নতুন স্লোগান হোক: নো স্পেস টু বিজেপি!!

অশোক মুখোপাধ্যায়

 



প্রাবন্ধিক, সেস্টাস-এর সম্পাদক

 

 

 

 

 

[এক]

২১৩ – ৭৭ – ১ – ১।

অনেক দিন পরে ২ মে বিকেলের পর থেকে আমাদের সকলেরই এক দিকে মনে হচ্ছে, যাক বাবা, হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেল। একটা বড় কাজ সারা হল। ঘাড়ের উপর বিজেপি-র দানবদের বিষাক্ত নিশ্বাস অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও থামানো গেল। একটা চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তিকে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে পর্যুদস্ত করা খুবই জরুরি হয়ে উঠেছিল। গত প্রায় চার পাঁচ মাস ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের প্রোলেতারিয়ান ইউনিটি ফোরামের কমরেডরা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একবার করে ফোন মারফত আমার কাছে জানতে চাইছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফল কী হবে। বিজেপি কি বাংলায় রাজ্য ক্ষমতায় এসে যাবে? আমি যখনই বলেছি, বিজেপি-র প্রভাব বৃদ্ধি পেলেও সরকার গঠন করার সম্ভাবনা কম, তাঁরা বলেছেন, “আমাদের এখানে কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো এবং প্রায় সমস্ত সংবাদপত্রের খবর হল, পশ্চিমবাংলায় বিজেপি আসছে।” আমাকে তখন সংবাদমাধ্যমের নগ্ন শ্রেণিচরিত্র নিয়ে মার্ক্সীয় পুরাতত্ত্ব পুনরুদ্ধার করতে হত। বলতে হয়েছে, এখানে বাংলা চ্যানেল এবং খবরের কাগজগুলোও একই প্রচার করে যাচ্ছে। ২৯ এপ্রিল শেষ (অষ্টম) দফার পরেও এই সংলাপগুলির পুনরুক্তি করতে হয়েছে দিল্লি বা কেরলের কমরেডদের সঙ্গে।

বিজেপি-র পেছনে কে ছিল না?

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ নামে পাঠ্যবই খ্যাত গণমাধ্যম— সামান্য দুচারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে— প্রায় কণ্ঠবন্ধন করে বিজেপি-র পেছনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সমস্ত চ্যানেলে এবং মুদ্রিত পাঠে তারা প্রতিদিন চব্বিশ ঘন্টা ধরে ক্লান্তিহীনভাবে মোদিচালিশা পাঠ করতঃ তোতাপাখির আদর্শ উদাহরণ স্থাপন করে চলেছে। বিচারব্যবস্থা, মায় সর্বোচ্চ আদালত এখন প্রধানমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় সরকারের বুকপকেটের কলমে পরিণত। যে কোনও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক মামলায় তারা এখন আর রায় দেয় না, সায় দেয়। সে রাফায়েলের দুর্নীতিই হোক, কিংবা ভীমা কোরেগাঁও মামলার বিনা বিচারে বন্দি বুদ্ধিজীবীদের মামলা শুরু করার প্রশ্নেই হোক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিবিআই, ইডি, এনআইএ, ইত্যাদি। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন এবং তাদের নিযুক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনি। এরা সকলেই এখন বিজেপি-র দলীয় শাখার ভূমিকায় অবতীর্ণ। এক কথায় রাষ্ট্রের এক অতি সামান্য অঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপি তার পাশে পেয়েছিল, বা নামিয়ে দিয়েছিল, সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

তার পরেও শেষ রক্ষা তাদের হল না।

এই প্রসঙ্গে আমি প্রথমেই বলতে চাই তাঁদের কথা, যাঁরা আমাদের মতো নানা মতের অনেককে সঙ্গে নিয়ে “বিজেপি-কে-একটাও-ভোট-নয়” আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কলকাতায় ৪ জানুয়ারি জন কনভেনশন থেকে গঠিত “ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপি বিরোধী বাংলা” নামক মঞ্চের উদ্যোগে এই যে আন্দোলন গত চার মাস ধরে কলকাতা থেকে শুরু হয়ে জেলায় জেলায় দক্ষিণ থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল (উত্তরবঙ্গে এই মঞ্চের নাম হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী নাগরিক মঞ্চ), পথসভায় জনসভায় মিছিলে পোস্টারে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে দিয়েছিল, তার একটা অত্যন্ত ধনাত্মক সুফল পাওয়া গেল। বিজেপি-র তরফে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দলের সভাপতি এবং আরও বহু ভারি ওজনের তেতাল্লিশ জন নেতা যেভাবে প্রায় নিত্যযাত্রীর মতো পশ্চিমবাংলার মাটিতে হামলে পড়েছিলেন, বিমানে হেলিকপ্টারে সাত-তারা হোটেলের আশ্রয়ে সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ করছিলেন, তার বিরুদ্ধে নিজেরা ভোটে না দাঁড়িয়েও যে এরকম একটা প্রচার চালানো যায়— নেতৃত্বের তরফে এই উদ্যোগকে, এর পরিকল্পনা এবং রূপায়ণকে, অসংখ্য সাধুবাদ জানাতেই হবে। এই লাগাতার প্রচারের ফলে একটা বিরাট আলোড়ন উঠেছিল ভোটারদের মনে।

নির্দ্বিধায় বলছি, কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিভাষায় এই আন্দোলনের নেতা এবং কর্মীদের অজস্র লাল সেলাম প্রাপ্য।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই আন্দোলনের অধিকাংশ কর্মসূচিতেই অংশ গ্রহণ করতে পারিনি, একথা সত্য। কিছু কিছু মিছিল ও সভায় উপস্থিত থেকেছি মাত্র। আর পশ্চিমবঙ্গে আমাদের ফোরামের যে সমস্ত পুরনো সাথী এখনও সমাজবদলের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমে কাজ করতে চান, তাঁদের অনেককেই যুক্ত করেছি এই প্রচেষ্টায়। কিন্তু এই মহাযজ্ঞের একজন অতি ক্ষুদ্র অংশীদার হিসাবে আমিও গর্ব অনুভব করছি।

দিল্লি পাঞ্জাব হরিয়ানা থেকে কৃষক আন্দোলনের বহু নেতানেত্রী পশ্চিম বাংলায় ঘুরে গিয়েছেন। বিভিন্ন মঞ্চে যোগদান করে নিজেদের বক্তব্য রেখেছেন। তাঁদের খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাংলায় যেন বিজেপি সরকারি ক্ষমতা না পায়। তাঁরা এটা আন্তরিকভাবেই অনুভব করেছেন, আজকের সময়ে বাংলার নির্বাচনে পরাজিত হলে বিজেপি-র জাতীয় উত্থানের পক্ষে সেটা হবে এক বিশাল আঘাত। তাঁরা চেয়েছিলেন মোদি সরকার আনীত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শ্রম কোড বিল, কৃষকদের বিরুদ্ধে কৃষি বিল এবং আমজনতার বিরুদ্ধে এনআরআইসি হামলার আত্মম্ভরী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার দ্বিধাহীন অনস্পষ্ট রায়। তাঁরাও তাঁদের পাঁচ মাসাধিক আন্দোলনের শিবিরে বসে রাজনৈতিক পরিতৃপ্তি পেয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

[দুই]

অন্য দিকে, একটা বেশ বড় মাত্রার প্রক্ষোভও গ্রাস করেছে আমাদের অনেকের বামমার্গিক মনকে। আমার যত দূর জানা আছে, স্বাধীনতার পরে ১৯৫২ সাল থেকে যে সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু হয়, তাতে এই প্রথম পশ্চিমবাংলায় একটা বিধানসভা গঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে একজনও বামপন্থী বিধায়ক নেই। সমগ্র বিধানসভাই চলে গেল দক্ষিণপন্থীদের দখলে। কী সরকার পক্ষে, কী বিরোধী বেঞ্চে। জিএনএলএফ ও আইএসএফ-কে ধরেই এই কথাটা আমাকে বলতে হচ্ছে। আর ফ্যাসিস্টদের একটা বড় শক্তি ঢুকে গেল বিধানসভার কক্ষে। সেই শক্তি যে বাংলার মানুষের কল্যাণের জন্য কিছু করবে না, বলাই বাহুল্য। তারা আরও ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতি ছড়ানোর সুযোগ নেবে আইনসভার মঞ্চকে ব্যবহার করেই। বামপন্থীদের যা বলার তা বলতে হবে কক্ষের বাইরে থেকে।

এর জন্য আমাদের অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় বসে কাটাছেঁড়া করতে হবে। কেন এরকম হল, কার কতটা দোষ, রণকৌশল গ্রহণে কার কোথায় কী কী ত্রুটি হয়েছিল, তার অনুপুঙ্খ বিচার করতে হবে। তবে, প্রথমেই আমার মতে জরুরি কাজ হল এটা লক্ষ করা, কুণ্ঠাহীনভাবে স্বীকার করা এবং অন্যদেরও দেখানো যে আমরা বামপন্থীরা রাজনৈতিক লড়াইতে বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছি। সমস্ত বামপন্থীরাই। শুধু সিপিআই (এম) নয়, বা তার সহযোগী বাম দলগুলি নয়। অন্যান্য ছোট ছোট দল— যাদের এই সেদিনও বিধানসভায় সামান্য হলেও উপস্থিতি ছিল, আজ তারা নেই।

বিজেপি-কে খানিক পর্যুদস্ত করে আমরা নিশ্চয়ই একটা ভয়ঙ্কর দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তিকে এই রাজ্যের বুকে নেচেকুঁদে বেড়ানো কিছুটা হলেও বন্ধ করতে পেরেছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, সেটা আমাদের বামপন্থী শিবিরের তাকতে হয়নি। যাদের তাকতে হয়েছে তারা হয়ত ভোটে জেতার জন্য বিজেপি-র ঘৃণা বিদ্বেষের রাস্তা নেবে না, মানুষকে অনাগরিক করে দেবার ভয় দেখাবে না, সেই অর্থে তারা বিজেপি-র মতো ভয়ানক নয়। কিন্তু উল্টোদিকে তারা তো আর গণ আন্দোলনের শরিক বা সংগঠক নয়, বা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসর প্রশস্ত করার শক্তি নয়। তারা জানেই না, বা মনেও করে না, একটা দেশে বা রাজ্যের জেলগুলিতে বিনা বিচারে আটক জনসংখ্যা ও তার মেয়াদের দৈর্ঘ্য দিয়েই সেই দেশে এবং রাজ্যে গণতান্ত্রিক অধিকারের অস্তিত্বের অভাব পরিমাপ করা সম্ভব। তৃণমূল কংগ্রেস পুরনো কংগ্রেসের রাজনীতিরই পকেট সংস্করণ। মানুষকে কিছু ভাতা-টাতা দিয়ে খুশি করে আন্দোলনের বদলে ভিক্ষাপ্রাপ্তির উপর নির্ভরশীল করে এবং যতটা সম্ভব পুঁজিপ্রভুদের জনচক্ষুর আড়ালে রেখে সেই প্রভুদের হয়ে সরকার চালানো। বিষয়টাকে এক কথায় প্রকাশ করলে দাঁড়ায়, ফ্যাসিস্ট শক্তির নির্বাচনে পরাজয় হলেও গণতান্ত্রিক জনশক্তির জয় হয়নি।

সেই সব বকেয়া কথা এবার তুলতে হবে। একে একে।

[তিন]

কিন্তু তার আগে বামপন্থীদের বিগত দিনগুলিতে নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে কথা তুলতে হবে। আমরা কি বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের সামনে যথাযথ বামপন্থী ভূমিকা পালন করেছি?

এক কথায় এর উত্তর হল, না।

অনেকেই যার যার দলের তরফে নানা রকম প্রচারপত্র বা পার্টি মুখপত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধ বা মুদ্রিত পুস্তিকার উল্লেখ করে বলবেন, “এই দেখুন, আমরা মোদি সরকারের নানাবিধ জনবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে, সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কত কিছু লেখালেখি করেছি। ভালো নোটবাতিল, বেসরকারিকরণ, কাশ্মীর ভঙ্গ, দিল্লির দাঙ্গা, ইত্যাদি।”

করেছেন হয়ত। বা করেছেন নিশ্চয়ই। খুবই ভালো কাজ করেছেন সেটা।

লেখাপড়া জানা মধ্যবিত্ত কমরেডরা এতেই খুশি। পার্টি সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদের বিরুদ্ধে, আরএসএস বিজেপি-র উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আদর্শগত সংগ্রাম চালাচ্ছে। শ্রেণিচেতনার দিক থেকে বামপন্থী দলগুলির নেতৃত্ব এখন এতটাই মধ্যবিত্তসুলভ যে নীচের তলায় শ্রমিক কৃষক কর্মচারীদের মধ্যে, এমনকি দলেরও একটা বেশ বড় অংশের মধ্যে, যে বিজেপি-র সযত্নে সাজানো “ওরা-আমরা” বিষ ছড়িয়ে পড়ছে, তার হয় খবরই রাখেন না, অথবা তার গুরুত্ব ও বিপদ বোঝেন না।

বুঝলে কী হত? কোথায় তফাত হত?

প্রথম তফাত হত, কংগ্রেসকে আদৌ একটা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তি বলে ভুল হত না। এসইউসিআই যেমন ২০০৮ সালে সিপিএমের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তাকে একটা গণতান্ত্রিক শক্তি হিসাবে ধরে নিয়ে এবং সেই মতো তুলে ধরে প্রচার করে মারাত্মক ভুল করেছিল, বামপন্থী আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সিপিএমও তেমনই কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করে ২০০৪ সাল থেকে একইরকম ভুল করে এসেছে। দুই দলই শ্রেণিরাজনীতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। বিজেপি যে সমস্ত কাণ্ডকারখানা করে চলেছে তার প্রতিটির জমি তৈরি হয়েছিল কংগ্রেসি জমানায়, বিশেষ করে মনমোহন সিং-এর গত দশ বছরের (২০০৪-১৪) শাসনকালে। কংগ্রেস যেমন তার নিজের তৈরি দানবিক নীতিগুলির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রচারে নামতে পারে না, তাকে সঙ্গে নিয়েও কারও পক্ষেই সেই সব নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর বিরোধিতা করা সম্ভব নয়।

বিজেপি-র মতোই কংগ্রেসেরও পেছন থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে, বা আসলে একতরফা ভয়াবহ মুসলিম বা শিখনিধন যজ্ঞ করে, সংগঠিতভাবে দলিত হত্যা করে, তারপর বরের মাসি ও কনের পিসি সেজে, নানান সময়ে জটিল ও অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার ইতিহাস নেহাত ফেলনা নয় এবং সেগুলো বামপন্থীদের, এমনকি সিপিএম-এরও না জানার কথা নয়। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত তাদের দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তৃতা এবং দলীয় প্রচারপুস্তিকায় প্রকাশিত তীব্র কংগ্রেসবিরোধী বক্তব্যেই তার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ বিদ্যমান। সেই ঘন কৃষ্ণ ইতিহাস ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র বিজেপি-জুজুর দোহাই দিয়ে কংগ্রেসকে রাতারাতি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তি মনে করা এবং তার সঙ্গে জুড়ি বেঁধে চলার একটাই মানে হয়— ফ্যাসিবাদের নব্য উগ্রশক্তির বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী ধ্রুপদী নরম শক্তিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী সাজিয়ে ময়দানে নামা। এবং পাশাপাশি মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়কে “ওরা” বানিয়ে রাখা। প্রান্তবাসে ঠেলে দেওয়া।

কংগ্রেসের সঙ্গে কি বিজেপি-র কোনও দ্বন্দ্ব নেই?

আছে। ভারতীয় বুর্জোয়াদের সর্বভারতীয় বিশ্বস্ত দল হিসাবে কে কখন শ্রেণিপ্রভুর কতটা সেবা করার সুযোগ পাবে এবং নেবে— তা নিয়ে অবশ্যই দ্বন্দ্ব আছে।

সেই দ্বন্দ্বকে কি গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর দরকার নেই?

তাও আছে।

কিন্তু সেটা সম্ভব একমাত্র বামপন্থীদের সম্মিলিত শক্তি সমাবেশ ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্মাণ করে। তাতে যদি কংগ্রেস যোগ দিতে চায়, তাকে তখন নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কংগ্রেসই যেখানে অন্যতম নীতিনির্ধারক শক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেরকম একটি মোর্চা কখনও বিজেপি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনে কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না। বরং নির্বাচনী সুবিধার মোহে এরকম মোর্চা নির্মাণের উৎসাহ ভেতরে ভেতরে বিজেপি-র সঙ্গেও বোঝাপড়ায় যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করে দিতে পারে বলে আমি গত দুবছর ধরেই প্রকাশ্যে সন্দেহ করে এসেছি।

গত লোকসভা নির্বাচন থেকে সিপিএম-এর ভোট যে ব্যাপক হারে পদ্মফুলের বাগিচায় অভিস্রবণ হয়ে চলেছে, এবারেও যার ব্যতিক্রম ঘটেনি, তাতেই তার প্রমাণ মিলে যাবে।

কিন্তু এবারে আর একটা জিনিসও ঘটেছে। লাল কেল্লা থেকে শুধু পদ্মবনে নয় ঘাসফুলেও বেশ ভালো সংখ্যক অভিস্রবণ ঘটেছে। ২০১৬-র তুলনায় টিএমসি-র কিছু আসন সংখ্যা এবং ভোটের পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধিই তার সাক্ষ্য বহন করছে।

অর্থাৎ, সিপিএম এবার এমন একটা কৌশল অবলম্বন করে ভোটে নেমেছিল, যা তার দলের ভেতরেও নিজের পক্ষে কাজ করেনি, করেছে তার বিরুদ্ধ পক্ষের হয়ে। এই দ্বিমুখী অভিস্রবণের পেছনে আরও একটা কারণ ছিল হঠাৎ করে হুগলির ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীকে খুঁজে বের করে তাকে দিয়ে রাতারাতি একটা “সেকুলার” ফ্রন্ট বানিয়ে সামনে তুলে আনা। যার একমাত্র কাজ ছিল “সেকুলার” পতাকা হাতে নিয়ে আসলে তৃণমূলের মুসলিম ভোট আমানতে কামড় দেওয়া। গোটা পরিকল্পনার পেছনে ছিল একটা ভ্রান্ত চিন্তা— মুসলিমরা নিছকই ধর্মান্ধ এককাট্টা ভোটারকুল, তারা কোনও চিন্তাশীল মানবসম্প্রদায় নয়। তাদের মধ্যে কোনও দেশভাবনা বা রাজনৈতিক বিচার বিবেচনা কাজ করে না। তারা তৃণমূলকে ভোট দেয় মমতা ব্যানার্জীর মাথায় কাপড় দিয়ে মুসলিম কায়দায় দোয়া ভিক্ষা করতে দেখে আর তাঁর মুখে খোদা হাফেজ শুনে! এবার আমরা খোদ একজন পিরজাদাকেই যদি মাঠে নামিয়ে দিই, তাহলে আল্লাহ্‌র কসম, সেই সব ভোটের গরিষ্ঠাংশ হয়ত কেটে আমাদের দিকে ছুটে আসবে।

হল ঠিক উলটো।

এক দিকে সিপিএম কর্মীদের এক বিরাট অংশ এই সব চাতুরি মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা সম্ভবত নীরবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঘাসফুলেই ভোট স্থানান্তর করে। আর এক অংশ মুসলিম ধর্মীয় শিবিরকে উৎসাহ দেওয়ার এই প্রবণতায় বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিক্রিয়া হিসাবে পদ্মবাগানে আশ্রয় নিয়েছেন।

অন্য দিকে—

এই কথাটা আমি আমার বেশ কিছু সাম্প্রতিক লেখায় দেখানোর চেষ্টা করছি। এখানেও পুনরুচ্চারণ করতে চাই—

ভারতে বা পশ্চিমবাংলায় মুসলিম সম্প্রদায় বিগত বেশ কিছু বছর ধরে নিজেদের ক্ষেত্রে কোনও দলের ভোটুক আমানতি স্ট্যাটাস ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছেন। তাদের মধ্যে একটা বড় শিক্ষিত অংশ দেশের আর পাঁচটা মানুষের মতোই নিজ নিজ বিশ্বাস ও উপলব্ধি অনুযায়ী কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল, লিবারেশন, এসইউসিআই ইত্যাদি দলের পতাকার নীচে যাচ্ছেন বা থাকছেন। আর সম্প্রদায়গতভাবেও তারা বিভিন্ন মুদ্দায় খুব সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। বাবরি মসজিদ চূড়ান্ত দখলের ঘটনায় তারা যে সংযম দেখিয়েছেন, খাগড়াগড় ধূলাগড় হয়ে সর্বশেষ শীতলকুচির হত্যাকাণ্ডের পরও তারা যেভাবে শান্ত মাথায় অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তিলমাত্র সম্প্রদায়গত উত্তেজনার প্রকাশ ঘটাননি, তাতে বিজেপি-র তথা আরএসএস-এর একটা দীর্ঘ ব্যবহৃত হাতিয়ার সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই নতুন পরিঘটনা সিপিএম নেতারা দেখতে পেলেন না, বা দেখেও বুঝতে পারলেন না— এটা ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে। মুসলিমরা যদি এবারও ব্যাপক সংখ্যায় তৃণমূলকে ভোট দিয়ে থাকেন (দিয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস) তার কারণ মমতার মাথায় কাপড় দেখে বা খোদা হাফেজ শুনে ধর্মভাবে আপ্লুত হয়ে গিয়ে নয়; বিজেপি-র ফ্যাসিবাদী আক্রমণকে থামানোর আপাতত এটাই নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক আশ্রয় বলে মনে করার জন্য। যে ভরসা বামপন্থীরা জাগাতে পারেনি। পিরজাদাকে সঙ্গে নিয়েও নয়। 

পরিশেষে সিপিএম-এর তুলনায় ক্ষুদ্রতর বামপন্থী শক্তিগুলিকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যেমন, এসইউসিআই এবং সিপিআই এম-এল-লিবারেশন কেন পরস্পর জোট বাঁধতে পারল না— সেও এক রহস্য। যে এসইউসিআই নিজেরা এক সময় ভোটের জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছিল, তার ভিত্তিতে সংসদে একটা আসন পেয়েছিল এবং জয়নগর আসন রক্ষা করেছিল, তারা কী করে যে লালুর দলের সঙ্গে জোটে থাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে লিবারেশনের সঙ্গে জোট গঠনে আপত্তি জানায় আমার কাছে তা খুবই দুর্বোধ্য। আবার, তারা কেন যে সিপিএম-এর কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাম জোট গঠনে আপত্তি করে সেও যথেষ্ট রহস্যজনক। বিজেপি-র বিরুদ্ধে সম্মিলিত শক্তি সমাবেশের জন্য দীপঙ্কর ভট্টাচার্য যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাতে সাড়া দিয়ে এসইউসিআই যদি সিপিআই এম-এল-লিবারেশন-এর সঙ্গে প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হত এবং তারপর সিপিএম-এর সঙ্গে সংলাপে যেত, হয়ত একটা ইতিবাচক বৃহত্তর বামপন্থী ঐক্য গড়ে উঠতে পারত।

[চার]

সিপিএম-এর তৃণমূল বিরোধিতার কারণ নীতিগত নয়, নিতান্তই সঙ্কীর্ণ ক্ষমতাগত। ওদের হাতে আমাদের ৩৪ বছরের মৌরসিপাট্টা হাতছাড়া হয়েছে, অতএব যে করেই হোক, ওদেরও ক্ষমতা থেকে হঠাতে হবে। তাতে যদি বিজেপি এসে যায় যাক। একটা লোকপ্রিয় প্রবচনই চালু হয়ে গেল বাংলার রাজনীতির হাটে— “আগে রাম পরে বাম”। ব্যাপারটা এতটাই প্রকাশ্য মন্ত্রগুপ্তি যে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও পর্যন্ত এবার দলের একাধিক নির্বাচনী জনসভায় এর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হয়েছে। তিনি আসলে রামাশ্রমের একজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন, একবার রাম হলে বাম আর পরে নয় অনেক দূরে পিছিয়ে যাবে।

সিপিএম-এর পশ্চিমবাংলা রাজ্য কমিটি এই কৌশলের একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। দিদি-মোদি এক হ্যায়। তৃণমূলই বাংলায় বিজেপি-কে ডেকে এনেছে (ত্রিপুরায় কে ডেকে আনল কমরেড?)। উপরে যাই বিরোধাভাস দেখা যাক, তলায় তলায় ঘাসফুল আর পদ্মফুল বোঝাপড়া করে চলেছে। ইত্যাদি। আর তারা তৃণমূলের দুর্নীতির পাশাপাশি এক “ভয়ঙ্কর” সন্ত্রাসের কথা বলেছে।

প্রথমটা ভুল; দ্বিতীয়টা অর্ধসত্য।

তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপি-র বিরোধিতা আদর্শগত নয়, নিতান্তই সরকারি ক্ষমতার বাঁটোয়ারাগত। তৃণমূল যখন কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়েছে, তখন তার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে একটা বড় খুঁটির দরকার ছিল। সেইজন্য তারা তখন বিজেপি-র সঙ্গে ছিল, জোটসঙ্গী ছিল। সেই জন্যই ২০০২ সালে শতাব্দের বীভৎসতম দাঙ্গা করে নরেন মোদি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে মমতা ব্যানার্জী তাঁকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় তাঁদের বাইরের কোনও খুঁটির দরকার নেই। অথচ বিজেপি-ও এখানে এখন আস্তানা ফেলতে চায়। ফলে গদির প্রশ্নে তাদের মধ্যে আগেকার সখ্যতা এবং এখনকার বিরোধ— দুটোই প্রবলভাবে বাস্তব। আগেরটা দেখিয়ে পরেরটা অস্বীকার করার মানে রাজনৈতিক ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাছাড়া, বিজেপি-র মুসলিম বিদ্বেষের পাশাপাশি মমতা ব্যানার্জী পুরনো কংগ্রেসের মতোই ধর্মীয় সুড়সুড়ি প্রয়োগে একটা স্থায়ী মুসলিম ভোট আমানত বানিয়ে রাখতে চান। এই জায়গাতেও তাদের পরস্পরের মধ্যে বনিবনার সুযোগ নেই। রাজনীতিতে সিপিএম নেতৃত্ব এত কাঁচা নন যে তাঁরা এই কথাগুলি জানেন না। কিন্তু নিজেদের রণকৌশলকে যুক্তিগ্রাহ্য করতে গিয়ে এই ছেঁদো সব কুযুক্তিকে হাতিয়ার করে ফেলেছেন।

আবার সিপিএমই যেখানে তলায় তলায় বিজেপি-র সঙ্গে বোঝাপড়া করে এগোতে (বা আসলে বিজেপি-কে এগিয়ে দিয়ে নিজেরা পেছোতে) চাইছিল, সেখানে বিজেপি-টিএমসি বিরোধের চরিত্র যে মূল নীতিগত হবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য।

তৃতীয়ত, তৃণমূল সহ এখন সমস্ত দলের মধ্যেই— এমনকি বামপন্থী দলগুলির মধ্যেও— রামপ্রিয় নেতাকর্মীর সংখ্যা খুব কম নয়, যারা “ওদের” একটু “সিক্ষে” দিতে চায়, টাইট করতে চায়। রাজ্য বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রেস তৃণমূল এবং সিপিএম থেকে দলে দলে ব্যাপক সংখ্যায় যে নেতানেত্রীরা পদ্মবনে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেছিল, তারা ভেতরের প্রকৃত রামভক্তদের একটা সামান্য অংশ মাত্র। বিজেপি-র ফলাফল আর একটু ভালো হলে কিংবা দুই দলের ফারাক বিশ তিরিশে নেমে এলেই অমিত শাহ তাঁর সেই বিখ্যাত স্যুটকেস নিয়ে এসে যেতেন এবং তখন অনেক বিধায়কই নিলামে চাপতেন।

প্রসঙ্গ সন্ত্রাস ও দুর্নীতি।

তৃণমূলের যা সন্ত্রাস আমরা গত দশ বছরে প্রত্যক্ষ করেছি, তার তুলনায় কংগ্রেসের শত গুণ সন্ত্রাস আমরা অতীতে দেখে এসেছি। এক সময় সিপিএম নেতারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭-এর সিদ্ধার্থ জমানায় ১১২০ জন ক্যাডার হত্যার হিসাব দিতেন। অর্থাৎ, বছরে গড়ে ২২৪ জন। সেটা যদি মিথ্যা না হয় তাহলে টিএমসি তো সন্ত্রাসে এখনও দুগ্ধপোষ্য শিশু— দশ বছরে মাত্র আড়াইশো জন। মানে, বছরে গড় মাত্র ২৫ জন। তাহলে তাঁরা সেই কংগ্রেসের রক্তাক্ত হাত ধরে চলছেন কী করে?

দুর্নীতির প্রশ্নেও তাদের অদ্ভুত দ্বিচারিতা। বিহারে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে সাজাপ্রাপ্ত নায়ক লালুপ্রসাদের দল যদি সিপিএম-এর আগাগোড়া জোটারু দোস্ত হতে পারে (লালুপ্রসাদের কন্যার ডাক্তারি ডিগ্রি প্রাপ্তির গল্পটাও সকলেই বোধ করি জানেন), টিএমসি-র সারদা কাণ্ড আর এমন কী দোষ করল? এবং একথাও মানতেই হবে, সিবিআই অনেক চেষ্টা করেও এখন অবধি তৃণমূলের একজন নেতারও অপরাধ সাব্যস্ত করে উঠতে পারেনি {অবশ্য নিন্দুকের জনরবে শোনা যায়, সিবিআই এক টানা তদন্ত চালিয়ে প্রচুর টানাহেঁচড়া করে কোনও প্রকৃত অপরাধীকেই শেষ অবধি নির্দোষ প্রতিপন্ন না করে ছাড়ে না}।

তাহলে ঘটনাটা কী?

আমার ব্যাখ্যা এই রকম: প্রবীণ লোকেরা জানেন, এক কালে সিপিএমের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম ঘুরপাক খেত ভয়ানক কংগ্রেস বিরোধিতার অক্ষ ধরে। আমাদের রাজনৈতিক শৈশবে দেখতাম, কাউকে গালি দিতে হলে সিপিএম-এর মোক্ষম বুলি ছিল “কংগ্রেসের দালাল”। অবশ্য মাথার উপরে সিআইএ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও ছিল। ১৯৬৪ সালে দল বিভক্ত হওয়ার পর সিপিআইয়ের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অভিযোগই ছিল— ডাঙ্গেপন্থীরা কংগ্রেসের লেজুরবৃত্তি করছে, কিংবা কংগ্রেসের বি-টিম। ইন্দিরা কংগ্রেসের তখনকার নির্বাচনী প্রতীক অবলম্বন করে তাদের বহুল প্রচারিত সচিত্র শ্লোগান ছিল: “দিল্লি থেকে এল গাই, সঙ্গে বাছুর সিপিআই।” ১৯৭১-৭৭ সালে সিপিআই পুরোপুরি কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে চলতে থাকে। সেই সময় তারা জরুরি অবস্থাকেও সমর্থন করে বসে। কলকাতায় সংবাদপত্রের উপর কাঁচি চালানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রবীণ কমরেড গোপাল ভৌমিক। আমরা আমাদের ততৎকালীন পার্টি ও গণ সংগঠনের কাগজের লেখাপত্র নিয়ে মহাকরণে তাঁর দপ্তরে যেতাম। সেই সব লেখায় কোথাও “বিপ্লব” শব্দটা থাকলে তিনি বন্ধুভাবে পরামর্শ দিতেন, “তোমরা এই সব জায়গায় আমূল পরিবর্তন লিখে দাও।” কী চমৎকার দ্বৈত দায়িত্ববোধ!! এখন দেখা যাচ্ছে, সেই সিপিআইয়ের কংগ্রেস-প্রিয় রাজনৈতিক লাইন নিয়েই সিপিএম দিব্যি চলছে। ভাগ্যিস কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক কমিশন বদলে দিয়েছে। নইলে একুশ শতকে বাছুর চরিত্রের কাস্টিং নিয়ে এক সাংঘাতিক টানাটানি শুরু হয়ে যেত হয়ত!

তাহলে সেই ভয়ঙ্কর শত্রু কংগ্রেসের গোত্রান্তর তথা মিত্রভবনের ফলে তার জায়গায় নতুন কাউকে বসাতে হবে। যার বিরুদ্ধে অনুরূপ ভয়ঙ্কর হুঙ্কার ধ্বনি দিয়ে ক্যাডারদেরও গরম রাখতে হবে, নিজেদের বিচিত্র রাজনীতিকেও তাদের দিয়ে গ্রাহ্য করিয়ে নিতে হবে। তৃণমূলবিরোধী যাবতীয় প্রচারের পেছনে এই হচ্ছে রহস্য।

আর ঠিক এই কারণেই দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি বা অনুদান নিয়ে তারা যতটা সরব, গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসর ক্ষুণ্ণ করা নিয়ে তার একাংশও উদ্বেগ দেখায় না বা প্রতিবাদ করে না। বিনা বিচারে জেলবন্দিদের নিয়ে তারা একটাও বাক্য আজ উচ্চারণ করতে পারে না, কেন না, এদের অনেককেই বাম আমলের শেষ দিকে তারাই নানা রকম মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কয়েদ করিয়েছিল। এখন তাদের নিয়ে সোচ্চার হতে গেলে কিঞ্চিৎ অসুবিধা তো হবেই। কিংবা তৃণমূল সরকারের পুলিশ যখন যে কোনও আন্দোলনে কাউকে গ্রেপ্তার করেই ইউএপিএ লাগিয়ে দেয়, যাতে অন্তত ছমাস বিনা বিচারে জেলে পুরে রাখাটা নিশ্চিন্ত, আর এইভাবে আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে একটা হিম আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তার বিরুদ্ধেও তারা কিছু বলতে পারে না, কেন না, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শেষ বছরগুলোতে কংগ্রেসের প্রবর্তিত এই আইন তারাও যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

[পাঁচ]

এই কাগজে আমার শেষ লেখায় আমি বলেছিলাম, বিজেপি পশ্চিমবাংলার মাটি চিনতে পারেনি। ফল বেরনোর পর এক বিজেপি নেতাও দেখলাম এটা স্বীকার করেছেন। রাম দিয়ে এখানে যাত্রাপালা হতে পারে, ভোট পাওয়া মুশকিল। পার্লারে বসে রবীন্দ্রনাথের দাড়ির নকল বানানো যায়, কিন্তু (ফেক ভিডিওর মতোই) তাতে বাঙালির মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করা সম্ভব নয়। ধর্মীয় জিগির তুলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটানোও এখানে বড্ড কঠিন। বাংলা বিভাজন, তার ফলস্বরূপ মানুষের আশ্রয়হীন অভিবাসন, উদ্বাস্তু সমস্যা— হিন্দু মুসলমান কাউকেই আর নতুন করে ধর্ম নাটকের শিকার হতে সহজে দেবে না। দীর্ঘদিনের অপপ্রচার সত্ত্বেও এটা এখন সকলের জানা দরকার, উদ্বাস্তু অভিবাসন শুধু একতরফা বা একমুখী হয়নি, শুধু পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবাংলায় হিন্দুরা এসেছে তাই নয়, সম সংখ্যক না হলেও এক বিরাট সংখ্যক মুসলিম জনগণও পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে সাম্প্রদায়িক খুনোখুনি হিন্দু মুসলমান কারও কাছেই আর সুস্বাদু নয়, সমাদৃতব্য নয়। বাংলা পাঞ্জাব বিভাজন থেকে অনেক দূরে বসে নাগপুর কেন্দ্রিক সংগঠন হিসেবে সঙ্ঘ পরিবারের পক্ষে এই ব্যাপারটা বোঝা দুষ্করই বটে! বিশেষ করে যাদের এক নেতাই ছিলেন (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী) বাংলা বিভাজনের অন্যতম প্রধান কু-নায়ক।

মুখে আস্ত নর্দমা ভর্তি একটা লোককে রাজ্য নেতা করে বাংলার মানুষের মন জয় করাও অসম্ভব। মহিলাদের প্রতি লাগাতার কটূক্তি করে অসম্মান করে বাংলার মা বোনেদের কাছে সমাদর জুটবে আশা করাও বোকামি। এক কালে সিপিএম-এর যে সমস্ত নেতারা এরকম অভব্য গালাগাল করতেন, মহিলাদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য ছুঁড়ে দিতেন— অনিল বসু, বিনয় কোঙার, প্রমুখ— তাঁদের মানুষ প্রথম সুযোগেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। বিজেপি-র অধিকাংশ নেতাকে যে মানুষ গ্রহণ করেনি, তার এগুলো বড় এবং সিধে কারণ।

তা সত্ত্বেও এটা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, বিজেপি রাজ্য জয় করতে না পারলেও তারাই এখন একমাত্র বিরোধী পক্ষ এবং তাদের হাতে এখন সাতাত্তরজন গেরুয়া সেবক বিধানসভায় আছে। সংখ্যাটা যথেষ্ট বড় এবং তোতা মিডিয়ায় এরা আগামী পাঁচ বছর প্রচুর বাইট খাওয়াতে থাকবে। আর সেই সব বাইটের প্যাকেটে সাম্প্রদায়িক গরল ছাড়া অন্য কিছু যে থাকবে না, তা এখনই বলে দেওয়া যায়।

কেন্দ্রে মোদি সরকার আরও তিন বছর আছে এবং জাতীয় সম্পদ যেখানে যা কিছু আছে বিক্রি করে দিয়ে মুকেশ গৌতম ভাইয়াদের খাওয়াতে থাকবে। নির্মলা দিদিভাইয়ের ভুল করে চালু করা সুদ কমানোর প্রত্যাহৃত সার্কুলার এবার আবার খাপ থেকে বেরিয়ে আসবে। মূল্যবৃদ্ধি বেকারি আরও জাঁকিয়ে আসবে এবং সমগ্র অর্থনীতিতে যে বিকট ধসের ছায়া তা আরও ঘনীভূত হতে থাকবে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কবে খুলবে, কবে আবার লেখাপড়া চালু হবে তা— রাম বা হনুমান— কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদী শক্তি রাজ্য সরকারে আসতে না পারলেও তারা দেশের বুকে জিন্দা আছে পূর্ণ শক্তি নিয়ে।

সুতরাং সেই বিজেপি নামক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে দু জায়গায়— একটা তার মতাদর্শের জায়গায়; আর একটা তার সরকারি বদ নীতিগুলির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে।

বিজেপি-র বিরুদ্ধে দীর্ঘ মতাদর্শগত লড়াই চালানো কংগ্রেসি ঘরানা জাত তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সম্ভব নয়। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত সেই বাম শক্তিকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর এই কাজে খুব সহজেই বিভিন্ন বাম দল ও গ্রুপগুলির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা যায়। এই প্রসঙ্গে আমার বিনম্র পরামর্শ হল: ধর্ম প্রসঙ্গে মার্ক্সবাদী শিক্ষা, ভারতে সাম্প্রদায়িকতা, দেশ বিভাজন, গোরক্ষা আন্দোলন, বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত বিবাদ, প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ও মিথ্যা বৈজ্ঞানিক অর্জনের তালিকা— ইত্যাদি মুদ্দাগুলি নিয়ে সিপিএম লিবারেশন এমকেপি বা এসইউসিআই ইত্যাদি দলের মধ্যে খুব বেশি মতপার্থক্য থাকার কথা নয়। বড় জোর কিছু অনুপুঙ্খে মতভেদ থাকতে পারে। তাহলে সেই সব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দফায় জেলায় জেলায় এই সমস্ত বাম দলের উদ্যোগে কর্মীদের নিয়ে তিন চার দিনের যৌথ স্টাডিক্লাস অনায়াসে সংগঠিত করা যেতে পারে। সেখানে প্রতিটি দলের বুদ্ধিজীবী/নেতারাই বক্তব্য রাখবেন। কর্মীরাও বলবেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখতে হবে। এর মধ্য দিয়ে এইসব দলের কর্মীরা মানসিকভাবে একটু কাছেও আসতে সক্ষম হবেন। পারস্পরিক বিদ্বেষ ও তিক্ততা অনেকটাই কমে আসবে। সঙ্ঘ যেমন অতি সন্তর্পণে অত্যন্ত সযত্নে নিজেদের মতাদর্শ একেবারে তৃণমূল স্তরে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাকে কাটান দেবার জন্য বামপন্থীদেরও উপযুক্ত প্রতিষেধ খুঁজে বের করতে হবে।

দ্বিতীয়ত গণ আন্দোলন। তার জন্য তাদের পুরনো ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি কাটিয়ে উঠে প্রকৃত বামপন্থী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সেই ভূমিকার একটা প্রধান কথা হল, সত্য কথা বলা, মিথ্যার চাষ বন্ধ রাখা, বিরোধী শ্রেণিশিবিরের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করা ও কাজে লাগানো। সেই ভূমিকার অন্যতম প্রধান কথা হল, নির্বাচনী প্রক্রিয়া মিটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের প্রকৃত দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনের রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়া। জনমত সংগঠিত করা। রাষ্ট্রকে চেনানো। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য চিনিয়ে দেওয়া। গতানুগতিক ধারার পাশাপাশি আন্দোলনের নতুন নতুন কায়দা উদ্ভাবন করা। যেমন, একটি নতুন পদ্ধতি দিল্লির জমায়েতে উত্তর ভারতের কৃষক সংগঠনগুলি দেখিয়ে দিয়েছে। এই কায়দার নতুনত্ব সারা পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। মার্চ মাসে জার্মানিতেও কৃষকরা সারা দেশ থেকে ট্র্যাক্টর নিয়ে বার্লিন শহরে জমায়েত করেছে নানান দাবিদাওয়া নিয়ে।

যাঁরা মার্ক্সবাদের কথা বলেন, কমিউনিস্ট মতাদর্শের কথা বলেন, তাঁদের দেখিয়ে দিতে হবে, তাঁরা ঘরে বাইরে একইরকম মার্ক্সবাদী, জিবি-তে এবং মিছিলে সমানভাবে কমিউনিস্ট। এই সব জায়গায় আমরা বামপন্থীরা দীর্ঘকাল ধরে অনেক ফাঁকি দিয়ে চলেছি। প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, রাজনীতিও তেমনই ফাঁকি দিয়ে বেশি দিন চালানো যায় না। আজ যদি আমাদের মধ্যে সেই বোধের উদ্বোধন ঘটে, তবে বামপন্থীদের এই নির্বাচনে সাময়িক পিছিয়ে পড়াও অচিরেই আশীর্বাদ বলে চেনা যাবে। একজন বিধায়ক না থাকলেও শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন, ছাত্র-যুব-মহিলা সংগঠনের মাধ্যমে জনসমর্থনের জোরেই বামপন্থীদের আবার রাজ্য রাজনীতির মধ্য মঞ্চের দখল নিতে হবে।

বামপন্থার পুনরভ্যুত্থান হোক!

আমাদের এবার নতুন শ্লোগান হোক: বিজেপি-কে এক ইঞ্চিও জমি নয় {No Space to BJP}!!

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3901 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...