মির্জা হাকিম
বাংলাদেশের শিশুপাঠ্য থেকে ঘরে-ঘরে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া লোকমুখে ঘোরে। স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণে তাঁর ছড়ার যে অবদান তার স্বীকৃতি জীবনভর অজস্র রাষ্ট্রীয় সম্মাননার মধ্যে দিয়ে তাঁকে জ্ঞাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ‘একুশে পদক’ সেরার শিরোপা হিসেবে বিবেচিত। পশ্চিমবাংলায় কতজন তাঁর ছড়ার আস্বাদে প্রাণোদিত হয়েছে সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের মধ্যে যারা তাঁকে গত কয়েক দশক ধরে পাঠ করে আন্দোলিত হয়েছি তাদের তরফে তাঁকে জানাই সুকৌমার্য প্রণাম
বিখ্যাত মানুষদের সমনামী হওয়ার বোঝা প্রায় অনেককেই সারাজীবন বয়ে নিয়ে যেতে হয়। যেমন একটি জনপ্রিয় নাম ‘মধুসূদন’। সে আপনি যতই সেন, মিত্র, চাটুজ্যে বাঁড়ুজ্যে প্রভৃতি হন না কেন, দত্ত হতে না-পারার বেদনা বাল্যকালে শিক্ষক কিংবা বন্ধুদের উপহাসের মধ্যে দিয়েই টের পেয়েছেন। কিন্তু ক্বচিৎ কখন-সখনও এমন তো হতে পারে বিখ্যাতের সমনামী নিজেও একইরকম বিখ্যাত হয়ে গেলেন? তখন ব্যাপারটা কেমন যেন ‘জীবনদেবতা’র কৌতুক মনে হয়। যেমন ধরুন সুকুমার। প্রায় প্রতি পাড়া-মহল্লায় ঢুঁ মারলে এক-আধটা সুকুমার পাওয়া যাবেই, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ আশ্চর্যভাবে রায়ও হতে পারে। কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ব্যাটা বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘সুকুমার রায়’ কি হতে পারে? সেটা যে অসম্ভবেরও অসম্ভব। কিন্তু সত্যি বলতে ‘রায়’বাবুর মতো আমাদের ভাষা-সাহিত্যে আর একজন তেমনই ক্ষণজন্মা ছড়াকার ছিলেন। তিনি স্বনামখ্যাত ‘সুকুমার বড়ুয়া’। বছরের প্রথম দিনে চুরাশি বছর বয়সে যিনি চিরবিদায় নিলেন। ‘রায়’ আর ‘বড়ুয়া’র মধ্যে কেবল জীবনকালের ফারাক নয়, সমাজ, অর্থনীতি আর সময়ের বিস্তর ব্যবধান। সুকুমার রায় ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট রায় পরিবারের সন্তান, রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন এবং মুদ্রণশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত। কিন্তু বড়ুয়া?
১৯৩৮ সালে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এক গ্রাম বিনাজুরিতে গরিব পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর যখন পাঁচ বছর বয়স সে সময় ঘটে যায় ‘মহামান্য’ চার্চিল-সৃষ্ট পঞ্চাশের মন্বন্তর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট যতজন ব্রিটিশ সৈন্য মারা গিয়েছিল পঞ্চাশের মন্বন্তরে তার চেয়ে বেশি বাঙালি মারা যায়, সংখ্যাটা তিরিশ লাখ। সেই আকালের দিনে সুকুমারের বাবা চিরকালের জন্য হারিয়ে যান। ফলে মায়ে-পোয়ে লড়াই করে বাঁচার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরেছিলেন। অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের মধ্যে ‘আড়াই ক্লাসে’র বেশি তাঁর লেখাপড়া এগোয়নি। গ্রামের স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে চলে যান এক বৌদ্ধ সংঘে, সেখানে ক্লাস টু-তে পাশ করে থ্রি হলেও মাঝরাস্তায় পড়া ছেড়ে দিতে হয়।
১৯৫০ সালে শিশুশ্রমিক হিসেবে বারো বছর বয়সে মাত্র তিন টাকা মাইনেতে নালাপাড়ার মনমোহনবাবুর তালুকদারিতে কর্মজীবন শুরু করেন। বাহান্ন সালে যখন প্রবল ছাত্র আন্দোলন চলছে তখন চোদ্দ বছরের সুকুমার রাঁধুনির কাজ নিয়ে চলে যান ভৈরব বাজারে। বস্তুত এই রান্নার কাজটা তাঁর জীবনে মুখ্য উপজীবিকা হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালে চাকরি পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সহকারী স্টোরকিপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। বাকি জীবন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন।
বাংলা ছড়ায় সুকুমার রায় যে ননসেন্স-এর আমদানি করেছিলেন বড়ুয়া সেই পথে যাননি। তাঁর যাপন এবং কাব্যচর্চা লো-লাইটে থেকে গেছে বরাবর। তিনি মুন্সিয়ানার সঙ্গে যাকে আমরা বলব বিশুদ্ধ fun সেই জিনিসে তাঁর জাদুকরি প্রতিভা রেখে গেছেন। দৃশ্যকলায় হাস্যরস এনে ছড়া বুনেছিলেন সুকুমার। কেমন সে ধরন?
দিনদুপুরে ঘর-ডাকাতি
পানি তোলার লোটাও নেই
সর্ষে-তেলের বোতল গায়েব
তেল তাতে এক ফোঁটাও নেই।
সরু চালের ভাণ্ড উজার
চাল তাতে আর মোটেও নেই
তিনটে গেল মিষ্টি কুমড়ো
তার কোনো এক বোঁটাও নেই।
ছাগল বাঁধার দড়ি গেছে
দড়ির মাথায় খোঁটাও নেই
আরেক মাথায় ছাগল ছিল
এখন দেখি ওটাও নেই।
ছড়ার নাম ‘নেই’। চুরি হয়ে সর্বস্বান্ত গেছে গৃহস্থের, সেই আবহাওয়ায় নিদারুণ শোক কেমন হাস্যরস এনে দিয়েছে। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে জীবনকে এভাবে দেখাটাই সুকুমার বড়ুয়ার দর্শন। বিপর্যয়কে মন্দভাগ্য বলে মধ্যবিত্তের মতো বিলাপ নয়, বরং তাকে বুড়ো আঙুল দেখানো, মুখভেংচি কাটা তাঁর সাহিত্যের নির্যাস। তাঁর অন্য একটি অতিবিখ্যাত ছড়া ‘ঠিক আছে’ সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে:
অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলি দিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।
রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু ক’টা শিক আছে
তবু তিনি বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।
কম্পিউটার এসেছে তাঁর জীবনের শেষপর্বে, নতুন প্রযুক্তিকে কীভাবে তিনি মজাদার ছাড়ার মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করেছেন সেটা দেখা যায় তাঁর ‘ডাটা সংবাদ’ ছড়ায়:
পুঁইয়ের ডাঁটা লাউয়ের ডাঁটা
বায়োডাটার ঝোল,
ডাটা প্রসেস করতে গেলে
কম্পিউটার খোল।
ডাঁটায় পাগল বুড়োবুড়ি
ক্যালসিয়ামে ভরা,
শজনে ডাঁটার গুণ বেশি তাই
বাজার ভীষণ চড়া।
উচ্চতর ডিগ্রি নিতে
ডাটাই পরম ধন,
সারা বছর খেটে করেন
ডাটা কালেকশন।
তাঁকে বলা হয়েছে শিশুসাহিত্যিক, যেমন সুকুমার রায়কেও বলে থাকেন পণ্ডিতেরা। অথচ এই মানুষটাই তীক্ষ্ম ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ছড়াও লিখেছেন। যেমন ‘শিয়াল মন্ত্রী’ ছড়ায়:
শিয়াল নাকি লোভ করে না
পরের কোনো জিনিসটার
কী পরিচয় দিল আহা
কী সততা! কী নিষ্ঠার!
তাই সে হল বনের মাঝে
এডুকেশন মিনিস্টার।
কিংবা তাঁর মাতৃভাষায় (চট্টগ্রামের প্রান্তিক ভাষা) লেখা ‘নেতা’ ছড়ায়:
লাল মিয়া তো বিরাট নেতা
রাস্তা ঘাডে ফাল মারে
দিনৎ বড় ভালামানুষ
রাইত দুপুরে জাল মারে।
গরীবরলাই কাঁদি কাঁদি
টেঁয়া পইসার টাল মারে
জাল কবলা দলিল বানাই
পরর ক্ষেতৎ হাল মারে।
পরর মাথাত খিয়া ভাঙি
পরর ভাতর তাল মারে
খালকুলে যাই মাল টানে আর
আফুডাইংগা গাল মারে।
‘ভেজাল’ কবিতায় তাঁকে আক্ষেপ করতে শোনা গেছে এই ভাষ্যে:
লিখতে দেখি ভেজাল কালি!
কলম হল ঠাণ্ডারে,
হায় রে কত ভাষার ভেজাল
বঙ্গভাষার ভাণ্ডারে।
তবে এমন আক্ষেপ চিরহাস্যময় এই শিল্পীর কলমে ব্যতিক্রম বলা চলে।
বাংলাদেশের শিশুপাঠ্য থেকে ঘরে-ঘরে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া লোকমুখে ঘোরে। স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণে তাঁর ছড়ার যে অবদান তার স্বীকৃতি জীবনভর অজস্র রাষ্ট্রীয় সম্মাননার মধ্যে দিয়ে তাঁকে জ্ঞাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ‘একুশে পদক’ সেরার শিরোপা হিসেবে বিবেচিত। পশ্চিমবাংলায় কতজন তাঁর ছড়ার আস্বাদে প্রাণোদিত হয়েছে সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের মধ্যে যারা তাঁকে গত কয়েক দশক ধরে পাঠ করে আন্দোলিত হয়েছি তাদের তরফে তাঁকে জানাই সুকৌমার্য প্রণাম।

