যাটেম্পট নিল অটবী।
–সেই তো। আগে থেকে বললে আমি চট করে এটা জয়েন করতাম না। আমার পক্ষে তো এক্ষুনি কিছু করার সময় হবে না। সামনের বছর জিআরই টিআরই দিয়ে একসঙ্গে যাব।

গুলতি বলল, একসঙ্গে না গেলেও হয়। একই জায়গায় যে চান্স পাওয়া যাবে, তার তো কোনও মানে নেই। তাছাড়া আমার সব বন্ধু এ বছরেই যাচ্ছে, আমি ইয়ার লুজ করতে চাই না।

লুচিতে মুড়ে ফুলকপি মুখে চালান করল শুভদীপ। মুখ খালি হলে বলল, আহা, এক জায়গায় না পেলেও এক দেশে তো থাকা যাবে। সেটাই যথেষ্ট। আর মহাকালের কাছে এক বছর আর কী। অটবীর দিকে তাকিয়ে হাসল শুভজিৎ। ডিসাইড করে ফেলেছি, সামনের বছরই যাব আমরা।

–এনআরআই হয়ে যাবি, গুলতি? বাড়ি এসে মিনারেল ওয়াটার খাবি? দাঁত বার করে বোনের কান মুলে দিল নির্ভীক।
–আমি কোথাও যাব না, কিচ্ছু হব না, কিচ্ছু ডিসাইড করিনি। ঝটকা মেরে দাদার হাত সরিয়ে দিল গুলতি।

****

 

রাতে বাড়ি ফাঁকা হলে নির্ভীক বলল, শুভদীপ ছেলেটা কাজের, বল? বেশ আটঘাট বেঁধে চলে।

চিবুকের ডানদিকে পেকে ওঠা ব্রণটায় যথাসম্ভব কম ব্যথা দিয়ে ওষুধ লাগানোর চেষ্টা করতে করতে অটবী বলল, বড় বেশি গুলতির গায়েপড়া। অত আঠার মতো লেগে থাকা ইরিটেটিং।

–যাব্বাবা, আমার তো ধারণা ছিল মহিলারা ওইরকম আঠামোই পছন্দ করে। কাল মা একটা সিরিয়াল দেখছিল, তাতে নায়িকা নায়ককে টাইম দাও না বলে ঘ্যানঘ্যান করছিল।
–ওটা সিরিয়াল।
–বলছিস রিয়েল লাইফে মহিলারা বরের বেশি টাইম দেওয়া অপছন্দ করে?

ক্যাপ লাগিয়ে ওষুধের শিশি ড্রয়ারে চালান করে জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াল অটবী। আর কে করে জানি না, আমার ধারণা গুলতি করে।

–ছাড় তো, ওর পছন্দ অপছন্দের কথা। গুলতির মাথায় সিরিয়াস গণ্ডগোল আছে, আজকাল আমার মনে হয় মাঝেমাঝে। এর আগে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে কী করবি প্ল্যান করেছিস? কী বলল বল তো?
–কী?
–বলে বাড়ির ছাদে মাশরুম ফার্মিং করব। হেবি নাকি প্রফিট।

হাসি থামিয়ে অটবী বলল, ভালোই হবে। আমাদের মাশরুম ফ্রি দেবে নিশ্চয়। অন্তত ডিসকাউন্টে। তখন আমরা রোজ মাশরুম খাব, মাশরুম পনীর, মাশরুম ফ্রায়েড রাইস, মাশরুম মুসল্লম। তুই তো ভালোবাসিস বলিস মাশরুম।

নির্ভীকের ফোন ভাইব্রেট করল। ফোন কানে ধরে, হ্যাঁ স্যার, না স্যার, এখনই ঘুমোব কি, সবে তো সাড়ে এগারোটা, ল্যাপটপ খুলতে খুলতে বলল নির্ভীক।

****

 

প্রসঙ্গটা কখনও না কখনও উঠবে জানত অটবী, কিন্তু ওভাবে যে উঠবে কল্পনা করেনি। অফিস ছুটি ছিল সেদিন, বিকেলবেলা বারান্দায় চা নিয়ে বসেছিল। বেশ আয়োজন করেই। বিয়েতে পাওয়া চায়ের সেট ছড়িয়ে। যে কটা চরম ইম্প্র্যাক্টিক্যাল বস্তুর প্রতি অটবীর ছোটবেলার লোভ, তার মধ্যে একটা হচ্ছে টি সেট। এর থেকে অনেক সুবিধে চা বানিয়ে ডিরেক্ট কাপে ঢেলে খাওয়া। গরম থাকে বেশিক্ষণ, বাসনপত্র ধোয়ামাজার ঝামেলা কম। তবু মাঝে মাঝে অটবীর অকারণ খাটতে ইচ্ছে করে।

উল্টোদিকের বারান্দা থেকে অটবীর খুড়শাশুড়ি, গুলতির মা, চেঁচালেন, বাঃ, টি পার্টি হচ্ছে বুঝি? আমাদের নেমন্তন্ন নেই? অটবী হাসল। অবশ্যই আছে, চলে এসো, এক্ষুনি। সিরিয়াসলি।

নির্ভীক কানে ফোন, নিয়ে বারান্দায় ঢুকল।

কাকিমা বললেন, না বাবা, তারপর বলবে কাকিমা আমাদের কাবাবে হাড্ডি হতে এসেছে। বাড়িতে ঢুকে গেলেন।

নির্ভীক চেয়ারে বসে বলল, শোন্‌ না, একটা কথা ভাবছি। মানে, এই প্রোজেক্টটা শেষ হতে আর বছর খানেক, তারপর হাই প্রব্যাবিলিটি শিকাগোতে শিফট করার। ভাবছিলাম, এখন যদি বাচ্চার জন্য ট্রাই শুরু করি, ধরে নেওয়া যাক মাস তিনেকের মধ্যে কিছু একটা… তিন প্লাস নয়, এক বছর, তদ্দিনে তুইও তোর এই চাকরিটা গুছিয়ে নিতে পারবি, বা ওখানে কিছু একটা খোঁজার ডিসিশন নিলেও হয়। অফ কোর্স, তুই যদি রাজি থাকিস, তবেই।

–কীসে?
–এই যে এতক্ষণ ধরে বললাম? বাচ্চা আর বিদেশ?

অটবী চায়ের কাপে আরাম করে চুমুক দিল। শুকনো হাওয়ায় গাছের পাতা খসে পড়ছে বারান্দায়। শীত পড়ছে।

–বিদেশের ব্যাপারে এক্ষুনি কিছু বলতে পারছি না, তবে বাচ্চাটা করা যায়।

নির্ভীক একগাল হাসল, গ্রেট। তাহলে ওই কথাই রইল।

অটবীর মনে একটুখানি আশা ছিল যে নির্ভীকের এই ছকটা নিশ্চয় মিলবে না। আফটার অল, এটা মানুষের শরীর, মেশিন না।

শরীর মেশিনের মতো কাজ করল। টি পার্টির ঠিক সাঁইত্রিশ দিনের মাথায় অটবীর প্রেগন্যান্সি কিটে কনফার্মেশন দেখা গেল। নির্ভীক ডিগবাজি খেতে বাকি রাখল। বাড়ির সবার ঘরে ঘুরে ঘুরে খবর দিয়ে এল দুজনে।

****

 

অটবীর আজকাল ক্লান্ত লাগে খুব। অফিস থেকে ফেরার পর আর শরীরে একবিন্দু শক্তি থাকে না। ক্লান্তির থেকেও বেশি লাগে ভয়। আরেকটা গোটা মানুষের দায়িত্ব। মাঝে মাঝে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অন্ধকারে জারুলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কী হবে জারুল? পারব আমি? সব যেন ভালো হয় জারুল। সব যেন সুস্থমতো হয়।

সেদিনও সেইরকমই বলছে মনে মনে, একটা চাপা চিৎকার হয়েই থেমে গেল। চিৎকারটা এতই ক্ষণস্থায়ী যে সত্যি শুনেছে কি না ধন্দ হয়। খানিকক্ষণ নৈঃশব্দ্যে কান পেতে যখন অটবী নিশ্চিত হয়েছে ভুল শুনেছে, এমন সময় অন্য একটা শব্দ কানে এল।

শব্দ এবং শব্দের উৎস চিনতে দু সেকেন্ড সময় লাগল অটবীর। ক্লান্তি অগ্রাহ্য করে ছাদে রওনা দিল অটবী। শব্দের মাত্রা বুঝে লোকেশন আন্দাজ করল এবং ভুল করল না। রেলিং ঘেঁষে উবু হয়ে আছে একটা ছায়া। কাল গুলতি ছুটিতে বাড়ি এসেছে।

–কীরে গুলতি? এই ঠান্ডায় ছাদে বসে আছিস কেন? কী হয়েছে?… কী রে?
–কিছু হয়নি। কান্না জোর করে সরিয়ে রাখতে গিয়ে গুলতির গলা অস্বাভাবিক কর্কশ।
–কিছু হয়নি বলে তুই এই মশার মধ্যে বসে বসে কাঁদছিস?

অটবী হাত বাড়িয়ে গুলতির কবজি ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করল। শক্ত হয়ে বসে রইল গুলতি।

–ঝামেলা করিস না গুলতি, আমার এখন ভারি জিনিস টানাটানি করা বারণ জানিস না?

রেলিং-এ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অটবী গুলতির দিকে তাকায়। রোগা হয়ে গেছে মেয়েটা। শুকনো মুখ ঘিরে কপালের পাশের চুলগুলো অগোছালো। দুই হাতে মাথা গুঁজে কান্না চাপার চেষ্টার ফল। অটবী হাত বাড়িয়ে চুলগুলো সমান করে দিল।

–আমার আর রোজ ঝগড়া করতে ভালো লাগে না… কান্নায় ডুবে গেল অটবীর নাম।

অটবী বলল, রোজ যদি ঝগড়া হয় তার মানে কোনও অসুবিধে হচ্ছে। সেটা কী আইডেন্টিফাই করেছিস?

–তুমি বুঝবে না।
–তুই বোঝানোর চেষ্টা করলে আমি বোঝার চেষ্টা করতে পারি।
–আমার আর শুভজিতের সঙ্গে সম্পর্কটায় থাকতে ভালো লাগছে না। গুলতি মুখ নিচু করে।
–থাকিস না। শুভজিৎকে বল।
–বলেছি। ও বলছে, জাস্ট ভালো না লাগাটা তো এতদিনের একটা সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়ার ভ্যালিড কারণ হতে পারে না। যদি কোনও অসুবিধে থাকে, ওর যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে, তাহলে ও সেটা সারিয়ে নেবে।
–ভালো না লাগাটা অত্যন্ত ভ্যালিড কারণ। তুই স্পষ্ট করে বল।
–অনেকবার বলেছি। ও মানতে চাইছে না। বলছে, ওষুধও তো লোকে ভালোবেসে খায়।

অটবীর হাঁ দেখে গুলতি বলল, এক্স্যাক্টলি। নিজেকে ওষুধের সঙ্গে কমপ্যারিজন করতে নাকি ওর অসুবিধে নেই। এটা নাকি একটা ফেজ, ঠিক হয়ে যাবে।

–আমি সরি, গুলতি, কিন্তু এই রকম ম্যানিপুলেটিভ লোকের সঙ্গে প্রেম করছিস কেন?
–আমি সত্যি আর করতে চাই না, অটবীদি। গুলতির মুখচোখ হতাশায় ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কিন্তু ও আমাকে ছাড়বে না।  যখন দুর্গাপুরে যাচ্ছি ভেবেছিলাম এইবার মুক্তি মিলল, একমাস বাদে হোস্টেলের ভিজিটরস রুমে ডাক পেয়ে গিয়ে দেখি সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছে। তারপর থেকে প্রত্যেক মাসে, উইদাউট ফেল, গেছে। আমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেছে, এখন আমরা বার্থডে পার্টিতে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে যায়। সেদিন শুনলে তো, ও আমাকে বিদেশেও যেতে দেবে না একা একা। সঙ্গে সঙ্গে যাবে।
–তুই শক্ত হ, গুলতি। বল যে এটা তোর ফাইন্যাল ডিসিশন।
–বলেছিলাম। বলেছিলাম এই শেষ। ফোন করিনি, ফোন ধরিনি, মেসেজের উত্তর দিইনি।
–তারপর?
–তারপর আমাকে ভিডিও তুলে পাঠিয়েছিল। হাতে ব্লেড চালানোর।
–অ্যাঁ!
–হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। ওর বাবা ফোন করেছিলেন। আমাদের একমাত্র ছেলে, তাকে আমরা হারাতে চাই না, মা, বলে কান্নাকাটি করলেন।

অন্ধকারের দিকে মুখ ফিরিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গুলতি বলল, বলল, আমি মেনে নিয়েছি অটবীদি, আমার মুক্তি নেই। আমি মরে যাব। ও তো হুমকি দেয় শুধু, আমি সত্যি সত্যি করে দেখাব।

–বাড়াবাড়ি করিস না গুলতি। চল ঘরে চল। গুলতির কাঁধ জড়াল অটবী।

সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে কিছুক্ষণ ধরে হয়ে চলা ঘাড়ের কাছের অস্বস্তিটা জোরালো হল অটবীর। দুটো চোখ যেন সেঁটে আছে ওর, ওদের ওপর। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে একবার চট কর বড়দির ঘরের দিকটায় তাকিয়ে নিল অটবী। ঘরের পাশে, গাছের নিচের ছায়াটা জমাট বেঁধে ঠিক যেন একটা মানুষের চেহারা নিয়েছে।

****

 

মাস ছয় পর কাকুদের ফ্ল্যাট থেকে কান্নার শব্দটা উঠল যখন অটবী তখনও ঘুমোতে যায়নি, আয়নার সামনে বসে ব্রণতে ওষুধ লাগাচ্ছিল। নির্ভীক তখনও কানে ইয়ারফোন গুঁজে হেসে চলেছে।

গান্ধর্বী গাঙ্গুলিকে রাত দশটা নাগাদ হোস্টেলের ঘরে অচেতন এসে আবিষ্কার করে রুমমেট। হোস্টেল নাইট চলাকালীন গুলতি কখন পার্টি থেকে সরে এসে নিজের ঘরে ঢুকে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। কতক্ষণ আগে খেয়েছে কেউ জানে না। ওষুধ কোথা থেকে, কার কাছ থেকে পেয়েছে তদন্ত চলছে। হোস্টেলের কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই মুহূর্তে আর কিছু বলা সম্ভব নয়। গান্ধর্বীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল। বাড়ির লোক যেন যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি আসেন।

পনেরো মিনিটের মধ্যে কাকু কাকিমাকে নিয়ে নির্ভীক বেরিয়ে গেল। হাত ধরে অটবীকে যখন বলল, সাবধানে থাকবি, অটবী টের পেল ওদের দুজনের হাতই কাঁপছে। আম্মা বললেন, আমি আছি। তুই রওনা দে। সাবধানে গাড়ি চালাবি। গুলতিকে বলবি, আমরা অপেক্ষা করছি।

অটবী আর আম্মা বসে রইল সারারাত। সকাল আটটা নাগাদ ফোন করল নির্ভীক। হাসপাতালে পৌঁছে গেছে ওরা।

চেয়ারে বসে আছেন আম্মা। খোলা দরজা দিয়ে ঠায় তাকিয়ে আছেন জারুল গাছের দিকে। সারারাত এই মূর্তিতে বসেছিলেন আম্মা। নির্ভীকরা যাওয়ার পর থেকে একটি শব্দ করেননি।

–আম্মা, গুলতি আউট অফ ডেঞ্জার। অটবী আর পারল না। আম্মা অটবীকে জাপটে ধরে কাঁদতে দিলেন।
–ছেলেটার নাম যেন কী?

আম্মার মুখের বলিরেখায়, ভুরুর ভাঁজে, ঠোঁটের দুপাশের ঝুলে পড়া পেশিতে সারারাতের ক্লান্তি ফুটে বেরোচ্ছে। খটখটে শুকনো চোখদুটো অটবীর দিকে ফেরালেন আম্মা।

–ছেলেটার নাম?
–শুভজিৎ?
–হুম্‌। শুভজিৎকে একটা খবর দেওয়া দরকার।

নির্ভীক ফিরল সন্ধেবেলা। বিধ্বস্ত। কাকুকাকিমা ফিরবেন গুলতিকে সঙ্গে নিয়ে। ওকে আরও দুদিন নার্সিংহোমে রাখা হবে। তারপর সাইকায়াট্রিক কেয়ার। সেটা কলকাতায় করা হবে।

বিছানায় পড়া মাত্র নির্ভীক ঘুমিয়ে পড়ল। অটবী পারল না। অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে ওর। ভ্যাপসা, দমবন্ধ গরমে কেটেছে সারাটা দিন। অটবীর আজকাল এত কষ্ট হয় গরমে। ওর শরীরটা এত বেঢপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি, বসতে অস্বস্তি। অবশেষে বৃষ্টি নেমেছে সন্ধে থেকে। এখন রীতিমত ঝমঝম করে পড়ছে। মেঘ ডাকছে ঘনঘন।

ঠান্ডা হওয়ার আশায় বারান্দায় বেরিয়ে এল অটবী।

গুলতিদের ফ্ল্যাট অন্ধকার। বাড়ি নিঃশব্দ। আম্মার ঘরে আলো জ্বলছে। অটবী জানে, শুভজিৎ এসেছে। গাড়ির আওয়াজ পেয়েছে অটবী। আম্মাই ফোন করেছিলেন সম্ভবত। অটবী সে সময় ইচ্ছে করে ঘরের ভেতর বসেছিল যাতে সামনে পড়তে না হয়। জলতেষ্টা পাচ্ছে অটবীর, ঘরের বোতলের জল শেষ কিন্তু অটবী রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে না, পাছে শুভজিতের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। বুকের ভেতর পাথরচাপ রাগ। অটবী দীর্ঘ শ্বাস নেয়। আম্মাকে একবার বলে ফেলবে ভেবেছিল, গুলতির কথাগুলো। সংযত হয়েছে। এখন কনফ্লিক্ট বাড়ানোর সময় নয়। গুলতি বাড়ি আসুক আগে, সুস্থ হোক।

দরজার শব্দ হল। ওকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই জেনেও আপনা থেকেই আরও ছায়ায় সরে এল অটবী। আম্মার ঘরের ভেতরের মৃদু হলদে আলোয় শুভজিতের নীল শার্ট দেখা যাচ্ছে। হাত তুলে কী একটা বলল, চাবিটা চকচক করে উঠল। দরজার আড়ালে আম্মা, বাইরে আসেননি। বেশ জোরে মেঘ ডেকে উঠল। হাওয়ার ঝাপট বাড়ছে। জারুলের ভেজা পাতা থেকে জলের ফোঁটা ক্রমশ দ্রুতবেগে পড়তে শুরু হয়েছে অটবীর ওপর। ওর এখন ঘরে চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু অটবী নড়তে পারছে না।

সিঁড়িঘরে শুভজিতের জুতোর শব্দ ইকো হচ্ছে। আম্মার ঘরের আলো নিভে গেল। অন্ধকার এখন জমাট। একতলায় সিঁড়ির ঘরের দরজার ঠেলে বেরোনোর ক্যাঁচ শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড বিদ্যুৎরেখা চিরে দিল আকাশ, একটা অমানুষিক চিৎকার, জারুলের একটা ডাল নেমে এসে জাপটে ধরল নীল শার্টের গলা, ছোঁ মতো মেরে তুলে নিল আকাশে। দুই হাত দুই পা শূন্যে ছিটকোচ্ছে প্রাণপণ, শুভজিতের বিস্ফারিত চোখের সাদা সোজা তাকিয়ে আছে অটবীর দিকে।

বিদ্যুতের আলো নিভে যাওয়ার আগের মুহূর্তে অটবী দেখল বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুভজিতের ঝুলন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে বারান্দায় টানটান দাঁড়িয়ে আছেন আম্মা। ভয় নেই। আতঙ্ক নেই। চোখমুখ জুড়ে কেবল ঘৃণা আর উল্লাস।

অটবীর পায়ের নিচটা খালি হয়ে গেল।

****

 

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, হাসপাতালের মেঝেতে স্ট্রেচারের চাকার ঘরঘর, নির্ভীকের কান্না ছাপানো ক্রমাগত অটবী, অটবী, ডাক ছুঁতে পারল না অটবীকে। ওর অচেতন মাথার ভেতর খালি বিদ্যুৎ চমক। শূন্যে ছটফটানো একটুকরো নীল, চোখের সাদা, পায়ের নিচটা বারংবার খালি হয়ে যাওয়ার ঘোরের মধ্যে অটবী অচেতন হয়ে শুয়ে রইল।

****

 

–মির‍্যাকল। বললেন ডাক্তার। মির‍্যাকল শুয়ে রয়েছে এখন অটবীর পাশের ছোট্ট বেডে। গত তিনদিন নির্ভীক অর্ধেক হয়ে গেছে। গালে দাড়ি, খোঁচা খোঁচা, অলরেডি দু-চারটে সাদা দাড়ি, যেগুলো ঢেকে রাখার জন্য নির্ভীক দিনে দুবেলা দাড়ি কাটতে রাজি আছে, প্রকাশ্যে এসে পড়েছে।

কাকুরা গুলতিকে নিয়ে রওনা দিয়ে দিয়েছে, এসে যাবে আজই। গুলতি না এলেও কাকুরা আসবে হাসপাতালে আজই।

অটবী শক্ত করে নির্ভীক আঙুলগুলো অটবীর নির্জীব আঙুলে জড়াল।

–তোরা সবাই মিলে কিছু খেল দেখালি মাইরি। উফ্‌। নির্ভীক ঝুঁকে পড়ে মেয়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে নানারকম অবোধ্য আওয়াজ করে।
–সবাই বলেছে আমার মতো দেখতে হয়েছে।

শব্দ হল। ঘরের দরজায় ধূসর রঙের শাড়ি। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন।

নির্ভীক উঠে পড়ল। এই তো। আমি এবার চান না করলে এরা আমাকে আর ঢুকতে অ্যালাউ করবে না। চান করেই আবার আসব। আম্মা তুমি থাকবে তো খানিকক্ষণ?

****

 

মেয়েকে আদর করে অটবীর খাটের পাশে এসে বসলেন আম্মা। অটবী চুপ করে রইল।

–তুই যখন অন্য কথা বলতে চাস না তাহলে সেই কথাই হোক। ব্যাগের ভেতর একটা চৌকো প্লাস্টিক বার করলেন আম্মা। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ভেতরের জিনিসটা অটবী আগে দেখেছে। আম্মার ঘরের শো-কেসে রাখা সারি সারি ডায়রির একটা।
–এই দেখ, এটা গাঙ্গুলিবাড়ির মেয়েদের লেখা ডায়রির জানা প্রাচীনতম নমুনা।

অটবী হাত বাড়িয়ে নিল ডায়রিটা। দড়ি দিয়ে বাঁধা ঝুরঝুরে কয়েকটা পাতা। হলুদ, ভঙ্গুর।

–অত আতুপুতুর দরকার নেই। এতবছরে যখন কিছু হয়নি তখন তোর আঙুলের ক্ষমতা নেই এই ডায়রি ধ্বংস করে।

দড়ি খুলে প্রথম ছেঁড়া পাতায় চোখ রাখল অটবী। শুকনো পাতার মতো স্পর্শ আঙুলে। প্রথম পাতায় লেখকের নামের বেশিরভাগটাই ধুয়ে গেছে।

–ইস কী খারাপ হাতের লেখা!

আম্মা কড়া চোখে তাকালেন। প্রথম প্রজন্ম লিখতে শিখেছে, তাও লুকিয়েচুরিয়ে, অন্যরকম কিছু হলেই অদ্ভুত হত।

অটবী ডায়রি ফেরত দিয়ে দিল। পরে পড়ব। নয়তো তুমি বলে দাও কী লেখা আছে।

তোর যে ঘটনাটা জানা দরকার সেটা ঘটেছিল এই ডায়রি লেখা হওয়ারও অনেক আগে। যদিও তার উল্লেখ এই ডায়রি ছাড়া আর কোথাও পাবি বলে মনে হয় না। ডায়রির লেখক যদিও রাসমণি, লিখেছিলেন মূলত ঠাকুমার রামপ্রিয়া দেব্যার মুখে শোনা গল্প। দেব্যা লিখতেপড়তে পারতেন না, কিন্তু রাসমণির লেখা পড়ে মনে হয়, গল্প বলার প্রতিভা শানদার ছিল। দেব্যা বর্ণনা দিয়েছিলেন ন বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এসে দেখা বাড়ির। বাড়িভর্তি গিজগিজ পুরুষমানুষ। যেদিকে চোখ ফেরাও, কান পাতো, পুরুষমানুষ। চেঁচাচ্ছে, ধমকাচ্ছে, চলছে, ফিরছে, হাত নাড়ছে। এদিকে সংখ্যায় প্রায় সমান সমান মেয়েমানুষ, অথচ তাদের দেখাই যায় না। তারা চলে পা টিপেটিপে, কথা বলে ফিসফিস। তাদেরও দাপট যে নেই তা না, কিন্তু সে সব আড়ালে। বাইরে থেকে দেখলে ও বাড়িতে পুরুষমানুষ ছাড়া আর কেউ আছে বলে মনে পড়ে না।

ও বাড়ির মেয়েরা যে গলা দিয়ে আওয়াজ বার করতে পারে সেটা যেদিন জানা গেল এটা সেদিনের গল্প। বর মরল ছোটবউয়ের।দেব্যার লতায়পাতায় জা। নিঃসন্তান। মরলে ছোটভাইয়ের বখরাটা বাকি ভাইয়েরা নিয়ে নিতে পারবে। রাষ্ট্র হল, ছোটবউ স্বপ্নে আদেশ পেয়েছেন, সতী হওয়ার।

তারপর যা হয়, হইহই রইরই মিছিল করে গিয়ে বাড়িশুদ্ধু, পাড়াশুদ্ধু লোক আফিমে বুঁদ ছোটবউকে চন্দনকাঠের চিতায় তুলে দিল। চারদিক থেকে বাঁশের চক্রব্যূহ উঁচিয়ে পুরুষমানুষেরা দাঁড়াল, যাতে ছোটবউয়ের পুণ্য ফসকে না যায়।

আগুন পড়ল, ছোটবউয়ের আফিমের ঘোর ছুটে গেল, সে চেঁচাতে চেঁচাতে চিতায় উঠে বসল। পুরুষেরা বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে ছোটবউকে ঠেলে দিতে লাগল আগুনের ভেতর।

–আম্মা! প্লিজ।

পাড়া কাঁপিয়ে নির্লজ্জের মতো অত জোরে কোনও মেয়ে চেঁচাতে পারে, তাও গাঙ্গুলি বাড়ির, ভাবা যায় না। কিন্তু কেউ কিছু মনে করল না, কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে জয়ধ্বনি দিতে লাগল। আর পালকির ভেতর বসে বুকে ঢেঁকির পাড় ফেলতে ফেলতে চিৎকার শুনলেন আমাদের দেব্যা।

পাশের পালকি থেকে বড় জা বললেন, এইবেলা শুরু কর পুঁটি, আর গড়িমসি করিসনি। দেব্যা করেনওনি। গোটা জীবনে সতেরোটা বাচ্চা বিইয়েছিলেন, যাতে মরেঝরে গেলেও দু-এক পিস থেকে যায়। যাতে স্বামী মরলে নিঃসন্তান বিধবা হয়ে না থাকতে হয়। বুড়ো বয়সে সে গল্প বলে গিয়েছিলেন নাতনি রাসমণিকে, রাসমণি লিখতে শিখে সেই গল্প লিখে রেখেছিল এই খাতায়।

ছোটবউয়ের ছিল গাছের শখ। দেব্যারও ছিল গাছের শখ। ছোটবউকে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেরার প্রায় মাসখানেক বাদে এক ভয়ানক ঝড়জলের পর বাগানে নিজের ভেঙে পড়া সাধের আমচারার সৎকার সারতে বেরিয়ে দেখেছিলেন, বাগানজোড়া ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে একটা টিংটিঙে চারা সটান দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়েছিল। সতী হওয়ার কদিন আগে এই চারা নিজের হাতে পুঁতে গিয়েছিল ছোটবউ।

সেই চারাই আজকের জারুল। ঝড়ে পড়েনি। খরায় শুকোয়নি। বানে ভাসেনি। খালি বেড়েছে আর উঁচু থেকে আরও উঁচু হয়েছে। জারুলের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বাড়ির মেয়েরা। তাদের বিয়ের বয়স পিছিয়েছে, স্কুলে গেছে, পড়তে শিখেছে, লিখতে শিখেছে, নিজের পায়ের তলার জমিতে নিজে দাঁড়াতে শিখেছে, দেবী থেকে দিব্যি মানুষের মতো হয়ে উঠেছে।

আর লক্ষ করেছে, তাদের প্রতি গাছের টান, গাছের প্রতি তাদের। লক্ষ করেছে ছোট ছোট অদ্ভুত ঘটনা। কেউ কম কেউ বেশি। যারা বেশি করেছে, তারা প্রথমটা বিশ্বাস করেনি। কারণ এ জিনিস বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এই ধর খড়ম খটখটিয়ে দাদু লোটা নিয়ে বাগানের দিকে চলেছেন। পাঁচ মিনিট আগে বউয়ের গালে এক চড় মেরে বেরিয়েছেন, যত্নে ত্রুটি হয়েছিল বলে। কোথাও কিছু হাওয়া নেই, জারুলগাছের কচি ডাল দুলে উঠে দাদুর গালে এসে পড়ল। সপাং। ফর্সা গাল দেখতে দেখতে লাল।

এই রকম ছোট ছোট ব্যাপার জমতে জমতে বাড়ির মেয়েরা অবশেষে বুঝল যে পুরোটা কল্পনা হতে পারে না। ব্যাপারটা সত্যি। এ বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে কোনওরকম বাঁদরামো জারুল সহ্য করে না।

এ ব্যাপার প্রকাশ্যে ঘোষণার বিপদটা তাদের বুদ্ধি এড়ায়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আচারের আড়ালে গড়ে তুলেছে গাছের সঙ্গে তাদের গোপন সম্পর্ক। গাছকে নিজেদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে। গাছের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। সংসারে নতুন মেয়ে এলে গাছের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এ আমাদের লোক, এ তোমার লোক। তুমি একে দেখো, এ তোমাকে দেখবে।

অটবীর মাথার ভেতর বিদ্যুৎ চমকায়। শূন্যে ছটফটানো একটুকরো নীল, চোখের সাদা, পায়ের নিচটা খালি হয়ে যাচ্ছে, প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় পেট আগলে ধরেছে দুই হাত, মাথা দ্রুত নেমে যাচ্ছে টাইল লক্ষ করে, শেষ মুহূর্তে ডালটা মাঝপথে এসে পড়ে বাঁচিয়ে দিল।

–ছেলেরা বোঝেনি?
–বুঝেছিল কি না জানি না, তবে কিছু করতে পারেনি। একাধিকবার গাছ কাটার প্রস্তাব হয়েছিল। মেয়েরা রুখে দাঁড়িয়েছে প্রত্যেকবার। বাড়িটার ওইরকম বিতিকিচ্ছিরি চেহারা কী করে হল তোর মনে হয়? সর্বদা ওই গাছকে বাঁচিয়ে বাড়ি বাড়াতে হয়েছে।
–তার মানে মাতাল বরকে বড়দি জানালা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেননি, তাই তো?
–উঁহু। কিন্তু খোলা জানালা বেয়ে ছোরা হাতে উঠে আসা বরকে কে হাত বাড়িয়ে টান মেরে তিনতলা নিচে আছড়ে ফেলেছিল, সেটা দেখেছিলেন। হয়তো সেই রাতেও সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকেছিল। হাসলেন আম্মা।
–এই সব কথা তুমি গালে পুরে বসে থেকেছ?
–আমি কিছু লুকিয়ে রাখিনি। আলমারির দরজায় তালা দেওয়া থাকে না। ডায়রি সাজানো আছে, তেমন কৌতূহল হলে খুলে দেখবে। তবে বেশিরভাগই দেখে না। আমার মতে ভালোই করে দেখে না। সবার সহ্যশক্তি সমান নয়। কিন্তু সব জেনারেশনেই দু-একজন থেকে যায় যাদের হাতে এ উত্তরাধিকার তুলে দেওয়া যায়। আমার শাশুড়ি আমাকে দিয়ে গেছিলেন। আমিও ভাবতে শুরু করেছিলাম একজনকে দিয়ে যাওয়া যায়, তার আর দরকার নেই।

অটবী হাত বাড়িয়ে মেয়ের মাথা ছুঁল।

–জারুলের ভরসা কতখানি, এ বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে গেলেই তো…

–সেটা আমি ভেবে দেখেছি জানিস। কিন্তু আমার ধারণা ভরসাটা অন্যভাবে কাজ করে। মানে এই যে তুই জীবনের তৈরি হওয়ার সময়টা ভয় না পেয়ে, খোলা মনে, তোয়াক্কা না করে বড় হচ্ছিস, নিজেকে কারও থেকে কম মনে করছিস না, কেউ তোকে কারও থেকে কম মনে করাচ্ছে না, এইটা একটা জীবনভরের বর্ম তৈরি করে দেয়। সেখানেই জারুলের ছায়া শুধু এ বাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে গোটা জীবনের ওপর পড়ে।

অটবী, আম্মা ঝুঁকে পড়ে অটবীর হাতে হাত রাখলেন। পৃথিবীটা আমাদের সারভাইভ্যালের জন্য সহজ নয়। ছোটবউয়ের জন্য সহজ ছিল না। বড়দির জন্য ছিল না। আমার জন্য নয়, তোর জন্য নয়, গুলতির জন্য নয়। তোর মেয়ের জন্যও হবে না। আর সারভাইভ্যালই শেষ কথা। সে জন্য যতখানি সাহায্য পাওয়া যায় নেওয়াই উচিত।

–তা বলে মেরে ফেলবে?
–আমাদের মেয়েটা যে মরে যাচ্ছিল? ওদের রাগে, ঘৃণায়, কামে, প্রেমে– মেয়েরা বারবার মরে ভূত হবে, আর কোনও রিট্যালিয়েশন থাকবে না?
–শুভজিৎ কেমন আছে?

জানি না। ডায়রি প্লাস্টিকে মুড়ে ব্যাগে চালান করলেন আম্মা। ওরা খবর নিয়েছিল বোধহয়। শারীরিক চোট সামলে উঠতে টাইম লাগবে, কিন্তু আসল চোট মানসিক। এখনও কথা বলছে না। ওরা সাইকিয়াট্রিস্ট কন্সাল্টেশন নিচ্ছে। তিনি বলেছেন টাইম লাগবে, কোনও কথা দেওয়া যাচ্ছে না।

ও, আজ আসার আগে দেখলাম এটা। তোর বারান্দার ডালটায় ফুটেছিল। ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলেন আম্মা, বেগুনি পাপড়িওয়ালা একটা ছোট্ট জারুলফুল। টেবিলের ওপর রাখলেন।

তাড়াতাড়ি বাড়ি আসিস। ভালো থাকিস।

****

 

ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল অটবীর। অবশেষে শেষ অতিথি বিদায় নিয়েছে। শেষের আধঘণ্টা ও কী বলেছে, কার সঙ্গে কথা বলেছে, কাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে কিছুই ওর মনে ছিল না।

নির্ভীক ঘরে এল। কীরে, তোরা এখানে? সবাই খুঁজছে তো। ওরা সবাই রেডি হচ্ছে, কী সব আচারটাচার হবেটবে আমাদের কুমড়োপটাশের অনারে। অটবীর ঘাড়ের ওপর ডিঙি মেরে মেয়ের ঘুমন্ত মুখে চুমু খায় নির্ভীক। ফোন বাজে। হ্যাঁ স্যার, বাড়ি পৌঁছে গেছেন অলরেডি? এক্সেলেন্ট– বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

অটবী মেয়েকে বুকে জড়িয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আজ চাঁদের আলো ম্লান। আবছা অন্ধকারে জারুল, সেই প্রথমবার দেখার মতোই, প্রকাণ্ড আর সুন্দর, আর– অটবীর এই প্রথম মনে হয়, খানিকটা কি ভয়ালও?

মেয়ে কেঁদে ওঠে। শ্‌শ্‌শ্‌ করে দোলা দিতে দিতে আবার মেয়েকে ঘুমের ভেতর ফেরত পাঠায় অটবী।

জারুল অপেক্ষা করে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2763 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. পরীক্ষামূলক গল্প বলতে মাঝেমধ্যে কিছু গল্প পড়ি যেখানে গল্পের পরিবর্তে থাকে পড়তে ভাল লাগে এমন বা বলা যায় গল্পহীন চমকপ্রদ গদ্য। কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকের।ভাষা কবিত্বময় এবং খুবই পরিমিতিবোধসম্পন্ন। এবং শুধু স্বাদু গদ্য নয়, সেই গদ্য দিয়ে তিনি তৈরি করতে পারেন একেবারে চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো চমতকার একটি গল্প। এই ‘অটবী ও জারুল’ গল্পে জারুল গাছটি সতিদাহ হওয়া বাড়ির সেই ছোটবউ-এর প্রতিবাদের আগুন থেকেই জন্ম নেওয়া। আপ্রাণ বাঁচার চেষ্টায় ব্যর্থ সেই নারী যেন শোধ তুলছে। না, এটা মোটেই ভূতের গল্প নয়। শোধ তুলছে পরবর্তি প্রজন্ম, শোধ তুলছে একের পর এক ঘটনার নারীদের মুখে মুখে তৈরি ব্যাখ্যায়, প্রচারিত গল্পে। আর, মানুষের জীবন তো গল্পেরই জীবন। কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্যই এই মুহূর্তের একজন খুবই ব্যতিক্রমী লেখক।

আপনার মতামত...