অনিন্দ্য হাজরা
ভেনেজুয়েলার উপর এই নজিরবিহীন আগ্রাসনের অনুমোদন আন্তর্জাতিক আইন দিয়েছে কিনা, বা মাদুরোর পাশে তামাম বিশ্ব এসে দাঁড়াল কিনা, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমেরিকার কি কোনও নৈতিক অধিকার রয়েছে, লাতিন-বিশ্বের কোনও দেশের বিরুদ্ধে ড্রাগ পাচারের অভিযোগ আনার?
গোটা বিশ্ব ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছে, ২০২৬-এর ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিজেদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেনাবাহিনী। ট্রাম্প টিভির পর্দায় এসে, সেই অভিযান যে কতটা একপেশে ছিল, সেটা যতই বোঝানোর চেষ্টা করুন না কেন, টেলিসুরের মতো লাতিন আমেরিকার সংবাদমাধ্যম-সহ বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, যে আমেরিকাকে আটকাতে সাধ্যমতো চেষ্টাই করেছিলেন মাদুরোর দেহরক্ষীরা। আমেরিকারও যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এই অভিযানে।
মাদুরোকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্ক শহরে নিয়ে এসে, কার্যত তামাশার বিচারপ্রক্রিয়ার মুখে দাঁড় করানোর পিছনে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় যুক্তি হল, মাদুরোর নির্দেশে নাকি ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী সরাসরি আমেরিকায় ড্রাগ পাচারে নেমেছে। কলম্বিয়া কিংবা মেক্সিকোর মতো দেশগুলির ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, প্রশাসনের একাংশের সহায়তায় লাতিন আমেরিকা থেকে আমেরিকার বাজারে ড্রাগ পাচার হয়। মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নাকি আমেরিকায় ড্রাগ পাচার করা হয় কারাকাস থেকে। এবং পেশাদার অপরাধীরা নয়, সেই অপারেশনে সামিল হয়ে পাচার অভিযানের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সামলায় ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী।
ভেনেজুয়েলার উপর এই নজিরবিহীন আগ্রাসনের অনুমোদন আন্তর্জাতিক আইন দিয়েছে কিনা, বা মাদুরোর পাশে তামাম বিশ্ব এসে দাঁড়াল কিনা, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমেরিকার কি কোনও নৈতিক অধিকার রয়েছে, লাতিন-বিশ্বের কোনও দেশের বিরুদ্ধে ড্রাগ পাচারের অভিযোগ আনার?
পাঠককে খুব বিশেষ খাটতে হবে না। হটস্টার অ্যাপে গেলেই কিল দ্য মেসেঞ্জার বলে ২ ঘণ্টার একটি সিনেমা রয়েছে। পুলিৎজার জয়ী সাংবাদিক গ্যারি ওয়েবের লেখা বই, দ্য ডার্ক অ্যালায়েন্স-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিনেমায় স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে, ৮০-র দশকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের সময়, আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ কীভাবে নিজেদের দেশে ড্রাগ বিক্রির চক্র চালাত, এবং সেই ড্রাগব্যবসার টাকায় অস্ত্র কিনে নিকারাগুয়ার কুখ্যাত কন্ট্রা বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দেওয়া হত গণহারে সান্দিনিস্তা ন্যাশনাল লিবারশন ফ্রন্টের কর্মী, কমিউনিস্ট এবং বামপন্থীদের খুন করার জন্য।
১৯৮০-র দশকে আমেরিকার কংগ্রেসে বল্যান্ড অ্যামেন্ডমেন্ট পাশ হয়। তার ফলে সরাসরি কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সাহায্য করার পথ বন্ধ হয় রোনাল্ড রেগানের। ঘুরপথে তাই দেশে কোকেন, হেরোইনের মতো ড্রাগের বন্যা বইয়ে দিয়ে, সেই টাকায় বামপন্থী হত্যায় মদত জোগানোর ইতিহাস রয়েছে হোয়াইট হাউসের।
প্রাথমিকভাবে গ্যারি ওয়েবের প্রতিবেদনকে ভুয়ো বলে চালানো হলেও, আমেরিকা সরকারের কেরি কমিটির রিপোর্ট এই অভিযোগের সত্যতা মেনে নেয়।

মজার বিষয়, রেগান প্রশাসনের অনেকের সাফাই ছিল, ড্রাগ-সমস্যার ফলে শ্বেতাঙ্গদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। কারণ ড্রাগের মূল ক্রেতা, মূলত গরিব আফ্রিকান আমেরিকান এবং মেক্সিকান অভিবাসীরা। তাই এই কূটকৌশলে কোনও ভুল নেই।
বর্তমানে সেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি দেশে ড্রাগসমস্যা মোকাবিলার নামে স্বাধীন, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের প্রধানকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছেন।
যদিও আমেরিকার এই দ্বিচারিতা এখানেই শেষ নয়।
হন্ডুরাসের প্রাক্তন দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট হুয়ান ওরলান্দো হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে আমেরিকার একের পর এক আদালতে। গ্রেপ্তার হওয়া ড্রাগমাফিয়াদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ড্রাগ চোরাচালানের টাকাতেই ২০১৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন হার্নান্দেজ। মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেলের নেতা জোয়াকিন এল চ্যাপো গুজম্যানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ মেলে। ২০২২ সালের এপ্রিল তিনি আমেরিকায় এসে আত্মসমর্পণ করেন, এবং নিউ ইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্টের আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালতে প্রমাণিত হয়, টাকার বিনিময়ে তিনি হন্ডুরাস হয়ে আমেরিকাগামী ড্রাগের যাতায়াত আটকানোর ক্ষেত্রে কোনও ব্যবস্থা নেননি, এবং মাদক কারবারিদেরও আইনের আওতায় আনেননি।
২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি নিউ ইয়র্কে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাঁকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
মজার বিষয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হার্নান্দেজকে মুক্তির নির্দেশ দেন, এবং হন্ডুরাসের নির্বাচনে হার্নান্দেজের দক্ষিণপন্থী দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী নাসরি অসফুরাকেও সমর্থন জানান। এই আসফুরা হন্ডুরাসের বামপন্থী রাষ্ট্রপতি জিওমারা কাস্ত্রোকে হারিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়। হার্নান্দেজের মতো দোষী অপরাধীকে মুক্ত করে ট্রাম্প দাবি করেন, বামপন্থী বাইডেন প্রশাসন ভুয়ো মামলায় তাঁকে ফাঁসিয়েছিল।
বর্তমানে, এই ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে অপহরণ করে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাস্যকর দাবি করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলি শুনলেই বোঝা যায়, মাদুরোর অপহরণের সঙ্গে ড্রাগ-বিরোধী লড়াইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েও নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের স্টিম রোলার চালানো শুরু করেছে ওয়াশিংটন, এবং সেই যন্ত্রের প্রথম বলি হলেন মাদুরো।
আমেরিকার রাষ্ট্রপতি খোলাখুলি বলে চলেছেন, ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফেয়ার বা পশ্চিম গোলার্ধ নাকি আমেরিকার ব্যক্তিগত বিচরণভূমি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকাও এই গোলার্ধের অংশ। ট্রাম্পের নয়া সাম্রাজ্যবাদী দাবি অনুযায়ী, এই অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোনও প্রতিস্পর্ধী রাষ্ট্রীয় স্বার্থ থাকতে পারে না। তাই নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করার নামে এই অঞ্চলের কোনও দেশ যদি আমেরিকা-বিরোধী কিছু করে, তাহলে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের অবস্থা নিকোলাস মাদুরোর মতো হবে।
ইতিমধ্যেই তিনি সরাসরি কলম্বিয়া এবং কিউবাকে সরকারিভাবে হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর শাসন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা, বাইকবাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ রাখার মতো বহু অভিযোগ রয়েছে হুগো চাভেজের উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো প্রশাসনের বিরুদ্ধে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক তেলের ভাণ্ডার-সমৃদ্ধ দেশ হলেও, সেই প্রাচুর্যের ভাগ দেশের সমস্ত অংশের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গাফিলতি ও দুর্বলতা রয়েছে মাদুরো প্রশাসনের। যদিও সেক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার উপর চাপিয়ে দেওয়া ১ হাজারের বেশি আমেরিকান নিষেধাজ্ঞারও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও, আমেরিকার রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করেই ভেনেজুয়েলার খনিজ তেলের শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে জাতীয়করণ করে, আমেরিকার কোম্পানিগুলোর বল্গাহীন মুনাফার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভেনেজুয়েলা।
সস্ত্রীক মাদুরোকে শয়নকক্ষ থেকে তুলে এনে সেই প্রতিস্পর্ধাকেই যেন ব্যঙ্গ করলেন ট্রাম্প।
যদিও মাদুরোর গ্রেপ্তারির ফলে এখনও অবধি ভেনেজুয়েলার প্রশাসন ভেঙে পড়েনি। রাজধানী শহর কারাকাস-সহ গোটা দেশে বিপুল জমায়েত হয়েছে। সেখানে যেমন মাদুরোপন্থী সশস্ত্র বাইকবাহিনীর দেখা মিলেছে, তেমনই সাধারণ জনতারও ঢল নেমেছে নিজেদের প্রেসিডেন্টকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে। দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাস্তায় দাঁড়িয়ে, সামরিক পোশাকে, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার শেষ দেখে ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছিল, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হয়তো ক্ষমতায় বসে যাবেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। কিন্তু জনমতের চাপে প্রকাশ্য-আমেরিকাপন্থী এই নেত্রীকে পিছু হটতে হয়েছে।
মাদুরোর সমর্থনে লাতিন-বিশ্ব থেকে দৃঢ় আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে। বলিভিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তথা আদিবাসী নেতা ইভো মোরালেস থেকে শুরু করে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেত্রো মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখেছেন। প্রাক্তন বামপন্থী গেরিলা পেত্রো সরাসরি জানিয়েছেন, আমেরিকা যদি মনে করে কলম্বিয়ারও স্বাধীনতা খর্ব করবে, তাহলে আরও একবার হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবব না।

কিউবা থেকেও পাশে থাকার বার্তা এসেছে। ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে মাদুরোকে অপহরণের জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি নির্বোধ বলে আক্রমণ করেছেন কমলা হ্যারিস। ডেমোক্র্যাট নেত্রীর দাবি, ট্রাম্পের এই কীর্তির ফলে বিশ্বের মঞ্চে আমেরিকার অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে চোখ বোলালেই দেখা যাবে, ক্রমেই আর্থিকভাবে দুর্বল হচ্ছে আমেরিকা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে যে একমুখী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই ব্যবস্থা ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। চিন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলের মতো একের পর এক দেশ বিশ্বমঞ্চে উঠে আসছে। ইউরোপের প্রাক্তন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি ইতিমধ্যেই সঙ্কোচনের মধ্যে দিয়ে চলেছে। এই আবহে, বয়সের ভারে ক্রমেই ন্যুব্জ হয়ে পড়া মস্তানের মতো শেষ একবার ‘এলাকা কাঁপানোর’ চেষ্টা করছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সারা বিশ্ব জুড়ে এই মুহূর্তে বয়ে চলা উগ্র দক্ষিণপন্থী গা-জোয়ারির রাজনীতি এই মনোভাবকে জল-হাওয়া জোগাচ্ছে।
এই অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ত প্রবৃত্তিকে রুখতে পারে একমাত্র সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ-বিরোধী সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ। যে আওয়াজ ইজরায়েলের সেনাবাহিনীকে বাধ্য করেছে গাজায় নিজেদের ঘোষিত ‘অপারেশনাল অবজেকটিভ’ পূরণের অনেক আগেই থেমে যেতে।
*মতামত ব্যক্তিগত

