সোমেশ ভট্টাচার্য

হাসপাতালের কবিতা

 

হাসপাতালের কবিতা ১

যমদুয়ার

বিষণ্ণ বিকেলে খাঁচাবাড়ির কাছাকাছি একটা ঘুড়ি উড়ছে

ধূসর, মাহাত্ম্যহীন

একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, একটু পরে ফের বৃষ্টি হবে
মাটি থেকে কয়েক বারান্দা ওপরে এ রকম অনেক কিছু হয়
সারা জীবনের চেষ্টায় খোঁড়া কাক সাঁৎ করে উড়ে এসে

ফের নেমে যায়
মাদারবোর্ডের মতো শহরে

সসঙ্কোচ গাছেদের তেল না পড়া ঝুঁঝকো রুক্ষ মাথা
ঝুরো বৃষ্টিতে কিছু ভিজে ঘন হয়, কিছু ভেজেই না— এই
ঢেউ খেলা মাঠ এক ছুটে পার হলে ওপারে বরোবুদুর

                 চৈত্য স্তূপ আরও আরও                        ছায়া-ছায়া হর্ম্যরাজি

নৃপতির, স্থপতির, দেবতার
আর সবজেটে এক মিনার

খুশবুদার গোলাপখাস আমের বাগান তাকে ঘিরে, আয়ত্তের অতীত

জানলার নাগালের কাছে

বিসদৃশ গাছের মাথা আর ধুতরোর ফুল, বালিকার জট পরা চুলে
রিবন বেগুনি, দক্ষিণী নার্সের মোবাইলে কেঁপে কেঁপে ওঠা মোহিনী ঘট্টম
অবতল স্বপ্নের মতো, শুকনো ঠোঁটের কোয়া আর বিবশ আঙুলের স্মৃতি

মৃত্তিকাময়, অজস্র আঙুলের
পেরেকের চিবুকের চাবুকের
থুতুমাখা চামড়ার
বেল্টের বেল্টের ডেটলের

আশৈশব অন্ধকারে অজস্র অস্ফুট ফুল আর বেহুদা হ্রেষাধ্বনি
নতমুখ নল নিয়ে হিসু করছে বিমা করা বিছানায়, স্নিগ্ধ নয়ন
আড়ালে রেখে স্নান করাচ্ছে কোভিড হিজাব
সান্নিধ্যে, স্বাস্থ্যবিলাসে

হেঁইও— বাঁচতে হবে!

কেন? এ প্রশ্ন অবান্তর— উড়ন্ত ম্যানিফেস্টোগুলো বৃষ্টিতে

অর্ধেক ভিজে অর্ধেক রং উঠে

এসে লেপ্টে যাচ্ছে কথাগুলোর গায়ে যা আমরা বলে গেছি অবিরত
বলে গেছি, বলে উঠে চলে গেছি অন্য কথার কাছে
যা স্বীকৃত, সংজ্ঞায়িত, নিরাপদ— বমি লেগে নেই চুলে বা রুমালে

কানে পুঁজ নেই, কুঁচকিতে
লেগে নেই পাহাড়ি ঘোড়ার লোম
নখে জলসত্রের কাদা

এখন কী আর হবে?

একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেল, একটু পরে বৃষ্টি হবে আবার
বিরতিতে ঝিলমিল করছে যে জীবন তার সবটুকুই বেড়ানোর গল্প
হাসপাতালে জানলার কাচে, হাতছানি, যে হাত অবশ হয়ে
জলে পড়ে গেল— মুঠো খুলতে পারেনি তাই ধরা আছে
ছাতা, ছেনি, তরবারির খুঁট
স্নানের ইচ্ছে, চন্দন অবলেপ
অস্থির বিনবিনে পিঁপড়েনগর

দূরবর্তী ঘুড়ির কাচে পাখসাট তোলা মাঞ্জাই শুধু মৃত্যুর মতো চুক্কিময়
পাহাড়ের উরুর কাছে কোলাখামে

উজ্জ্বল কুচো কুচো অজস্র ফুল এ বারও ফুটেছে?

 

হাসপাতালের কবিতা ২

সকাল সাড়ে ৬টার রোদ্দুর

সায়েবি গোরস্থানের পাশ দিয়ে হেলেদুলে চলে যাচ্ছে সোমত্ত দুধের গাড়ি
কাগজের অফিসের মোড়ে রং পাল্টানো বাতি অনর্গল সম্মতির
প্যাটপ্যাট করে চেয়ে, অহেতুক তালাবন্ধ সকালে
উপোসি মতন দুটো ট্যাক্সি হাসপাতালের কাছেই
আর বেগনে ফুল নিয়ে জারুলের গাছ এ পাশে

কিছু জুঁই, কাঠচাঁপা, বেলি
কাঠবেড়ালির তুরতুরে নখ বুকে কাপালিক কৃষ্ণচূড়া রোজকার মতো চুপ
সার সার ফলক, চৌখুপি, নোয়ানো ফুল আর দু’চারটে সন-তারিখ
মাঝবয়সি রোদ্দুর রোজই আসে হাঁটতে, মরে ঝরে যাওয়ার আগে
ওয়েদার বাগড়া না দিলে
ভালোবাসার পানপাতা পাথরের

দূরে দূরে বাক্স-প্যাঁটরায় যেখানে যা মানুষের বাস, জ্যৈষ্ঠের কুয়াশায় সন্ত্রস্ত
কুয়াশা উঠলেই পার্ক স্ট্রিটে হেলান দেওয়া ধোঁয়া-আলো পাহাড়ি বস্তি
খোপ খোপ জানলা দরজা ঘুলঘুলি, বারান্দায় ফুলটব পানশালা নামচিবাজার

সকালের রোদ্দুরে জনহীন

মরণের ভয়ে হাস্যকর

রাবণের অন্ন-ফল আঁচলে লুকিয়ে সতী ঠাকরুন সীতা, সারসের ছেড়ে যাওয়া
সরোবর ঘিরে সার সার নির্মীয়মাণ অযোধ্যা প্রাসাদপুরী, শিয়রে সবল ক্রেন
জীবন কি এভাবেই যাবে
কালীদা? ভয়ের অভিনয়ে?

…এই সিনে অনিবার্য মাংসে-চর্বিতে মাখামাখি রদ্দি ফিল্মের গান এক পিস
ছবি বিশ্বাস কবেই চলে গেছেন, জেল্লাদার শাল গায়ে বেপথু বরুণ চন্দও
যদি একবার এসে দাঁড়াতেন!

 

সওয়া ১০টা বাজল মনে হয়

কবরের সিঁথি কাটা ইটপাতা রাস্তায় নিঝুম একটা লোক, হাতে কাজ নেই
বসে বসে দেখছে বেলা কী করে চড়ে
লাল টালি ছাওয়া পাতলা গেট পেরিয়ে চলে গেল বস্তির ছোঁড়া পিছু-পিছু
ভাঙা ডাল-পাতা ঘষটে, ওরও কোনও কাজ নেই, বিকেলে লটকায় আকাশময়
লকডাউনের ঘুড়ি, দূরে ছ্যাতলা পরা জলট্যাঙ্কি ছাড়া তার সবই অচেনা
নীরবে শব্দ ফুলে ওঠে শব্দ ফুলে ওঠে ঘোলা পালের মতো
চতুর্দিকে এক দিন কলরোল ফের জেগে উঠবে এই আশায়, আশঙ্কায়
সাইকেলে নড়বড়ে ত্যাঁদোড় বালক শুধু রপ্ত করছে নির্জনে সিঁথি ভেদ করা

 

সাড়ে ১২টার রোদ্দুরে শ্রীমধুসূদন

দত্তমশায় ওখানে শুয়ে আছেন
উত্তরপাড়ার দেউড়িতে কাঁচালঙ্কা মটকে মটকে অসাড় জিভে ঘষে
ঘোড়া শুয়ে আছে আর বেদম ঘোড়সওয়ার, সকালের কাচ ঘষে ঘষে
বিবশ আঙুলগুলো কিছুটা সচল, কবরে ঘনিয়েছে কেয়ারি করা ঘাসের
শরীর থেকে লাবণ্যের বেআব্রু ঢলানি
কী ভয়ঙ্কর ঘন অস্থিরতা এই সব কবরের নীচে জোনাকির আভার মতো

সন্তানেরা কবে জানবে

এই সব স্খলিত বাপ-পিতেমো আর গলিত ভিখিরির অলীক অঙ্গচেতনা
বাতাসে হিল্লোল হয়ে আছে?

কাকের ছায়া ঘুরছে লম্বা-ত্যাড়া হয়ে ঘাস থেকে গাছের শরীরে ভেঙে ভেঙে
মুখোমুখি হলে ছায়ার সঙ্গম ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে বাতাসে না থেমেই
এখন আর শালিখ নেই, মুনিয়া নেই, ক্রমলীন চড়াইয়ের মেঘখণ্ড পালক যেন
আরোগ্য-পুলিশের হাতছুট হয়ে ভেসে নেমে এল

নাইকুন্ডুতে তেল দিয়ে দত্তমশায় উঠে নাইতে যাবেন
রক্তছোপ ববি প্রিন্টের মগজ এই শামুকপুকুরের কাদায় খুলে রেখে যাচ্ছি

 

জ্বরজোছনা

জানলার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফটফটে চাঁদ, খানিক তেরছা
হয়েই আছে, স্বভাবে, পটাপট জামার বোতাম খুলে ফেলছে মধ্যরাত
আমি ঘুরে তাকাচ্ছি না

ভারী আকাচা পর্দায় পশম রোঁয়ার মতো শ্বাস, কষ্ট ফিনফিনে
ফ্যানের ঘষটানো ব্লেডে রক্তের ছিটের মত ভয়, সিনেমার মত
ন্যাকামি, যা যা হুশ—

অস্নাত গলায় বুকে চটচট করছে অপমান, গুঁড়ো গুঁড়ো ভয়
চোখে চুলে মুখে, জানলার শিক খুলে ফেলে দিলে জোছনা নেমে
জলনেকড়ায় মুছে নেবে

যেন! হি হি

অবিশ্রান্ত জলকাদা ভেঙে কাচের আকাশে ঝিকঝিকে প্লেন
তার ককপিটে এক বোমারু আর জানলায় জড়োসড়ো বছিরুদ্দি

ডানার কাছে উড়ন্ত নাবাল জমি, কারও বাঁধা কারও বেচে দেওয়া
কব্জির ঘড়ি হার গরু মেয়েমানুষের কসম আনাড়ি আড়কাঠি ধরে
কুয়েত মালয়েশিয়া মহাকাশ

উটের বিচালি, সোনা, সিমেন্টের লেই আর ভাতমাখা সেক্স

চাঁদের ভারী বুক উঠছে নামছে যেন পর্দার খুঁটটুকু ছেড়ে কিছুতেই
পিছলে যাবে না ভাটার পানার সাথে অনিবার— এ হেন জ্যোতিষ
তার বুকের কাছটিতে, ধকধকে বৃহস্পতি নক্ষত্র

অরেঞ্জাভ

আচমকা আকাশ ভেঙে রাতচরা লেবারের দল ট্রেন-ফেন বন্ধ বলে
পলাশি নওদা হরিতকি হিঙ্গলগঞ্জ থেকে কাঁধে ব্যাগ পাট করা দু’সেট
শার্ট-প্যান্ট ভাঁজে টাকা

পাট করা চুল, উড়ছে
গাছকোমর শাড়ি, ভারী কোমর, ছিপছিপে সালোয়ারও সব ধেয়ে
যাচ্ছে ভাইরাস ছেড়ে ফের ভাইরাসের দিকে অনিবার্য সঙ্গমের দিকে

মাস্ক কনডোম বর্ম ছাড়াই হেব্বি হাসিমুখ অগুনতি চাঁদ লেগে যাচ্ছে
তাদের পিঠময়

পাশে কে নড়ে উঠল? সতীদাহ বামুনের বৌ? হাত কোথায় জানে না
পা কোথায়, নাভি স্তন ব্রণময় আকাঙ্ক্ষাসুড়ঙ্গ গূঢ়তর অহিফেনে লীন
নিষ্কম্প, বোঝা না বোঝায় মেশা

ব্যথা বিষ, ক্লান্তি ঘোর

বেকার জ্যোৎস্না অফ করে বামুন দিব্যি আছে, কিচ্ছু আটকাচ্ছে না
আমাদের সমবে়ত জ্বর, দেখতে দেব না বলে চেপে ধরে রেখেছি পর্দা

 

ইঁদারার ভিতর সিঁড়ি 

এ ঘর আজ বিজয়া দশমীর মত অন্ধকার
হলদে বাতিদানে মরা আলো
চালচিত্রের খাঁচা সিলিং ফ্যানের ছায়া দুলছে

ঢাকের বোলচাল নদীর পথে মৃদু লব্জের মত
উৎসব আছে কিনারেই, তবু উৎসব সরে গেছে
সিঁড়িতে ছলাৎ করে উঠছে জল

বিষণ্ণতার কি বর্ণাঢ্য সুষমা লাগে?
বিষণ্ণতার কি বর্ণাঢ্য সুষমা লাগে না?

নিরন্নও কি বিষণ্ণ হয় মোলায়েম ছায়ার মত
আমিষ ভাসিয়ে দিয়ে ম্লান বিধবা বেহুলার থান
নাকি সে কেবলই তিক্ত হয়ে ওঠে নষ্ট পিত্তে

আমিষ চায় আমিষ চায় সঙ্গম চায়
বা গলন্ত লাভার মত ভাত তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে

তোমরা এরকম নও, খিদে নেই বিষাদ রয়েছে
উদ্‌যাপনে যে যার মত চলে গেছ আজ বিজয়া
ইঁদারার ভিতর সিঁড়ি, নেমে যাচ্ছি

যাব, তার আগে আতর মাখব মণিবন্ধে

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3324 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...