সিআইএ-র খেলার বই

বর্ণিল ভট্টাচার্য

 


প্রান্তিক এক শিখ ব্যক্তিকে হত্যার নেপথ্যে এই যোগসাজশের কথা ভারতের জনসাধারণ এবং জনমাধ্যমগুলি বিশ্বাসই করেনি। কেউ মনেই করেন না যে এই হত্যাকাণ্ডের থেকে ভারত সরকার কোনও আলাদা সুবিধা পাবে। প্রান্তিক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে শহিদ বানিয়ে কী লক্ষ্য হাসিল হতে পারে যার নিজের লক্ষ্যই থমকে দাঁড়িয়ে নিরাশায় ডুবে যায়? রাজনৈতিক অঙ্কটা ভুল কষা হল না কি? সম্ভবত নয়। ভেবেচিন্তেই অঙ্কটা কষা হয়েছে, যদিও কানাডা যে সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত হানবার অভিযোগ এনেছে ভারতের বিরুদ্ধে, তা নিয়ে কেউই বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করবে না। কারণ, এখন বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের শত্রু নিধনে পররাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যপারে আগের চেয়ে বেশি নির্লজ্জ হয়ে গেছে

 

প্রাণবন্ত শহরটির নাম সার‍্যি। এখানকার বাসিন্দাদের গড় বয়স ৩৭। ভারত, চিন এবং আফ্রিকার মানুষদের বেশ প্রিয় গন্তব্য এই শহর। কারণ, এখানে স্বল্পমূল্যে বাড়ি পাওয়া যায়, ভাল কিছু স্কুল আছে বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্যে, পরিবেশ-বান্ধব পার্কগুলি সবুজে সবুজ। তাছাড়াও, দূরগামী যাতায়াতের যানবাহনকেন্দ্র হিসেবে এই শহরটির অবস্থান ভৌগোলিক দিক থেকেও যথেষ্ট সুবিধাজনক। কাছাকাছি ক্রিসেন্ট বিচ এবং বিয়ার ক্রিক পার্কে গ্রীষ্মকালে ভ্রমণার্থীদের ভিড় ভালই জমে। ছোট শহরটির হৃদপিণ্ডে, ফ্রেসার নদীর দক্ষিণ দিকে দশ মিনিট গাড়িতে গেলেই এসে যাবে গুরু নানক শিখ গুরুদোয়ারা। শহরে পাঁচটি শিখ মন্দিরের একটি এই গুরুদোয়ারা।

১৮ জুন সন্ধ্যাবেলায় ৪৫ বছর বয়সি নীল পাগড়ি পরিহিত এক ব্যক্তি এই গুরুদোয়ারা থেকে বার হয়ে তাঁর ধূসর ট্রাকটিতে ইঠে বসেন। সেদিন ছিল ফাদার্স ডে। বাড়িতে ফোন করে তিনি জানান যে উনি ফিরে আসছেন। পার্কিং লটে তখন কয়েকটি তরুণ ফুটবল খেলছিল। মফস্বলে যেমন নিত্যনৈমিত্তিক হয়, সেদিন ছিল তেমনই এক সাধারণ দিন।

হঠাৎ দুই মুখোশ-ঢাকা একটি সাদা গাড়ি চেপে এসে ট্রাকটির পথ আটকে দাঁড়ায়। সবে পার্কিং লট থেকে বার হতে যাচ্ছিল ট্রাকটি। গাড়ি থেকে নেমে আততায়ীরা অটোম্যাটিক বন্দুক থেকে গুলিবৃষ্টি করে আবার গাড়ি চেপে পালিয়ে যায়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সি শিখ নেতা হরদ্বীপ সিং নিজ্জর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজের ট্রাকেই প্রাণ হারান।

হত্যার তিন মাস পরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ভারত সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন এবং কানাডায় কর্মরত গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেন। অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে যা জানা যাচ্ছে তা কানাডায় কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিবিদদের কথোপকথনে আড়ি পাতার ফলশ্রুতি। কানাডা সম্ভবত আরও কিছু গোপন তথ্য আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড দ্বারা গঠিত ‘পঞ্চ চক্ষু’ নামের আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জোটের সঙ্গে শেয়ার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো জানাচ্ছেন যে সম্প্রতি সমাপ্ত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন দ্বিপাক্ষিক এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এই অভিযোগটি করেছিলেন। আবেদনও করেছিলেন যে ভারতের প্রশাসন যেন এই তদন্তে সহযোগিতা করেন।

নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন অবশ্য অভিযোগটিকে ‘ঘোর অবাস্তব (absurd)’ বলে উড়িয়ে দেয়। এই বিষয়ে কানাডার প্রশাসনিক পদক্ষেপের জবাবে ভারতে কর্মরত কানাডার এক কূটনীতিবিদকে পত্রপাঠ বিদায়ের নির্দেশ দেয় এবং কানাডাবাসীদের ভারতে আসবার নতুন ভিসা দেওয়া বন্ধ করে।

হরদ্বীপ সিং নিজ্জরের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি দুই দেশের কূটনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাশিয়া এবং চিনের পাল্টা ভরকেন্দ্র হিসেবে ভারতকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বাইডেনের প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টাটি এই লড়াইয়ের কারণে মাঠে মারা যেতে পারে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এক নেতা তার এক নাগরিককে সেই দেশেই হত্যা করবার অপরাধে আরেকটি দেশকে অভিযুক্ত করে, এমন ঘটনা অতি দুর্লভ। ট্রুডো অত্যন্ত বড় ঝুঁকি নিয়ে এই জুয়াখেলায় মেতেছেন। এর ফলে উগ্রপন্থীদের প্রতিরোধ, বাণিজ্য এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতার মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েই যায়।

কানাডার কিছু সংরক্ষণপন্থী ট্রুডোকেই অভিযুক্ত করেছেন এই বলে যে সেই দেশের জনসাধারণের মধ্যে নিজের ক্রমশ কমে যাওয়া রেটিং-এর থেকে নজর ঘোরানোর জন্যে তিনি অপ্রমাণিত গোয়েন্দা তথ্য সর্বসমক্ষে এনেছেন। গত দুই বছরে এই নিয়ে ট্রুডো চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর পদ আঁকড়ে রাখতে চাইলেন। তবে কানাডাবাসীর কাছে ওঁর আবেদন ক্রমাগত কমছে। গত বছরে ওটাওয়ায় ট্রাকচালকদের এক প্রতিবাদসভায় হস্তক্ষেপ করতে চাইলে এক বড় সংখ্যক মানুষ ওঁর আচরণকে বিদ্রূপের বিষয় বানিয়ে দেন। পর পর দুটি কোয়ার্টারে কানাডার অর্থনীতি ঋণাত্মক দিকে চলছে। ওঁর প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী পিয়ের পয়লেভ্রে বারংবার বার্তা দিচ্ছেন ‘কানাডা ভেঙে গেছে (Canada is broken)’। এই বার্তাটির প্রতি কানাডার মানুষের সমর্থন ক্রমশ বাড়ছে।

এই মুহূর্তে বাসিন্দাদের জন্যে যথেষ্ট আবাসন নির্মাণে কানাডা সরকার গলদঘর্ম। আইনি অভিবাসীর হার দ্রুত বেড়েই চলেছে। পশ্চিমি দুনিয়ার বিশেষজ্ঞরা একমত যে জি-২০ দলের মধ্যে কানাডার প্রভাব কমছে।

প্রান্তিক এক শিখ ব্যক্তিকে হত্যার নেপথ্যে এই যোগসাজশের কথা ভারতের জনসাধারণ এবং জনমাধ্যমগুলি বিশ্বাসই করেনি। তাঁদের কাছে এই গোটা বিষয়টি গুরুত্বহীন। কেউ মনেই করেন না যে এই হত্যাকাণ্ডের থেকে ভারত সরকার কোনও আলাদা সুবিধা পাবে। ১৯৮০ এবং ১৯৯০— দুই দশক ধরে যে খলিস্তান আন্দোলনের অভ্যুত্থান ঘটে, তা এই মুহূর্তে শিখ অনাবাসীদের জন্যে মুখে মারিতং জগৎ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রান্তিক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে শহিদ বানিয়ে কী লক্ষ্য হাসিল হতে পারে যার নিজের লক্ষ্যই থমকে দাঁড়িয়ে নিরাশায় ডুবে যায়? রাজনৈতিক অঙ্কটা ভুল কষা হল না কি?

সম্ভবত নয়। ভেবেচিন্তেই অঙ্কটা কষা হয়েছে, যদিও কানাডা যে সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত হানবার অভিযোগ এনেছে ভারতের বিরুদ্ধে, তা নিয়ে কেউই বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করবে না। কারণ, এখন বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের শত্রু নিধনে পররাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যপারে আগের চেয়ে বেশি নির্লজ্জ হয়ে গেছে। ইউক্রেন আর রাশিয়া পরস্পরের শত্রু শিকার করছে, সৌদি আরব, ইরান এবং তুরস্ক গত দশকেই বিদেশের মাটিতে অনেকগুলি গোপন আক্রমণ হেনেছে। বিশেষ জঘন্য একটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে সৌদি আরব তার দেশের এক ভিন্নমত পোষণকারী সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে তুরস্কে নিজের দূতাবাসে ডেকে এনে কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়।

রাষ্ট্রীয় মদত-পুষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার কাপট্য নিয়ে কিছু দেশ সমালোচনা করেন। যেমন, ইজরায়েল দ্বারা সংঘটিত ইরানের পারমাণবিক গবেষকদের হত্যা, বা পাকিস্তানে গিয়ে আমেরিকার ওসামা বিন-লাদেন হত্যা। আলেকজান্ডার লিটভিনেকো-র মতো এক ভিন্নমত পোষণকারীকে রাশিয়াও বিদেশের মাটিতে হত্যা করে। আলেক্সি নাভালনি অল্পের জন্যে বেঁচে যান।

ড্রোন এবং উন্নত নজরদারি যন্ত্রাদি ব্যবহারের ফলে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা এখন জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার ড্রোন আক্রমণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন যাঁদেরকে জিহাদি হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছে। অসংখ্য নিরীহ নাগরিকও নিহত হয়েছে সেই আক্রমণগুলিতে। ২০২২ সালে আমেরিকার এক ড্রোন আক্রমণে ওসামা বিন লাদেনের ডানহাত আয়মান আল জাওয়াহিরি মারা যান কাবুলে। ২০২০-র আমেরিকান ড্রোন আক্রমণে বাগদাদ বিমানবন্দরে ইরানের পররাষ্ট্র-ক্রিয়াকলাপ বিভাগ কাডস (Quds) ফোর্স প্রধান কাশিম সুলেইমানি মারা যান।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিগগজেরা বিশ্বাস করেন যে পৃথিবীতে নামীদের হত্যাকাণ্ড ক্রমশ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক এবং কর্তৃত্ববাদী দ্বারা চালিত— দুই ধরনের দেশগুলিই এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেও দায়মুক্ত থাকতে পারছে। উদাহরণস্বরূপ, বাইডেনের প্রশাসন খাসোগিকে মারবার পরে প্রাথমিক জনরোষ সত্ত্বেও এখন সৌদি আরবের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে।

আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশ লক্ষ্যবিন্দু স্থির করে হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীদের হত্যা করাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য বৈধতা’ অথবা ‘বিশ্বাসযোগ্য অস্বীকৃতি’ হিসেবে আড়াল করবার চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি রাষ্ট্র যখন উগ্রবাদী ক্রিয়াকলাপকে প্রতিরোধ করতে চায় না অথবা পারে না, তখন দেখা যাচ্ছে সেই দেশ সামরিক সক্রিয়তাকেই মান্যতা দিয়ে দিচ্ছে।

হয়তো ভারতও এখন ইজরায়েল বা আমেরিকার মতো সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীদের সাবাড় করবার পদ্ধতি নকল করছে, যদিও তা আন্তর্জাতিক আইন-বিরুদ্ধ কাজ। ভারতেরও হয়তো অভিযোগ থাকতে পারে যে তার তালিকায় যে ‘উগ্রপন্থী’-দের নাম লেখা রয়েছে, কানাডা তাঁদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। তাঁদের কাবু করবার জন্যে সাহায্যেরও আবেদনও রাখতে পারে ভারত।

যে আন্তর্জাতিক আইন কোনও দেশ মানে না সেই আইনের বই ভারতের মুখে ছুড়ে মারাটাকে এবং আইন ভেঙেছে বলে চেঁচানোটা প্রায় এই কথাটাই বলবার মতো হয়ে দাঁড়ায়: “যা বলছি তাই করো, আমি যা করি তা অনুসরণ করবে না (do as I say, not as I do)।”

পঞ্চচক্ষু জোট যত ইচ্ছে প্রমাণ জড়ো করে করুক, কিন্তু এই কঠোর বাস্তবটি না দেখে উপায় নেই যে সেই দেশগুলি যে কাণ্ডকারখানা এতকাল ঘটিয়েছে, এ তারই প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।


*মতামত ব্যক্তিগত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...