কাশ্মিরের কবিতা

সোনালী চক্রবর্তী

 

সাইমা আফরিনের কবিতা

সাইমা আফরিন বর্তমানে ভারতের ইংরাজি ভাষার তরুণ কবিদের মধ্যে অন্যতম ও অগ্রগণ্য। তিনি ‘নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ডেপুটি সিটি এডিটরের পদে সম্প্রতি কর্মরত। ২০১৭ সালে তিনি ফিনল্যান্ডের “ভিলা সারকিয়া রাইটার্স রেসিডেন্সি থেকে পুরস্কৃত হন যেখানে তিনি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সিন অব সিমেন্টিক্স” এর পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করেন। ২০১৯ সালে তিনি সৃষ্টিশীল সাহিত্যের চর্চার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট ইউনিভার্সিটি  থেকে ‘চার্লস ওয়ালেস ইণ্ডিয়া ট্রাস্ট ফেলোশিপ’ পেয়েছেন।

 

একটি কাশ্মিরি শিশুকে…

বাবাই,

দেখো…

কসাইয়ের ঘরে কুচি কুচি হয়ে যাওয়া ঘুম পাড়ানি গানগুলো থেকে যে আশমানি স্রোত ভেসে আসছে তার উপর সেই কাগজের নৌকাটা ভাসছে যার উপর তোমার স্বপ্নগুলোকে একটা ছোট্ট অশ্রুবিন্দুর মধ্যে তোমার মা সাজিয়ে দিয়েছে আর সঙ্গে বসিয়ে দিয়েছে তার মুখ থেকে উড়ে যাওয়া একটা মাছিকে।

অজস্র বুলেটে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাওয়া গলিত চাঁদের মুখে বসে তোমার ছোট্ট দুনিয়াটা সাদা রক্তের দাগ মাখা দুই ছোট্ট ছোট্ট তালুর মধ্যে কাঁদছে।

বাবাই,

আজ রাতে খাকি পোশাকের শান্তিরক্ষক নেকড়েরা চাঁদের শবকে দাহ করবে, তুমি আর তার প্রতীক্ষায় থেকো না।

রাস্তায় রাস্তায় তাজা রক্তের লাল কার্পেট থেকে আর্তনাদকে পিষে মাড়িয়ে দিয়ে যাওয়া তাদের বুটের আঘাতগুলোর প্রতিধ্বনি উঠে আসছে।

পপলারের সারি থেকে ভাঙা শব্দ হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া নীল পালকগুলোকে রাত পরিপাটি করে সাজিয়ে নিচ্ছে সর্বনাশের নিঃশব্দ অপচ্ছায়ার মত।

বাবাই,

কাঁদতে নেই। পুঁতে না দেওয়া গণলাশের করাল গভীর কূপ থেকে উঠে আসা ভয়ঙ্কর চীৎকারের ভিতরে তোমার মাথা ছেঁড়া পুতুলটা নিজের কবর ঠিকই খুঁজে নেবে।

বাবাই,

যদি দেখতেও পাও গুঁড়িয়ে দেওয়া খুলিগুলো থেকে সবুজ ঘাসের কিনারা ধারাল হয়ে বেড়ে উঠছে, শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থেকো থেঁতলে যাওয়া প্রজাপতিটার পশমি ডানা।

শোনো,

নিশাত বাগের দগ্ধ গোলাপগুলো থেকে ধোঁয়ার প্রেতেরা রক্তাক্ত হৃদয়ে সদ্য গেয়ে উঠল ফুটন্ত বসন্তের গান।

বাবাই,

এই উপত্যকায় আর কোনওদিন রঙের তোড়া পাবে না তুমি এমনকী তোমার রঙ-পেন্সিলের চিড় খাওয়া আঙ্গুলগুলোতেও না।

বাবাই,

তোমার লজেন্সের উজ্জ্বল কমলা ভুলে সামনে তাকিয়ে দেখো কাশ্মীরে পড়ে আছে শুধু ধূসর, কালো আর লাল, এই তিনটে মাত্র রং।

এই নির্মম নীল রাত্রি সিঁদুরে ছাড়া বাকি সমস্ত আলো ভীষণ দ্রুত মুছে দেবে।

কাটারি হাতে এক শয়তান মুছে দিতে চাইছে ঝড়ের শুভ্র ডানার উপর লেখা সব কাব্য অগণিত সকালের কাঠ কয়লায় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া, শবের গন্ধ মাখা তার আঙ্গুলগুলো দিয়ে।

আগুনের সর্পিল জিভ গিলে নিয়েছে তোমার রূপকথার বইয়ের সব পরী আর বামনদের ঝলমলে ছবিগুলো। বৃষ্টির ছুঁচলো আগায় এখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গের হিসহিসানি।

বাবাই,

চলে যাও। এখানে নিদারুণ নরক গিলে নিয়েছে তোমার রামধনুর তরল স্ফটিকের উপর থির থির করে কাঁপতে থাকা ভোরের শুকতারাকে।

গোলাপী কানগুলোকে বুজে ফেলো। উপকথা, ছড়া, করতালি এরা সব গলিত সীসার বিন্দু এখন। তোমার ত্বকের দেওয়ালে আঁকা ফুলগুলোকে চেটে খাবে বলে শুধু রক্ত আর তার জমাট বেঁধে শুকনো হয়ে যাওয়ার গল্পেরা বাদুড়ের মত উড়ে বেড়াচ্ছে।

টকটকে লাল রঙের ঘা হয়ে যাওয়া সূর্যটাকে অজ্ঞাত হাতেরা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ঘন কালো হ্রদের মধ্যে যেখানে কলহাস্যকে জবাই করা হয়েছিল।

এমনকী, ভবিষ্যদ্বাণীর মৃত চোখটিও হারিয়ে গেছে বিকৃত মানচিত্রে।

দেখো বাবাই,

অরণ্যের সুগন্ধেরা মেরামত করতে চাইছে ছিঁড়ে-খুঁড়ে যাওয়া আকাশের শালটাকে তোমার মা যেটা দিয়ে নিজেকে মুড়ে রাখতো। চিনার বৃক্ষের ছায়ায় ভূ-গর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্রে নীল সেই কাপড়টার নোংরা কিছু ফালি লুটিয়ে পড়ে আছে।

বাবাই, এবার বলো তো আমায়,

কোনওদিন এই পৃথিবী আদৌ জানতে পারবে মৃত জরায়ুর ভিতরে শ্বাস নেওয়া বলতে ঠিক কী বোঝায়?

 

আঘা শহীদ আলীর কবিতা

কাশ্মিরি কবিদের প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে যে নামটি আন্তর্জাতিক কবিতার জগতেও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি আঘা শহীদ আলি। ১৯৪৯ সালে তিনি শ্রীনগরে জন্মান এবং ২০০১ সালে আর্মহার্স্টে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড’ সহ অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবনে। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্যগুলি হলো “A Walk through the Yellow Pages”, “The Half-Inch Himalayas”, “A Nostalgist’s Map of America” ইত্যাদি।

যাদুঘরে …

প্রশ্নটা হল,
খ্রিস্টজন্মের সেই ২৫০০ বছর আগে,
ব্রোঞ্জ দিয়ে একটা ঝিয়ের মূর্তি কে বানিয়েছিল?

দাস আর সৈনিকদের কথা ইতিহাস বলে না,

দেওয়াল ধুতে ধুতে,
মেঝে ঘষতে ঘষতে,
মাংস ছাড়াতে ছাড়াতে,
রসুন ছেঁচতে ছেঁচতে,
চর্বি ঘাঁটতে ঘাঁটতে,

মেয়েটার শক্ত হয়ে যাওয়া আঙ্গুলগুলোর ব্যথাকে
মসৃণ করার সময়,
ভাস্করও তা জানতে পেরেছিলেন।

কিন্তু আমি কৃতজ্ঞ যে মেয়েটা শিল্পীর দিকে তাকিয়ে হেসেছিল,
কারণ, ব্রোঞ্জের ভিতর দিয়ে তার হাসি আমি এখন দেখতে পাচ্ছি।

একটা শিশু যাকে তার প্রভুর কাছে মেয়েমানুষ হয়ে যেতে হত,
উষ্ণ আষাঢ়ের হরপ্পায়,
বৃষ্টি পৌঁছে গেলেই …

 

লুবায়েদ খানের কবিতা

তরুণ প্রজন্মের কাশ্মিরি লেখকদের মধ্যে লুবায়েদ খান অগ্রগণ্য। তিনি বর্তমানে লন্ডনের অধিবাসী। মূলত উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখলেও তাঁর কবিতা সাম্প্রতিক কাশ্মিরের মুখ হিসাবে পাঠক মহলে সমাদৃত হয়ে চলেছে।

যে, পাথর ছুড়েছিল…

স্বাধীন আকাশের উজ্জ্বলতম মেঘটাই আমি,
আমি আজন্ম হতে চেয়েছি সেই রোদ্দুর যা অন্ধকারকে মূল থেকে উপড়ে ফেলে।
শরতের এই শ্রান্ত বৃষ্টিতে,
আমার তন্দ্রাকে ব্যহত কোর না।
আমার মুছে যাওয়ায় চোখ থেকে জল ঝরিয়ো না,
আমি এখানেই ছেয়ে আছি,
আমি তো মরিনি।

বরং আমার কবর থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ো চতুর্দিকে,
মনে রেখো, সহানুভূতি কোনও প্রদর্শনীয় সামগ্রী নয়।
আমাকে কিছু একাকী মুহূর্ত দাও
প্রার্থনা করার মত,
কেননা মাতৃভূমির তকদিরের
নিয়তি পরিবর্তনে,
আমি বন্ধক রেখেছি নিজেকে।
আমি প্রেরিত হয়েছি ঈশ্বরের ধৈর্য্যে মন্থন তুলতে।

কর্কশ বুলেট আর নির্মম ব্যাটনগুলোর ছায়ায়,
ইস্পাতের নগ্ন বাঁকানো ফলা আর হিংস্র দ্রোহের ভিতর
সর্বদিক থেকে সাইরেন গর্জে উঠেছিল,
(ঠিক যেভাবে তারা হত্যালীলায় মাতে প্রতিবার)
শুরু হয়ে গিয়েছিল আতঙ্কে আর্তনাদ আর
সন্ত্রাসে খাবি খাওয়ার ধারাপাত।

জীবিত বা মৃত,
সর্ব অঙ্গে প্রগাঢ় যন্ত্রণা আর
অকৃত্রিম রক্তের গন্ধ মাখা
শরীরগুলোকে তারা ডাঁই করে রাখছিল একের উপর আরেক।
আমার বন্ধু হারিয়ে গেল,
কোথাও আর খুঁজে পেলাম না,
শুধু একান্ত চিন্হ কিছু তার,
ছড়িয়ে থাকল রাজপথের উপর।

শুয়ে থাকা আমার শরীরের উপর,
একজন ঝুঁকে পড়ে চোখে চোখ রেখে ঠায় তাকিয়েছিল।
ঠিক এমনটাই হয় যতবার তুমি আজাদি খোঁজো।
তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে,
কোনও কন্ঠ নির্গত ভাষায়,
তারা তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবে?
যদি স্বীকার করে নিতে পারতে দাসত্ব,
আজও জীবিতই থাকতে।

আমি চীৎকার করতে শুরু করেছিলাম ভীষণ
আর টের পেয়েছিলাম সমস্ত শরীরের থরথরানি,
যা শুধু বেপরোয়াই হয়ে উঠল
সময় এগোনোর সমানুপাতে।
আরও অনেকের মধ্যে একজন করে,
তারা আমায় এম্বুলেন্সে সরিয়ে নিয়ে গেল।
আমার যাত্রাকে ঘন্টাদুয়েক পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া,
কারফিউ পাসও ঠুঁটো হয়ে থাকল।

আমার বাবা পড়ল প্রচণ্ড সংঘাতে,
আর মা, অঝোর কান্নায়।
তারা ধসে পড়ল তীব্র শোকে,
আমি অব্যর্থ জানতাম তারা ঠিক কীসের ভয় পাচ্ছিল।
কাশ্মিরের নিপীড়ন তার অন্তের থেকে বহু দূরে ছিল তখনও,
অথচ আমি ‘মৃত’ ঘোষিত হয়ে গেলাম।
আমার দিক থেকে শেষ হয়ে গেল যাবতীয় কসরত।

আমার মা আমার শরীরের উপর ভেঙে পড়ে,
শেষ বিদায়ের চুমু এঁকে দিল,
পাগলের মত চীৎকার করার সময়,
আমার বাবা তাকে হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল।
সবাই কাঁদছিল খুব,
আমার পরিবার, আমার সমস্ত আত্মীয়রা।
তারা আরেকটা নামকে শহীদের তালিকায় যোগ করে দিল এই দৃশ্য দেখতে দেখতেই।

শেষমেষ, তারা যখন কবরের গভীরে
আমার দেহটাকে ডুবিয়েই দিল,
আমার শীত করে উঠল খুব,
একা লাগতে লাগল তীব্র।
কারণ আমি আরও কিছুক্ষণ লড়তে চেয়েছিলাম।
হঠাৎ করেই দেখা দিল এক দেবদূত,
আর পারলাম না,
অসহায়ের মত কান্নায় ভেঙে পড়লাম তাঁর কাছে।
প্রতিধ্বনি ভেসে এল-
“তুমি এখন মৃত কিন্তু মুক্ত একজন”।

যদিও উত্তর দিয়েছিলাম-
“আমি মৃত হতে পারি না, আমি তো সদ্য যুবা এক”,
কিন্তু আয়ুর অসম্পূর্ণতা আমায়
গভীর নৈরাশ্যে আচ্ছন্ন করল।
আমি তো এভাবে আমার শেষ চাইনি,
আমি চেয়েছিলাম বাঁচতে, অনেক অনেক।
অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল,
আমার আত্মা এই সব কথার সময়,
আমার নশ্বরতা থেকে উড়ানের প্রস্তুতিতে তখন।
আমি চোখ ফিরিয়েছিলাম আমার স্বজনদের দিকে,
বন্ধুরা শেষ বিদায় জানাচ্ছিল আমায়।
আমি বলতে চেয়েছিলাম আর্তনাদ করে,
ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি,
আমাকে নিয়ে দেখা তোমাদের সমস্ত স্বপ্নকে
ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছি আমি,
আমি দুঃখিত,
তোমাদের হতাশ করলাম খুব।
আব্বু, মা, এভাবে আর কেঁদো না,
এটুকু তো দয়া করো আমায় এবার।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3775 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...