এসআইআর: সর্বজনীন ভোটাধিকারের চেতনার এক অবমাননা

অরুন্ধতী ধুরু ও সন্দীপ পাণ্ড্যে

 

এটা স্পষ্ট যে, আসন্ন উত্তরপ্রদেশ পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য যেভাবে সহজসরল বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার মাধ্যমে ভোটার তালিকার সংশোধন করা হয়েছিল, সেই পথ না বেছে নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মানুষকে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করতে বাধ্য করার ফলে প্রায় ১৮ শতাংশ ভোটার বাদ পড়েছেন— যাঁদের একটি বড় অংশই প্রকৃত ভোটার। উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— একই প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার জন্য কেন দুই স্তরের নির্বাচনে ভোটারতালিকা সংশোধনের জন্য দুটি ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করা হল, যার ফলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তালিকা তৈরি হয়েছে? আমলাতান্ত্রিক ঔদ্ধত্য, দুর্ব্যবস্থাপনা এবং জনসাধারণের সময় ও অর্থের এমন অপচয়ের এর চেয়ে সহজ ও জোরালো উদাহরণ আর কী হতে পারে?

 

ভারত স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনতা আন্দোলনের দূরদর্শী নেতাদের উদ্যোগে দেশের মানুষ মৌলিক অধিকার হিসেবে সর্বজনীন ভোটাধিকার পেয়েছিল। বিদেশি শাসনের অধীনে যেখানে মানুষ ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিলেন, সেখানে গণতন্ত্রে এই অধিকারপ্রাপ্তিকে একেবারে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই দেখা হয়েছিল। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে একটি প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। যাঁদের কাছে ইলেক্টোরাল ফটো আইডেন্টিটি কার্ড ছিল না, কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম ছিল, তাঁদের অন্য কোনও পরিচয়পত্রের ভিত্তিতেও ভোট দিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল, বিদেশিরা ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনের মতো পর্যাপ্ত সময় দেশে না কাটালে ভোট দেবেন না। সুতরাং যাঁরা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে মনে করতেন, তাঁদের সকলেরই ভোটাধিকার থাকবে— এই ছিল ধারণা। এটিই সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূল ভাবনা।

এখন, এসআইআর চালু হওয়ার ফলে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ধারণাটিই ব্যাহত হয়েছে। নাম অনুযায়ী এটি কোনও সাধারণ সংশোধন প্রক্রিয়া নয়। কার্যত নতুন করে ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এসআইআর-এর ঘোষিত উদ্দেশ্য হল মৃত, দ্বৈতভাবে নথিভুক্ত এবং স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আরও বহু শ্রেণির মানুষকে বাদ দেওয়া হচ্ছে— যাঁরা শুধুমাত্র একটি সাধারণ সংশোধন প্রক্রিয়া হলে নিশ্চিতভাবেই ভোটার তালিকায় স্থান পেতেন।

উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ ধরা যাক। এই রাজ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ১৬.১ কোটি। সাম্প্রতিককালে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার মাধ্যমে ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২.৭ কোটি। এটি কেবলমাত্র গ্রামীণ এলাকার ভোটারদের হিসাব। অথচ ভারতের নির্বাচন কমিশন গোটা উত্তরপ্রদেশে— গ্রাম ও শহর মিলিয়ে— এসআইআর প্রক্রিয়ার আওতায় ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত ১৫.৪ কোটি ভোটারের প্রত্যেককে একটি করে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করতে বলেছিল। সেই প্রক্রিয়ায় মাত্র ১২.৬ কোটি ভোটার তাঁদের ফর্ম জমা দিতে পেরেছেন। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, এসআইআর-এর পর গোটা উত্তরপ্রদেশে মোট ভোটারের সংখ্যা শুধু গ্রামীণ এলাকার পঞ্চায়েত নির্বাচনের ভোটার তালিকার সংখ্যার চেয়েও কম! এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? মৃত, দ্বৈতভাবে নথিভুক্ত ও স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটারদের পাশাপাশি আরও কিছু শ্রেণির ভোটার ছিলেন, যাঁরা তাঁদের এনুমারেশন ফর্ম বিএলও-দের কাছে জমা দিতে পারেননি।

এমন অনেক ভোটার আছেন, যাঁরা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও অনলাইনে তাঁদের ফর্ম পূরণ করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে ভোটারের মোবাইল নম্বর আধার কার্ড ও এপিক— উভয়ের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে হয় এবং দুই কার্ডে থাকা নামটি হুবহু এক হতে হয়। কেন ভোটারকে তাঁর আধার নম্বর প্রকাশ করতে হবে— যা হাতে-কলমে এনুমারেশন ফর্ম পূরণের সময় একটি ঐচ্ছিক বিষয়— সে প্রশ্ন না তুললেই ভালো; কারণ আধার নম্বর না দিলে অনলাইন প্রক্রিয়ায় এক ধাপও এগোনো যাবে না। পরে ভোটার যখন আবার ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে তাঁর এনুমারেশন ফর্মের অবস্থান যাচাই করতে যান, তখন সেই লিঙ্ক খুলে নতুন করে ফর্ম পূরণের পাতা দেখায়। অন্যদিকে, যাঁরা তাঁদের ফর্ম বিএলও-দের হাতে জমা দিয়েছিলেন এবং যেগুলি পরে আপলোড করা হয়েছে, তাঁরা ওয়েবসাইটে ঢুকলে দেখতে পান— তাঁদের ফর্ম ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে বলে একটি বার্তা দেখানো হচ্ছে। এই ধরনের অনলাইনে সফলভাবে পূরণ করা এনুমারেশন ফর্ম পরবর্তীকালে যাচাইয়ের সময় ‘ফর্ম ইতিমধ্যেই জমা দেওয়া হয়েছে’— এই বার্তাটি না দেখানোর বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটি অভিযোগ দাখিল করা হয়। সেই অভিযোগের কোনও প্রতিক্রিয়াই পাওয়া যায়নি।

এমনও ভোটার আছেন, যাঁদের কাছে বৈধ এপিক রয়েছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে এপিকের অবস্থা যাচাই করতে গেলে ‘নো রেজাল্ট ফাউন্ড’ দেখাচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, তাঁদের নাম অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিন্তু যুক্তির দিক থেকে দেখলে, যেহেতু তাঁদের কাছে বৈধ এপিক রয়েছে, তাই বর্তমান ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম থাকার কথা। সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হল— তাঁরা কেন এনুমারেশন ফর্ম পেলেন না? এনুমারেশন ফর্ম না পাওয়ার ফলে তাঁরা কোনও ফর্ম জমাও দিতে পারেননি। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে— নির্বাচন কমিশন যখন খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে, তখন তাঁদের নাম সেখানে অনুপস্থিত থাকবে।

এমন ভোটারও আছেন, যাঁদের কাছে এপিক নেই, কিন্তু ২০০২-০৩ সালের শেষ এসআইআর তালিকায় তাঁদের নাম অথবা তাঁদের বাবা-মা কিংবা দাদু-দিদা/ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম রয়েছে— অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নাগরিকত্ব পরীক্ষায় তাঁরা উত্তীর্ণ। কিন্তু এনুমারেশন ফর্ম না পাওয়ার কারণে তাঁরাও কোনও ফর্ম জমা দিতে পারেননি। ফলে খসড়া ভোটার তালিকায় তাঁদের নামও অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এরপর এমন ভোটারও আছেন, যাঁদের নাম বর্তমান ভোটার তালিকায় রয়েছে, কিন্তু কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সরকার তাঁদের সদলবলে উচ্ছেদ করেছে— যেমন লখনউয়ের প্রাক্তন আকবর নগরের বাসিন্দারা। তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিএলও এই বলে এনুমারেশন ফর্ম দেননি যে তাঁরা স্থায়ীভাবে অন্য একটি বিধানসভা কেন্দ্রে চলে গেছেন। অথচ সঠিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল— তাঁদের হাতে এনুমারেশন ফর্ম তুলে দেওয়া এবং একই সঙ্গে ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম-৮ পূরণ করিয়ে নেওয়া। এই ধরনের ভোটাররাও কোনও এনুমারেশন ফর্ম জমা দিতে পারেননি এবং খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলে তাঁদের নামও সেখানে অনুপস্থিত থাকবে।

তবে উপরের সব শ্রেণির যে ভোটারদের নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে, তাঁদের সকলকেই এখন ফর্ম-৬ পূরণ করতে বলা হচ্ছে— যে ফর্মটি মূলত প্রথমবার ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ফর্ম পূরণের সময় একটি ঘোষণা দিতে হয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতীতে কখনও কোনও ভোটারতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ কার্যত মানুষকে ফর্ম-৬ পূরণের সময় মিথ্যা বলতে বাধ্য করছে। এর ফলে গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে— এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে বাদ পড়া প্রায় ৩ কোটি নামের মধ্যে উপরোক্ত ধরনের প্রকৃত ভোটাররা আদৌ কি কখনও ভোটারতালিকায় নিজেদের নাম ফের অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন?

এটা স্পষ্ট যে, আসন্ন উত্তরপ্রদেশ পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য যেভাবে সহজসরল বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার মাধ্যমে ভোটার তালিকার সংশোধন করা হয়েছিল, সেই পথ না বেছে নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মানুষকে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করতে বাধ্য করার ফলে প্রায় ১৮ শতাংশ ভোটার বাদ পড়েছেন— যাঁদের একটি বড় অংশই প্রকৃত ভোটার। উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— একই প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার জন্য কেন দুই স্তরের নির্বাচনে ভোটারতালিকা সংশোধনের জন্য দুটি ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করা হল, যার ফলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তালিকা তৈরি হয়েছে? আমলাতান্ত্রিক ঔদ্ধত্য, দুর্ব্যবস্থাপনা এবং জনসাধারণের সময় ও অর্থের এমন অপচয়ের এর চেয়ে সহজ ও জোরালো উদাহরণ আর কী হতে পারে? এই সব কিছুর শিকার হয়েছেন যে বিএলও-রা, বহু ক্ষেত্রে যাঁদের মূল্যবান জীবনও বিপন্ন হয়েছে— সে-কথা নয় উহ্যই থাকল। এর সবটাই কি সর্বজনীন ভোটাধিকারের চেতনার পরিপন্থী নয়?

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5265 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...