ডন, তাকে ভালো লাগে

প্রতীক

 

 


ভণ্ডামি কিন্তু আমাদের ডনের মধ্যে পাবেন না। উনি খুব ধারাবাহিক লোক। গাজার কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; গ্রিনল্যান্ডের কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; ভেনেজুয়েলার কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; মেক্সিকো, কিউবা, কলম্বিয়া, কানাডার কী হবে সেটাও উনি ঠিক করবেন। বলেই দিয়েছেন— এটা আমার হেমিস্ফিয়ার। আহা! ভাগ্যিস ডন আছেন! তাই কাউকে আর ‘নিও-ইম্পিরিয়ালিজম’ বোঝানোর দরকার রইল না। ইনি একেবারে পুরনো সাম্রাজ্যবাদের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। যেমন ছিল আর কি— মোটের উপর এশিয়া আর উত্তর আমেরিকা ইংরেজদের, আফ্রিকাটা ফরাসিদের আর দক্ষিণ আমেরিকা স্প্যানিশ, পর্তুগিজদের। এবারে নাহয় একটু অন্যরকম হবে। ডন, নেতানিয়াহু, পুতিন আর জিনপিং নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবেন

 

আবার সে এসেছে ফিরিয়া। পাগলা দাশু নয়, অ্যাডলফ হিটলার। তবে এই জন্মে গতি অনেক বেশি।

হিটলারের রাজ্যবিস্তারের কায়দাটা কীরকম ছিল? প্রথমে নিই নিই করে অস্ট্রিয়া নেব, তারপর একটু একটু করে চেকোস্লোভাকিয়া নেব। রুশরা উশখুশ করলেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বলবে, আহা, কী-ই বা চেয়েছে? ওটুকু দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। তারপর পোল্যান্ডের দিকে হাত বাড়াব। তখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের একটু একটু ভয় করতে শুরু করবে। যতক্ষণে ‘ও মা, ও পিসি, ও শিবুদা’ বলে লাফিয়ে উঠবে, ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফলে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি পেরিয়ে ফ্রান্সে যখন নাজিবাহিনী পৌঁছবে, তখন প্রায় কোনও লড়াই-ই হবে না। লন্ডনকে বোম ফেলে আলুরদম বানিয়ে দেওয়া হবে।

এ-জন্মে কিন্তু একেবারে সুপারসোনিক গতিতে এগোচ্ছেন হিটুদা, থুড়ি, ডনদা। মানে ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদক পাচারকারী মাফিয়া বলে দেগে দিয়ে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি আর তাঁর গিন্নিকে তুলে আনলেন ৩ জানুয়ারি। কিন্তু আনার পরেই বলে দিলেন, ওই দেশটা আমরাই চালাব। ওদের তেল আমাদের লাগবে, অতএব নেব। কিন্তু পয়সা দেব না। তবে চিন্তা নেই, দেশটাকে সুন্দর করে দেব। পষ্ট কথায় কষ্ট নেই। ইউরোপের নেতারা নড়েচড়ে বসতে না বসতেই বলে দিলেন— এরপর গ্রিনল্যান্ড নেব। ডেনমার্ক সবে চিঁ চিঁ করতে শুরু করেছে, তার মধ্যেই বলেছেন কিউবায় বদল করে ফেলার অবস্থা তৈরি, কলম্বিয়াকেও দেখে নেব।[1] তারপর ৮ জানুয়ারি ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলে দিয়েছেন— মেক্সিকো দেশটা মাদকে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আমরা জলপথে ব্যবস্থা নিচ্ছি, স্থলপথেও নেব।[2] একই দিনে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন— ন্যাটো-ফ্যাটো বুঝি না। আমার গ্রিনল্যান্ড চাই, তাতে ন্যাটো গেলে যাবে।[3]

এইজন্যেই মানুষটাকে ভালো লাগে। কী সৎ বলুন তো! রাজনীতিবিদদের মতো মনে-এক-মুখে-আর নন। সেই যখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি, সবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যবিষয় হিসাবে নিয়ে বেশ একটু ইয়ে বোধ করছি, তখন এক মাস্টারমশাই বলেছিলেন “হিটলার এক হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে অনেস্ট পলিটিশিয়ান। মাইন কাম্ফ বইতে যা যা করবে বলে লিখেছিল, ঠিক তাই তাই করেছিল। কথায় আর কাজে এরকম মিলের উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না।” তা আমাদের ডন কি আর এ যুগে আস্ত বই লিখতে বসবেন? অত সময় কোথায়? তেনার আছে ‘ট্রুথ সোশাল’। লেখালিখি যা করার ওখানেই করেন। প্রাক্তন প্রেমিক, থুড়ি, বন্ধু ইলন মাস্কের এক্সে সে পোস্ট শেয়ার করেন। দেখুন তো কেমন বলে বলে কাজ করছেন! ভেনেজুয়েলাকে যে টিকতে দেবেন না সে-কথাও তো কবে থেকে বলে আসছিলেন। লোকে বিশ্বাস করছিল না, কারণ ভাবছিল ডন আর পাঁচজন রাজনীতিবিদের মতো মিথ্যুক। যা বলেন তা করেন না। উনি যে জাতিস্মর, এ জন্মে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হয়ে এসেছেন, সে-কথা বোঝেনি।

এখন দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যত লোক মার্কিন দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছে, ট্রাম্প তাদের মধ্যেও সবচেয়ে সৎ। অমুক দেশের তমুক জিনিসটা চাই বলে সে-দেশের অপছন্দের সরকারের ভিটেমাটি চাঁটি করেছেন তো অনেক রাষ্ট্রপতিই। অনেকে আবার চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু সকলেই ভালোমানুষি বজায় রেখেছেন। ভাগ্যিস মরা মানুষ কথা বলে না। বললে চিলির সালভাদোর আলেন্দে, বুরকিনা ফাসোর থমাস সাঙ্কারা, পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগা, লিবিয়ার মুয়াম্মর গদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন— সকলেই বলতেন, তাঁদের অবস্থার জন্যে কোন মার্কিন রাষ্ট্রপতি দায়ী। ফিদেল কাস্ত্রো আর উগো শাভেজ যেহেতু মরতে মরতে বেঁচেছেন, তাই তাঁরা তো বলেই গেছেন যা বলার। কিন্তু এতকাল সে-সব কথা বামপন্থীরা ছাড়া কেউ বিশ্বাস করেনি। টিটকিরি মেরে বলেছে— এ ব্যাটারা খালি সবেতে আমেরিকাকে টেনে আনে। বড়লোকদের এরা দু-চক্ষে দেখতে পারে না, ওই দেশটা বড়লোক। তাই এদের এত রাগ। ‘নিও-ইম্পিরিয়ালিজম’ আবার কী কথা? ইম্পিরিয়ালিজম, মানে সাম্রাজ্যবাদ, তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই মিটে গেছে। আমেরিকা কী চমৎকার দেশ! আকাশে বাতাসে জলে জঙ্গলে সেখানে গণতন্ত্র। যে যা ইচ্ছে বলতে কইতে পারে। এ কি কমুনিস্ট দেশ পেয়েছ? আমেরিকানরাও বেজায় রঙে ছিলেন। গোটা দুনিয়াকে বলেছেন ‘আমাদের গণতন্ত্র অমুক, আমাদের গণতন্ত্র তমুক।’ এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুলাগ নিয়ে যত হইচই হয়েছে এবং সোভিয়েত ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার সাড়ে তিন দশক পরেও হয়, তার সিকি ভাগ আমেরিকার কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নিয়ে হয় না। জোসেফ স্তালিনের গুলাগের কথা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে, কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্টের আমলে টেক্সাসের ক্রিস্টাল সিটিতে যে লাতিন আমেরিকায় জন্মানো, জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে[4] থাকতে হয়েছিল তা কজন জানে? আলেকজান্দর সলঝেনিৎসিন গুলাগ নিয়ে লিখেছেন বলে সোভিয়েত ইউনিয়নে টিকতে পারেননি জানে সবাই। কিন্তু এডওয়ার্ড স্নোডেন কেন গণতন্ত্রের স্বর্গরাজ্য আমেরিকায় থাকতে পারলেন না?

এসব প্রশ্ন করলেই বারাক ওবামার আমল পর্যন্তও সবাই পাগল বা সিপিএম বলে ঠাউরেছে। ডন এসে বুক ফুলিয়ে দেখিয়ে দিলেন— আমেরিকা সত্যিই সেই দেশ, লিবার্টি যেখানে স্ট্যাচু। চুলোয় যাক কংগ্রেস (রাহুল গান্ধির নয়, আমেরিকার আইনসভার কথা হচ্ছে)। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সংসদকে পাশ কাটিয়ে অর্ডিন্যান্স এনে যা ইচ্ছে করার আদলে ডনও একের পর এক এক্সিকিউটিভ অর্ডার পাশ করে যা প্রাণে চায় করে যাচ্ছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তো বলেই দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন-টাইন মানি না। আমার বিবেক ছাড়া আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না। দেশের ভিতরেও মার্কিন গণতন্ত্রের কঙ্কালসার চেহারা দেখিয়ে দিয়েছেন। অ্যাদ্দিন ধনকুবেররা দেশটাকে চালাত পিছন থেকে; ডন মাস্কের হাতে আস্ত আস্ত সরকারি দপ্তরই ছেড়ে দিয়েছিলেন। সারা পৃথিবীকে বিলগ্নিকরণ, সরকারের আকার ছোট করা, সরকারি চাকুরে কমানোর জ্ঞান দিয়ে বেড়াত আমেরিকা। ডন এসে আমেরিকারই সরকারি দপ্তর লোপাট করে দিয়েছেন, হাজার হাজার চাকুরেকে বলেছেন— এবার আসুন। এবার ভেনেজুয়েলায় হানা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, বিদেশনীতির ব্যাপারেও ঘোমটার নিচে খ্যামটা নাচার লোক উনি নন। লীলা যা করবেন, সব খুল্লমখুল্লা। উফ! কী সৎ!

আবার দেখুন, মনটা কিন্তু হিটলারের চেয়েও বড়। একাই সব দেশকে গিলে নিতে চাইছেন না। স্যাঙাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হাতে গাজাকে ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা বানানোর বরাত তো কবেই ছেড়ে দিয়েছেন, এখন ভাবগতিক দেখে বোধ হচ্ছে ইজরায়েল ইরানও আক্রমণ করতে চলেছে। এদিকে ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন নিয়ে আর বিরক্ত করছেন না, উপরন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন— শি জিনপিং তো মনে করেন তাইওয়ান হল চিনের অংশ। তা ওটা নিয়ে উনি কী করতে চান সে উনি বুঝবেন। আমি অবশ্য বলেছি, তেমন কিছু করলে আমি খুশি হব না।

সোজা লোককে কারও পছন্দ হয় না, বুঝলেন? তাই ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ দেখলাম বেজায় চটে গেছেন। বলেছেন, ভাবুন কী দিনকাল পড়ল! জোর যার মুলুক তার ভাবনা আবার ফিরে আসছে দুনিয়ায়। আমাদের ভাবতে হচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড না আক্রান্ত হয়। কানাডা না আমেরিকার ৫১তম রাজ্য হয়ে যায়। তাইওয়ানেরও শিগগির বিপদ হতে পারে। এভাবে আর চলবে না। আমাদের নতুন পার্টনারশিপের কথা ভাবতে হবে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে কিনা তার এক নম্বর সদস্যই গুরুত্ব দিচ্ছে না![5]

জার্মানির রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ারের, এই বুড়ো বয়সে, আমেরিকা দেশটার মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে বুকটা ভেঙে গেছে। তিনি বলেছেন, আমেরিকা দুনিয়াটাকে এমন চোরেদের আস্তানায় পরিণত করছে যেখানে যার যা চাই সে সেটা কেড়ে নেবে। গোটা গোটা দেশকে এরা নিজেদের সম্পত্তি বলে ভাবছে![6]

এঁদের বক্তৃতা শোনার সময়ে একটু আবহসঙ্গীত চালিয়ে নিলে দেখবেন হেব্বি লাগবে। সাউন্ডট্র্যাকটা হতে হবে গাজার শিশুদের আর্তনাদ। অবশ্য হার্ড মেটাল না কী যেন বলে? সেরকম মিউজিকের ভক্ত হলে বোম ফেলার শব্দও চালাতে পারেন।

যা-ই হোক, এসব ভণ্ডামি কিন্তু আমাদের ডনের মধ্যে পাবেন না। উনি খুব ধারাবাহিক লোক। গাজার কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; গ্রিনল্যান্ডের কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; ভেনেজুয়েলার কী হবে সেটা উনি ঠিক করবেন; মেক্সিকো, কিউবা, কলম্বিয়া, কানাডার কী হবে সেটাও উনি ঠিক করবেন। বলেই দিয়েছেন— এটা আমার হেমিস্ফিয়ার। আহা! ভাগ্যিস ডন আছেন! তাই কাউকে আর ‘নিও-ইম্পিরিয়ালিজম’ বোঝানোর দরকার রইল না। ইনি একেবারে পুরনো সাম্রাজ্যবাদের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। যেমন ছিল আর কি— মোটের উপর এশিয়া আর উত্তর আমেরিকা ইংরেজদের, আফ্রিকাটা ফরাসিদের আর দক্ষিণ আমেরিকা স্প্যানিশ, পর্তুগিজদের। এবারে নাহয় একটু অন্যরকম হবে। ডন, নেতানিয়াহু, পুতিন আর জিনপিং নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবেন।

আমার একটাই দুঃখ। ভেবেছিলাম আমার দেশ বিশ্বগুরু হয়েছে, হিন্দি আর সংস্কৃত শিখবে দুনিয়ার সবাই। আমাকে শিখতে হলেও নয় শিখে নেব। বাংলার সঙ্গে মিল আছে যখন, বিশেষ বেগ পেতে হবে না। সেটি হচ্ছে না দেখে ভাবলাম, ডন যখন আমাদের মোদিজির বন্ধু, তখন ডনের ভাগেই আমরা পড়ব। ইংরেজি তো জানাই আছে, চিন্তা নেই। এখন ভয় হচ্ছে, ধেড়ে বয়সে আবার ৫০০ শতাংশ শুল্কের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে মান্দারিন না শিখতে হয়।

 


[1] Hale, Erin. Trump threatens Colombia’s Petro, says Cuba looks ‘ready to fall’. Al Jazeera. Jan 5, 2026.
[2] Spencer Hakimian. Status 2009457779627708484?s=20. x.com. Jan 9, 2026. 8:20 am.
[3] Sanger, David E. et al. Trump Lays Out a Vision of Power Restrained Only by ‘My Own Morality’. The New York Times. Jan 8, 2026.
[4] Minidoka: An American Concentration Camp. National Park Service.
[5] Astraia. Status 2009332071513096307?s=20. x.com. Jan 9, 2026. 12:01 am.
[6] Arnaud Bertrand. Status 2009511919741489252?s=20. x.com. Jan 9, 2026. 11:55 am.


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5265 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...