তিনটি নামহীন অণুগল্প

শঙ্খশুভ্র মল্লিক

 

এক নম্বর

এদিকে দাদা, বাঙুর, হলদিরাম, এয়ারপোর্ট, এদিকে আসুন, মধ্যমগ্রাম বারাসাত! হ্যাঁ দাদা! একটু আস্তে! কেষ্টপুর তো? দাঁড়ান! এ্যাঁ বারাসাতও নাকি? ইয়ার্কি পেয়েছেন? বারাসাত? উল্টোডাঙা থেকে বারাসাত? অটো না বাস দাদা? ধুর মশাই, থামুন তো, লিখছেন তো গল্প, তাও অ্যাত্তো দাবী কীসের? গরু কিনেছেন! বেশ করেছেন! ব্যস এবার তাকে ছেড়ে দিন, সে নিজের খুশিতে চড়ে বেড়াক। খাক দাক, এদিক ওদিক মর্জিমাফিক ঘুরুক, বেয়াড়া পাবলিক দেখলে খানিক তাড়া করুক, একটু আধটু ঢুঁসোক! তবে তো খেলা জমবে! বলছেন? আচ্ছা তাই সই, আমার আবার অনেকদিন টাচ নেই কিনা এসবের! তাই খানিক নার্ভাস লাগছে! ঠিক হ্যায় তাহলে চালাও পানসি বারাসাত। আমার আর তাতে কী এসে যায়? আমি তো নামব কেষ্টপুর! তারপর, যান না আপনি অনেক দূর! আহ কী দিলেন দাদা! পুরো টুলাইনার তো, এই যে বললেন টাচ নেই? ওই আর কী, তা দাদা একটু চেপে টানুন না এবার! বুঝলেন তো কাকিমা বোয়াল করেছে, বেশ তেল রসুন দিয়ে কষিয়ে, সঙ্গে বেগুন বড়ি ধনেপাতা দিয়ে আড়ের ঝোল। উফফ উফফ, পুরো বিয়েবাড়ির মেনু নামিয়ে দিলেন তো মশাই! লকডাউন থেকে এখন আর অত রেগুলার ভালোমন্দ জোটে না, বাজার কমই যাই, বাড়িতে বয়স্ক লোকজন, দুটো বাচ্চা, বোঝেনই তো নিজেদের সেফটি, তারপর পয়সাকড়ি সর্ট, অটোটাও ঝোলাল, মেকানিক মাস খানেক করোনায় মরেছে, তার ছেলেটা এই সবে সপ্তাহখানেক গ্যারেজ খুলছে, সেরকম পোক্ত নয় কাজে। তাও কদ্দিন বউ লাউচিংড়ি খাব বলছিল বলে কাল সুযোগ পেয়ে রেঁধেছিলুম, সেরা হয়েছিল, বেশ ঝাল ঝাল। বাহ আলাদাই তো! খিদেটা বেড়ে গেল দাদা! একি বাঁদিক নিলেন কেন? মেন রোড বন্ধ নাকি? না না রাস্তা একদম ঠিক আছে! তবে কেষ্টপুর যাব না আর! যাবেন না মানে? আবার ইয়ার্কি মারছেন তো? না না ইয়ার্কি কেন হবে? এ্ই তো এইবার টেক অফ করব! ফোনটা বন্ধ করে চটপট সিটবেল্টটা বেঁধে নিন দেখি! ধুর মশাই, সিটবেল্ট, টেক অফ, কী যা তা বলছেন? পাগল নাকি! আহা খামোকা চটছেন কেন? দেখুন না সামনে একবার! রাস্তা কই? খোলা আকাশ তো! এই যে এই প্লেনের ছবি এঁকে কায়দা করে পাইলট লিখে দিয়েছি, ব্যস আর চাপ নেই! সিক্রেট মিশনে যাচ্ছি বুঝলেন কিনা, বোমা ফেলে আসব, কারুক্কে বলবেন না কিন্তু ভুলেও! উরে বাবা বোমা টোমা আবার কেন? আমি খুবই ভয় পাই ওসবে! এখনো কালীপটকা ফাটালে মাকে খুঁজি। রংমশাল তুবড়ি ধরালে সিঁটিয়ে যাই। ওগুলোও মাঝে মধ্যে বেকায়দায় ফেটে যায় জানেন তো! শব্দে পিলে চমকে যায় মশাই। উফফ এ বোমা সে বোমা না! সুমনের গান শুনেছেন তো? বারুদ নয় কেবল চকোলেট ভরা আছে! চেপে বসুন একটু খানিক, তারপর সল্টলেক এলে বলব না হয়, কারও সঙ্গে দেখা করে জমিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে ফিরবেন! সল্টলেক? সেখানে কার সঙ্গে দেখা করব? যাহ ভুলে গেলেন নাকি সেইসব বিকেলগুলো? লাথ খেয়ে শখ মিটে গেছে? যাহ তাহলে এখন কোথায় নিয়ে যাই? গল্ফ গ্রিন? ব্যাঙ্গালোর? চাকরিও তো পাননি অ্যাদ্দিনে তাই না? না না প্লিজ না! আর বলবেন না এসব! কোত্থাও না! আমি আর কোথাও যাব না! স্রেফ কেষ্টপুরটা এলে নামিয়ে দিন না প্লিজ, এরকম করছেন কেন দাদা! আপনি কে? আমি কে? আমি কেউ না! বেকার জাদুকর! আগে মেট্রোর সিঁড়িতে বাঁশি বাজাতাম, এখন আকাশে অটো চালাই। হাওড়া ব্রিজের উপর ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে বিড়ি মুখে চোখ রাখি আপনাদের উপর! এই আপনারা যারা ভাবেন খানিক হাঁটলেই সব ঝ্যাম মুছে জীবন জিঙ্গালালা হয়ে যাবে! মেট্রো থেকে কদ্দিন মাথা নিচু করে বেড়িয়ে রাজ্য হেঁটে মাঝরাতে বাড়ি ফিরেছেন, ঘন্টায় কটা সিগারেট ফুঁকেছেন, মদের নেশায় পা টলেছে কি টলেনি, গালে জলের দাগ ছিল কি ছিল না, সব হিসেব আছে! না না কাঁদতে হবে না, সরি সরি, আচ্ছা আচ্ছা সব ঠিক আছে, এই চুপ করলুম, উফফ, কী ভীতু রে বাবা! শুনুন না বলি কী পালাবেন নাকি শহর ছেড়ে? দাঁড়ান তাহলে একটু!

ও দাদা, উঠুন, উঠুন, ঘুম ভেঙে ঝটপট এবার নামুন দেখি, পৌছে গেছি! এই যে নামি, দাঁড়ান! ও দাদা এ কোথায়! এ তো পাহাড়! হিমালয় চলে আসবেন বলেননি তো? আহা কদ্দিন পাহাড় দেখিনি! ভারি ভালো লোক তো আপনি! না হিমালয় আর কই এলুম! অত জাদু জানিনে তো! এই একটা এমনিই পুঁচকে পাহাড়! আর জানেন তো এইটে একটু কষ্ট করে টপকাতে পারলেই স্রেফ স্বর্গ! বোয়াল, লোটে, কাজরী, ইলিশ যা চান, সব যত্ন করে পাতে সাজানো আছে। চাকরির চিঠিও লেটার বক্সে গোঁজা! কে বলতে পারে রাতদিন আপনার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতেও কেউ রাজি হয়ে যাবে সেখানে! টপকাব? কী করে? ওই একটু হাঁটতে হবে, বেশি না, এট্টুখানি! বলছেন? তাহলে হাঁটি? হ্যাঁ হ্যাঁ হাঁটুন, নিশ্চিন্তে হাঁটুন! একা একা এই জন্মটা বেকার হেঁটে নিন কেবল! মানে? কী বলতে চাইছেন? শুধুই হাঁটব? পৌছাব না কোথাও? দাদা দাঁড়ান, শুনুন একবার, যাবেন না, প্লিজ যাবেন না, আকাশ কালো করে আসছে, বাজ পড়ছে, তুমুল বৃষ্টি, যাবেন না, ছেড়ে যাবেন না, ভাড়া দেব না কিন্তু। ভাড়া কে চায়? আপনি এগোন মশাই এবার! কথাদের চেপেচুপে যে পাহাড় বানিয়েছেন অ্যাদ্দিন সেসব হেঁটে ডিঙোবেন না আজ? আপনি ছাড়া কে বইবে আপনার ক্রুশ? হাঁটুন তাহলে, আমি আসি এবার। টা টা।

 

দুই নম্বর

শালা হারামজাদা! আরেকবার এ তল্লাটে দেখলে ডান্ডা মেরে তাড়াব! পুলিশের তাড়া খেয়ে জাদুকর ভয়ে খানিক পিছিয়ে আসে! লকডাউনের পর এই আজ মেট্রো খুলেছে। লোকজন সেরকম নেই। যাও বা আগের মত সিঁড়ির সামনে বসে একটু বাঁশি বাজিয়ে, দুটো বলের জাগলিং দেখিয়ে যাহোক কটা টাকার ধান্দা করেছিল, পুলিশের তাড়ায় সে আশায় বালি। এ কমাস বড়বাজারে একটা চায়ের দোকানে উদোম খেটেছে। মালিক একেবারেই সুবিধের না। পয়সার গরমে পা পড়ে না মাটিতে! বুড়ো ছাড়া আজ অবধি আর কিছু বলে ডাকেনি। খিস্তিখাস্তা, সময়ে অসময়ে দু একটা চড়চাপড় তো জলভাত! মেট্রো আবার খুলছে জেনে কাল সেসব ছেড়েছুড়ে খুব করে শুনিয়ে এসেছিল। দুদিনের শ দেড়েক টাকা আটকে রেখেছিল লোকটা। বুড়ো পাত্তা দেয়নি, ভিক্ষে দিচ্ছে নাকি? হকের টাকা নাহ? যাক রেখে দিক, ওইতে গুষ্টিশুদ্ধু গান্ডেপিন্ডে গিলে হেগে মরুক! আরেকবার বলে দেখবে পুলিশটাকে? স্যার ও স্যার, একটু শুনুন না, এই একটু সাইড করে বসে বাঁশি বাজাব কেবল, আর কিচ্ছু করব না! একটু দিন না স্যার, অ্যাত্তো বছর এই করে পেট চালাচ্ছি। করোনার সময় বসে বাঁশি বাজাবে? মাস্কটা কি তোমার বাবা পরবে শুয়োর? বাঁশিতে রোগ ছড়াবে জানো না শালা? ভালো কথায় হবে না এর! জাদুকর আর কথা বাড়ানোর সাহস পায় না। সাতসকালে খালি পেটে রুলের গুঁতো পড়লে হজম হবে না। সত্যিই তো বাঁশি বাজাতে গেলে মাস্ক খুলতে হবে, করোনাও ছড়াতে পারে, ভুল নয়! আচ্ছা মাস্ক পরে শুধু বলের খেলা দেখানো যাবে কিনা জিজ্ঞেস করবে? না থাক! এমনিতেই রাগী চোখে তাকাচ্ছে, এরপর কেলিয়ে দিলে মুশকিল! কী হবে তাহলে এবার? আবার চায়ের দোকান? আর তো বড়বাজারে ফেরা যাবে না! কলেজ স্ট্রিটের দিকটা একবার দেখবে? তখন লোকজন ছিল না দিব্যি নিয়ে নিয়েছিল, এখন সব ফিরে এসেছে, আর কি বুড়োকে নেবে? জাদুকর ভাবতে গিয়ে আর থই পায় না! যা আছে তাতে দিন সাত শাকভাত চলে যাবে যাহোক। তাহলে থাক বরং এখন আর না ভেবে একটু ঘরে ফেরা যাক, ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান এঁটে কাল আবার বেরোনো যাবে! দুটো বাস রেষারেষি করতে করতে আসছিল। দুটোই যাবে। জাদুকর কোনওভাবে দৌড়ে সামনেরটায় উঠে পরে। হ্যান্ডেল্টায় নড়বড়ে হাত হড়কাচ্ছিল। পিঠে কন্ডাকটর হাত দিয়ে সামাল দেয়।

শালা হারামজাদা! এভাবে কেউ চালায়! এক্ষুনি তো বুড়োটা মরলে জেলে পচতে হত! কেউ একটা গজগজ করে। তবে কন্ডাকটর পাত্তা দেয় না বিশেষ। জাদুকর পেছন দিকে এগিয়ে আসে। দাদা পাঁচজন তো, একটু সরে বসবেন? করোনার সময় জানো না? গাদাগাদি করে বসে ছড়াবে নাকি? না মানে! জাদুকর আবার চুপ করে যায়! সামনের লোক চারটের মধ্যে একটা ছেলে খালি মাস্কে মুখ ঢেকেছে। বাকি দুজনের থুতনিতে, আরেকজন আবার খুলে পকেটে রেখেছে। কথা বলার দরকার নেই বাবা, না বসাই ভালো। এবাজারে করোনা হলে আর কেউ বাঁচাতে আসবে না। এমনিতেই শীত পড়ে দিন দুয়েক ঠান্ডা লাগছে ভোরের দিকে, ওই হাঁচি বার কয়েক, একটু নাক টানা, বেলায় কমছে! জাদুকর মাস্কের উপর গামছাটা ভালো করে জড়িয়ে নেয়। বাসটা পাগলের মতো টানছে, রাস্তা ফাঁকা, জুড়ি পেয়েছে, কে থামায়। কাঁপা হাতে দাঁড়ানো ঝক্কির! বলতেই বলতেই সিগন্যাল। ব্রেকের ঠেলায় বুড়ো সামলাতে না পেরে গিয়ে পরে সামনের লোকটার ঘাড়ে। শালা হারামজাদা, তখন থেকে এভাবে চালাচ্ছে! সমানে বলে যাচ্ছি শালা মানুষ মারবে এরা! এই করেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়! কেস না খেলে শুধরোবে না। সবাই অবশ্য ঠিক একই সুরে গায় না! শালা হারামজাদা, সকালবেলাই মাল খেয়ে টাল নাকি? লোকের ঘাড়ে এসে পড়ছ? দাঁড়াতে শেখোনি ঠিকমতো? বুড়োর মুখে থুতুর ছিটে লাগে। নিজেকে বাঁচিয়ে বুড়ো আরও সরে আসে একটু দরজার দিকে। আর দুটো স্টপ। কথা বাড়ানোর মানে নেই। দাদু ভাড়াটা? কত? আট নাও? আট ফাট হবে না। পনেরো হয়েছে অনেকদিন, জানো না? পাশের লরিটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সমানে ধোঁয়া ছাড়ছে। বুড়োর দম বন্ধ হয়ে আসে। সিগন্যালটা লাল থেকে সবুজ হওয়ার সঙ্গে আরও একবার বাসের মধ্যে কালো ধোঁয়া ছেড়ে যায় লরিটা। জাদুকর আর সামলাতে পারে না। কাশিটা এসেই যায়! শালা হারামজাদা, এসব কেশো বুড়োকে কেন তোলে বাসে? মাতাল পুরো! হ্যাঁ ওই দেখেই তো বসতে দিইনি। ভাড়ার আশা না থাকায় কন্ডাকটরও ফাঁকতালে দুটো খিস্তি দিতে ভাবে না। এতক্ষণ সমানে দাঁড়িয়ে হাত পা কাঁপছে! কাশির চোটে মাস্ক আর গামছার ফাঁক গলে শ্বাস নিয়ে কোনওভাবে নিজেকে রড ধরে সোজা রাখাও বড্ড শক্ত।

একদল লোক নিজেদের মুখ ঢাকবার কষ্ট না করেই কেশো বুড়োকে ধাক্কা মেরে চলন্ত বাস থেকে রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দেয়! হাতে স্যানিটাইজার ঢালতে ভোলে না অবশ্য তারপর! পেছনে কোনও গাড়ি চোখ কান বুজে তেড়ে আসছিল কিনা তা জানার জন্য কেউ আর অপেক্ষা করেনি।

 

তিন নম্বর

আরে আরে করছে কী লোকটা? পড়ে মরবে নাকি? একবার পা ফসকালেই শেষ তো? কেউ চেনে? ছাদে উঠল কী করে? এই চাওয়ালা, ও বাড়ির কাউকে চেনো? নিচ থেকে উঠে আসা স্বরগুলো এড়িয়ে জাদুকর পাঁচিলের উপর উবু হয়ে বসে। এ ছাদ থেকে ও ছাদে বাঁধা তারটায় একবার নাড়া দেয়। বাহ বেশ শক্তপোক্ত হয়েছে, টান টান, ছিঁড়বে না, ভয় নেই। তবু এক পা সাবধানে পাঁচিলে রেখে আরেক পা তারে ছুঁইয়ে জাদুকর হাত দুটো দুদিকে ছড়িয়ে দেয়! একটা বাঁশ থাকলে সুবিধে হত খানিক। অনেকদিন অভ্যাস নেই তো। তবে পা কাঁপে না। তারটা একটু ডেবে গেলেও দিব্যি ধরে রাখে। জাদুকর পাঁচিল থেকে আরেকটা পাও সরিয়ে নেয়! পৃথিবীটা একবার টলে গিয়েও মুহূর্তে সামলে যায়। শরীরের স্মৃতি ফিরে পেতে ওটুকুই সময় লাগে!

দশ মিনিট আগে সস্তা বাংলার বোতলে শেষ চুমুকটা দেওয়ার আগেও অবশ্য এসবের ঠিক ছিল না। আজ সেরম ঠান্ডা নেই বলে ঘরে ভাত ওলভাতে চাপিয়ে বাইরে এসে বসেছিল জাদুকর! ঘরে আজকাল আর ভালোও লাগে না। বৌটা মাস খানেক হল করোনা হয়ে দুম করে চলে গেল। কী করে বাধাল কে জানে! বয়স হয়েছে, হ্যানত্যান অসুখবিসুখ লেগেই আছে বলে আজকাল বেরোত না বিশেষ। ছাদে কেউ এলেই মুখে আঁচল জড়াত, চোদ্দোবার হাত ধুত, তবু হল। আর হল তো হল দুদিনের জ্বরে হাঁপ তুলে বুড়ি চলেই গেল! সইবে না শালা। একা ফেলে চলে গেল, সইবে না! জাদুকর কাঁপা হাতে বিড়ি ধরায় আর চোখ পড়ে সামনের তারটায়। কবে খেলা আছে বলে পাড়ার ক্লাব থেকে তার ঝুলিয়ে গেছে। যে জিতবে তার পতাকাটা লাগাবে শুধু। তারটাকে একটু টান করলে কেমন হয়?

বছর চল্লিশ আগে ওস্তাদ তারে হাঁটতে শিখিয়েছিল। বেনারসে একটা ঘুপচি মাড়োয়ারির বাড়িতে আরও শখানেক লোকের সঙ্গে থাকত দুজনে। বছর বিশের জাদুকর তখন মাল বয়ে পেট চালায়, সকালের ব্যায়ামটা নিয়ম করে করতে অবশ্য ভুল হয় না। আর বুড়ো ওস্তাদ পাড়ায় পাড়ায় শো করে, জাদুর খেলা, দড়িতে চলা, থুতনিতে বাঁশ রাখা, জাগলিং এই সব। তা ওস্তাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট দেশে ফিরে চাষ করে খাবে বলে একদিন কেটে পড়ল। ওস্তাদ এসে ধরল জাদুকরকে। সে আর না বলেনি। পয়সা বেশ, খাটনিও কম, তারপর লোকে ভিড় করে ঘিরে দেখছে, বাহবা দিচ্ছে, স্যার বলে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে, অ্যাত্তো ভালো জিনিসে খামোখা না বলতে যাবে কেন? বৌটার সঙ্গেও দেখা এই সময়। সার্কাসের দলে ছিল, ট্রাপিজের খেলোয়ার, কিন্তু দল বেঁধে ঘুরতে আর ভালো লাগছিল না। তা দুজনে জুটি বেঁধে একদিন বেনারস, ওস্তাদ, সব ছেড়েছুড়ে এ শহরে চলে এল। সেই থেকেই এই পাড়া, বেনারসে আলাপ হওয়া বোসগিন্নির দয়ায় মেলা দশ টাকা ভাড়ার এই চিলেকোঠা, আর সঙ্গে অ্যাত্তো বড় ছাদটা।

জাদুকর বয়স হয়ে এমনিতে বছর বিশেক খেলা ছেড়েছে, গলির মোড়ে চায়ের দোকান দিয়ে দিব্বি চলে যায়! খালি বিয়ের দিনটা একটু অন্যরকম। হাজার হোক মেয়েটা সেদিন নিজের শোয়ের ফাঁকে একটু ঘুরতে বেড়িয়ে জাদুকরের খেলা দেখতে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ কী মনে করে জাদুকর যখন পয়সা গুছোচ্ছে তখন নিজেই খাটানো দড়িতে তড়তড় করে উঠে ডিগবাজি খেয়ে সবাইকে চমকে দেয়! তারপর দুজনে কত্তো গল্প, গঙ্গার ঘাট, রুটি তরকা রাবড়ি, সে রাতে মেয়েটা আর তাঁবুতে ফেরেনি। তা আজকে সেই মেয়েটাকে একটু খেলা দেখাবে না? জাদুকর খাটের তলা থেকে চটের থলেটে টেনে আনে। বৌ লাল হলুদ চৌখুপি কাজ করেছিল উল দিয়ে। ধুলো পড়েছে। একটু ঝেড়ে হাত চালাতেই বল, ছুরি, কাপড়, সবই আঙুলে ঠেকে। কিন্তু মনে লাগে না কিছু, এসব তো রোজই আছে, জমছে না ঠিক।

এক পা, দু পা, তিন পা, আস্তে আস্তে সরে সরে রাস্তার মাঝখান অবধি এসে যায় জাদুকর। আর তিন চার পা। তারপর ও বাড়ির পাঁচিলে এক পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে এক পাক ঘুরে আবার তারে হেঁটে ফিরে আসবে। নিচের ভিড়টা ইতিমধ্যে বহরে বেশ বেড়েছে সঙ্গে সুরও বদলেছে, ভয় থেকে বিস্ময়। কেউ বলেছে বোধহয়, পুরনো লোকেরা তো অনেকেই জানে। ওপারে পৌছতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। এবার স্রেফ বুড়ো আঙুলের উপর শরীরের ভার রেখে পাকটা খেলেই হল।

হাওয়াটা আসে। ঠান্ডা হিম ঠিক যেমন সে রাতে অন্ধকার গঙ্গার ঘাটে এসেছিল। বুকে ধাক্কা দেয়। কাশির দমক সামলাতে পারে না জাদুকর, সে রাতেও তো পারেনি। আহা ষাট ষাট! মেয়েটা পিঠে হাত বুলিয়ে থামিয়েছিল। পিঠ থেকে ঘাড় থেকে মুখ। হাতদুটো আর কখনও ছেড়ে যায়নি। জাদুকর অভ্যাসে শরীরটা পিছনে হেলিয়ে দেয়। সেই হাতদুটো ঠিক ধরে নেবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...