একুশের ‘উত্তর’

অভিষেক ঝা

 



গদ্যকার, অনুবাদক, পেশায় শিক্ষক

 

 

 

পশ্চিমবাংলায় একুশের ভোটে ভালো ফলাফল করতে বিজেপি মরিয়াভাবে যে ভৌগোলিক অঞ্চলগুলির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল সেইগুলির ভিতর মালদা থেকে শুরু করে দার্জিলিং অবধি ভূখণ্ড অন্যতম। ভূখণ্ডটিকে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায় ‘উত্তরবঙ্গ’ বলে অভিহিত করা হয়। এই ভূখণ্ডের ভোটের রাজনৈতিক অভিমুখ কখনওই দু হাজার উনিশের আগে একমুখী হয়নি। হওয়া সম্ভবও ছিল না কারণ ‘উত্তরবঙ্গ’ বলে একটি অন্তর্নিহিত যোগসূত্রে গাঁথা কোনও একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল পৃথিবীতে নেই কোনওদিন। ‘সুন্দরবন’, ‘রাঢ়বঙ্গ’, ‘জঙ্গলমহল’ যেভাবে নিজেদের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অন্তর্নিহিত যোগসূত্র দিয়ে স্বতন্ত্র অঞ্চল হিসেবেই বহমান, ‘উত্তরবঙ্গ’ বলে তেমন কোনও স্বতন্ত্র অঞ্চল নেই বাংলায়। ‘উত্তরবঙ্গ’ বলে উল্লেখিত অঞ্চলের ভূগোল একমাত্রিক নয়, ইতিহাস একমাত্রিক নয়, অন্তত সাতটি বেঁচে থাকা ভাষা রয়েছে এই অঞ্চলে, কমপক্ষে পনেরোটি জনজাতি। সুতরাং রাজনৈতিক অভিমুখ ও রাজনৈতিক বছাই একই অভিমুখে চালিত না হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই উনিশের লোকসভা ভোটের ফলাফল এই অঞ্চলসাপেক্ষে একটি অস্বাভাবিক প্রবণতাকে চিহ্নিত করে। ৮টি লোকসভা আসনের ভিতর দক্ষিণ মালদা কেন্দ্রটিতে খুব অল্প ব্যবধানে কংগ্রেসের কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া বাকি ৭টি কেন্দ্রের সবটাতেই বড় ব্যবধানে জিতে বিজেপি। সেই ভোটের নিরিখে বিধানসভাভিত্তিক তৃণমূলের আসন সংখ্যা ছিল ১৪, বামসমর্থিত কংগ্রেসের ছিল ২ এবং বিজেপি ৩৮। একুশের ভোটের হিসাব: সংযুক্ত মোর্চা ০, অনান্য (বিনয়পন্থী মোর্চা) ১, তৃণমূল ২৩ এবং বিজেপি ৩০। সংখ্যার দিক দিয়ে কাছাকাছি হলেও বিজেপি ও তৃণমূলের এই আসনগুলির প্রাপ্তির ভৌগোলিক পরিধি কিন্তু একেবারে আলাদা। কোচবিহার-আলিপুরদুয়ার-জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং অর্থাৎ উত্তরদিকের জেলাগুলি থেকে বিজেপি পেয়েছে একুশটি আসন, তৃণমূল পাঁচটি। উত্তর দিনাজপুর-দক্ষিণ দিনাজপুর-মালদা অর্থাৎ দক্ষিণদিকের জেলাগুলি থেকে তৃণমূল আঠারোটি আসন পেয়েছে, বিজেপির প্রাপ্তি নয়টি আসন।

মমতার পপুলিস্ট রাজনীতির ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠা মমতার নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক এই নির্বাচনে মমতার পক্ষেই রায় দিয়েছে— এই তত্ত্ব মেনে নেওয়ার পরেও এই শুখা তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করে যে সম্ভাবনাগুলি উঁকি মারে তা হল:

  • রাজবংশী হিন্দু ভোটের সিংহভাগ গেছে বিজেপির ঝুলিতে। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও দক্ষিণ দিনাজপুরের ফলাফল থেকে তা স্পষ্ট।
  • মদেশীয় ভোট, টোটো, রাভা, মেচ, সাঁওতাল, সমতলের গোর্খা ও লেপচা ভোট বিজেপি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তরাই, ডুয়ার্স, দক্ষিণ দিনাজপুর ও উত্তর মালদার ভোটের ফলাফল থেকে তা স্পষ্ট হয়।
  • দার্জিলিং পাহাড়ের ভোট সার্বিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে (ফলত তৃণমূল) গেছে।
  • রাজবংশী মুসলিম, বাঙালি মুসলিম, সূর্য্যাপুরি মুসলিম, দ্বারভাঙিয়া মুসলিম, বাদিয়া মুসলিম ভোটের প্রায় সবটাই তৃণমূল পেয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের চিকেন’স নেক এবং দক্ষিণ মালদার ফলাফল থেকেই তা বোঝা যাচ্ছে।
  • উত্তরবাংলার শহরাঞ্চলগুলির ভোট বিজেপির পক্ষে গেছে। জলপাইগুড়ি সদর বিধানসভাতে বিজেপি হারলেও জলপাইগুড়ি শহরের ২৫টি ওয়ার্ডের ভিতর ১৬টি ওয়ার্ডে তারা জিতেছে। কোচবিহার, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, ইংরেজবাজার প্রতিটি জায়গায় বিজেপি জিতেছে। এর মধ্যে জলপাইগুড়ি ছাড়া বাকি প্রতিটি বিধানসভায় বর্ণহিন্দুর সংখ্যাধিক্য।
  • উত্তরবাংলায় বসবাসকারী দুইবারের রিফিউজি নমঃশূদ্ররা একুশের বিধানসভা ভোটে সামগ্রিকভাবে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক হিসাবে কাজ করেনি। এর ফলাফল হিসেবে জলপাইগুড়ি জেলায় উনিশের লোকসভা ভোটের সাপেক্ষে একুশের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ফলাফল আশাতীত ভালো হয়েছে।

এই সম্ভাবনাগুলিকে খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে এই ভোট যেমনভাবে সম্পূর্ণ মেরুকরণের ভোট হতে পারেনি, ঠিক তেমনভাবে এই ভোট সম্পূর্ণভাবে বিজেপিকে প্রতিরোধের ভোটও হতে ব্যর্থ অন্তত এই অঞ্চলের  ক্ষেত্রে। এই ভোট মূলত নির্দয়ভাবে জাতি ও গোষ্ঠীস্বার্থ এবং জাতি ও গোষ্ঠীর প্রতিরোধের ভোট হয়ে থাকল। সান্দাকফু থেকে ফারাক্কার গঙ্গা অবধি ভূগোলের মতোই বৈচিত্র্যময় এই সমীকরণ। অঞ্চল ধরে ধরে এগোলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমীকরণগুলি।

সামগ্রিক পশ্চিমবাংলার মতোই, না, পশ্চিমবাংলার চেয়ে খানিক বেশি অসহায় অবস্থা ছিল দার্জিলিং পাহাড়ের।  তবে চয়েসটা ইভিল ও লেসার ইভিলের ভিতর চয়েস নয়, চয়েসটি ছিল অভিজ্ঞতালব্ধ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং অভিজ্ঞানলব্ধ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভিতর। ২০১৭ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর অবধি যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পাহাড় জুড়ে চালিয়েছে তার ট্রমা এত দ্রুত ফিকে হওয়ার নয়। ফলে ফ্যাসিস্ট হিসেবে পাহাড়ের মনে মমতার মুখ অনেক বেশি দাগ কাটে, মোদির চেয়ে। তাই বিমল গুরুংকে যতই জোট করতে বাধ্য করুন  মমতা, পাহাড় ফ্যাসিস্ট হিসেবে মমতাকে প্রত্যাখান করেছে। ব্যতিক্রম লেপচা ভোটারের সংখ্যার দিক দিয়ে নির্ণায়ক কালিম্পং যা মমতার পক্ষে না গেলেও একদা মমতার হাত ধরা বিনয়ের দলের প্রার্থী জয়ী সেইখানে। মনে রাখতে হবে মমতা প্রথম প্রশাসক যিনি গোর্খা থেকে আলাদা করে লেপচা-অস্মিতাকে মর্যাদা দিয়ে জিটিএ-র ভিতরেই আলাদা করে লেপচা পর্ষদ গড়েছিলেন। তরাই ও ডুয়ার্সেও গোর্খা ভোট বেশিরভাগ বিজেপিতে যাওয়ায় পুরো আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং সমতলের দুইটি ও জলপাইগুড়ির একটি আসনে জয় পেতে সুবিধা হয়েছে বিজেপির।

একটি জনজাতির অস্মিতাকে কাজে লাগিয়ে সেটাকে ভোটবাক্সে টেনে আনতে বিজেপি এইবারও সফল আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও দক্ষিণ দিনাজপুর জুড়ে। চারটি জেলার সাতাশটি আসনের ভিতর উনিশটি পেয়েছে বিজেপি ও আটটি তৃণমূল। এই অঞ্চলের বিজেপির ভোট সাফল্যের মূল কারণ রাজবংশী ভোটের প্রায় সবটাই নিজের দিকে টেনে নেওয়া। বাইরে থেকে বিজেপির এই কৌশল টিপিক্যাল হিন্দুত্ববাদী মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায় যে রাজবংশীয়-অস্মিতাকে বিজেপি যতটা কাজে এখানে লাগাতে চেয়েছে, হিন্দুত্ববাদকে তেমনভাবে নয়। বিগত তৃণমূল সরকার রাজবংশী জাতিসত্তাকে গুরুত্ব দিতে ‘রাজবংশী ভাষা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিল ‘রাজবংশী ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল বোর্ড’-এর অংশ হিসেবে। আশ্চর্জনক ব্যাপার এই যে এর সঙ্গে ‘কামতাপুরী ভাষা একাডেমি’ও প্রতিষ্ঠা করা হয় মাথায় নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ির মতো একজন অ-রাজবংশীয়কে রেখে। পঞ্চানন বর্মার নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসির পদেও বসানো হয় এক বাঙালি ব্রাহ্মণকে। কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের মুখ হয়ে ওঠে বাঙালি বর্ণহিন্দুরাই। এই সুযোগ বিজেপি কাজে লাগায় বেশভূষায় এবং ভাষায় নিজেকে রাজবংশী প্রোজেক্ট করতে চাওয়া দলিত পদবি থাকা নিশীথ প্রামাণিককে নিজেদের দলে এনে। নিশীথ নিজের এলাকা দিনহাটা বাদ দিয়ে প্রস্তাবিত ‘গ্রেটার কোচবিহার’ অঞ্চলে বিজেপির পক্ষে একটা মাস্টার স্ট্রোক হিসেবেই কাজ করেছে। নিশীথের প্রোজেক্টেড রাজবংশী আইডেন্টিটি, বাঙালি-দলিত পদবি বিজেপিকে সুবিধা দিয়েছে রাজবংশী ভোট ও রিফিউজি নমঃশূদ্র ভোটকে একত্রিতভাবে নিজেদের দিকে টেনে আনতে, যা আপাতভাবে অসম্ভব। নিশীথের এই ফ্লুইড-আইডেন্টিটি কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত ভার্চুয়াল মাধ্যমগুলিতে প্রচার চালিয়ে ‘গ্রেটার কোচবিহার’কে ‘উত্তরবঙ্গ’ হিসেবে প্রোজেক্ট করাতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। যার ফলাফল ভোটের ফলাফলের পর ‘উত্তরবঙ্গ পৃথক রাজ্য চাই’-এর ফেসবুকে প্রবল উপস্থিতি।

‘গ্রেটার কোচবিহার’ অঞ্চলে উনিশের লোকসভায় পরস্পর স্বার্থ-বিরোধী রাজবংশী ও বাঙালি নমঃশূদ্র ভোট  বিজেপি ভোট বাক্সে গেলেও, এইবারের বিধানসভা ভোটে স্বার্থ হেতুই নমঃশূদ্র ভোট জলপাইগুড়ি সদর ও মালবাজারে তৃণমূলে গেছে। উনিশের শেষদিকে ক্যা সহ এনআরসি-র সম্ভাবনা দেখা দিলে ‘গ্রেটার কোচবিহার’ ও ‘কামতাপুর’-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি রাজবংশী সংগঠন ক্যা-এর বিরোধিতা করে এবং এনআরসি-র পক্ষে সওয়াল করে। এই সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সদস্য ও সমর্থক। ফলে দুইবারের রিফিউজি বাঙালি নমঃশূদ্র মুখে হিন্দুত্ববাদ আওড়ালেও যে ভোট তৃণমূলকে দিয়েছে তা স্পষ্ট জলপাইগুড়ি সদরের ফলাফলে। রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকা এবং জলপাইগুড়ি শহরে পাওয়া বিজেপির লিড মিটিয়ে তৃণমূলকে প্রথমবারের জন্য এখানে জয় এনে দিয়েছে নমঃশূদ্র অধ্যুষিত তিস্তার চর।

এই গোষ্ঠীস্বার্থ ও গোষ্ঠীক্ষোভের বাইরে গিয়ে বিজেপির টিপিক্যাল ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়; হিন্দুত্ববাদী মডেল এইবারও সফল হয়েছে বাংলাভাষী ও অ-বাংলাভাষী বর্ণহিন্দু অধ্যুষিত জেলা সদর শহরগুলিতে এবং শিলিগুড়ি শহরে। আরএসএস একটা বড় অবদান রেখেছে আদিবাসী ভোটকে বিজেপির দিকে নিয়ে আসতে। উত্তর মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুরের ক্ষেত্রে আরএসএস নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে বারোটির ভিতর ছয়টি আসন পেতে। কামালি সোরেনের ‘বনবাসী কল্যাণ আশ্রম’ দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে আরএসএস-এর শাখা হিসেবে কাজ করে চলেছে। খ্রিস্টান মিশনারিদের চেয়েও বেশি সুযোগসুবিধা প্রদান করে ও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ দিয়েও ‘ঘর ওয়াপসি’ চলছে এই অঞ্চলে। একুশে সোরেন-কে পদ্মশ্রী প্রদান করে বিজেপি-রাষ্ট্র এই প্রবণতাকে সমাজসেবার বৈধতা দিয়ে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। বিজেপি নিজেদের মোডাস অপারেন্ডি হেতুই এই অঞ্চলে এইবারও অপরাজেয়।

বাকি রইল চিকেন-স নেক যার বেশিরভাগটাই উত্তর দিনাজপুর ও উত্তর-মালদার দুইটি আসন নিয়ে গঠিত এবং দক্ষিণ-মালদার গঙ্গা দিয়ারা। ভৌগোলিকভাবে একই অঞ্চলের না হলেও প্রতিরোধের রাজনীতির প্রেক্ষিত থেকে এই অংশের ভোটের ফলাফলের অভিমুখের সঙ্গে মিল রয়েছে কোচবিহারের সিতাই ও মেখলিগঞ্জ আসন দুইটির। কোচবিহারের এই আসন দুটি, উত্তর দিনাজপুরের কয়েকটি আসন তৃণমূল ২০১১ থেকে পেয়ে এলেও, মালদার এই আসনগুলির ভিতর রতুয়া ছাড়া অন্য কোনও আসন কোনওদিনই পায়নি তৃণমূল।  এইবার তৃণমূল ছাড়া অন্য কোনও পার্টির অস্তিত্ব এই আসনগুলিতে নেই— শুধুমাত্র বর্ণহিন্দু প্রধান ইংরেজবাজার বিধানসভাটি ছাড়া। এই অঞ্চলের ভোটের ফলাফল গোষ্ঠী হিসাবে মুসলমানের বিজেপিকে প্রতিরোধের ভোট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। বিজেপি-রাষ্ট্রে বিজেপির পক্ষে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রতিরোধকারী সত্তাটি তর্কাতীতভাবেই মুসলিম। কোচবিহারের উল্লেখিত দুইটি আসনে, চিকেন’স নেক এবং গঙ্গা দিয়ারায় জাতিগতভাবে নস্যশেখ, সূর্য্যাপুরি, বাঙালি জোলা, দ্বারভাঙিয়া, বাঙালি শেরবাদিয়া এবং অল্পসংখ্যক পাঠান মুসলিম রয়েছে। রয়েছে তাদের ভিতরের বহুবিধ দ্বন্দ্ব। সমস্ত আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে তারা ভোট দিয়েছেন। এই অঞ্চল এবং এই অঞ্চলের মুসলিমরা গোষ্ঠী হিসেবে তৃণমূল আমলে সবচেয়ে অবহেলিত এবং উপেক্ষিত। তারপরেও তারা ভোট দিয়েছেন তৃণমূলকে। দুইটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। প্রথমত প্রবল হিন্দুত্ববাদের আতঙ্কের সম্মুখীন হয়ে তৃণমূলকে বেছে নেওয়া তাদের অসহায় চয়েসলেস অবস্থান। আবার চতুর্থ দফার ভোটের দিন শীতলকুচিতে বিজেপি-রাষ্ট্রের দ্বারা চারজন মুসলিম খুন হওয়ার পর “জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে” এই হিংস্র উচ্চারণের সামনে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে এই অঞ্চলে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়াকে মুসলমানের সুদৃঢ় প্রতিরোধ হিসেবে দেখা যায়।

ভোটের ফলাফল থেকেই স্পষ্ট ভোট পরবর্তী রাজনীতি কোনদিকে এগোতে পারে এই অঞ্চলে। বিজেপি নিজের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং এই অঞ্চলের বিজেপিমনস্ক বাঙালিদের সমর্থন বজায় রাখতে ‘গ্রেটার কোচবিহার’কে ‘উত্তরবঙ্গ’ বলে চালাবার চেষ্টা করতে মরিয়া হয়ে উঠবে। এই নাম পরিবর্তন বিজেপির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে রাজবংশী-কামতাপুরী-কোচ অস্মিতা হেতুই। একই সঙ্গে গোর্খাল্যান্ড-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজেপির পক্ষে ‘উত্তরবঙ্গ’, ‘গ্রেটার কোচবিহার’ এবং ‘গোর্খাল্যান্ড’— পরস্পর স্বার্থবিরোধী এই জাতিস্বার্থগুলিকে একই কাঠামোর ভিতর নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তাই এই অঞ্চলে  সামনের দিনগুলি নিশ্চিতভাবেই বিজেপির পথ চলা খুব একটা মসৃণ হবে না।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...