তিনটি গল্প

ফেলিক্স দাভিদোভিচ ক্রিভিন

 

মূল রুশ থেকে ভাষান্তর: লীলা সরকার

ফেলিক্স দাভিদোভিচ ক্রিভিন (১৯২৮-২০১৬) সোভিয়েত রাশিয়ার লেখক। ১৯৫১-তে কিয়েভ থেকে স্নাতক হন। প্রথম জীবনে প্রকৌশলী হিসেবে দানিয়ুব জাহাজ তৈরির সংস্থায় কাজে যোগ দেন। ছয়ের দশক থেকে শুরু করে পঁচিশটির বেশি গ্রন্থের প্রণেতা। ২০১৮ সালে প্রথমবার তাঁর গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। ১৯৯৮ থেকে জীবনের শেষ বছরগুলি তিনি ইজরায়েলে কাটান এবং সেখানেই মারা যান। বর্তমান গল্পগুলি সরাসরি রাশিয়ান ভাষা থেকে অনূদিত।

 

জীবন-সায়াহ্নের উপকথা

জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখো। দেখতে পাচ্ছ, গাছের একটাই পাতা বাতাসে উড়ছে? শেষ পাতা……

এখন ওর গায়ের রং হলুদ। একটা সময় ও কিন্তু সবুজ রঙের ছিল। তখন ও পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত না। পাতা তখন গাছের ডালে একটা লাল টুকটুকে চেরিফলের পাশে থাকত। সমস্ত হৃদয় দিয়ে ও চেরিফলকে ভালবাসত।

বয়স্ক ভ্রমণকারী বাতাস তাকে প্রায়ই বলত: চলো আমরা যাই, পৃথিবী বেড়িয়ে আসি! সব জায়গায় কী সুন্দর সুন্দর চেরিফল!

কিন্তু পাতা রাজি হত না। তার অনেক চেরিফলের দরকার কী? তার একজন আছে, তার চেরিফল, যে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর।

কিন্তু একদিন তার সুখ ঘুচে গেল। তার চেরিফল হঠাৎ অন্তর্হিত হল। কেউ বলতে পারল না, কোথায় সে চলে গেল।

হেমন্তকালের শীতের সময় এল। অনেক আগেই গাছের সব পাতা ঝরে গেছে। শুধু একটি পাতা দুঃখে হলুদ বর্ণ হয়ে গাছের ডালেই থেকে গেছে। সে এখনও আশা করত, যে চেরিফল ফিরে আসবে।

—এখানে বসে থেকে তোমার কী লাভ?— বাতাস বলে। চলো, চলো, ওকে আমরা খুঁজি চলো, হয়তো খুঁজে পেয়েও যাব ওকে।

বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে পাতাও উড়ে চলল।

…জানলা দিয়ে দেখো। দেখতে পাচ্ছ, অস্পষ্ট গাছগুলি শীতে জড়াজড়ি করে আছে! এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই: শীতে সকলেই গরম পোশাক পরে, কিন্তু ওদের তো কোনও পোশাক নেই। আর ওদিকে তাকিয়ে দেখো, শেষ হলুদ পাতাটি বাতাসে ঘুরছে। এটি আমাদের পাতা, আমাদের বিশ্বস্ত প্রেমিক পাতা; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে তার বিশ্বাসে অটুট থেকেছে। সে এখনও তার চেরিফলকে খুঁজছে।

 

প্রেম

ঘাসের একটি ফলক সূর্যের প্রেমে পড়ে গেল।

অবশ্যই সূর্যের কাছ থেকে এর কোনও প্রতিদানের আশাই সে করত না। পৃথিবীতে এতজনের দিকে সূর্যকে তাকাতে হয়! ছোট্ট একটা ঘাসের ফলকের দিকে তার তাকাবার সময় কোথায়! তাছাড়া সূর্য আর ঘাসের ফলক— উপযুক্ত জুটিই বা হয় কী করে!

কিন্তু ঘাসের ফলক ভাবল, তাদের জুটি তো সুন্দরই, তাই সে সূর্যের দিকে প্রসারিত হল। সে এত জেদের সঙ্গে প্রসারিত হল, যে রূপান্তরিত হল লম্বা, উঁচু এক আকাশমণি গাছে।

সুন্দরী আকাশমণি! চমৎকার আকাশমণি! কেউ কি জানে যে এই আকাশমণিই অতীতে ছিল এক ঘাসের ফলক!

মাঝে মাঝে প্রেম এমনই কাজ করে, এমনকি প্রতিদান না পেলেও সে ভালবাসা ফুরিয়ে যায় না।

 

ফোরতোচকা*

আগ্রহী, অস্থিরমতি ফোরতোচকা, কাচের জানলার ভিতর ছোট্ট আর একটা কাচের জানলা, উঠোনের দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর ছবি দেখল।

উঠোনে একটা বিরাট ফুটবল লাফিয়ে লাফিয়ে খেলে বেড়াচ্ছিল। বলটা গাছের ডাল ভাঙল, দেয়ালের প্লাস্টারও ভেঙে ফেলল। বেশ ভাল দেখতে বলটা, তাই ফোরতোচকা বলের প্রেমে পড়ে গেল: “কী সুন্দর! কী শক্তিমান!”— সে ভাবল।

ফোরতোচকার খুব ইচ্ছে হল বলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। কিন্তু বলটা শুধু লাফিয়েই বেড়াত। আপাতদৃষ্টিতে ওর কোনও পরিচিতই ওর কাছে যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়।

বলটা উড়ে গিয়ে ধাক্কা মারতে মারতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তখন খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিতে গেল। তারপর মাটি থেকে লাফিয়ে সোজা সে একটা উল্টে যাওয়া পিপের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

ভারি মজার ব্যাপার হল এটা! ফোরতোচকা আনন্দে শিহরিত হল। সে এত জোরে হাততালি দিয়ে উঠল যে অবশেষে বলের দৃষ্টি তার দিকে পড়ল। সহজে জয় করতেই বল অভ্যস্ত, কাজেই নিঃস্পৃহভাবে সে কাচের ফোরতোচকা জানলার দিকে লাফিয়ে গেল। দারোয়ান দৌড়ে আসার আগেই মিলনটা ঘটল।

এরপর সকলেই বলটাকে বকতে লাগল। ফোরতোচকার জন্য সকলেরই খুব কষ্ট হতে লাগল এমন অসঙ্গতভাবে ওর জীবনটা ভেঙে গেল বলে।

কিন্তু পরের দিন বলটা আবার উঠোনে খেলতে লাগল। আবার আর একটি ফোরতোচকা বলকে দেখে জোরে হাততালি দিল আর অধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগল বলের সঙ্গে মিলনের জন্য।


*ফোরতোচকা: শীতের দেশে কাচের বড় জানলার মধ্যেই একপাশে কাচের একটি ছোট্ট জানলা থাকে বায়ু চলাচলের জন্য।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4658 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...