কান্না-ভেজা ডিটেনশন সেন্টার— রাজনীতি ও মেডিসিনের যুগলবন্দি?

কান্না-ভেজা ডিটেনশন সেন্টার— রাজনীতি ও মেডিসিনের যুগলবন্দি? -- জয়ন্ত ভট্টাচার্য

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

 



চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য-কর্মী, প্রাবন্ধিক

 

 

 

ইন্ডিয়া টুডে সংবাদপত্রের (মার্চ ৩, ২০২১) একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম— “BJP in a fix as Opposition parties thrust voter polarisation over NRC-CAA”। সংবাদের শিরোনামটিই প্রতিবেদনের অন্তর্বস্তু বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। এর কিছুদিন আগে ডেকান হেরাল্ড সংবাদপত্রে (১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১) একটি খবর ছিল— Why BJP is silent on CAA, NRC ahead of Assam polls।

কিন্তু ২০১৯ সালের কথা স্মরণ করুন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকার খবর (আগস্ট ১৭, ২০১৯) হয়েছিল— “India Plans Big Detention Camps for Migrants. Muslims are Afraid”। এ খবরে বলা হয়েছিল— “ভারতে ৪০ লক্ষের বেশি মানুষ যাদের অধিকাংশ মুসলিম, বিদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার বিপদের মধ্যে রয়েছে। যেহেতু সরকার একটি কঠোর হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডাকে অনুসরণ করে দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং ভারতীয় বলতে কী বোঝায় এই সংজ্ঞাকে পুনর্নির্ধারিত করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে।” আরও বলা হল— “হিন্দুগরিষ্ঠ দেশের এক বড় অংশের হিব্দু মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতির বিরোধিতা করছে না। তারা এগুলোর প্রশংসা করছে বিশ্বের কাছে ভারতের পৌরুষদীপ্ত ছবি তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি দারিদ্র্য দূর করার লড়াই করছেন এসব ধরে নিয়ে … বিজেপি শুধু অসমেই থামতে চায় না।”

ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় (১৫.০২.২০২১) প্রকাশিত হল “Inside Assam’s Detention Camps: How the Current Citizenship Crisis Disenfranchises Indians” শীর্ষক প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধে জোর দিয়ে বলা হল—

এখনও অব্দি যাদেরকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে তার প্রত্যক্ষ কারণ এনআরসি নয়, বরং ডি-ভোটার এবং রেফারেন্স কেস হিসেবে। ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় মানুষকে নির্বাচনী তালিকায় ডি-ভোটার বানানোর মধ্য দিয়ে। এটা পছন্দমতো বাছাই করে হয়, এবং অসমভাবে মুসলিম এবং বাঙালি হিন্দুদের আক্রমণ করে।

আরও বলা হয়েছিল—

এনআরসি লক্ষ লক্ষ মানুষকে হয়রানি করেছে যার পরিণতিতে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষকে রাষ্ট্রহীনতার খাদের ধারে ঠেলে দিয়েছে। অধিকন্তু, বর্তমান শাসকদলের বাগাড়ম্বর থেকে বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হবে— কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে ঘোষণা করেছেন ভারতের সমস্ত রাজ্যে এনআরসি লাগু করা হবে, এবং বিপক্ষে অসংখ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ডিটেনশন সেন্টারের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।

সে এক অদ্ভুত শিউড়ে ওঠা সময়ের কাহিনি। আমরা সেই সময় অতিবাহিত করছি যখন আমাদের মনে পড়ে যায়—

পিচ্ছিল নেপথ্যে আজও রয়েছে মানুষ—
একা— নরক দর্শন করে,
তবু অন্ধ নয়, খোঁড়া নয়;
রক্ত মাংস কর্দমের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে, নদী সাঁতরিয়ে
নরক উত্তীর্ণ হতে ক্লান্তিহীন যাত্রা তার।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তামাম ভারতবাসীকে স্বস্তিবচন শুনিয়েছেন যে ভারতে কোনও ডিটেনশন সেন্টার নেই। ফলে প্রায় কুড়ি লক্ষ অসমবাসী বা ভারতবাসী (অন্তত এতদিন অব্দি এ কথাই জানত) যে ডিটেনশন সেন্টারে যাওয়ার দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছে তাদের আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্তত এমনটাই তো মনে হয় এরকম স্বস্তিবচন শুনে। আমরা তো বিশ্বাসী জনতা, বিশ্বাস করে বুকে বল পাই, দেহের মাঝে কীরকম একটা বাহুবলী ধরনের অ্যাড্রেনালিন-সঞ্জাত অনুভূতি প্রবাহিত হতে শুরু করে। আমাদের বুকে হিল্লোল ওঠে—

হাসছি মোরা হাসছি দেখ,
হাসছি মোরা আহ্লাদী,
তিনজনেতে জটলা ক’রে
ফোকলা হাসির পাল্লা দি।
হাসতে হাসতে আসছে দাদা,
আসছি আমি, আসছে ভাই,
হাসছি কেন কেউ জানে না,
পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই।

এরকম হাসি নিয়ে ভরসা করেই তো স্বাধীনতার তথা সাম্প্রদায়িকতায় বিক্ষত দেশভাগের ৭২ বছর পরেও পরম নিশ্চিন্তে বেঁচেই আছি। আমরা রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে সর্বত্র ভরসাকে খুঁজে বেড়াই—

আমরা তো এতেই খুশি;
বলো আর অধিক কে চায়?
হেসে খেলে,
কষ্ট করে আমাদের দিন চলে যায়।

অবশ্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্ত বড় সংবাদপত্র ও মাধ্যমের খবর অনুযায়ী অসমে এই মুহূর্তে ৬টি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জেলের মধ্যে— গোয়ালপাড়া, কোকরাঝার, তেজপু্‌র, ডিব্রুগর আর শিলচরে। যদি না-ডিটেনশন সেন্টারকে সত্যি বলে ধরে নেওয়া যায় তাহলে হিসেব বলছে এই কারাগারের দেয়াল ২২ ফুট উঁচু, কংক্রিটের তৈরি। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের হঠাৎ করে না-নাগরিক না-ভোটার হয়ে যাওয়ার পরেও, কয়েক হাজার মানুষের ডিটেনশন সেন্টারে যাত্রার পরেও আমরা আমাদের সংশয় অতিক্রম করে আমরা বিশ্বাস করে শান্তি পাচ্ছি এই জেনে যে ভারতে কোনও ডিটেনশন সেন্টার নেই, মন্ত্রিসভায় কোনওদিন এনআরসি নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমরা ভীরু, নিরুপদ্রব, নিরীহ গোবেচারা গোছের সব স্তরের বা দরিদ্র মধ্যবিত্ত মানুষ। সর্বশক্তিমানদের কথায় অবিশ্বাস করে আমাদের লাভ কী? আর সবচেয়ে বড় কথা হল— “আমরা তো সামান্য লোক/ আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।” যদিও ৫.০১.২০২০ অব্দি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী ২৯ জন “সামান্য লোক” শুধু না-নাগরিক/না-ভোটার হওয়ার কারণে না-ডিটেনশন সেন্টারে মারা গিয়েছে।

আমাদের কথা ভেবেই তো শঙ্খ ঘোষ (কি মুশকিল! তিনি আবার আমাদের বিবেকের প্রতিনিধিত্বও করছেন ঋজু স্বরে) সেই কবে লিখেছিলেন—

পেটের কাছে উঁচিয়ে আছ ছুরি
কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি
এখন সবই শান্ত, সবই ভালো।
তরল আগুন ভরে পাকস্থলী
যে-কথাটাই বলাতে চাও বলি
সত্য এবার হয়েছে জমকালো।
গলায় যদি ঝুলিয়ে দাও পাথর
হালকা হাওয়ায় গন্ধ সে তো আতর
তাই নিয়ে যাই অবাধ জলস্রোতে–

সন্ত্রাস, ত্রাস এসমস্ত উস্কানিমূলক অবান্তর কথাবার্তায় একেবারে আমল দেননি শঙ্খ ঘোষ। নিতান্ত মোলায়েম গলায় আমাদেরকে জানিয়ে দিলেন—

নেই কোনও সন্ত্রাস
ত্রাস যদি কেউ বলিস তাদের ঘটবে সর্বনাশ–
ঘাস বিচালি ঘাস
ঘাস বিচালি ঘাস।

 

বাস্তবতার আরও কিছু দিক

১লা জানুয়ারি, ২০২০— একেবারে বছর শুরুর দিনে— অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী দুই অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এস্থার ডুফলো ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রে লিখলেন “CAA, NRC introduce meddlesome officialdom into a question as fundamental as citizenship.” তাঁদের পর্যবেক্ষণে ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন “maximum governance, minimum government” তথা “সর্বাধিক প্রশাসন, ন্যূনতম সরকার”-এর শ্লোগান দিয়ে। সর্বাধিক প্রশাসনের মধ্যে কেউ হয়তো বেন্থামের প্যান-অপ্টিকনের প্রতিধ্বনি শুনতে পান। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। কথা হল সরকার জনজীবনে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এবং নাগরিক সমাজে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ করবে। কিন্তু প্রশাসন সর্বত্র দেখাশোনা করবে। সে দেখাশোনার একটি অঙ্গই হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি। বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডুফলো আরও প্রাঞ্জলভাবে বিষ্যটিকে ব্যাখ্যা করলেন এভাবে— “আমরা যারা সার্ভের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিলাম, তারা জানি যে উত্তরদাতাদের কাছ থেকে সঠিক উত্তর পাওয়া কত কঠিন হতে পারে। আমাদের মনে আছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বছর কুড়ির মহিলার কথা। তিনি সেখানেই জন্মেছিলেন। “এ গ্রামে নয়”, দক্ষিণ বা পূর্ব দিতে হাত দেখিয়ে “ওই দিকে, দু-এক ঘণ্টা দূরে।” আপনি এখানে এলেন কী করে? “আমার মা ছিল পাশের গ্রামের, মায়ের বিয়ে হয়েছিল যে গ্রামে আমি জন্মেছিলাম, সেইখানে। কিন্তু আমার বাবা আবার বিয়ে করে, আমাদের বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেয়। আমার বয়স তখন ছয় কিংবা আট। আমরা আমাদের গ্রামে ফেরত যাই, কিন্তু আমাদের মামারা আমাদের নিতে চায়নি। শেষে এ গ্রামের এক মহিলা আমাদের একটা ঠাঁই দিয়েছিলেন।” গ্রামের নামটা বলতে পারবেন? “মা জানত, কিন্তু মা তো মরে গেছে!” আমরা জন্মস্থানের জায়গায় অজ্ঞাত কোড বসিয়েছিলাম (যদ্দূর মনে পড়ে ৯৯৯৯)। প্রত্যাশা করা হচ্ছে এনআরসির সময়ে নিজের নাগরিকত্বের মর্যাদা স্থির করবার জন্য এই মহিলা তাঁর সম্পর্কে সমস্ত তথ্য দিতে পারবেন। আর যদি তিনি না সেসব তথ্য না দিতে পারেন, তাহলে তো হাতে রইল সিএএ— অভিবাসী, হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও জৈনদের জন্য। মুসলিমদের জন্য নয়।”

তাহলে এদেশের মাটিতে, বাতাসে, জলে-জমিতে, পাড়ার সবার সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা মানুষগুলো হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করল যে তারা রাষ্ট্রহীন। কিছু সরকারি আধিকারিক তাদের সর্বশক্তিমান আমলাতন্ত্রের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রহীনতা নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকারী হল। ওঁরা বলছেন— “আমাদের ফিল্ড ওয়ার্ক থেকে আমরা যা শিখেছি, তাতে এ এক ভয়াবহ জুয়া।” আরও বললেন— “এর মধ্যে কোনও ন্যূনতম সরকার বা সর্বোচ্চ প্রশাসনের ব্যাপার নেই। এ হল মানুষের নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার প্রশ্নে অবাঞ্ছিত সরকারি হস্তক্ষেপ। যদি তুমি দেশের নাগরিক না হও, তাহলে এতদিন তুমি কোথায় বাঁচলে? কেউ যদি তোমাকে না চায়, তাহলে তুমি কে? এ প্রশ্নটাই বহু তরুণ-তরুণীকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।”

কীসের ভয় পাচ্ছে সরকার? অনেকে উদ্বাস্তু তথা রাষ্ট্রহীন হলে বাকিদের অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ কিংবা ন্যায়বিচারের সুযোগ বাড়বে? অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলে এমনটা ঘটে না। কী ঘটে তাহলে? সে কথা আমরা খানিকটা পরে আলোচনা করব। ওঁদেরই কথায়— “অভিবাসন নিয়ে এই যে প্যারানোইয়া, তা হল এমন এক দৈত্য, যাকে পত্রপাঠ বোতলে ভরে ফেলা উচিত।”

তারপর? ওঁদের বক্তব্য শেষ করছেন— “ভারতের প্রয়োজন সেই দর্শনকে আলিঙ্গন করা যেখানে ভারত বহু সভ্যতার জননী। যাঁরা গণতান্ত্রিক, খোলামেলা, সহিষ্ণু, সকলকে গ্রহণ করতে সক্ষম হিসেবে যাঁরা জাতীয় উদ্যোগে যোগ দিয়েছেন, তেমন সকলের জন্য আমরা দরজা খুলে দেব না কেন! কেন দরজা খুলে দেব না পাকিস্তানের নিপীড়িত আহমেদি ও শ্রীলঙ্কার হিন্দুদের জন্য! আমরা ১.৩ বিলিয়ন মানুষ, আর কয়েক মিলিয়ন নিমেষে মিশে যাবে। আমরা সত্যিই সারা বিশ্বের ধ্রুবতারা হয়ে উঠব।”

এ আশাবাদ ভারতের কোটি কোটি জনতা এখনও হৃদয়ে ধারণ করার মতো পরিস্থিতিতে নেই। ভারতের তিনটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের— জেএনইউ, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামিয়া মিলিয়া— ছাত্রছাত্রীরা যখন পুলিশের বেধড়ক লাঠির বাড়ি খায়, রক্তাক্ত হয়, অঙ্গহানি ঘটে, যখন উত্তরপ্রদেশের অহিন্দু মানুষ একের পরে এক গুলি খেয়ে মরে যায়, কয়েক হাজার জেলবন্দি হয় নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে, যখন রামচন্দ্র গুহ কিংবা প্রিয়াঙ্কা গান্ধিও বাদ যান না তখন এ আশাবাদ ধারণ করা অসম্ভব এক বাস্তব হয়ে ওঠে।

একটি সমাজে, বিশেষ করে স্ট্রেসের সময়ে, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, সুরক্ষার বোধ এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার আনন্দ কতকগুলো বিষয়ের ওপরে নির্ভরশীল। গবেষকেরা দেখিয়েছেন একটি social support system বা সামাজিক অবলম্বন দেয় যে সমাজব্যবস্থা তা নির্ভর করে— (১) আবেগময় অবলম্বন, (২) আশার আলো, (৩) পেছনের দিকে না তাকিয়ে সামনে কি সম্পদ আছে তার দিকে তাকানো, (৪) কি কি চ্যালেঞ্জ রয়েছে জীবনে সেগুলোকে খুঁজে বার করা এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম ঠিক করা, (৫) একজন মানবসন্তানকে তার নিজের আভ্যন্তরীণ অনুভূতি অকপটে খুলে ধরার পরিসর তৈরি করা, (৬) সামাজিক স্ট্রেসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বিকল্প পথের সন্ধান দেওয়া, (৭) বিশেষ মানুষটিকে স্মরণ করানো তার সঙ্কটপূর্ব অস্তিত্বের কথা, এবং (৮) পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য উৎসাহ জোগানো। আমরা একটু তলিয়ে দেখলে বুঝব এধরনের পদ্ধতিগুলো হয়তো বা এমনকি হিটলারের কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পের ক্ষেত্রেও সত্যি হতে পারে। ইউরোপে মোটের উপরে সমধর্মী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাকাঠামো, সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে যারা তাদের ক্ষেত্রে একথাগুলোর তবু কিছু অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু অসমের বা ভারতের যেকোনও অঞ্চলের দরিদ্র, সামাজিক সুযোগ (entitlements and empowerment) থেকে বঞ্চিত পাঁচমেশালি অবস্থানের মানুষগুলোর ক্ষেত্রে এগুলো কী ভূমিকা পালন করবে? আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইউরোপ প্রায় ২০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে নেশন-স্টেট হিসেবে গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে নাগরিক হওয়ার ধারণা, নাগরিকত্বের ধারণা। আমাদের সমাজে এখনও সমূহের শক্তি ও প্রাণোচ্ছলতা (community resilience) ব্যক্তির চাইতে বেশি। এজন্য না-নাগরিকত্ব যে কী সে বিষয়টাই যারা “নিজভূমে পরবাসী” তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। সব হারানোর যন্ত্রণা বা suffering-এর মধ্য দিয়ে ভাসাভাসাভাবে বোঝার চেষ্টা করে ভোটার কার্ড দেখিয়ে ভোট দিলেও এবং সরকারের তথা রাষ্ট্রের দেওয়া আধার কার্ড থাকলেও না-ভোটার হয়ে গেল কী করে? তাহলে যে ভোটার কার্ড দিয়ে এখনকার আইনপ্রণেতাদের নির্বাচিত করেছিলাম তাহলে তারাও না-ভোটার হয়ে যাবে? ওদের মনে হয়তো প্রশ্ন আসে, আবার মিলিয়েও যায়। ফলে সমগ্র দেশের অধিকাংশ ভারতবাসীর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে তা ওরা হয়তো ভেবে উঠতেও পারে না। গবেষণা দেখিয়েছে, যেমনটা মাইকেল মার্মট তাঁর The Health Gap গ্রন্থে বলছেন, যে যেসব কমিউনিটি তাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পেরেছে এবং সমবেতভাবে ভবিষ্যৎকে নিজেদের মতো করে গড়ে নিতে পেরেছে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক কম।

ডিটেনশন সেন্টারের মধ্য দিয়ে যেখানে ভারতের জল-হাওয়া-বাতাস-মাটিতে সিঞ্চিত, এতদিন ধরে একটু একটু করে তৈরি ভারতীয় সমাজের সমাজবদ্ধতার বিশিষ্টতাই ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে সেখানে আরও অনেক বেশি মানুষ আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকবে এটা খুব অপ্রত্যাশিত নয়। এখানে ফ্যাসিস্ট জার্মানি বা ইতালির সঙ্গে ভারতের একটি পার্থক্য আপাতত রয়েছে। ওখানে racial extermination (অর্থাৎ জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া) হয়েছিল, ভারতে তা এখনও ঘটেনি। এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে সরাসরি মেরে ফেলা বা নিকেশ করা হচ্ছে না। এখানে বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে তোলা হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতে রাষ্ট্র তৈরির ঐতিহাসিক মেকানিজমের ফলে কমিউনিটি ভেঙে নাগরিক তৈরি হয়েছে, ব্যক্তির উদ্ভব হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে। লক্ষ-কোটি ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। আর এদেশে নর্মদা বাঁধ তৈরি বা বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি বসানোর সময়ে কয়েক লক্ষ মানুষ ওয়াটার রিফিউজি হয়েছে। সাংস্কৃতিক, সামাজিক ভূমি থেকে উন্মূল হয়ে গেছে, কিন্তু অসমের মতো (এবং ভবিষ্যতে সমগ্র ভারতবর্ষেই হয়তো) না-ভোটার, দেশের মধ্যে থেকে দেশহারা হয়ে যায়নি। এরকম বাস্তুচ্যুত মানুষদের (যদিও নিজের দেশেই তারা না-ভোটার কিনা অনেক গবেষণাপত্রেই আসেনি) অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় মিহি করে বলা হয় internally displaced persons (IDPs) বা নিজভূমে পরবাসী মানুষ। মান্য গবেষণা পত্রিকা PLoS-এর এক হিসেবে পাচ্ছি ২০১১ সাল অবধি UNHCR (United Nations High Commissioner for Refugees) গোটা পৃথিবী জুড়ে এরকম ১৫,৬২৮,০৫৭ জন মানুষকে উদ্ধার করেছে। আর ভারতের একটি রাজ্যেই এ সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ। এবং এটা ভারতের নিজস্ব সমস্যা হিসেবে গৃহীত বলেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের পরিসর আপাতত প্রায় কিছুই নেই। এ এক অনন্যসাধারণ অবস্থা যা ভারতের জনবিন্যাস, সামজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন চিরদিনের মতো বদলে দেবে। আনুগত্য আদায়ের নতুন governance হিসেবে কাজ করবে। এরকম ঘটনা ইউরোপের কোনও দেশেই কখনও ঘটেনি। এক নতুন ইতিহাসের জনক এই প্রক্রিয়া।

হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি হয়েছিলেন মনস্তত্ত্ববিদ চিকিৎসক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেল। অদ্ভুতভাবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে মুক্তও হন গ্যাস চেম্বারে না গিয়ে। তাঁর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন বিখ্যাত গ্রন্থ Man’s Search for Meaning। এ বইয়ে এক জায়গায় মানুষের চরিত্রের বিশিষ্টতা নিয়ে বলছেন— “…sometimes he does not even know what he wishes to do. Instead, he either wishes to do what other people do (conformism) or does what other people wish him to do (totalitarianism).” আরেক জায়গায় বলছেন— “intenfication of inner life helped the prisoner find a refuge from the emptiness, desolation and spiritual poverty of his existence, by letting him escape into the past.” গ্যাস চেম্বারে প্রবেশের আগেও ফ্রাঙ্কেল বন্দিদের inner life-কে তীব্র করে বেঁচে থাকার বিশেষ অর্থ তৈরি করতে চেয়েছেন, এবং খানিকটা সফলও হয়েছেন। কিন্তু গোয়ালপাড়া ক্যাম্পের ২৯তম মৃত নির্মল কোচ? তার জীবনের কি অর্থ ছিল তার কাছে, একমাত্র পরিবারের সঙ্গে সহস্র প্রতিকূলতার মাঝেও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ছাড়া! মৃত্যুর পরে একজন না-ভোটার হিসেবে ১৩০-৩২ কোটি ভারতবাসীর মধ্য থেকে কেবলমাত্র খসে গেল। আর এসবে আমাদের কীই বা এসে যায়?

এরকম এক পরিস্থিতিতে ফ্রাঙ্কেল যা বলেছেন বা স্ট্রেসের পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য যে পদ্ধতিগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলোই কতটুকুই বা এখানে বাস্তবে কার্যকর? এখানে সঙ্গতভাবেই উল্লেখ করা যায় ফ্রাঙ্কেলের আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা। তিনি যখন প্রথম ক্যাম্পে ঢোকেন তখন আরেক বন্দি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রতিদিন যেন গাল, মুখ পরিচ্ছন্ন থাকে। রোজ যেন দাড়ি কাটেন। কারণ? নাহলে তাঁকে মুসলিমদের মতো দেখাবে— Do you know what you mean by a ‘Moslem’? A man who looks miserable, down and out, sick and emaciated, and who cannot manage hard physical labor any longer … that is ‘Moslem’. Sooner or later, usually sooner, every ‘Moslem’ goes to the gas chamber. কিমাশ্চর্যম! এরকম miserable, emaciated, sick মানুষগুলোও আগে গ্যাস চেম্বারে ঢোকে! কারণ তাদের পরিচয়-চিহ্ন হল দাড়ি। এ যেন বর্তমান ভারতবর্ষে পোষাক দিয়ে চেনার মতো ব্যাপার। এবং উভয়ক্ষেত্রেই হতভাগ্য জীবটি ধর্মের দিক থেকে মুসলিম।

আরেকটা ঘটনার কথা স্মরণ করা যায়। পোল্যান্ডের শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন জানুস করজাক (Janus Korczak)। তিনি ৮ জন শিশুকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর হাত থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি সফল হননি। তিনি নিজে তাঁর পরম স্নেহের শিশুদের নিয়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যাত্রার ৪ দিন আগে, ১৮ জুলাই, ১৯৪৪-এ শিশুদের দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকের ইংরেজি অনুবাদ The Post Office (হিটলারের জমানায় নিষিদ্ধ ছিল জার্মানিতে) অভিনীত করান। করজাক বলেছিলেন যে এ নাটক অভিনয়ের উদ্দেশ্য ছিল ওই শিশুগুলো যেন ডাকঘরের অমলের মতো আনন্দ নিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে পারে। করজাকের লেখা Ghetto Diary এক সহৃদয় রক্ষী মারফত বাইরে আসে এবং পরে প্রকাশিত হয়। সে ডায়ারিতে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। আমাদের ডিটেনশন সেন্টারের মাঝে এ কাহিনি কি কোথাও সন্নিবিষ্ট হতে পারে? এ তো ইউরোপীয় “এনলাইটেনড” নাগরিক নয়— বিপরীতে, অর্ধভুক্ত হতাশ্বাস নিঃসহায় প্রায়-অশিক্ষিত জনপিণ্ড!

এখানে স্বতন্ত্র একটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় চিনের ডিটেনশন সেন্টার নিয়ে কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮-তে প্রকাশিত নিবন্ধের শিরোনাম— China’s Detention Camps for Muslims Turn to Forced Labor। এ লেখায় বলা হল যে এই ক্যাম্পগুলো “…holds Muslims and forces them to renounce religious peity and pledge to the party … The program aims to transform scattered Uighurs, Kazakhs and other ethnic minorities … into a disciplined, Chinese-speaking industrial work force, loyal to the Communist party and factory bosses, according to the official plans published online.” আমেরিকার প্রচারমাধ্যম বলে পুরোপুরি মেনে নিতে খানিকটা অস্বস্তি হয় বটে, কিন্তু আমাদের দেশের সঙ্গে কোথাও একটা সাযুজ্য দেখা যায়। একই পত্রিকায় ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৯-এ প্রকাশিত নিবন্ধের শিরোনাম— Inside china’s Push to Turn Muslim Minorities Into an Army of Workers। এ লেখায় বলা হল এই ক্যাম্পগুলো “crucial to the government’s strategy of social re-engineering alongside the indoctrination camps”। কী হয় এই ক্যাম্পগুলোতে? Ouartz পত্রিকায় ২১ অক্টোবর, ২০১৯-এ প্রকাশিত একটি খবর বলছে চিনে সস্তায় তৈরি কাপড়ের পোশাক আমেরিকায় বিক্রি হয়। বেশিরভাগ পোশাক তৈরি হয় এসমস্ত ক্যাম্পে। বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টার থেকে জানানো হচ্ছে— China: Ethnic minorities detained in internment camps reportedly subject to the forced labour in factories supplying to major apparel brands. আন্তর্জাতিক মানে অনৈতিকভাবে তৈরি হওয়া এসব সুতির পোশাকের আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আমেরিকায় বিভিন্ন সংগঠন সরকারি-বেসরকারি স্তরে চাপও দিচ্ছে।

অনেকেরই হয়তো নজরে পড়েছে কদিন আগে ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবর— কাশ্মিরে ৫৭,০০০ একর জমি সরকার নেবে শিল্প গড়ে তোলার জন্য। আমরা যদি রাজনৈতিক ক্রমকে একটু ভালো করে নজর করি তাহলে ঘটনাগুলো পরপর এরকম— আগস্টে কাশ্মিরের জমির রক্ষাকবচ তুলে নেওয়া হল, ডিসেম্বরে বিপুল পরিমাণ জমি চিহ্নিত করা হল। কে নেবে এই জমি? কে গড়বে শিল্প? স্মরণে রাখব ভারতের অর্থনীতির এরকম মন্দার বাজারেও মুকেশ আম্বানির পুঁজি ২০১৭-তে ৪ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ২০১৯-এ ১০ লক্ষ কোটি হয়েছে— প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে কি ব্যাপারটা এরকম যে কর্পোরেটদের জন্য ৩৭০ ধারা বাতিল করা হল যাতে কাশ্মিরে পুঁজি প্রবেশ করতে পারে যার ফলে হয়তো কাশ্মিরের ডেমোগ্রাফি এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র চিরদিনের মতো বদলে যাবে। এরকম প্রেক্ষিতে নির্মীয়মান ডিটেনশন সেন্টারগুলো কি চিনের মতো forced labor camp হয়ে উঠবে কর্পোরেট মুনাফার জোগান দিতে? আশঙ্কা কি অমূলক?

 

মেডিসিনের চোখ দিয়ে

আমাদের আলোচনার পরের অংশটুকুতে মূল ঝোঁক থাকবে এরকম বাস্তুচ্যুত, অবলম্বনহীন মানুষদের বাস্তব অবস্থা, নিঃসহায় suffering বা ক্লিষ্টতা, এদের জীবনের নিঃশেষিত নির্বাপিত সমস্ত আশা আর ভরসাকে মেডিসিনের চোখ দিয়ে কীভাবে দেখব। আমাদের দেশে চিকিৎসকেদের, কিছু ব্যতিক্রমী অসরকারি চিকিৎসক ছাড়া, রাষ্ট্রকে অতিক্রম করে কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে গিয়ে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান বা তদন্ত চালানোর আগ্রহ রাখেন না কিংবা সফল কোনও পদক্ষেপ নিতে আদৌ প্রস্তুত নন। অথচ আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার ডাক্তারদের সংগঠনের মতো সংগঠনগুলো মৃত্যুদণ্ড থেকে বন্দিদের ওপর অত্যাচার নিয়ে খুব নির্দিষ্টভাবে নিজেদের ভিন্ন অবস্থান ব্যক্ত করে সরকারি সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে কিংবা স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করে।

আগে উল্লেখিত সুবিখ্যাত জনস্বাস্থ্য গবেষক মাইকেল মার্মট (যিনি social determinants of health-এর ধারণার অন্যতম প্রবক্তাও বটে) তাঁর দ্য হেলথ গ্যাপ পুস্তকে ডাক্তারদের স্মরণ করান—

As doctors we are trained to treat the sick. Of course; but if behaviour, and health, are linked to people’s social conditions, I asked myself whose job it should be improve social social conditions. Should not be the doctor, or at least this doctor, be involved?

(চিকিৎসক হিসেবে আমাদের প্রশিক্ষণ হয়েছে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা করার জন্য। অবশ্যই, কিন্তু যদি আচরণ এবং স্বাস্থ্য যদি সাধারণ মানুষের সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে তাহলে? আমি নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো কার দায়িত্ব। এতে কি ডাক্তারদের কিংবা অন্ততপক্ষে একজন ব্যক্তি চিকিৎসকের ভূমিকা থাকবে না?)

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮-তে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল “The Violece of Uncertainty— Undermining Immigrant and Refugee Health” শিরোনামে। এখানে দু ধরনের হিংসা বা ভায়োলেন্সের কথা বলা হয়েছে— প্রথম, পল ফার্মার তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ Pathologies of Power যেমনটা বলেছেন স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স বা কাঠামোগত হিংসা; দ্বিতীয়, ভায়োলেন্স অফ আনসেরটেইন্টি বা অনিশ্চয়তার হিংসা। কেমন এদের চেহারা? যখন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তিসমূহ রোগের জন্ম দেয় বা রোগের রিস্ক ফ্যাক্টর বেড়ে যায় তাকে বলা হচ্ছে স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স। এরকম বিশেষ ধরনের হিংসার ফলে সমগ্র দেশ একটি জীবন্ত ল্যাবরেটরি হয়ে ওঠে। অমর্ত্য সেন এ বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বিষয়টি আরেকটু বিশদে ব্যাখ্যা করেন। সে ব্যাখ্যা অনুসরণ করে আমরা বলতে পারি এই যে না-নাগরিক/না-ভোটার মানুষেরা নিজের আত্মপরিচয় সহ সবকিছু খুইয়ে ডিটেনশন সেন্টারে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে সেক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রকট এবং শক্তিশালী চালক হিসেবে থাকে সামাজিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে অসাম্য এবং অবিচার। এখানে যে যে শক্তিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে— দানবীয় রাষ্ট্রশক্তি, অনুভূতিহীন আমলাতন্ত্র, সমাজে শ্রেণিবিন্যাসের অতলান্ত তারতম্য। একেই বলা হচ্ছে স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স। পরিণতি?

এখানে আসে দ্বিতীয় সমস্যা— ভায়োলেন্স অফ আনসেরটেইন্টি বা অনিশ্চয়তার হিংসা। The Violece of Uncertainty— Undermining Immigrant and Refugee Health-এর লেখকেরা জানাচ্ছেন যে এখন আমরা আরেকটি নতুন চরিত্রের এবং কাঠামোগত হিংসা দেখছি— form of violence inflicted on these groups, enacted through systematic personal, social, and institutional instability that exacerbates inequality and injects fear into the most basic of daily interactions. We refer to such violence as “the violence of uncertainty.” রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এ হিংসা চিরস্থায়ী চেহারা নেয়। ওঁদের পর্যবেক্ষণে, “Even naturalized citizens fear that their status is no longer secure. These are not unfounded fears.” যারা জন্ম থেকেই স্বাভাবিকভাবে এদেশের নাগরিক তাদের মাঝেও অনিশ্চয়তার ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এ এমন এক পরিস্থিতি যখন পাশের বাড়ির প্রতিবেশী কিংবা ঘনিষ্ঠতম বন্ধুও কোনও সাহায্য করতে পারে না, পারবে না। তাহলে এমন এক অন্তহীন দুশ্চিন্তার পরিস্থিতি হল যা “affecting all social determinants of health and injects more uncertainty into communities that are already precarious.” এ অবস্থায় যে রোগটি সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে তাকে আমরা ডাক্তারি পরিভাষায় বলি post-traumatic stress disorder বা PTSD। একবার ভাবার চেষ্টা করি সেই পরিস্থিতির কথা যেখানে সন্তানকে ডিটেনশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মা বাবা বাড়িতে। কিংবা এর উল্টোটা। যে নীতি-নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই সামাজিক ভীতি ও অনিশ্চয়তার জন্ম হল এর ফলে লেখকদের মতো আমাদেরও মনে হয় “these challenges will outlive the policies that created them.” প্রসঙ্গত বলার যে একইরকম PTSD-তে বছরের পর বছর ধরে ভুগছে কাশ্মির, সিরিয়া, লেবানন এবং অন্য অনেক জায়গার শিশু এবং মানুষ।

এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের অবস্থান কী হবে? পল ফার্মার অন্য একটি প্রবন্ধে বলছেন— Careful assessment of severity is important, at least to physicians, who must practice triage and referral daily. আমাদের ভারতবর্ষের বিশেষ পরিস্থিতিতে ডাক্তাররা যাবেন তো? তাদেরকে রোগী দেখার প্রবেশিধিকার দেওয়া হবে তো? দেবে রাষ্ট্র এবং প্রশাসন?

Rebecca Chopp তাঁর The Praxis of Suffering গ্রন্থে লিখছেন—

ইতিহাস কেঁপে কেঁপে ওঠে, অতিবৃহৎ সব ঘটনা দিয়ে বিদ্ধ হয় জনতার suffering বা ক্লিষ্টতা, স্মৃতিকে তাড়া করে ফেরে ইতিহাসের বলির পশুদের চুপিসার পদক্ষেপ … বুভুক্ষু মানুষের আর্তনাদ, রাজনৈতিক বন্দিদের সুতীক্ষ্ণ চিৎকার এবং নিপীড়িতের নিঃশব্দ স্বর আমাদের প্রাত্যহিক যাপনে ধীর গতিতে, যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

সত্যিই কি আমাদের দিনযাপনে, এমনকি চিকিৎসকদের দিনযাপনেও, মূক পশুর মতো অস্তিত্বে পর্যবসিত হওয়া মানুষের suffering বা PTSD কোনওভাবে তাড়িত করে? আমি নিশ্চিত নই। ২৯ জুন, ২০১৯-এ ল্যান্সেট জার্নালের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল “Refugee health is a crisis of our own making”। এ সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছিল—

Health is a right, not a privilege granted by circumstance of birthplace.

স্বাস্থ্য মানুষের একটি মৌলিক অধিকার, সৌভাগ্যক্রমে জন্মস্থানের সূত্রে পাওয়া কোনও সুবিধে নয়।

আজকের ভারতে মেডিসিনের পেশার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক এবং সমস্ত স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীর বোধহয় অনুভব করার সময় এসেছে ডিটেনশন সেন্টারের চরিত্র কী এবং ওখানকার মানুষদের জন্য আমাদের কী ভূমিকা হওয়া কাম্য। স্ক্রোল.ইন অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে (জানুয়ারি ৭, ২০২১) “The NRC in Assam doesn’t just violate human rights of millions— it also breaks international law” শিরোনামে সংবাদ। সংবাদে বলা হল—

এপ্রিল, ২০২০-তে সুপ্রিম কোর্ট যারা ২ বছরের বেশি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি ছিল তাদের শর্তাধীন মুক্তি দিতে বলেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কোর্ট আইনের ভিত্তিতে ডিটেনশনের নীতিকে প্রশ্ন করেনি। সরকারের কাছে জানতে চায়নি অসমের জনগোষ্ঠীর মানুষদের একাংশ হাজার হাজার মানুষকে কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্দি করে রাখা হয়েছে, কেন বন্দি করে রাখা এত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল কিংবা জনস্বার্থে এর চেয়ে কম নিষ্করুণ কোনও পদ্ধতি কেন উদ্ভাবন করা যেত না।

রামচন্দ্র গুহ তাঁর সুবৃহৎ India after Gandhi পুস্তকে মির্জা গালিবের একটি কবিতা উদ্ধৃত করেছেন। আমাদের জন্য বর্তমান মুহূর্তে বড় প্রাসঙ্গিক সে কবিতা—

Sir, you well perceive,
Fidelity and love
Have all departed from this sorry land.

….
Why does not the Last Trumpet sound?
Who holds the reins of the Final Catastrophe?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

1 Trackback / Pingback

  1. ডি-ভোটারদের দেশে ভোট মহোৎসব – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply to Swapna Roy Cancel reply