অত্রি ভট্টাচার্যের মুখপুস্তক থেকে

অত্রি ভট্টাচার্য

 

সাদা একটা গন্ধ তাড়া করে আসছে আমাদের বাইক। প্রায় নব্বই শতাংশ নিশ্চিত হয়ে বলা চলে এটা আমের মুকুলের গন্ধ, অথচ আমার মনে হচ্ছে আশফল। দুপাশে মাইলের পর মাইল ঘাসহীন জমির উপর গর্ভবতী আমগাছেরা অন্ধকার করে আছে, মদন আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে ওটা ল্যাংড়া, ওটা গোলাপখাস, আর ওই বউপালানী। ফজলির গাছ হয় অপেক্ষাকৃত বড়, স্তনের ভারও বেশি। গন্ধেও বেশ ভেজাল, আজকাল ফার্টিলাইজারের মিশেল থাকে। শোনামাত্র আমার গন্ধের পর্দা বদলে গেল অপারেশন থিয়েটারের মাথায় দপদপে লাল আলোয়। মুকুলের গাঢ় সবুজ, ফ্যাকাশে ধুসর, হালকা লাল রঙের ঘনত্ব দিয়ে কী বোঝায় জানি না, শুধু বুঝতে পারছি ওরা একে অপরের থেকে হামেহাল আলাদা। বৈশাখের শুরুতে কয়েকবার ঝড় হবে, অবাঞ্ছিত সন্তানদের খসিয়ে ফেলবে গাছ। তার আগেই ঠিকেদারেরা কবরের মতো চওড়া ও গভীর গর্ত খোড়া শুরু করে দিয়েছে। আমবাগানের টেন্ডার হয় তিনবার। প্রথমে মুকুল এলে, তারপর আম এলে এবং সব শেষে, আম আসবার পরে। গাছ এসব টের পায় না। ফলে ফলে উজাড় হয়ে থাকে শরীর, দাম্পত্যকলহ নেই, রান্নাবান্নার ঝক্কিঝামেলা নেই। দিনের শেষে একদলা থুতুও পরের দিনের জন্য পড়ে থাকে না। বাগানের মোহে বিকিয়ে যায় মানুষ, সোনাদানা, ঘরবাড়ি, এমনকি জাতধর্ম। মালদায় আমের মরশুম আসে হু হু করে টাকা ওড়াতে ওড়াতে। ব্যাঙ্কের পর ব্যাঙ্ক খালি হয়ে যায়। লেবারদের লাইন পড়ে প্রতি শুক্রবারে, হাটবারে। তার আগেআগেই এবারে নোটবন্দীর কোপ পড়ল আমের বোঁটায়।

এই চাঁদের বুড়ির দেশ রাতারাতি শেরশাহ থেকে ক্যাশলেস ক’রে তোলবার মরিয়া ফিকির এক বা একাধিক চোরা অর্থনীতির ড্রেনের মুখ খুলে দিয়েছে। কান পাতলেই বাতাসে শোনা যাচ্ছে তার ফিস ফিস। আজান থেকে ফেরার সময় ঘামে ভিজে যাচ্ছে বৃদ্ধের দাড়ি; সদ্যোজাত কোলে নিয়ে চোখের উপর হাত রাখছে পথিক পথিকানী। ব্যাঙ্ক নয়, বাজার নয়, অন্য কোনও-র পথ চেয়ে। টাকা বিক্রি হচ্ছে, কোষ থেকে বাইপাস হচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া। বিকেন্দ্রীকরণের রাস্তায় ছোট ছোট ক্লাস্টার, মানুষ ও তার সামর্থ্য নিয়ে সে ভিড়ের মধ্যে দলছুট। সারাদিন কাজ করতে করতে আমারও তো চোখ পড়ে উদ্‌ভ্রান্তর দিকে, সে নাম বদলে সর্বস্বান্ত হয়েছে আজ থেকে। গা থেকে কোকুন খসেনি, অথচ পৃথিবীর টেম্পারেচার এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছে কয়েক ডিগ্রি। এ পোড়া দেশে প্রজাপতি আসার সম্ভাবনা নেই। আমরা জাল পেতে ক্ষমাভিক্ষা করতে বসেছি, তাও মাইনের বিনিময়ে। সারাদিন দেশটা জেগে থাকছে, গভীর রাতে ট্রাকের ছাতে উড়তে উড়তে এ পুরু অন্ধকার আরও রহস্যময় মনে হয়। যে কোন নদীই অমাবস্যায় আলোকপ্রসবা। ব্রীজ তো নদীরই সন্তান, তার সঙ্গে আলো অন্ধকারের এইটুকু খুনসুটি থাকবে না? যেন, সকালের গোপন খুপরিতে শলা করা ছেলেমেয়েদুটির নেগেটিভ লেপ্টে আছে ব্রীজের রেলিং-এ। নদীর নাম কালিন্দী হোক, মহানন্দা হোক। তার বুক উপচে আসা মৃদু ট্র্যাফিক হোক, সে গিয়েছে তো বহুদূরে। মানুষের হঠকারিতায় নেমে আসা মানুষের চোখের জল বইতে বইতে, নুড়ি বোল্ডার মৃতদেহ ক্ষইয়ে ক্ষইয়ে শ্যাওলা পুঁততে পুঁততে আরেকটা নামের সঙ্গমে মিশে গিয়েছে।

এ কয়টি মাস পেরিয়ে আসার পরেও কিছু সম্ভাবনা ও বাদবাকি অবভিয়াস থেকে যায়। জিডিপির হিসেব হয় বোকা মানুষকে আরও বোকা বানিয়ে। সেসব কাগজে ছাপে, কাগজ কবে ওয়েব হয়ে গেল পাপী সাক্ষরতা জানতেও পারে না। কে কার বুকে কখন ডুব দিচ্ছে তার হিসেব জিডিপির থেকেও ঢের বেশি কঠিন। তার পেনসিল আসলে বেহালার ছড়। বেহালার আকার দেখলেই মনে হয় দুঃখ নামের ফ্লুইডে টইটম্বুর। প্রৌঢ় বাদক কাঁধে নিয়ে দুঃখেরই লেভেল মাপছেন, তারপর ছড় বুলিয়ে প্রলেপ দিচ্ছেন তাতে। সামনে মাঠ। যাত্রা দেখবার নির্ঘুম চোখ নিয়ে গোটা পঞ্চাশ শাড়ি চুড়ি ধুতি পিরান বসে রয়েছে। এরাই প্রদীপে গরম তেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে মানুষের শান্তির উপরে ঢেলে দেবে। আগুন তো ছুতো!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...