মুসাফির এ মন

নীলাঞ্জন হাজরা

 

পূর্ব প্রকাশিতে পর

অ্যারিস্টটলের দেশে অক্টোপাস

‘I shall be very happy to hospitalize you!’ ঠিক এই বাক্যটিই আমায় লিখে পাঠিয়েছিলেন ই-মেলে কমরেড সোফ্রোনিস পাপাদোপুলোস৷ ২০০৫-এর কথা বলছি৷ তখন তাঁর বয়স ৭০ পার করে গিয়েছে৷ আমার অবিশ্যি বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি যে, উনি বোঝাতে চাইছেন ‘তোমায় আমার বাড়িতে হসপিটালিটি দিতে আমি খুশি হব৷’ আশ্চর্য সে মানুষটির কথা হয়তো অন্য কোনও দিন বলব৷ শুধু এইটুকু— যে কদিন ছিলাম ওঁর শহরে, পান থেকে চুনটি যাতে না খসে তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন৷ ছিলাম ওঁর বাড়িতেই৷ এথেন্স৷ প্লেন থেকে মাটিতে পা দিয়েই শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল৷ আক্রোপোলিস, পার্সেনোদাস (পার্থেনন), পৃথিবীর প্রাচীনতম রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার (যেখানে বসতে পারতেন ৫০০০ দর্শক) ইরদ্স্ওআতিক (হেরোডেস অ্যাটিকাস)-এর ওদিয়োন, সুপ্রাচীন মোনাস্তিরাকি বাজারাঞ্চল, প্লাতো-র আকাদেমিয়া, আরিস্তোতেলিস-এর লিকিয়ন৷ পশ্চিমি সভ্যতার বীজতলা— আথেনা!

এথিনা দেবীর মন্দির

পার্থেনন

মোনাস্তিরাকি

আর এইখানেই আমি প্রথম অ্যাকুয়ারিমের বাইরে দেখেছিলাম অক্টোপাস৷ এক্কেবারে আমার থালায়৷ কিন্তু সে তো কদিন পরে৷ সে আস্বাদনের আগে আস্বাদন করে ছিলাম গ্রিক আতিথেয়তা৷ মনে করে দেখুন, ২০০৫— গ্রিস তখন উত্তাল৷ অর্থনীতির হাঁড়ির হাল৷ সরকারের নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে৷ কীভাবে ঠিক করা হবে এই পরিস্থিতি, তা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বেধেছে ঘামাসান লড়াই৷ সরকার বলছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ান থেকে ধার করতেই হবে৷ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ান বলছে ধার দেব, কিন্তু দান-খয়রাতি করতে নয়৷ আগে তোমাদের সরকারি খরচ কমাও৷ সহজ ভাষায় নাগরিকরা সরকারের কাছ থেকে যে সব সুযোগ সুবিধে পায় সেগুলো কমাও, ভরতুকি কমাও, কর্মী ছাঁটাই করো৷ আর বামপন্থীরা, যাঁদের মধ্যে আমার যাঁর বাড়িতে থাকার কথা সেই কমরেড সোফ্রানিস পাপাদোপুলোসও আছেন, তাঁদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের সুযোগ সুবিধা নয়, বড় বড় কম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা পায় সে সব কমাও৷ কম্পানিগুলো বলছে, আমাদের গলা টিপে ধরলে আমরা আর কর্মীদের মাইনে দেব কী? তাতে তো বেকারি আরও বেড়ে যাবে৷ মোট কথা, সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার৷ গ্রিকরা যে যোদ্ধা জাত, সে তো খোদ আলেকজান্দারের সময় থেকেই আমরা ভারতীয়রাও হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলুম৷ সে রক্ত যাবে কোথায়? হুঙ্কার পেড়ে দুপক্ষই রাস্তায়৷ মারামারি, ট্রামে-বাসে আগুন৷ ধুন্ধুমার কাণ্ড৷ তার মধ্যে তুরস্ক থেকে হাজির হওয়ার কথা আমার৷

কথা ছিল ইস্তানবুল থেকে ট্রেনে চেপে যাব গ্রিসের সীমান্ত শহর থেসালোনিকি৷ সেখানে দু-এক দিন কাটিয়ে ফের ট্রেনে চেপে চলে যাব এথেন্স৷ আমি আর আমার ইস্তানবুলের বন্ধু হাকান গুলস্বেন টিকিট কাটতে গিয়ে শুনি গ্রিসের রেলকর্মীরা ধর্মঘট শুরু করেছেন, কবে শেষ হবে কোনও ঠিক নেই৷ কাজেই ট্রেন বন্ধ৷ এখানে টুক করে বলে রাখা ভালো যে, পশ্চিমবাংলাতেই শুধু আমরা এতকাল কাক-চিল না ওড়া ধর্মঘট দেখেছি তা কিন্তু আসলে নয়৷ ইউরোপে খুব হরতাল হয়৷ বিশেষ করে ফ্রান্সে আর গ্রিসে৷ লন্ডনেও হত এক সময়৷ আমি ট্যাক্সি ধর্মঘটের সময় লন্ডনে পৌঁছে মহা ঝামেলায় পড়েছিলাম।

তো যাই হোক, এখন উপায়? থেসালোনিকি দিয়ে তো ঢোকা যাবে না, তা হলে? সোফ্রানিস জানালেন কুছ পরোয়া নেহি, তুমি ইস্তানবুল থেকে ফ্লাইটে এথেন্স চলে এসো৷ বাকি দায়িত্ব আমার৷ গেলুম৷ পৌঁছেই দেখি এয়ারপোর্টে বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন৷ রোগা, লম্বা, খাড়া নাক, টাক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মুখে একটা শিশুর মতো হাসি৷ প্রথমেই কেড়ে নিলেন আমার ভারী স্যুটকেসটা৷ এ কাণ্ড করতে আমি আর একবার আর একজনকেই দেখেছিলাম৷ অনেক পরে৷ ইরানের তেহরান এয়ারপোর্টে৷ আমার ইরানি বন্ধু সৈয়দ বোরেরিকে৷ কিন্তু সে গপ্পো পরে৷ সোফ্রানিস বৃদ্ধ মানুষ, আমি তো হৈ হৈ করে উঠি৷ কিন্তু কে কার কথা শোনে৷ টানতে টানতে সোজা নিজের গাড়িতে৷ তারপর নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিজের বাড়িতে৷ ঘণ্টা খানেক লেগেছিল৷

সোফ্রানিসের বাড়ি

দেখতে দেখতে চলেছি৷ এথেন্স অত্যাধুনিক শহর৷ ঝাঁ চকচকে রাস্তা ঘাট৷ পেল্লায় পেল্লায় কাচে মোড়া স্কাই স্ক্র্যাপার৷ শপিং মল৷ আমি যে একটা পুরো পুরনো ভাব আশা করেছিলাম তেমনটা একেবারেই নয়৷ আর যেটা আশা করিনি, এথেন্স দেখলাম রীতিমতো পাহাড়ি অঞ্চল৷ পাহাড় ঠিক নয়, বলা যায় টিলা৷ অনেকটা আমাদের পশ্চিম বাঁকুড়া বা ঝাড়খণ্ডের মতো৷ এর মধ্যে সব থেকে উঁচু পাহাড়টির নাম লাইকাবেত্তাস৷ আর মূল শহর থেকে আধঘণ্টা খানেক গেলেই সারোনিক খাঁড়ি৷ যে খাঁড়ি ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে৷ ম্যাপ দেখলে বোঝা যাবে আসলে গ্রিসের তিন দিকেই সমুদ্র৷ আর তাই জন্যই জাত খাদ্যরসিক বা গুরমে-দের কাছে গ্রিকরা যে খানা খান সে গোত্রীয় খানা হল ‘ভূমধ্যসাগরীয় খানা’, মানে ‘মেডিটেরানিয়ান কুজিন’৷

যে অঞ্চলের খানাদানার সঙ্গে ‘সাগর’ যুক্ত তার সিংহভাগই যে হবে সামুদ্রিক প্রাণী তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? আর তাই জন্যই বাঙালিদের মতোই গ্রিকরা জাত মেছুড়ে৷ না একটু ভুল হল৷ বাঙালিদের মতো নয়, বরং বলা ভালো মালাবার উপকূলের মানুষদের মতো৷ কারণ, গ্রিকরা যে মাছ খায় তা মিঠে জলের নয় সমুদ্রের৷ তবে সমুদ্রের মাছই শুধু নয়, সামুদ্রিক যা কিছু খেলে মানুষ মরে-টরে যাবে না, আমার তো মনে হয়েছিল সবই তারা খায়৷ আর তার মধ্যে সব থেকে বেশি খায় একই গোত্রীয় দু’টি প্রাণী— অক্টোপাস আর স্কুইড৷ হায়তাকুলি আর কালামারি৷

কিন্তু হায়তাকুলি বা কালামারির আগেই অন্যান্য গ্রিক খাবারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল৷ সোফ্রানিসের বাড়ি পৌঁছনোর পর তিনি আমায় তাঁর এক তরুণ কমরেডের জিম্মায় করে দিলেন৷ পাওলিন৷ ভারী মিষ্টি ছেলে৷ পাওলিন বলল, চলো আজ তোমায় আধুনিক এথেন্স ঘুরিয়ে দেখাই কাল যাওয়া যাবে প্রাচীন পাড়ায়৷ সত্যি বলতে কী সারা দিন ঘুরেও আধুনিক এথেন্সে এমন কিছুই দেখিনি যাকে বলা যেতে পারে চোখে পড়ার মতো৷ দুটি জিনিস ছাড়া৷ এত ছোটখাটো পোশাকে বিশ্বের আর অন্য কোনও শহরে মেয়েদের দেখেছি বলে মনে পড়েনি৷ এবং তাঁদের উগ্র সাজগোজ৷ কিন্তু ওখানে দেখলাম ব্যাপারটা সকলে খুব সহজেই নেয়৷ মেট্রোয় যেতে যেতে এমনই একটি অতি স্বল্পবাস মহিলাকে দেখে ইচ্ছে করেই আশপাশের পুরুষদের লক্ষ করছিলাম৷ আমাদের এখানে ছোটখাটো পোশাকে মেয়েরা ট্রামে-বাসে চড়লে পুরুষদের চোখে যে একটা শিস্-দিয়ে-উঠি ভাব দেখি, তেমনটা একেবারেই দেখলাম না৷ ব্যাপারটা যে কেউ খেয়াল করছেন, তা মনেই হল না৷

আর চিরকাল মনে থাকবে গ্রিসের প্রেসিডেন্ট-এর প্রাসাদের সামনে গার্ড বা প্রহরী পরিবর্তন হওয়ার দৃশ্য৷ এমন হাস্যকর দৃশ্য আমি খুব কমই দেখেছি৷ পাওলিন আমায় টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল সে দৃশ্য দেখাতে৷ সাদা ঘাগরা, লাল-কালো পাগড়ি, কালো পমপম দেওয়া খয়েরি জুতো আর লম্বা লম্বা সাদা মোজা পরে পাঁচ প্রহরী যে কাণ্ডটা প্রতি রবিবার সকাল ১১টার সময় করে সেটা দেখতে দেখতে আমার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল৷ সোজা সুকুমার রায় থেকে উঠে এসেছে৷

আর এ দৃশ্য দেখে ফুরফুরে মন নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ঘণ্টা দুয়েক পরে হাজির হয়েছিলাম এথেন্স-এর প্রতীক আক্রোপোলিস-এর পাহাড়ের নীচের পাড়ায়, যার নাম— প্লাকা৷ শহরের রেস্তোরাঁ পাড়া৷ আর সেখানেই প্রথম পরিচয় খাস ভূমধ্যসাগরীয় সেই বিখ্যাত খাবারের সঙ্গে, যার নাম মুসাকা৷ আর তখনই জানতে পারলাম বেগুন আর টক দই বলতে গ্রিকরা অজ্ঞান৷

 

গ্রিক খানা আর সিংহের দুধ!

গ্রিকদের বেগুন প্রীতি আমাকে সত্যিই অবাক করেছিল৷ অল্প-বিস্তর দুনিয়ার যে সব দেশে ঘুরেছি, ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া আর কোথাও এ সবজিটির প্রতি এমন পক্ষপাতিত্ব দেখিনি৷ এথেন্সে যাঁর বাড়িতে উঠেছিলুম, সেই সোফ্রোনিস পাপাদোপুলোস সন্ধেবেলা প্রস্তাব করলেন— ‘চলো তোমাকে একটি প্রচীন রেস্তোরাঁয় খাস গ্রিক খানা আর খাস গ্রিক মদ্য খাওয়াব৷’ প্রস্তাবের দ্বিতীয় অংশটি শুনে বিশেষ করে মনটা নেচে উঠল৷ জীবনে যেখানে যেখানে গিয়েছি সেখানে সেখানেই স্থানীয় মদ চেখে দেখাটা আমার প্রায় একটা নেশা বলা যায়৷ এ নেশাটা ঠিক কবে প্রথম চেগেছিল আজ সঠিক মনে করা মুশকিল, কিন্তু তার শুরু যে আমাদের খোদ বাঁকুড়ায় অরণ্য পরিবৃত সাঁতাল গ্রামে মহুয়ার মদ, মৌল দিয়ে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ ফ্রেশ মৌলের মজাই আলাদা৷ একটা কড়া গন্ধ আছে বটে, তবে মৃদু লিমকা সহযোগে পান করলে নাকে লাগে না৷

এমনকী পাকা মহুয়াও টপাটপ খেতে দিব্যি লাগে৷ বেশ কিছুকাল আগে, আমার তদানীন্তন আমেরিকান বস্ ডাগ কেলিকে সঙ্গে নিয়ে সুদূর রাঁচির পাশে গভীর জঙ্গল পরিবৃত আদিবাসীদের এক গ্রামে গিয়েছিলাম৷ সে অভিজ্ঞতা ভোলার নয়৷ ছোট্ট গ্রাম৷ মনে হয় খান কুড়ির বেশি বাড়ি নেই৷ কালো আর মাটির গভীর রঙে তকতকে করে নিকোনও বাড়ি৷ কাছে একটা ঝর্না ছিল সেটা দেখতেই হাজির হয়েছিলাম৷ পুরো রাস্তা গাড়ি যাবে না৷ রাস্তা নাকি ভালো নয়৷ আমার মনে হল, ড্রাইভারটি খারাপ রাস্তার থেকে মাওবাদীদের ভয়ে বেশি অস্থির৷ কুছ পরোয়া নেহি৷ হেঁটেই রওনা দিলুম৷ আধ ঘণ্টাটাক পথ৷ তারপর গ্রাম৷ ঢোকার আগেই বাতাসের ঢেউয়ে গন্ধটা নাকে এল৷ মার্চ মাস৷ ভরা বসন্ত৷ পাহাড়, জঙ্গলে আগুন লেগে গিয়েছে৷ পলাশ আর শিমূল আর চোর পলতা৷ তারই মাঝখানে মাঝসকালের রোদ্দুরে বিশাল গাছটা সোনালি হয়ে আছে৷ পাকা মহুয়া৷ গাছের তলায় সোনার গালিচা৷ বাতাসে ক্রমাগত ঝরে ঝরে পড়ছে পাকা ফল টুপটাপ-টুপটাপ৷ পড়েই চলেছে৷ কয়েকটা তুলে মুখে দিই৷ তীব্র মদির মিষ্টি৷ দরিদ্র আদিবাসীদের চাল-গম জোটে না৷ কুড়িয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি শুকিয়ে রেখে দেয়৷ সারা বছর তাই খাদ্য৷

ডাগকে উৎসাহিত করি— Try it, you will love it৷ এখন নয়, তিনি জানান, ফিরে এসে খাব৷ ঝর্না দেখে ফেরার পথে দাঁড়াই৷ গ্রামের লোকজন, বাচ্চার কৌতূহলে ভিড় জমায়৷ ববুরা এখানে কেন? কেউ তো আসে না৷ তার মধ্যে আবার একজন সাদা চামড়া৷ ডাগ মাটি থেকে কুড়িয়ে খেতে ইতস্তত করে— কিছু ফল পাড়ানো যায় না৷ দাঁড়িয়ে থাকা এক ছোকরাকে বলি৷ লোকজনের মধ্যে হাসাহাসি পড়ে যায়৷ এক আধবুড়ো ভদ্রলোক ছোকরাকে বলেন— বাবু বলছে, পেড়ে দে না৷ ছোকরা পলকে গাছের ওপরে৷ কোঁচড় ভরে পাকা মহুয়া আমাদের এনে দেয়৷ কিন্তু ততক্ষণে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে৷ কী খাবার মিলবে? একটা চায়ের দোকান৷ সামনে বাঁশ পিটে তৈরি একটা বেঞ্চ৷ গাঢ় দুধের চা৷ লেড়ো বিস্কুট৷ ডবল ডিমের অমলেট৷ রুপোর মতো ঝলমলে স্টিলের গেলাস আর থালা৷ হঠাৎ চোখে পড়ে একটা খাঁচায় অনেকগুলো তিতির পাখি৷ কী ব্যাপার? ‘ও তো আমরা পুড়িয়ে খাই,’ দোকানি জানায়৷ আমরা খেতে পারি না৷ আলবৎ পারো৷ বাবুদের উৎসাহে তারাও উৎসাহিত৷ তাই দেখে আমি আরও একটু অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে উঠি— ‘ভালো মৌল মিলবে না?’ খুব মিলবে৷ সে এক অসাধারণ লাঞ্চ৷ পাকা মহুয়া, চা, বিস্কুট, অমলেট, মৌল (জল দিয়ে অবশ্য, লিমকা-টিমকা আর সেখানে কোথায় মিলবে?) আর তিতির পোড়া— একরত্তি পাখি, এট্টুখানি মাংস, পাকা কাতলার মতো হাড়! আমার জীবনে মৌল খাওয়ার হাইলাট৷ তারপর সন্ধ্যায় দুজনেরই সে কী মাথা ব্যথা!

এ ছাড়া আমার দেশি মদ্যপানের হাইলাইটের মধ্যে রয়েছে, কিছুকাল আগে প্রয়াত বিশিষ্ট ডাক্তার, কবি এবং প্রথম সারির জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ-র সল্টলেকের বাড়িতে বসে লেবু-ফাড়া-লঙ্কা দিয়ে বাংলা পান৷ ভূমেনদা যে তরিবৎ করে বাংলা তৈরি করতেন তেমনটা আর জীবনে কখনও দেখিনি৷ আর তিনি জোর গলায় বলতেন— মদ্যপান মাত্রেই স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর৷ কিন্তু তোমরা যে সব গাল ভরা ‘অন দ্য রক্স্’ নাম দিয়ে বরফ মেরে কাঁচা হুইস্কি খাও পটাপট, এভাবে বাংলা খাওয়া তার থেকে অনেক কম বিপজ্জনক৷

এ দেশে আর খেয়েছি কাজু ফলের খোসা থেকে তৈরি ফেনি৷ আমি কখনও গোয়া যাইনি, কিন্তু বন্ধুদের উপহার দেওয়া ট্রিপল রিফাইন্ড ফেনি-র আনন্দ তুরীয়৷ খেয়েছি তালের তাড়ি৷ রাবিশ৷ গন্ধটাই আমি জাস্ট নিতে পারি না৷ একই রকম খারাপ লেগেছে নেপালিদের ছাং৷ যেন কাঁচা স্পিরিট খাচ্ছি৷ বহু কাল আগে কলেজ জীবনে ক্লাসের সবাই মিলে মধ্যপ্রদেশ গিয়েছিলাম৷ খাজুরাহতে ‘নারঙ্গি’ বলে সেখানকার একটা মদ কেনা হয়েছিল কয়েক বোতল৷ ঠিক কেমন খেতে আজ আর মনে নেই৷ তবে মনে আছে, অমিতাভ বচ্চনের অভিনয় করা নানা জওয়ান বয়সের চরিত্র ফিল্মে সাংঘাতিক রাগ আর দুঃখে যে বোতল ধরে ঢকঢক করে খেয়ে মাতলামি করত ঠিক তেমনি লম্বা লালচে-কমলা বোতল! আর দেশি মদ্যপানের সেরা অভিজ্ঞতা— তোম্বা৷ তিব্বতি মদ৷ সিকিমে, নেপালে আকছার মিলবে৷ বিরাট একটা বাঁশের জাগ৷ তাতে ভরতি ‘মিলেট’ দানা৷ কালো কালো৷ কনকনে ঠান্ডায় নেপালের পোখারা হ্রদের পাশে একটা রেস্তোরাঁয় বসে আছি৷ সামনে তোম্বার জাগ৷ তাতে ঢালা হচ্ছে অল্প অল্প গরম জল৷ একটু পরেই সেই জল হয়ে যাচ্ছে সাদা ফিকে দুধের মতো৷ এবার বাঁশের স্ট্র দিয়ে চুকচুক করে খাও৷ শরীর গরম, মন খুশ৷

–‘স্টার্টারে কী নেবে?’ সোফ্রোনিস জানতে চান৷
–‘আবার স্টার্টার-টার্টার কেন? একেবারে মেন কোর্সে চলে গেলেই তো হয়’, আমি বিনয়ের অবতার৷
–‘না-না৷ আগে একটু উজো খাবে তো৷ খালি পেটে একদম খাওয়াটা ঠিক না৷’
–‘উজো?’
–‘গ্রিসের জাতীয় মদ৷’

ঠিক তাই৷ উজো৷ সাংঘাতিক কড়া পাকের সে মদ্য৷ বড়সড় একটা থালায় স্কুয়িড এল আগে৷ অক্টোপাসের ছোট ভাই৷ খাওয়া হয় শুঁড়গুলো৷ ছোট ছোট করে কেটে৷ হাল্কা করে অলিভ অয়েলে ভাজা৷ সঙ্গে প্রচুর অলিভ দেওয়া স্যালাড৷ আর তার সঙ্গে একটা উজো-র বোতল৷ একেবারে জলের মতো৷ আর এল সরু সরু লম্বা লম্বা গ্লাস৷

উজো

অক্টোপাস-স্কুইড

সোফ্রানিস বোতল খুলে একটা গ্লাসে অল্প একটু ঢেলে এগিয়ে দিতেই বুঝলাম এ জিনিস আমি আগে পান করেছি৷ মানে এরই রকমফের৷ প্রথমবার বহুকাল আগে, ওয়াশিংটন ডিসি-তে৷ আমার মিশরের, কায়রো-র, সহকর্মী নিহাল রিজ্ক-এর সঙ্গে জর্জ টাউনে৷ সে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল ‘লেবানিজ’ খানার একটা রেস্তোরাঁয়৷ সেখানে এল ‘আরাক’৷ সেও ছিল একই রকমের কড়া পাকের৷ তাই নিহাল তাতে ভালো করে জল মিশিয়ে দিল৷ আর ওমনি রং হয়ে গেল দুধের মতো সাদা৷ কিন্তু রং নয়, অবাক হলাম তার গন্ধে— ঠিক যেন উৎকৃষ্ট লখনওয়ি মৌরি৷

ঠিক সেই একই মৌরি-গন্ধা মদ খেয়েছিলাম প্রায় সারা রাত ধরে, ইস্তানবুলে হাকান গুলস্বেন-এর বাড়ির ব্যাল্কনিতে বসে৷ কিন্তু তুর্কি ভাষায় তার নাম— রাকি৷ আর এখানে, গ্রিসে, তাই হয়ে গিয়েছে উজো৷ টাইম ম্যাগাজিন জানাচ্ছে, এমন সাংঘাতিক কড়া পাকের বলেই স্থানীয়রা একে বলে থাকে— সিংহের দুধ! সঙ্গে সমুদ্রের গভীর স্বাদওয়ালা স্কুয়িড বা কালামারি৷

এর পর এল খাস গ্রিসের খানা— খাস ভূমধ্যসাগরীয় খানা— মুসাকা৷ পরতে পরতে সাজানো মাংসের কিমা, চিজ, আলু সিদ্ধ, ডিমের অমলেট আর বেগুন ভাজা৷ আর ওপর থেকে ঢালা জায়ফল গন্ধী বেশামেল সস্৷ অমৃত৷

 

(চলবে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...