পার্কিনসন এবং মহারাষ্ট্রের কিরণ কামদার

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

মহারাষ্ট্রের পালঘাটের ডিএম পেটিট সরকারি হাসপাতাল। গেটের কাছে ভিড় জমানো মূলত ওপিডি-র রোগীদের জমায়েত এবং তাদের প্রত্যাশিত চোখ হাসপাতালের গেটের দিকে। কেন? কারণ তখন লাঞ্চ টাইম এবং বাষট্টি বছরের কিরণ কামদারের আসার সময়। কে কিরণ কামদার? এবং ঠিক এইসময় প্রতিদিন তাঁকে দেখলেই অদ্ভুত সুখে ছটফট করে একটা মফস্বল হাসপাতাল, কেন?

গল্পের শুরু থেকে বলা দরকার। পালঘাটের কিরণ কামদার তাঁর স্বামী, ছেলে, মেয়েকে নিয়ে অদ্ভুত সুখ-দুঃখ ভরা জীবন কাটাচ্ছিলেন, মিশে থাকত পারিবারিক সুখ, সচ্ছলতা এবং তার পাশাপাশি অসুখ-চিন্তা। ছেলে জন্ম থেকেই সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। তার চিকিৎসার চিন্তা, আজীবন অসুস্থতার মোড়ক, স্বাভাবিক জীবন থেকে সরে যাওয়া এক কিশোরের মুখ। এই ছেলেকে সেবার পাশাপাশি মা কিরণ এলাকার বস্তিবাসী অভাবী ছেলেমেয়েদের, মূলত মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সবাইকে, মারাঠি ভাষা পড়াতেন, অবশ্যই বেতন ছাড়াই। এবং তার পাশাপাশি গৃহস্থের কাজ, রান্না এবং বাকি সমস্ত তদারকি তো আছেই। গল্পটা এই অবধি চলছিল। প্লট টুইস্ট, টার্ন— তার পরেই…

২০১৮-য় পার্কিনসনে আক্রান্ত হলেন কিরণ। সাময়িক বিহ্বলতা এবং কাজে শিথিলতা। যদিও তা কেটে গেল সহজেই, কারণ, ওই, কিরণের অদম্য জেদ। ঘরে সমস্ত ছেলেমেয়েকে ডেকে এনে পড়ানোর কাজে বাধা পড়ল না একেবারেই। তবে, গতি কমল, ক্লান্তি, পেশিগত শিথিলতা এসব নিয়েই লড়াই চালালেন। ২০২১ অবধি গল্পটা এভাবেই চলল। তার পরেই অদ্ভুতভাবে একদিন সবকিছুই বদলে গেল, অন্যভাবে, বলা ভাল আরেকটু আলোর দিকে। সে-বছরই মেয়ে পালক তার এক বান্ধবীর অসুস্থতার জন্য মাকে নিয়ে ডিএম পেটিট হাসপাতালে গেছিলেন, এবং সেদিনই হাসপাতালের নিদারুণ অবস্থা দেখে অন্য এক ভাবনা এল কিরণের। ওপিডি পেশেন্টদের দৈন্যদশা, পর্যাপ্ত খাবার নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা ডাক্তার এবং চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার পর রীতিমত মানসিক ক্লান্তি তাদের অসুখকে আরও দ্বিগুণ, চারগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কিরণ এক অন্য ভাবনায় এগোতে থাকলেন। মেয়েকে নিয়ে পালঘাটের ডেপুটি কমিশনারের কাছে গেলেন। কমিশনার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। ষাট পেরোনো পার্কিনসন আক্রান্ত বৃদ্ধা বলছেন, হাসপাতালের একশোর কাছাকাছি ওপিডি পেশেন্টদের জন্য বিনামূল্যে খিচুড়ি রাঁধবেন রোজ? অর্থ যদি দেয়ও, শরীর দেবে? অনুমতি না দেওয়ার তো প্রশ্নই নেই। তবু, লিখিত অনুমতির জন্য হাসপাতালের ডিন রানি বদলানির কাছে আবেদন করলেন। সাড়া পেলেন প্রচুর। এবং ২০২১-এর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হল কিরণ কামদারের রান্না…

মূলত আলু, পেঁয়াজ ছাড়া মুগডালের খিচুড়ি এবং তাতে ক্যাপসিকাম, গাজর, বিন, মটর— হাসপাতালে আশেপাশের ১৫টি গ্রাম থেকে আসা গড়ে রোজ ৭৫ জন ওপিডি রোগীর জন্য প্রায় ২২ কেজি খিচুড়ি রান্না শুরু করলেন। হাত লাগালেন বাড়ির সবাই। আগের দিন বাজার করা, ভোর পাঁচটা থেকে রান্না। মাকে রান্নায় সাহায্য করা থেকে শুরু করে খাবার প্যাকিং, মেয়ে এবং স্বামী যথাযথ পাশে দাঁড়ালেন। কারণ তাঁরা জানেন, এটাই ওঁর ওষুধ, বিন্দুমাত্র পজিটিভিটি হারালেই ভেঙে পড়বেন, পার্কিনসন জাঁকিয়ে বসবে কিরণের শরীরে, এবং তাই যতদিন পারা যায় মানুষটাকে সমস্ত কাজে উৎসাহ দিতেই হবে, যতটা সাধ্যে কুলোয়।

হাসপাতালে তিন বছর ধরে একদিনও রোগীদের খিচুড়ি বিতরণে মিস করেননি কিরণ। দুপুর দুটো অবধি ওপিডি এবং ঠিক তার আগেই বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার হেঁটে হাসপাতালের দরজায় ট্রলি নিয়ে এসে যান কিরণ, সঙ্গে বাক্স আর বাক্স খিচুড়ি। হাসপাতালের সহায়িকাদের সাহায্যে করিডর, বা প্রতিটি ঘরে গিয়ে প্রতিটি রোগীকে নিয়ম করে বিলি করেন সেই পথ্য। পাশাপাশি রোগীর পাশাপাশি দুঃস্থ কিছু রোগীর আত্মীয়-পরিজন-বন্ধুদেরও। বিশেষত যেসব রোগীর বন্ধুবান্ধব, পরিজন নেই, তাদের মধ্যে সুখটুকু যেন আরও বেশি। কিরণ আসার প্রায় আধঘন্টার মধ্যেই সেই খিচুড়ি শেষ। এতই চাহিদা এই পথ্যের। কিন্তু কেন খিচুড়ি? কেন অন্য কিছু নয়?

কিরণ শুনেছেন খিচুড়ি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার। নিউট্রিশনিস্টদের মতে, খিচুড়ি প্রয়োজনীয় সবকটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের জোগান দেয় শরীরকে। অনাক্রমতা বাড়ায়। ক্যালরি দেয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা যদি কিছু বাছাই করা সবজি থাকে, সেগুলি বাড়তি ফাইবার দিয়ে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। কিরণ এই সামান্যটুকু শুনেছিলেন, তাতেই বলছেন, বড়াপাও ইত্যাদি সহজলভ্য খাবারের মোহে অসুস্থতার চেয়ে খিচুড়ি অনেক সাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এবং খিচুড়ি রান্নাও নখদর্পণে কিরণের। এবং ডায়াবেটিক পেশেন্টদের জন্য আলুর ব্যবহার একেবারেই নেই সেই পথ্যে।

এভাবেই কিরণ কামদারের ট্রলি তিন বছর ধরে আসছে ডি এম পেটিট হাসপাতালের মধ্যাহ্নে, নিয়ম করে। কতদিন টানতে পারবেন এই কাজ? কিরণকে জিজ্ঞেস করলেই ছোট্ট উত্তর— ‘যতদিন বাঁচি…’

আরও অনেকদিন বাঁচুন, সুস্থ থাকুন কিরণ কামদার। জেলা মফস্বল হাসপাতাল তার স্বভাবগত মরবিডিটি, অসহায়তা থেকে সামান্যক্ষণের জন্য হলেও আলো পাক এক মানুষকে দেখে, তার হাতে তৈরি হলুদ ভাতডালের মিশেল সোনালি আশার দিকে চেয়ে। সেই আশা জারি থাকুক…

____

*আগ্রহীরা কিরণ কামদারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন 9322439645 নম্বরে। আর্থিক সাহায্যের জন্য ইউপিআই আইডি— kirankamdar61@okicici

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অসামান্য এই খবর। প্রায় অবিশ্বাস্য এই উদ্যোগ। জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা।

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.