দুনিয়া কাঁপানো এক তরুণের গল্প 

সৌভিক দে

 

তখন বারো ক্লাসে পড়ি। অনেকদিন ধরেই মাথায় একটা শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে— ‘মন্তাজ’। থাকতে না পেরে একদিন প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম আমাদের চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া বায়োলজি স্যারকে। স্যার একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, তা এটার আমদানি করলি কোত্থেকে?

–একটা পেপারে পড়েছিলাম স্যার।
–হুম.. বুঝলাম। ছুটির পর ল্যাবে চলে আয়। পারলে আরও দু-চারটে গরুকে সঙ্গে নিয়ে আসিস।

যথারীতি রাহুল নামক জনৈক গরুকে সঙ্গে নিয়ে ছুটির পর দুই গরু মিলে গোয়ালঘরে হাজিরা দিলাম। এবার স্যার দাঁড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলা শুরু করলেন,

–‘মন্তাজ’ জানতে হলে সবার আগে জানতে হবে এক বিপ্লবীর কথা। সের্গেই মিখাইলভিচ আইজেনস্টাইন।

রাহুল হুট করে বলে উঠল, আইজেনস্টাইন? আইনস্টাইন শুনেছি, কিন্তু আইজেনস্টাইন..?

–হুমম.. আইজেনস্টাইন। একজন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, যাঁর চলচ্চিত্রে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। 

–বলেন কী.. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? উনি আইজেনস্টাইনকে চিনতেন? 

–চিনতেন বললে ভুল হবে, তবে আইজেনস্টাইনের দুটি ছবি ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ (Battleship Potemkin) এবং ‘দ্য জেনারেল লাইন’ (The General Line) দেখে উপলব্ধি করেছিলেন যে সেলুলয়েডের ফিতার মধ্যেও অভূতপূর্ব শিল্প নিহিত থাকে। শিল্পীর হাতের ছোঁয়াতে তা শতদলের আকারে প্রস্ফুটিত হয়। তবে পরিচালক তখন আমেরিকায় থাকায় তার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনি তাঁর।


সের্গেই আইজেনস্টেইনের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২২ জানুয়ারি লাটভিয়ার রিগায়। মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক আন্দোলনে যোগ দেন। ছোট থেকেই চিত্রাঙ্কনে পারদর্শী আইজেনস্টাইন ১৯১৮ সালের গৃহযুদ্ধের সময় লালফৌজের হয়ে পূর্বপ্রান্তের রণাঙ্গনে প্রচারমূলক রেলগাড়িতে ছবি আঁকতেন। বিপ্লব পরবর্তীতে প্রলেটকাল্ট থিয়েটার সৃষ্টি হয়েছিল সোভিয়েতের নাটকের প্রয়োজনে। লালফৌজ থেকে এসে তিনি যোগ দিলেন সেখানে। আইজেনস্টাইন ডিজাইন এবং সেট নির্মাণের কাজ করতেন থিয়েটারে। সেই সময় বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মেয়ারহোল্ডের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল মেয়ারহোল্ড নাটকে তখন ছবির ব্যবহার করতেন। আইজেনস্টাইন-সহ অনেক চিত্রপরিচালকের ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় ঘটে মেয়ারহোল্ডের মাধ্যমে।

১৯২৪ সালে তৈরি হয় আইজেনস্টাইনের প্রথম ছবি ‘স্ট্রাইক’ (Strike) একদল শ্রমিকের ধর্মঘটকে চিত্রায়িত করাই ছিল এ ছবির উদ্দেশ্য। আর এখানেই প্রথম ‘মন্তাজ অব অ্যাট্রাকশন’ (Montage of Attractions) তত্ত্বের প্রয়োগ হয়। গোটা সিনেমায় একজন নির্দিষ্ট কোনও কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই, জনসাধারণকেই নায়ক হিসেবে দেখা গিয়েছে। বুর্জোয়া নায়কের ব্যক্তিত্ববাদী ধারণাকে বাতিল করে নায়ক হল জনতা। ‘জনগণ নায়ক’ আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্রের এক বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য।

স্ট্রাইক

–স্ট্রাইক? নামটা বেশ চেনা চেনা লাগছে… হ্যাঁ মনে পড়েছে, গত বছর ১৫ আগস্ট যোগেশ মাইমে এই সিনেমাটা দেখেছিলাম। পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভের তরফ থেকে আয়োজন করেছিল।
–বোঝো কাণ্ড, সিনেমা দেখা হয়েছে এদিকে পরিচালকের নামই জানা নেই।
 

আমি জিভ কেটে বললাম, একদম খেয়াল ছিল না স্যার।

–এখন যেগুলো বলছি সেগুলো কত খেয়াল থাকবে জানা আছে। যাক গে, মন্তাজের কথায় আসা যাক।

‘মন্তাজ’ (Montage) হল একটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ জোড়া লাগানো। সিনেমায় একটা শটের সঙ্গে আর একটা শটকে জোড়া লাগানোকেই মূলত মন্তাজ বলা হত, যার প্রয়োগ চলচিত্র সম্পাদনার সময় ব্যবহার হয়। হলিউডি পরিচালক ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথ চলচ্চিত্রে প্রথম এর প্রয়োগ করেন। তবে আইজেনস্টাইনের মন্তাজ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর ‘মন্তাজ তত্ত্ব’কে বলা হয় ‘ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ’, অর্থাৎ তা বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রভাবিত করবে। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথেসিসের উপর ভিত্তি করে আইজেনস্টাইনের ‘মন্তাজ তত্ত্ব’ দাঁড়িয়েছে। তাঁর কাছে মন্তাজ হচ্ছে দৃশ্যের সঙ্গে দৃশ্যের দ্বন্দ্ব। বিরোধী সত্তার মধ্যে সংঘাতচেতনা আইজেনস্টাইনের শিল্পভাবনা ও কর্মের প্রধান উৎস। সে বিরোধ বস্তুতে বস্তুতে, বস্তুতে ও ভাবে, দৃশ্যে ও শ্রাব্যে, গতির দিক পরিবর্তনে এবং ক্যামেরাতে ধরা শটের সঙ্গে শটের। একটি স্বতন্ত্র শটের আলাদা করে কোনও মানে থাকে না। একই রকম আরেকটি শটেরও কোনও মানে থাকে না। কিন্তু ওই দুটি শটের সংযুক্তিতে, আইজেনস্টাইনের মতে সংঘর্ষের ফলে, নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে।

সের্গেই আইজেনস্টাইন তাঁর ‘মেথডস অফ মন্তাজ’ (Methods of Montage) প্রবন্ধে পাঁচ ধরনের মন্তাজ এর কথা বলেছেন। সেগুলো হল:

মেট্রিক মন্তাজ: বিভিন্ন শটের নির্দিষ্ট গাণিতিক সময় ধরে পর পর শট সাজানোর পদ্ধতির নাম মেট্রিক মন্তাজ।

রিদেমিক মন্তাজ: ছন্দনির্ভর মন্তাজ, এই ছন্দ বস্তু বা অভিনয়ের গতির মধ্য থেকে সৃষ্টি হয়।

টোনাল মন্তাজ: কাহিনির ভাবকে রিদম বা ছন্দের সঙ্গে সংঘাতের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে চাওয়াই টোনাল মন্তাজ।

ওভার-টোনাল মন্তাজ: টোনাল মন্তাজের সঙ্গে সংঘাতের ফলে সৃষ্টি হয়; আলো, রেখা প্রভৃতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ: এই চার ধরনের মন্তাজের মিশ্রণ ও সংঘাতের ফলে দর্শকের মনের মধ্যে এক ধরনের স্নায়বিক ও বৌদ্ধিক আবেগের জন্ম হয়, যার ফলে দর্শক ঘটনা বা বিষয়কে বুদ্ধি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, একেই ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ বলে। এই ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজকে আইজেনস্টাইন আবার দু ভাগে ভাগ করেছেন: ‘হিস্টোরিকাল মন্তাজ’ ও ‘এপিক মন্তাজ’ যে মন্তাজে কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা, ব্যক্তি, প্রতীক বা অনুষঙ্গকে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে হিস্টোরিকাল মন্তাজ। আর এপিক মন্তাজে ধর্ম, পুরাণ, মিথ, মহাকাব্য, দেবদেবী, এরকম অনৈতিহাসিক কোনও অনুষঙ্গ উল্লেখ করা হয়।

কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা ভালো করে বুঝতে পারবি। ‘অক্টোবর’ (October: Ten Days That Shook the World) সিনেমার একটা জায়গায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতালাভের পর কেরেনস্কি সাড়ম্বরে উইন্টার প্যালেসে ঢুকছে। জারের প্রাসাদে নানারকম মূর্তির মধ্যে একটি মূর্তি ছিল, যেখানে নেপোলিয়ন বুকে হাত রেখে উদ্ধত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। কাট্। পরের শটেই আমরা দেখলাম কেরেনস্কিও নেপোলিয়নের মতো বুকে হাত রেখে উদ্ধত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ, এই নতুন শাসক মুখে এখন গণতন্ত্রের কথা বললেও অন্তরে সে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতোই একজন স্বৈরাচারী, ফলে প্রস্তুত হতে হবে শ্রমিকশ্রেণিকে। আবার ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’-এর ‘ওডেসা স্টেপ’ (The Odessa Steps) সিকুয়েলে একটা শটে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ তাড়াহুড়ো করে বন্দরের সিঁড়ি দিয়ে নামছে। কাট্। পরের শটেই দেখা যাচ্ছে এক মা মৃত বাচ্চা কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। বাচ্চাটির মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। অর্থাৎ, তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পদপৃষ্ট হয়ে যায় বাচ্চাটি। এই দুটি বিপরীতমুখী শটের যোগফলে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষের মনে যে স্নায়বিক উত্তেজনার সৃষ্টি হচ্ছে সেটাই হল মন্তাজ। আইজেনস্টাইনের মতে শুধু পাশাপাশি দুটি শটের মধ্যেই নয়, গোটা সিনেমাটাই তৈরি হতে হবে দ্বান্দ্বিক কাঠামোয় উত্থান-পতন, উত্তেজনা-স্থিরতা সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই ছবির বক্তব্য এগিয়ে যাবে।

ওডেসা স্টেপ: ব্যাটেলশিপ পটেমকিন

আইজেনস্টাইন আসলে মানুষের চিন্তাশক্তিকে নাড়া দিতে চেয়েছেন, একটি সুন্দর, মানবিক, চিন্তাশীল পৃথিবী গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি মাত্র পঞ্চাশ বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু তাঁর দর্শন, তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি আজও বেঁচে রয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিকে যতবার অনুসরণ করা হবে, ততই তাঁকে সম্মান জানানো হবে। শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই অমর হয়ে থাকেন।

এবার স্যার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, চল এবার ওঠা যাক, অনেকটা দেরি হয়ে গেল। এবার তপনদা তোদের সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও তাড়া করবে। সিনেমাগুলো দেখ, তারপর এই নিয়ে আরও ভালোভাবে আলোচনা করা যাবে। আমি সিনেমাগুলোর নাম বলে দেব আর আইজেনস্টাইনের লেখা কিছু বইয়ের নামও। অবশ্য আমার কাছেও দুটো বই আছে, পরের দিন নিয়ে আসব। তোরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে পড়ে নিস। আমি আজ আফিমটা শুধু টেস্ট করালাম, এবার নেশা করবি কিনা তোদের ব্যাপার।

তখন সাড়ে ছটা বেজে গেছে। এমনিতেই শীতের রাত, ইচ্ছা না থাকলেও অগত্যা…। তবে আফিম যে তার কাজ করা শুরু করে দিয়েছে তা উপলব্ধি করতে বেশি বেগ পেতে হল না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...