শ্রাবণঘনগহনমোহে

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

 

জানিস তো, সকলেরই নিজস্ব একটা শ্রাবণ থাকে, একটা নিজস্ব যমুনারঙের মেঘ। স্থান কাল বয়স ভেদে শুধু বদলে যায় সেই মেঘের গন্ধ। বা আরও গুছিয়ে বললে, মেঘগন্ধ মেখে ভারি হয়ে ওঠা বাতাস। খুব গোপন একটা বর্ষাকাল। বিশ্বাস কর, শ্রাবণজলের অবিশ্রান্ত ধারাপাত ইত্যাদি জাতীয় শব্ধবন্ধ খুলে খুলে যদি গলির মোড়ে জমে ওঠা ঘোলাজল আর কাদামাখা রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফেরার কথা বলিস, মনে করিয়ে দিস আমায় সোঁদা, স্যাঁতস্যাঁতে তোর চির অপছন্দের আবহটুকুও, তবু আমাকে একটু সরাতে পারবি না এই একান্ত প্রেম থেকে। ওই যে ফেরার পথগুলো আমাদের চিরকালীন আলতো ধুলোকে সামান্য লোনাজল মাখিয়ে ঘন করে তোলে, তাকেই কি কাদা নামে ডাকা? আমার সাদা চাদরের প্রতি ভালোবাসা নেই রে, তুই জানিস। নিতান্ত ধূসর আমি অনেকটা সাদাকালোমেঘলারোদ্দুর মাখামাখি শুধু মৃত্যুপরবর্তী সাদার তীব্রতায় বিশ্বাস করি যে! তুই তো আমাকে শ্রাবণ চেনালি এভাবে, মেঘদূতের অপেক্ষা শেখালি, জলভারনত চোখের অভিমান শেখালি। গোটা একটা বর্ষাকাল করে তুললি আমাকেই। গঙ্গা মহানন্দার শহরটায় সেই বর্ষা মানে জেনেছিলাম বিড়ম্বনা। প্রতি ঋতুবদলে ভাঙনের মাটি শহরের পায়ের তলা থেকে সরিয়ে নেওয়ার গল্প কিরকম বিষণ্ণ করে তুলত। খুব বৃষ্টির সেই দুপুরগুলো– ঘোরানো বারান্দার পাশে বোগেনভেলিয়ার গাছে ঘুঘু পাখির বাসায় ভিজে ঝুপসি মা পাখির ডানার নিচে ছানাদের দেখে হঠাত গলার ভিতর কান্না আটকে যেত জানিস– আমার মা-টা হয়তো স্কুলফেরত বাস না পেয়ে তুমুল ভিজছে তখন ফাঁকা রাস্তায়! এই দৃশ্যকল্পনা আমাকে আজীবন কাঁদিয়ে চলেছে আজও। একটা ছবি তৈরি হয়ে আছে কোথাও– ওই যে রে বলেছি তোকে অনেকবার– সবুজাভ কালচে একটা চরাচর আর সাদা সাদা বল্লমের মতো নেমে আসা বৃষ্টির একটা খাঁচায় কে যেন এদিক ওদিক দৌড়চ্ছে– মাটি থেকে আকাশ অব্দি সাদা আলো, শব্দহীন এঁকেবেঁকে উঠে আসছে নাকি নেমে যাচ্ছে! অনেক ভেবেও ওই শব্দহীনতার কারণ আমি পাই না। আর আমার সেই লাল সাইকেলটা। নিঝঝুম উঠোনে ভিজছে একা। তুই তো বিশ্বাসই করলি না যে, মাঝরাতে সত্যিই দুটো ডানা মেলে ওই সাইকেলটা চাঁদ ছুঁয়ে আসত। যাকগে, সে গল্প তো আর বর্ষাকালের নয়! আর শোন, আমার গল্প শুনতে হলে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমি যেসব গল্প এর’ম বৃষ্টির সন্ধেয় মুখোমুখি বসে বলব সেসব সত্যি অরূপকথা স্পর্শ করবি কী করে বল? কাচের পাল্লার ওইপাশে জমে থাকা বাষ্পগুলো শুধু দেখবি, আঙুল বুলিয়ে নৌকো আঁকবি না তাতে?

কতরকমের বৃষ্টিপতন, বৃষ্টি পরবর্তী পথঘাটজনমানুষগাছপাতানদীপুকুর তারও কতই না রকম! টানা দু’তিনদিন বৃষ্টি ঝরার পর থমকানো সময়ে শ্যাওলা জমা ভেজা ভেজা পুরনো বাড়ির ছাদের কার্নিশে বর্ষা বিকেল কীভাবে এসে বসে বল তো? বাসি পাঁউরুটির ওপর জমে থাকা সবজে সোঁদা ছত্রাকের মতো কির’ম আলতো একটা ছোঁয়া রেখে যায় পিছল উঠোনে, রাস্তার হ্যালোজেনে বাদলা পোকার ওড়াউড়ি দ্যাখে। ডানা-খসা পোকা খাওয়ার লোভে ব্যাঙদের উল্লাসের মধ্যে চালে ডালে বেগুন ভাজায় ‘মামলেট’-এ সে এক মফস্বলি রূপকথা সিঁড়িঘরের টিনের চালের নিচে গামলা রেখে আসে। সমস্ত রাত টুপটুপ জল পড়ে কোন এক অদৃশ্য ফাটল দিয়ে। কিন্তু একদিন যে কী হইতে কী হইয়া গেল– “বৃষ্টি” শব্দের অনুষঙ্গ গেল বদলে। দিগন্তের ওই প্রান্ত থেকে, দৃষ্টিসীমার অন্য দ্রাঘিমা থেকে হা হা শব্দে ছুটে আসা মেঘ যে কী আকুল কী তীব্র হতে জানে– তা বুঝে নিতে যেন নতুন জন্ম হল এই বৃষ্টি উপত্যকায়। সেখানে ঝাঁকড়াচুলো গাছ হা হা করে হাসতে হাসতে অনবরত ঝরিয়ে যাচ্ছে স্ফটিকগুঁড়ো আর তাদের স্পর্শ করতেই লক্ষ লক্ষ ঝরা পাতা বেমালুম নৌকো হয়ে ঢেউ গুনছে! সেই পতঝরের পথ বেয়েই তো আধখানা ছাতার তলায় আধখানা ভিজে যাওয়ার গুনগুনিয়ে ওঠাগুলো। আর যাকিছু ফেরত-অযোগ্য স্মৃতিভিড়! তুমুল শরীরি আবেদন মাখা সিট্রোনিলা ঘাসের তীব্র পুরুষ-গন্ধ।  ঘন বাঁশঝাড়ের প্রায় অলৌকিক সবুজ অন্ধকারের ভিতর আটকে পড়া বৃষ্টিফোঁটাদের চমকে ওঠা। তার তলা দিয়ে সরসর করে চলে যাওয়া গোখরোর হলদে ধূসরে খড়মচিহ্ন নিয়ে জেগে ওঠা ফণা, শঙ্খলাগা শরীরের রাজকীয় বিন্যাস, মুদ্রা ও চলন। আর বৃষ্টি শব্দের ছোট্ট অবয়ব ক্রমশ ব্যাপ্ত হয়ে ওঠা। তোর হাত ধরে সেই প্রথম ফুলে ওঠা পূর্ণগর্ভা নদীর ওপর ঝুলে থাকা দোদুল্যমান সাঁকো দেখা আমার– মনে পড়ে? আর সেই বন্যার সতর্কতা জারি করা রাত? বিপদসীমা কীভাবে কখন যে পার হয়ে যায় অগোচরে বেড়ে ওঠা জল, জীবন দিয়ে কতবার বুঝেছি আমরা পরে! আকাশ ভেঙে পড়ছিল যেন সেদিন। খুব বাড়ছিল শব্দটা, একটা হাওয়ার শব্দ মিশে মিশে যাচ্ছিল তাতে। বাইরে বারান্দার পাশে কুলগাছটা ভেঙে পড়ল বোধহয়। খুব জোর শব্দ হল। লণ্ঠনের আলোটা দপদপ করছে। আতপচালের গন্ধ আসছে হাওয়ায়। ভাম দুটো ছানাপোনা নিয়ে বোধহয় বারান্দার কোণে এসে উঠেছে। উঠোন উপচে ওই একটা রূপোলি রেখা। জল!! সে কী প্রবল একটানা সাতদিন জলপ্রপাতের শব্দ স্মৃতির ভিতর আজও। দ্যাখ– আজ শ্রাবণের এক তারিখ। এখনই খেয়াল হল। শ্রাবণজল এসো আমাকে তুমি নাও! যে গান লেখা ওই নীলাভ জ্বরো রাত আমি তো লিখেছি সেসব আখ্যান। আমি কি লিখেছি প্রকৃত বেঁচে থাকা? কতদিন আগে লিখেছিলাম তোকে! এই বর্ষা এলেই আমার আবার লম্বা লম্বা চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে। চিঠি পেতেও ইচ্ছে করে। অসংলগ্ন এখন যেমন লিখে যাচ্ছি– শুরু ও শেষ না থাকা বৃষ্টির শব্দগুলো। কিছুতে কেন যে মন মানে না– তার উত্তর এই ঘন কালো মেঘের কাছে নেই, এই জানলার বাইরে টইটম্বুর নদীর কাছে নেই। প্রতিদিনের পারাপারের পথে তিস্তার ঘূর্ণিগুলো, যেগুলো ঠিক ঠোঁটের কাছে ভেঙে যাওয়া টুকরো হাসির মতো খানখান হতে দেখি রোজ– তাদের কাছে নেই। একলা ঘাটে সন্ধ্যায় বেঁধে রাখা নৌকোর ছইয়ে দুলে ওঠা লণ্ঠনের আলোয় নেই। সেই আলো লক্ষ করে ছুটে আসা অযুত পতঙ্গের কাছে নেই। নেই নেই নেই– শুধু মনকেমনের রাগরাগিনী বুকের ভিতর অবিশ্রান্ত গুনগুনিয়ে ওঠায় কথা ভুলে যাওয়া একটা গান একলা বেজেই চলে। আর সেখানে অনবরত ভারি ব্যাপক বৃষ্টি ঝরতেই থাকে। নিজস্ব শ্রাবণে। সেখানে সোঁদা গন্ধের বয়স বাড়ে না। সেখানে পেঁপে গাছের ডালপাতা মাথায় জল বাঁচাতে চাওয়া এক বিস্মিত বালকের টানা টানা চোখের সামনে হঠাৎ রামধনু ঝলসে উঠলে পৃথিবী থেকে দরিদ্র শব্দটি হারিয়ে যায়। সেখানে প্রবাসী সন্তানের মা নিঝঝুম বারান্দার আলো আঁধারিতে একলা বসে জমা জলে কবেকার হারিয়ে যাওয়া কাগজ নৌকো খোঁজেন। সেখানে দূর দেশে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েটি মেঘের দিকে তাকিয়ে মনে মনে চিঠি লেখে স্মৃতির পাতায়। সেখানে অনন্ত শ্রাবণে কবিতার চিরকালীন বাঁশিটি বাজতে থাকে মনপবনের উতল গাঙে। কদম বকুল গন্ধরাজ ফুটে থাকে নির্জনে, বারোমাস। আর কস্তূরী হরিণ ঠা ঠা রোদে পুড়তে পুড়তে নিজের চোখের বর্ষার্লিপি পড়তে পারে না শুধু।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5412 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.