মৌমন মিত্র

বৃক্ষ বলয়

 

বৃক্ষের দেহ মন লিখব বলে
প্রথম পৃষ্ঠায় উপচে পড়ে মোহিত গন্ধ রস
তার বাকল বেয়ে বাতাস
ক্রমশ ছুঁয়ে যায় মাটির সারাৎসার
দিকে-দিকে ঘন হয় ছায়ার শিকড়

আরও মেঘ আসুক
তার ডানায় ঘন গন্ধ-রস লিখতে-লিখতে
পরিযায়ী পাখির বাসা ভেদ করে চলে যাব একদিন
নাগ চাঁপা দোলনচাঁপার বাগিচায়
তার নীচে জিরিয়ে নেব একটুক্ষণ
সেখানে জন্ম নেবে আস্ত একটি মেঘবন্যার কাহিনি
মিঠে রোদে গা এলিয়ে
বায়ুমণ্ডল শোনাবে ঠাকুমার একশো ঝুলি
আর তাঁতির সুতো বোনার ছন্দ

বালিকার চুলে তখনও কি ধূমকেতুর বাসর?
গ্রহাণু জ্বলছে ধিকিধিকি? এখনও ম ম করছে মধুস্নান বরণ?
যদি-বা এ লেখা শ্রাবণের খাতায় খুঁজে পাও
টের পাও ভুলে ভরা দু-চারটে ক্যাকটাস কাঁটা
দেখবে,
মেখলার কুয়াশা, বেতের ঝুড়ি, চুম্বক বা ধানের ঠোঁটে
কোনও-না-কোনও খেসারত বা কান্না লেখা থাকবেই

 

কত ভুল শুশুকের আঁশ জমে আছে
তার নিঃশ্বাসে স্রোত বাড়ছে, স্রোত পুরনো কথার
একদিন ছিল দিক গঞ্জ
তারাও তীব্র আগুন জ্বালাল

আর আঁশটে কোষের গায়ে
কে যেন দু হাতের তালু কচলে কচলে
পেরিয়ে চলেছে একের পর এক অন্ধকূপ
মেহেফিলের ফিলফিলে পর্দা
মাইলের পর মাইল খেতের অরিগ্যামি
অনির্বাণ শিখার আশায়

তবু কি সে আগুন থেকে আলোর ঝলক ঠিকরে আসে?
ছুঁতে পারে টাটকা রঙের অজস্র বিন্দু?
মনের ভেতর উঁকি দেয় যত ভুল অথবা মিথ্যে চাহনি?

এতসব ভেবে-ভেবে ডিঙার মন, ঢেউ-শ্বাস
ভুলভাবে বিঁধল ভগ্ন সারেঙ্গির সুরে, একাকী

তবু পান পাতার শিরায় শিরায়
পদ্য আঁকার মুহূর্তে, চাইনি কোনও কিছু
চেয়েছি কখনও? চাইলে,
এ-অধীর বীণায় বেহাগ বাহার বয়ে যেত না…

 

ছায়ার তিতির কাঁপে। তাই, অপেক্ষান্তে
যে ঘন তৃষা দিয়েছ তা তো

তুলির রঙে ঝরে, মোহশূন্য

গোধূলির ধূসরিমায় কোথাও কটা কথা পড়ে থাকে
এভাবে একে-একে রাত নিয়েছি চিনে

ভোর হলেই বিহঙ্গসুর আবার সেই পূবে মিলিয়ে যায়

চিহ্নহারা রেখা ধরে আমিও থামি
কুড়িয়ে আনি ফেলে রাখা নিশীথ মোমের শরীর,
কিছু গৃহহারা তারার শব্দাংশ

ইচ্ছেমতীর ঠোঁট ছোঁয় ওই রাগিণীর স্বর
শস্যের কাঁচা দাগ, সেও এক সময় হারিয়ে যায়
আর শুষ্ক কাঠের উপর একা পুড়তে থাকে
আমাদের শার্শি-ভেজা কবেকার বর্ণগুছি

 

শ্বাস রুদ্ধ হতে-হতে ধাক্কা দিচ্ছে মুক্ত ডালের বুকে

বিলুপ্ত সময়ের পূর্ণিমা, আমার মৃত ঠোঁট বোঝে

আর কেউ নেই তখন
একটা অন্যমনস্ক ঝড় উড়িয়ে দিয়েছে পৃষ্ঠা সংখ্যা,
প্যাগোডার হিমকাহিনি, সারি সারি পলেস্তরা
তারই ডানা বেয়ে উড়ে গেছে দীর্ঘ কবিতার পালক

দৃষ্টিহীন এমন ঘুরে বেড়ায় পলিমাটির পাড়, ভেসে যায় দিগ্বিদিক

আমিও তার চোখের কল্পে গোপনে বুনেছি টালির ছাদ,

চাঁদের যমুনায় চাঁদ
তুমি তার এক-পা দূরত্বে থেকেও এগিয়ে এলে না
মনে পড়ে? বৃক্ষ মতে হৃদয়ং তব?
মনে পড়ে বালির পদশব্দ, বারান্দাভর কচুপাতার ঢিপি?

আজ মাথার ভেতরে তেমন কিছু ছন্দতত্ত্ব লিখছি না আর
ভুলতে পারছি না ট্যাক্সিচালকের উড়ো স্লোগান
গন্ধ আঁচলে তেমন কোনও বাসাও গেড়ে বসছে না ইহকাল

শুধু ক্ষোভ

শুধু স্তনের দুধচিহ্নে দ্রবীভূত হয় মা-পুরাণ!

 

শিশিরের পাতায় ছোট্ট দীঘি গড়েছে এ-শহর
হাতে লণ্ঠন, ধু ধু পাথরভূমি— অনেক তোলা ছবি
ক্যামেরায় মুদে থাকা বহু নিঃসঙ্গ প্রহর
আর কিছু ইতস্তত সংলাপ
দিকে-দিকে খুঁজে বেড়াই তার অগণিত অক্ষর

জলের ছলে আমিও কি অস্থির ছিলাম?
পেটের মিনারে মাছরাঙা ডুব দিতে-দিতে
ও শহর,
সাদা আঁশে মোহরের কলঙ্ক খুঁজে পাওনি?

অসংখ্যবার উড়ে গেছি বনভূমির কাছাকাছি
দেখেছি কেমন নেশা-হয়ে-ওঠা স্রোতের বুকে টলমল করে রোদের গা,
আধ ধোয়া চাল, আহা সিঁথির পথ!
তোলপাড় করছে মাটির গন্ধ

বাদামি পাতার গায়ে

কী বুঝব আমি? কাকে বোঝাবে গন্ধ-ফড়িঙের গপ্পো?
পৃথিবীর শব্দ বেমালুম ভুলে যায়,

একবার হারিয়ে গেছে সে
একবার তাকে দেখা যায় জাফরানি গালিচায়

 

সাঁকো পেরোলেই দু’হাত বিক্ষিপ্ত চাঁদের বন
রাত্রি তার পাশে পাশে হাঁটে, স্নান করে
এসব অদৃশ্যে লিখে রাখছ মায়াপ্রান্তর
দূর থেকে শুধু ঝরা পাতার গুঁড়ো গুঁড়ো বালি আর বালি
সাইনবোর্ডের সীমা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে ক্রমশ
দেখেছ তার নকশা? জেনেছ তার নির্জন, উড়ো বাতাস কিনা?
আমিও এখানে জলের ছায়ায় মগ্ন শরীরের রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছি
তাতে ধূসর স্কারলেট রঙের দেওয়াল
আর দুটি পাথরে মতো শোকের বর্ণ লেগে আছে

পাখার ব্লেডে

এমন স্রোতের পাশে বয়ে চলাই কি নিয়তি? একথালা ভাতের স্বপ্ন কি আজও ভরাডুবি?

কোনও একদিন বিভ্রমের বিষাদ নিয়ে চলতে-চলতে
আমিও এত আয়োজন ভুলে যাব
আমার ঘুমের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে নিশাচর বৃক্ষ
উচ্ছন্ন পথের দিক দিশা ও শ্রাবণের এলোকেশী ঠোঁট

তখন চোরাবালির প্রিয় ঘরে বসো। সময়ের সঞ্চিত বিষ ঢেলে
এঁকে দিতে পারো আমার গভীরতর শেষ বলয়!

 

মৃত আলপথ হেঁটে এসে, বৃক্ষ তোমার গুঁড়ির ছায়ায় বসি
এঁটো হাত, নষ্ট ছায়ায় মুড়ে রাখা
যত ক্লান্ত শিরা ও ধমনী
বালুকণায় হারিয়ে যায় অনেক-অনেক দিন
দৃষ্টি গভীর হয়ে পিরানহা মাছের দাঁতে জমতে থাকে

কাঁধের ব্যাগে আর-একজন জলদস্যুর নাম খোদাই করে লিখে দিই

ওই প্রবহমান ধারার বুকে তখন মেঘ বৃষ্টি ধুন্ধুমার!
দু-একটা পুরনো খাতাপত্র শেষ
চক কালির ইতিহাসে, চড়া দাগের ইস্তাহার
এদিকে দূর পাহাড়ে চা-চিনির ফেনায়-ফেনায়
অস্তমিত সূর্যের পালক ছড়িয়ে যায়
ক্রমশ ফুটে ওঠে নতুন ঋতুর লালচে আভাস
জিভে তার নোনতা আগুন নিয়ে একটা শ্যাওলা ছাতের দিকে
পা বাড়ালাম
যদিও সেখানে টেরাকোটা বন, উইন্ডচাইম ধ্বনি খুঁজে পাব না জানি
কেননা দামি মদের রস চিবোতে চিবোতে
একদা তোমার জরিপ শেষ হবে, শেষ হবে অপেক্ষা
অথবা আর-একটা শুরু
ঠিক তখন,
পাতালের গর্ভে বাঘের খোলস চিরে দিয়ে
রুবিকের দেহে বর্গমূল কষে দিতে পারবে?

 

জানো না কি অরণ্যে খুঁজে পেতে চাই শুধু
মেঘ খচিত নগ্ন মিনার, খেলা নও?
ফেল্ট পেনে আঁকা তার অবুঝ চোখ আত্রেয়ী হয়
ভুলে গেছি সুতোয় সুতোয় কীভাবে জলপাখি বোনা যায়
আরও কত ছুঁয়েছি নীল মত্ততার আদিম আকুতি

আর এক সর্বনাশী আঁধার ঘিরেছে

সবুজ ঘাসের গন্ধ

ক বিঘা টেরিকাটা মোড়
তার চরিত্রে ভেসে ওঠে চ্ছল চ্ছল পাণ্ডুলিপি
ভ্রমণ তাকে শিখিয়ে নিয়েছে কথা
হয় না শেখা— কীর্তিনাশা— এমন কত কথা?
সে বলেছে আমায়
এক দিস্তায় ভরে দেবে পারস্য আফিম
আর-এক দিস্তায় জমে থাকবে মেঠো উঠোনের কাটগ্লাস
যদি তার সত্যি মিথ্যের অ্যালগোরিদম করে
জানতে চাই, হে কোমল নি
স্বপ্নের ভিতর বুঝি— এমন শেফালিকা আসে? থাকে বহুকাল?

মদির মেয়েটি তখন নিজের আয়ুর আভাস স্পর্শ করে
জলতরঙ্গে লিখে দেয়

মিলনোন্মত্ত তানের স্বরলিপি

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. মৌমণের কবিতার আত্মমগ্নতা, শব্দচয়ন মন কেড়ে নেয়। ভারি চমৎকার বর্তমান প্রজন্মের এই কবির লেখা। কবিতা গুলি এক অন্য জিজ্ঞাসার, অন্য কথনের দিক নির্দেশ করে।

Leave a Reply to Rahul Ray Cancel reply