বাছাই করা সিঙ্গল-ইউজ প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করায় দেখনদারি বেশি, কার্যকারিতা কম

সৌম্য দত্ত

 




লেখক রাষ্ট্রপুঞ্জের ক্লাইমেট টেকনোলজি সেন্টার অ্যান্ড অ্যান্ড নেটওয়ার্ক-এর অ্যাডভাইসরি বোর্ড মেম্বার, সাউথ এশিয়ান পিপলস অ্যাকশন অন ক্লাইমেট ক্রাইসিস-এর যুগ্ম কনভেনর, মৌসম ট্রাস্ট, ভারতীয় জনবিজ্ঞান জাঠা সহ বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত

 

 

 

ভারত সরকার ১ জুলাই থেকে কিছু বাছাই করা সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিক বা এসইউপি-র উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একটি নির্দিষ্ট পুরুত্বের কম প্লাস্টিক (মূলত পলিথিলিন) ব্যাগের ওপর আগে পর্যায়ক্রমে নেওয়া কিছু নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতাতেই এই সিদ্ধান্ত। খুবই স্বল্পসংখ্যক এসইউপি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে— প্লাস্টিক স্টিক লাগানো ইয়ার বাড, বেলুনের প্লাস্টিক স্টিক, প্লাস্টিক ক্যারি ব্যাগ, লজেন্সের কাঠি, আইসক্রিমের কাঠি, সাজানোর কাজে ব্যবহৃত পলিস্টাইরিন (থার্মোকল), প্লাস্টিকের প্লেট-কাপ-গ্লাস, ফর্ক-চামচ-ছুরি-স্ট্র-ট্রে জাতীয় কাটলারি সামগ্রী, মিষ্টির বাক্স বা সিগারেটের প্যাকেটের মোড়ক হিসেবে ব্যবহৃত প্লাস্টিক ফিল্ম, আমন্ত্রণপত্র, ১০০ মাইক্রনের নিচে প্লাস্টিক বা পিভিসি ব্যানার এবং পানীয় নাড়ানোর প্লাস্টিক স্টিক। তালিকাটি দেখলে আশ্চর্য হওয়া স্বাভাবিক। এই ইউজ-অ্যান্ড-থ্রো প্লাস্টিকগুলি যে পরিমাণে আবর্জনার জন্ম দেয় সেই তুলনায় এই তালিকায় প্রায় কিছুই নেই। সরকারের দাবি, এগুলিকে নিষিদ্ধ করা হল কারণ এদের পুনর্নবীকরণ প্রায় করাই যায় না, অন্যদিকে এগুলি ব্যাপক আবর্জনা তৈরি করতে সক্ষম। ঠিক কথা, কিন্তু এটাও ঠিক কথা যে একটা ওপর-ওপর খসড়া হিসেবেই দেখা যাচ্ছে যে দিনে যত এসইউপি ব্যবহার হয়, নিষিদ্ধ হওয়া জিনিসগুলি তার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। এসইউপি ব্যবহারের ক্ষেত্র যদি লাখে না-ও পৌঁছয়, কাছাকাছি তো হবেই। শুধু কোনও শহরের (এখন গ্রামেও) এইরকম প্লাস্টিক আবর্জনার স্তূপ যেখানে জমা হয় সেরকম কোথাও গেলেই আপনি দেখতে পাবেন যাদের ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস বা এফএমসিজি বলে সেগুলির কতরকম প্যাকেজিং-এ প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়।

 

রাঘববোয়ালদের ছেড়ে চুনোপুঁটিদের ঘাড়ে কোপ মারা হল

এই ‘ব্যান’-এর তালিকা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার— সরকার ছোট উৎপাদক এবং খুচরো ব্যবসায়ীদের তার শিকার হিসেবে নিশানা বানিয়েছে এবং, যথারীতি, এসইউপি যারা এক বিশাল স্কেলে উৎপাদন এবং ব্যবহার করে চলেছে, অর্থাৎ বড় এফএমসিজি এবং রিটেইল কোম্পানিগুলি, তাদের পরিষ্কার ছাড় দিয়েছে। কোনও একটা বড় রিটেইলের দোকানে ঢুকুন— বিস্কুট, টফি, চা, কফি, প্যাকেট করা মুদিখানার জিনিস— এসবে এরকম হাজার হাজার এসইউপি আপনার নজরে পড়বে। আর ঘটনা যেটা, সরল পলিথিলিন প্যাকেট বা ব্যাগগুলিকে আপনি তাও রিসাইকেল করে (একে ডাউন-সাইক্লিং বলে পরিভাষায়) যাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ তাঁদের ব্যবহার্য নানা জিনিস তৈরি করতে পারবেন। কিন্তু এফএমসিজি-গুলিতে যে প্লাস্টিক ব্যবহার হয়, সেগুলিকে এরকম রিসাইকেল করা প্রায় দুঃসাধ্য। এগুলিকে অ্যালুমিনাইজড প্লাস্টিক বলে, এবং এতে অনেকরকম বিষাক্ত রং-ও ব্যবহার হয়। চমকের বিষয়— এগুলি কিন্তু কিছুই নিষিদ্ধ হল না! অনেক বছর আগে একটা উদ্যোগের সূত্রে আমি আমার বেশ কিছু বিজ্ঞানী বন্ধুদের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা চালিয়েছিলাম। তাঁরা প্রায় সবাই এখন মার্কিন-নিবাসী, এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পেট্রোকেমিক্যালসে উচ্চস্তরের বিশেষজ্ঞ। তা তাঁদের সবারই মত হল সাধারণ-ভ্যানিলা পলিথিলিনকে (বা পলিথিন এবং কিছু অন্যান্য পলিমার) সহজেই পুনর্নবীকরণ করা যেতে পারে, কিন্তু অ্যালুমিনাইজড প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে সেটা এতটাই কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ যে কার্যত অসম্ভব। তাঁরা স্পষ্টতই একমত ছিলেন যে এগুলিকে রিসাইকেল করার চেষ্টা করার চেয়ে বন্ধ করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

 

তদারক এবং কার্যকর করার ব্যবস্থাপনায় গুরুতর গলদ রয়েছে

তবুও এই নিষেধাজ্ঞা যদি ঠিকভাবে কার্যকর করা যায় তবে স্বল্প হলেও অগ্রগতি হওয়া সম্ভব— কিন্তু এখানে একটি বড়সড় ‘যদি’ রয়েছে। যেসব জিনিস ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়, যদি তাদের বন্ধ করতে চাই তবে প্রথমেই দরকার তদারকি ব্যবস্থার একটি কার্যকরী পরিকাঠামো। ভারতের কিন্তু এ-বিষয়ে রেকর্ড খুবই খারাপ। আমাদের প্রচুর ভালো পরিবেশ-আইন এবং নির্দেশনামা রয়েছে। যদিও বর্তমান সরকার বিশ্বপুঁজি এবং তাদের চিয়ারলিডার বিশ্বব্যাঙ্কের ‘ব্যবসা সহজ করার’ আদেশ মেনে সেই আইনগুলিকে প্রায় সবই নষ্ট করতে বদ্ধপরিকর— তবে সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে আইনগুলি যথাযথ মানা হচ্ছে কি না তা তদারক করা এবং আইনগুলি কার্যকর করার একটি সক্রিয় ব্যবস্থা কায়েম করা। তা না হলে এরকম একটি তুঘলকি নিষেধাজ্ঞার পরিণতি আগের কিছু নিষেধাজ্ঞার মতোই হবে— সে ২০ মাইক্রনের নিচে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতোই হোক, ঘরোয়া এবং কারাখানাজাত কঠিন বর্জ্যগুলিকে বায়োডিগ্রেবল, নাকি তা নয় সেই নিরিখে ভাগ করার নির্দেশিকার মতোই হোক বা যানবাহনের দূষণবিধি মান্য করার নির্দেশনামার মতোই হোক। যদি একটা সঠিক বৈজ্ঞানিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম না থাকে তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা চলতে থাকবে এবং কিছু পুলিশ বা ইন্সপেক্টরের পকেট ভারী হবে— এটুকুই।

 

সুব্যবস্থিতভাবে সরকারি পরিষেবার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করা হয়েছে

মোটামুটি বিগত প্রায় দুই দশক ধরে সরকারগুলি সুচতুরভাবে তখনও অব্দি যেসব সাধারণ সরকারি পরিষেবাগুলি পাওয়া যেত, সেগুলিকে নষ্ট করেছে, এবং বেসরকারি ‘প্যাকেজড দ্রব্যাদি’র অনুপ্রবেশের পথ সুগম করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, গণ জল সরবরাহ ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলা। যার ফলে প্যাকেট করা বা বোতলে ভরা জলে দেশ ছেয়ে গেল, সমাজকে যার বিপুল মাশুল গুণতে হচ্ছে। সরকার কিছু এসইউপি নিষিদ্ধ করা নিয়ে এত কথা বলছে, কিন্তু এসইউপিদের যে এই বাড়বাড়ন্ত হল কেন, সেই গোড়ার কারণটায় কখনওই যেতে চাইছে না। বা হয়তো প্রকৃতপক্ষে সেটাকে গোপন করতে চাইছে। যদি শুধু বাড়িগুলিতেই নয়, পাবলিক স্পেসগুলিতেও একটি বিশ্বস্ত এবং সস্তা জল সরবরাহ ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এই কোটি কোটি ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতলের কোনও অস্তিত্বই থাকত না। ১০-১২ বছর আগেও রেলওয়ে স্টেশনগুলিতে পরিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ একটি সাধারণ ঘটনা ছিল। এই ধরনের গণ জল সরবরাহ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বদলে সরকার সেগুলিকে আরও বন্ধ করে দিচ্ছে, আর ব্যবসায়ীরা যাতে প্লাস্টিক বোতলে ভরা জল বিক্রি করতে পারে সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। খাবার-বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও গল্পটা একই। রেলওয়ে স্টেশনগুলিতে আগে খাবারের দোকানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। খুব দ্রুত হারে সেই নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেওয়া হল, এবং বড় বড় খাবার বিক্রেতা হাজির হয়ে গেল প্যাকেট করা খাবার নিয়ে। এখন সেই একই সরকার নামমাত্র কিছু প্যাকেট করা জিনিস নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আমাদের সামনে পরিবেশদরদী সাজতে চাইছে! এরকম লাখো উদাহরণ দেওয়া যায়, যেগুলি প্রমাণ করে সরকারের এই প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে অভিযান আসলে কতটা অন্তঃসারশূন্য।

 

বিপুল মাত্রায় এসইউপি-র বিকল্প কোথায়?

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— যেটা আদৌ কোনও গুরুত্ব পাচ্ছে না। সেটি হল এসইউপি-দের বিকল্প কী যেটা বিক্রেতা, উৎপাদক এবং পরিবহনকারীরা নিরাপদে ব্যবহার করতে পারে? এবং, অবশ্যই, এই বিপুল পরিমাণে? হ্যাঁ, গাছের পাতার প্লেট-কাপ-বাটি একটি প্রতিষ্ঠিত বিকল্প, এবং বিক্ষিপ্তভাবে এর কিছু উৎপাদনও হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এসইউপি-গুলি এই সমস্ত কাজে যে ব্যাপকতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, সেইরকম কোনও সাপ্লাই চেন এই জিনিসগুলির নেই। বড় শহরগুলিতে এই পাতার কাপ-প্লেটের সাপ্লায়ার আমাদের হাজার হাজার দরকার— কিন্তু কোথায় তারা? অন্য এসইউপিগুলির দিকে তাকালে তো ছবিটা আরও খারাপ। প্লাস্টিকের জলের বোতলের বাস্তব বিকল্প কী? গ্লাস নিরাপদ নয়, ব্যয়সাপেক্ষও— তবে? আমাদের সত্যিকারের যেসব হাজার হাজার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্লাস্টিক দিয়ে (আরও ভয়ানক— অ্যালুমিনাইজড প্লাস্টিক দিয়ে) প্যাকিং করা হচ্ছে, সেই প্যাকিং-এর বিকল্প কী? কাগজ বিকল্প হতে পারে না— এতে জিনিসগুলির শেলফ-লাইফ কমবে, ঠিকঠাকভাবে নাড়াচাড়া করাও যাবে না।

এই সমস্ত প্রশ্নগুলির গভীর বিশ্লেষণ, গভীর উপলব্ধি এবং সুপরিকল্পিত উত্তর চাই। সেসব পরিকল্পনা না করে এবং পরিকল্পনাগুলিকে যথাযথ কার্যকর না করে শুধু বাছাই কয়েকটি হাতে গোনা জিনিস নিষিদ্ধ করলে কিছু সস্তা হাততালি আর মিডিয়ায় কিছু ফুটেজ খাওয়া যায় বড় জোর— কিন্তু প্রসব হবে নেহাতই অশ্বডিম্ব।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply to হীরক সেনগুপ্ত Cancel reply