লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে

লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে | প্রবুদ্ধ ঘোষ

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 

লোকটা ক্যানাল ওয়েস্ট রোডের মোড়ে যায়, সিগারেট কেনে। দশটা পাঁচ। “টাইম নেই। বড্ড তাড়া আজ।” রোজই। ফর্ম্যাল পোশাক। বড় ডায়ালের ঘড়ি মণিবন্ধে। চকচকে কালো বুট। বাদামি ব্যাগ হাতে। ফাইল থাকে নিশ্চয়ই। নাকি কর্পোরেট টেন্ডার? “ওই তো, দিনেন্দো স্টিটের মুখ থেকে ট্যাস্কি নেবে”, “ধুর ল্যাও, উবের নেয়। দু’দিন দেখেছি”…। পান্তু দশটা দশে জটলায় ফেরে। ঠেক থেকে। সাড়ে আটটায় খালপাড়ে ছোটা হাতি সান্টিং মারে। কলে উবু হয়ে কুলকুচি করে। ঘাড় মাথা রগড়ে ধোয়। সাতবাষ্টে ময়লাধোয়া জল গড়িয়ে যায়, তার ওপরে গলা খাকড়ে থুতু ফেলে। ফেরেশ হয়ে বাঁদিকের ফুটপাত ধরে দু পা। সাড়ে সাতটায় খুলে যায় ঠেক। পুন্না আর মাসি ফুটপাতের ওপরে ডালা সাজিয়ে বসে। ছোলামাখা, শসা, কচকচি। কাটা ফলে মাছি বসছে। পান্তু গিলেমেটে আর বাংলা নেয়। লোকটা ক্যানাল ওয়েস্ট রোডের মোড় থেকে হনহনিয়ে হাঁটে। ওই ফুটপাত ধরে দীনেন্দ্র স্ট্রিটের মোড়ে। পান্তুর সঙ্গে বারকয়েক চোখাচোখি হয়েছিল। জটলায় ফিরে পান্তু বলে, “ন্না, মালটা হাঁটে। একদিন বাস ধরতে…” লোকটার কানে এসব ফিসফাস হালকা পৌঁছাবে। নাও পৌঁছাতে পারে। শহরের আওয়াজে এরকম অনেক ফিশফাশ ঝরে। ভাসে। উবে যায়।

ততক্ষণে লোকটা শহরের কোনও বাড়িতে কলিংবেল টিপছে।

—মানে? কেন? আপনি কে?
—আমি এমনিই, মানে, একজন লোক।
—তো? কী চাই?
—এমনিই। আলাপ করতে এলাম। দেখুন…
—না না, কিছু কিনব না। আসুন তো।
—ন্না, ব্যাগে কিচ্ছু নেই। ডায়েরি। পেন। দু-চারটে কাগজ…

লোকটা কথায় কথায় বোঝে তাদের ইমেজ। জানতে চায় তারা ইমেজ বদলাবে কিনা। তাদের অভ্যাস বদলে নেওয়ার। পুরনো শাড়ি-চাদর বদলে নতুন বালতি-ডেকচি। পুরনো ফ্রিজ বদলে নতুন। পুরনো আলাপ ঝেড়ে ফেলতে নতুন ফোন— সেভড কনট্যাক্ট লিস্ট বদলে যায়। বাড়ি বদলে ফ্ল্যাট। অনেকেই তাই রাজি হয়। কারোর এমন ইমেজ, তাতে হ্যাটা জোটে শুধু। আয়পয় নেই। কারও রুখু ইমেজ, রোম্যান্সের ডিওগন্ধ নেই। কেউ এত খরচা করে মেয়ের অন্নপ্রাশন করল, তবু কিপ্পুস বদনাম গেল না। লাইক-শেয়ার কম নেই, টাচউড, তবু লেখক লেখক ইমেজটা ঠিক দাঁড়াচ্ছে না। দেখাই যাক না বদলে…

লোকটা ইমেজ বানায়। বদলায়। নেশা থেকে পেশা।

***

 

জলদি ফিরল আজ লোকটা। বিকেলের রং গলছে তখন। হর্নের আওয়াজ বাড়ছে। শহর ঘরে ফিরছে। ঘরের সুখ। পোশাক বদলে নেবে সবাই। দিনের ক্ষতে মলম দেবে। যেমন বিনীত পারেখ। তিপ্পান্নর বিনীত পালক খুলছে গা থেকে। আজ একটুও রক্ত লেগে নেই পালকের তলায়। তিরিশজনের টার্মিনেশন লেটারে সই। বিজয় জানিয়েছিল, দুজন কোর্টে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। বিনীত সিইও আনন্দ দেশাইকে জানিয়েছে সবটা। তিরিশজনকে চেম্বারে ডেকে টার্মিনেশন লেটার আর ধন্যবাদ দিয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য হার্দিক শুভকামনা। বিকেলের মধ্যেই কানাঘুষোয় শুনে নিয়েছে যে, ওরা সকলে বিজয় বণিককে খিস্তি করছে। “বিনীত ট্রায়েড টু সেভ আওয়ার অ্যাস। ওই খানকির ছেলে বিজয় আমাদের নাম পাঠিয়েছিল…”, “বাস্টার্ড শালা, নিজের ফ্যামিলি নেই। ও কী বুঝবে?”, “বিনীত স্যার এইচআরকে রিক্যোয়েস্ট করেছে টু ক্লিয়ার আওয়ার পেন্ডিং পেমেন্টস আসাপ”… ছ মাস আগের এক মঙ্গলবার পালক খুলতে খুলতে রক্তের ছোপ দেখেছিল বিনীত। সেবার ১৫ জন টার্মিনেটেড। বিনীতের মিছরিদানা ইমেজ টাল খেয়েছিল। পাত্তা না-দিলেও অফিসে সাবঅর্ডিনেটদের চাউনিতে খুচরো অস্বস্তি হচ্ছিল। ইয়ার-এন্ডিং পার্টিতে থার্ড পেগে বরফ নেওয়ার সময় বস্‌ দেশাই “ডুইং গ্রেট, বিনীত” বলেও একটা “জাস্ট ইমপ্রুভ ইওর ইমেজ অ্যামাং দোজ” জুড়ে দিয়েছিল। কাঁটা। যাক! লোকটাকে মনে মনে থ্যাঙ্কস দিল বিনীত। রোদ মুছেই গেছে এতক্ষণে। লোকটাকে ঝুরো প্রায়-এক-কামরা ঘর ছাড়তে হবে। তারক বোস লেন। একতলার ভাড়াটে। জিনিসপত্তর গুছোতে আর কতক্ষণ লাগবে? সময় লাগবে ইমেজগুলো গুছোতে। বদলানো ইমেজগুলোর কিছুটা সঙ্গে নিয়ে আসে লোকটা। যত্নে রাখে। অযত্নে ছড়িয়েও অনেক। ছড়ানো-ছেটানো ইমেজগুলো গুছোতে গুছোতে দুটোয় স্মৃতি আটকাল। হালসিবাগানের সেই আধবুড়ি। তখন সবে এই ঘড়িটা কিনেছে। এসপ্ল্যানেড। বড় ডায়াল। দুশো তিরিশ টাকা। বুটটা চারশো। তাপ্পি মারতে হয়েছিল। সেলিমপুরের বাড়িটায় যাওয়ার পরে। কথোপকথন শুরুর পরে অনেকেই খেদায়। ভাবে, ও কোনও প্রতারক।

—এগুলো কী ধরনের জালিয়াতি বিজনেস?
—জালিয়াতি? না, না। দেখুন ইমেজ ব্যাপারটা জীবনে খুব ইম্পর্ট্যান্ট।
—আমাদের ইমেজ যথেষ্ট ভাল মশাই। অনেকেরই চোখ টাটায় তাতে। এই, তোকে হারামি সুমনটা পাঠিয়েছে, না?
—কে সুমন? না, আমি নিজেই বাড়ি বাড়ি যাই, তারপর…
—তুই শুয়রের বাচ্চা বেরোবি? নাকি… ভিক্টর, ভিক্টর, চ্চু চ্চু…

ভিক্টর তেড়ে আসছিল। গ্রেট ডেন। দৌড়তে গিয়ে পেরেকের খোঁচা। জুতোর গায়ে ফুটো। প্যান্টের তলা ছিঁড়ল। লোকটার এসব অভিজ্ঞতা আছে।

 

দুই.

হালসিবাগানে আধবুড়ির কামরা। ভেতরে একটা ক্ষয়া চৌকি, চাদরের বদলে লম্বা প্লাস্টিক পাতা। কামরার এক কোণে একটা স্টোভ। পেচ্ছাপ পায়খানা কমন কলঘরে। সামনের উঠোনের এক পাশে। টিনের ফাটাফুটো দরজা। লোকটা খাওয়ার অনুরোধ ফেলতে পারেনি। চট করে বেরিয়ে পাশের মুদিখানা থেকে দুটো ডিম এনেছিল। পকেট থেকে বের করে— “আমি খালি হাতে কারও বাড়ি যাই না, মাসি।” বুড়ি হেসে তোবড়ানো ডেকচিতে ডিম বসিয়েছিল। শাক-ভাত। কাদাচিংড়ির বড়া। ডিমসেদ্ধর আলোয় ঘর ভরে উঠেছিল। লুটি সহরা। প্রায়-সাদা চুল। ভাঙাচোরা মুখ। একাধিক আধা-বেআইনি নার্সিংহোমে বদলি আয়া ছিল। ওর ইমেজ নাকি অপয়া। তুকতাকের। ‘জীবনদাত্রী’-তে দুটো বাচ্চা পরপর দু মাসের মধ্যে মরে গেল। লুটি সারারাত জেগে ছিল। বাচ্চাটার ওজন দেড় কেজিও হয়নি। মা-টা ধুঁকছিল। অপুষ্টি। তেরাত্তির না পুইয়েই বাচ্চাটা মরল। বাড়ির লোকের ধারণা হয়েছিল কেউ তুকতাক করেছে। কেউ? কে? “লুটিদি এখন যেতে হবে না আর। ওঃ, হপ্তার বাকি টাকাটা রাখো”— মানি এসেছিল দুদিন পর সকালে। ‘সেভিয়ার’-এ একজন সবে-মা মরে গেছিল। লুটি কেঁদেছিল খুব। বাচ্চা মেয়েটা গো। নার্স বড়দি বলেছিল ২৩ বছর, আসলে এক কুড়িও বয়েস হয়নি, লুটি বুঝেছিল। এটা তিন নম্বর। “এতবার পোয়াতি হলে শরীলে দেয়?” রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেলে লুটির সঙ্গে কথা জুড়ত মেয়েটা। ফ্যাকাশেপানা হয়ে গেছিল। ভুয়াসুনি মা-র কাছে মনে মনে মাথা ঠুকেছিল লুটি। আহ, একবার যদি ভুয়াসুনি মা-র থান থেকে শেকড় আনতে পারত মেয়েটা তাহলে বাঁচত গো। লুটি শেষ কাজটা পেয়েছিল একটা বাচ্চা-খালাসের হোমে। আগেরগুলোর চেয়ে একটু বেশি দিত এরা। বিনির মা জোগাড় করে দিয়েছিল। পুলিশ আসত। অনেকরকম ঝাম হত। বাবুরা সামলাত। লুটি ভালই কাজ করছিল ওখানে। হঠাৎ এক রাতে আগুন। ঝন্টু সর্দার ঝাড়পোঁছ করে। অনেকদিন ধরে বলছিল ঠান্ডামেশিনে গণ্ডগোল হচ্ছে। বাবুরা পাত্তা দেয়নি। তিনজন মারা গেছিল দমবন্ধ হয়ে। পুলিশ, হুজ্জুত। লুটি সহরা অপয়া— সংশয় নেই আর। সেও অনেকদিন আগে। লুটি অনেককে ধরেছে। কম টাকাতেও কাজ করবে। হপ্তায় দুদিনই নাহয় করবে। “খবর দেব”, “ইশ্‌, ভুলে গেসলুম রে…”, “আসলে লুটি, শবরদের ঠিক… দেখছি তাও, বলব” এসব বলে কাটিয়ে দেয় আয়া-সেন্টার। লুটির ঘষা ঘষা চোখে লোকটা অনেক গল্প পেয়েছিল। লুটি সহরা। ২০০৮। কোশিনদীতে বান। খড়কুটোটুকু বাঁচেনি। বরের খোঁজ মেলেনি। মেয়ে তো কবেই সুরাত না নাগপুর কোথায় যেন, কাজের জন্য। উজাড় হয়ে কলকাতায়। লুটি সহরা। ইমেজটা বদলে গেলে বিনির মায়ের মতো হপ্তায় চারদিন কাজ পাবেই। লোকটা পারেনি। ফেল। একবারই। একবারই?

আলোকপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে সহজে নতুন ইমেজ বানিয়ে দিয়েছিল। ঝক্কি কম। আলোকপ্রতিমবাবু নিজেই লোকটাকে ডেকেছিলেন। পোস্তার দিকে টানা দুমাস ঘুরছিল তখন লোকটা। জোড়াবাগানের বাংলার ঠেক থেকে আশ্চর্য অনাবিল গন্ধ তখন সন্ধে গড়িয়ে দিতে চাইছে অনেকটা পথ জুড়ে। লোকটার দুদিকে ছায়ার মতো সেঁটে গেছিল দুজন, “পুঁটেদা ডাকছে। এখনই চলুন।” পুঁটে চাটুজ্যে। তিনটে খুন। রমরমা সিন্ডিকেট। “ইমেজটা পাল্টাতে হবে, বুঝলেন?” লোকটার বেশি সময় লাগেনি পুঁটেকে মাপতে। “কালচারাল ফিল্ডে একটা জম্পেশ ইমেজ হলে! পরিচিতি বাড়বে। একটা পাবলিশিং হাউজ খুলব।” পুঁটে টাকা সাদা করবে। তিনটে লবির বাওয়াল বেড়েছে পার্টিতে, পুঁটে এখন সামলে খেলতে চাইছে। লোকটা সময় নিয়ে ইমেজ বদলেছিল। কিছু গল্প মিশিয়েছিল। পুঁটে মাপা-অনুপাতে সিমেন্ট, বালি সাপ্লাই করে। তাতে যে নির্মাণ হয়, তাতে সঘন যৌন উপমা। শহর লম্বা হচ্ছে, ইঞ্চি-ফুটের সাইজ বেড়ে উত্থিত ইমারত। “আলোকপ্রতিম শহরের ক্যানভাসে কবিতা লিখছে”। ছকভাঙা ছাঁদ, পিলার সংলাপময়, দখলদারি নেহাৎ প্রতীকী। পাথুরেঘাটার ফ্ল্যাটবাড়ি। হুড়মুড়িয়ে ভাঙল। মৃত বেশ কয়েকজন। তবু খেয়াল করার— ভাঙনগুলিও কী কাব্যিক। সমিল মুক্তক ছন্দে ধ্বসে পড়ল। সকলে বুঝত শব্দ ওভাবেই হৃদয়ে ভেঙে পড়ে নতুন দ্যোতনায়। যে দু-তিনজন বুঝত না, তারা খুন হত। আশ্চর্য খুন। বুকে-ছুরি-গাঁথা বডি যেন নস্ট্যালজিয়া-বেঁধা নব্বই দশকের মতো উপমাবিভোল! এগারোতলা থেকে একজন ঘাড়ত্যাড়া-বুড়োর পতনে সকলে রূপক খুঁজে পেয়েছিল সনাতনি কর্মফলের। রক্তের ছোপ। নান্দনিক চিত্রকল্প। আলোকপ্রতিম চট্টোপাধ্যায় ডাক পেত উচ্চ-সরকারি উৎসবে, কাব্যপাঠ। বাদামি ব্যাগটা উপরি উপহার পেয়েছিল লোকটা। প্রাইস ট্যাগ— ৩৫৯৯ টাকা।

***

 

লোকটা হাঁটবে। বসন্তভোর। প্রেম-উতলা হাওয়া দেবে। চা-পাতার গন্ধে দোকানে লোক জুটবে দু-তিনটে করে। ক্যানাল ওয়েস্ট রোডের মোড়। লোকটা হাঁটবে। ঢাউস ব্যাগ ঘষটাবে পিচভাঙা খোয়ায়। পাশে বউই বোধহয়।

—আরে মেয়েটা সঙ্গীতার মতো দেখতে না?
—বাল। বসাকগলির টুম্পার মতো নাক-চিবুক।
—বুকটা কিন্তু লালিবৌদির মতো।

বসন্তে ওড়া পরাগরেণুর মতো মন্তব্য উড়বে। গায়ে পড়বে। লোকটা ব্যস্ততায় হাঁটবে। ফুলছড়ানো পিচপথ দিয়ে অনেক রোদের দিকে যেতে হবে লোকটাকে।

—বড়লোকের কপাল বাঁড়া। আমাদের মতো নাকি?
—বড় চাকরি, চাম্পি বৌ, এই তো লাইফ…
—বেড়াতে-ফেড়াতে যাচ্চে, বুয়েচিস? হানিমুন পকাপক…

ইমেজ বানাবে। লোকটা মাকড়সার জালের থেকেও সূক্ষ্ম তন্তুর ইমেজ বোনে। রেশমে বোনা কাপড়ের মতো উজ্জ্বল। আলো ঝলকায় তাতে। বিষাদ পিছলে যায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ভোরে দখিনা বাতাস আর শিরশিরে মনজাগানিয়া গন্ধ উথলোবে। লোকটা তারক বোস লেনের ঝুরোকামরা ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। লোকটার ব্যাগভর্তি ইমেজ। মেয়েটির ব্যাগে আশ্চর্য সঙ্কেত। কথায় কথায় রাস্তা পেরোবে ওরা। মাঘের প্রায়-শেষে কুয়াশা সোহাগী প্রেমিকের মতো শহরের রাস্তা-বাড়িকে জড়িয়ে থাকে। তেমনই কুয়াশায় একটু পরে ওরা মিশে যাবে।

 

তিন.

“তু সমহলকর ব্যাঠনা, হুসন্‌-এ-ল্যায়লা দেখনেবালো
তামাশা খুদ না ব্যন যানা, তামাশা দেখনেবালো”

আলোকপ্রতিমবাবু লোকটার খোঁজ পেয়েছিল অমৃত সামন্তর থেকে। সামন্ত দুঁদে অফিসার। ছিল। সত্তরের শুরু থেকে দাপিয়েছে বাঁকুড়ায়। কিছু বছর হুগলিতে। সামন্তর স্পেশাল কেয়ার নিত রঞ্জিত গুপ্ত, বিভূতি চক্রবর্তী। অমৃত সামন্ত নদীয়ার দায়িত্ব পেয়েই প্রথমে বুড়ো প্রামাণিককে ফেক এনকাউন্টার করে। ১৯৭০-র সেপ্টেম্বর। কলকাতায় সেসময় নকশাল-মারার যে ব্লু-প্রিন্ট, তাকে হুবহু প্রয়োগ না করে নতুন কৌশল বানিয়েছিল সামন্ত। ‘প্রতিরোধ বাহিনি’। লোকাল লুম্পেন আর ত্যাড়া হুলিগান নিয়ে তৈরি। মাসে ৭০ টাকা। কিছু বল্লম, কিছু পাঁচ ব্যাটারির টর্চ আর তিন-চারটে দেশি পিস্তল। সামন্তই জোগান দিত। আইডিয়াটা পেয়েছিল পাশের দেশের রাজাকারদের থেকে। বাঁকুড়ায় সফল প্রয়োগ। সামন্তর ইমেজ তখন দক্ষ সেনাপতির। ১৩টা অপারেশন। নটা এনকাউন্টার। দুখানা কাস্টডিয়াল রেপ+একটা মার্ডার (পাঁচ বছর পরে কেস ডিসমিস্‌ড অবশ্যই)। দেড় বছরের মধ্যে একটা মডেল তৈরি ক’রে দিয়েছিল। রঞ্জিত গুপ্ত সামন্তর কড়ক্‌ ইমেজ আরও রঙিন করে দিয়েছিল সদর দফতরে। সামন্ত ফাঁপড়ে পড়েছিল রিটায়ার করার পরে। ‘অতিবিপ্লবী ছেলেমানুষি ও পুলিশের নায়কত্ব’ শিরোনামে একটা গবেষণা নামিয়েছিল। পুলিশ ফাইলের রিপোর্ট আর লক-আপ স্বীকারোক্তির বানানো তথ্য নিয়ে। বই বেরোল। “শালা এমন ঝাড় ইমেজ হয়ে গেছে, বইটা বিকোচ্ছে না।” অমৃত সামন্ত ততদিনে অণ্ডঝোলা, বুড়ো সিংহের মতো। পুলিশি ডান্ডার পৌরুষের সঙ্গে ইমেজও নেতিয়ে গেছে। এদিক-ওদিক পুশসেল্‌ করে কটা বই গছাল। তাতে ইনভেস্টমেন্টের ১/৩ উঠল না। এক আইপিএস ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিল, “ধুর্‌ মশাই, কী পড়ব? আমরা তো জানি মালটা কীভাবে লিখেছেন।” সামন্তর বাড়িতে গিয়ে লোকটা এসব জেনেছিল। সামন্তর বিষাদ, লেড়ে বিস্কুট আর সস্তার চা। শুরুতে অবশ্য ঘাড়ধাক্কা। “আমি কে জানিস? চিনিস আমায়?” লোকটা জানত প্রথমেই যারা তেড়েফুঁড়ে নিজেদের জাহির করে, তারা বেশিরভাগই ইমেজ পাল্টাতে রাজি হয়ে যায়। ৯০% কেসে দেখেছে এটা। লোকটা কী ম্যাজিক করেছিল না কীভাবে গিঁট খুলেছিল, সামন্ত বোঝেনি। কিন্তু পরের হপ্তায় একটা থার্ড-স্ট্রিমের সভায় নকশাল-গবেষক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছিল। লোকটা কয়েকমাস সময় নিয়েছিল ইমেজ বদলাতে। সামন্ত ভড়কে গেছিল একটা মানবাধিকার রক্ষার সভায় প্রধান অতিথি হওয়ার ডাক পেয়ে। সামন্তর ইমেজ ক্রমশ নকশালদরদী হয়ে গেল। ফেক এনকাউন্টার করতে করতে গল্প বানানোর অদ্ভুত দক্ষতা জন্মেছিল সামন্তর। সঙ্গে মিশল পুলিশি তথ্য, বিষাদকামী অভিনয় আর পুরনো দু-একজন ঊর্ধ্বতনের ওপরে খার। একটা বামপন্থী প্রকাশনীর বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণ। দুটো পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী কলকাত্তাইয়া সভায় ‘মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্ট প্রতিবাদী বিদ্বজন’ হওয়ার স্বীকৃতি। সামন্ত বামপন্থী মানবাধিকার কর্মী হল। অমৃত সামন্ত সিন্ডিকেট-হুব্বা পুঁটেকে এতকিছু ভেঙে বলেনি। পুঁটের ভাইঝির বিয়েতে স্কচ খেতে খেতে লোকটার ইমেজ বদলানোর কিস্‌সা বলেছিল। স্কচের বরফের মতো লোকটার বর্ণনা দিয়েছিল। ঠান্ডা। মাপা।

মাপা জায়গা। কোণের ঘর বলে রোদও কিপটে। দেয়াল স্যাঁতস্যাঁতে। ছবিহীন। ক্যালেন্ডারহীন। তক্তপোষে কবেকার তোষক। তুলো অনেকদিন আগে থেকে উড়ছে। সামান্য কটা রোজকার জিনিস গুছোনো শেষ। একটা ইমেজ ব্যাগে ঢোকাবে না লোকটা। পুড়িয়ে দেবে? লাইটার বের করেও রেখে দেবে। পোড়ানোটা বড্ড নাটকীয় হয়ে যাবে। দুমড়ে-মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলাই ভাল। কিন্তু ছেঁড়া কি সোজা? কখন ভাঁজ খুলে বা জুড়ে নিপাট হয়ে যাবে আবার। পেনের কালি ঘষতে থাকবে হিজিবিজি করে। তবু কি মুছবে ইমেজটা? কী করা যায়? এই ইমেজটা ধ্বংস করতেই হবে ওকে। একটু থমকাবে লোকটা। ভাববে। সময় মুচকি হেসে এগারোটার দিকে গড়াবে।

***

 

সময়। সময়ের চেয়ে ভরসাযোগ্য বন্ধু নেই লোকটার। ইমেজ বদলানোর ব্যাপারে সময় তাকে সাহায্য করেছে বহুবার। ছোটবেলায় সেই রোববার রোববার সকালে টিভির সামনে হাঁ। ‘ম্যায় সময় হুঁ!’ বাবা-মা দুজনের ইমেজ বদলে গেল। একজন মরে গেল শিরা কেটে। আরেকজন অথৈ জলে খড়কুটো আঁকড়াল, জলের ওপর ঋণের দাগ কাটল, ডুবল, ভেসেও উঠল। “আগে এমন বেহায়া বেবুশ্যে ছিল না”। “ছিঃছিঃ, ঘরে একটা পাঁচ বছরের ছেলে রেখে…”। কীভাবে ইমেজ বদলে যায়, বুঝেছিল। শিখেছিল তখন। ইস্কুলে লাল্টুর ব্যাগে শুভমের দামি পেন্সিলবক্স রেখে দিয়েছিল। লাল্টু থার্ড বয়। শুভমের বাবা লাল্টুর বাবাকে চোরের গুষ্টি বলেছিল। লাল্টু তিনদিন সাসপেন্ড। তখন কুড়ি-একুশ বছর বয়েস। দিঠির সঙ্গে ভালবাসা প্রেমে গড়িয়েছে। বুকের তিল, কোমরের নিচের জড়ুল, পিঠের শিরিশিরানি চেনাচিনি হচ্ছে। দিঠি দেড় বছরের বড় ছিল। থিতু হওয়ার তাড়া ছিল। ভাবার সময় চেয়েছিল। লোকটা তখন ইমেজ বানানোর নেশায় ছুটছে। দিঠির চোখে ওর ইমেজ বদলে যাচ্ছে কীভাবে, লোকটা বুঝতেই পারেনি। দিঠি সময় চেয়েছিল। দিয়েছিল লোকটা। বেশ কমাস পরে সময় ফিরে এসেছিল অভিমানী পুরনো বন্ধুর মতো, দিঠি ফেরেনি। সময় কখনও ছেড়ে যায়নি লোকটাকে। সময়কে ব্যবহার করতে জানত লোকটা। বছর আটেক আগে মানিকতলার পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। ‘সেলসম্যান আর নট অ্যালাউড’ নোটিস পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল। ধোপদুরস্ত পোশাকে লাগা ইমেজের জন্যই হয়তো। লিফটের বোতাম টিপতে যেতেই হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল আকাশি ইউনিফর্ম। ছবি তুলবে, মোবাইল নম্বর লিখবে, কোন ফ্ল্যাট, কী দরকার। তারপর “না না, লিফট সেলসম্যানের জন্য না”। খ্যাদানি খেয়ে লোকটা আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে চারটে গুটকে কচুরি আর তরকারি খেয়ে বিবেকানন্দ রোডের দিকে হাঁটছিল। তখনই মিছিলটা এল। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল। আশি-নব্বই জন। মিছিলটা থিতু হতে গিটার বাজিয়ে গান। লোকটা আলাপ করেছিল গিয়ে। তরুণ অধ্যাপক। কাগজে রাষ্ট্রবিরোধী উত্তর-সম্পাদকীয় লিখে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অনুরাগীর সংখ্যা প্রচুর। এমন ইমেজ চুম্বকের মতো— সভা, মিছিল, বক্তৃতা, প্রবন্ধ, মুগ্ধতা আটকে থাকে তাতে। তিন বছর আগে রীতেশের খ্যাতিতে ছোপ। লোকটা যে দুপুরে রীতেশের বাড়িতে পোঁছেছিল, তখন সাসপেনশনের দিন চলছে রীতেশের। কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ। পাবলিক কল-আউট। পাঁচদিনের মধ্যে আরও চারজনের অভিযোগ। লোকটা শুনেছিল। রীতেশ সত্যি বলছে না। বুঝেছিল লোকটা। “আমার ইমেজটা পুরো গেল। দুটো ফেমিনিস্ট অর্গ্যানাইজেশন যা-তা প্রচার করছে। আমার রেকো নিয়ে ফেলোশিপ গ্র্যান্টে অ্যাপ্লাই করেছিল, ব্লাডি বিচ, কাজ মিটতেই…” লোকটা মোটা টাকা নিয়েছিল। রীতেশের হাতে কিছুটা সময় দিয়ে এসেছিল। রীতেশ এখন চ্যানেলের টক-শোতে অতিথি হয়ে যায়। দুটো নারী-অধিকার বিষয়ক সেমিনার একটা বামপন্থী ক্ষমতায়নের সেমিনার আয়োজন করেছে সরকারি গ্রান্টে। বিদেশি অ্যাকাডেমিক, বামপন্থী নাট্যকার, বাম যুবনেতা ভাষণ দিয়েছিল সেমিনারে।

টাকাটা নিয়ে লুটি সহরার ঘরে গেছিল লোকটা। “আবাগীর বেটি। ইকবালের ঘরে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ল। তাড়িয়ে দিয়েছে পাড়া থেকে।” লোকটা দাঁড়ায়নি। এ শহরে হারিয়ে যাওয়া সোজা। রোজ অনেক মানুষ হারিয়ে যায়। হেমন্তের বিকেলের এমন একটা ইমেজ আছে। কখন যে হারিয়ে যায়। প্রিয় মানুষটাও টের পায় না কখন পাশের মানুষটার মুখ থেকে রোদ্দুর সরে গেল। সরে গেলে বোঝা যায়। স্ট্রিটলাইট জ্বলে ওঠে। খুব আলো, জমকালো। অত আলোর মধ্যে লুটি সহরা কোথায় যে মিশে রয়েছে। এই ইমেজের কিছুটা তুলে রাখল লোকটা। কাজে লাগবে পরে। হাঁটতে হাঁটতে কারবালা লেন। চা-বিস্কুট। তারপর হোসেনি দরগায় ঢুকেছিল। ফুল, চাদর চড়াচ্ছে কতজন। প্রার্থনায় বসেছে। কেউ ভাল হবে। কেউ বড়লোক। কেউ পাপ ধুয়ে নেবে। কারও প্রিয়মুখে চুমুর আকাঙ্খা। এক কোণায় নতজানু দুজন গলা মেলাচ্ছে—

“তুঝকো খুদা কঁহুঁ ইয়া খুদা কো খুদা কঁহুঁ, দোনো কে শক্‌লো এক হ্যাঁয়, কিসকো খুদা কঁহুঁ…”

লোকটা নেমে আসে। মাজারের সিঁড়ির নিচে অনেক জুতো। প্রত্যেকটা জুতোর মালিকের স্বতন্ত্র ইমেজ। কত ইমেজ মিশে আছে জুতোর ভিড়ে। আজ নিজের জুতোয় পা গলাতে ইচ্ছে করল না। লোকটা একটা ঝকঝকে চটি বেছে নিল। ন নম্বর। ঠিক আছে, ম্যানেজ হয়ে যাবে।

***

 

টাকার চিন্তা আর গেল না। রীতেশের থেকে নেওয়া টাকাটা কী হবে এবার? দুমাসের বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে নতুন পাড়ায় উঠে যাবে? তাতেও তো অনেকগুলো টাকা পড়ে থাকে। কী করবে? আশুকে দেবে? আশু। লোকটা অনেক সময়, অনেক আলো, অনেক বয়ামভরা গল্প দিয়েও আশফাকের ইমেজ বদলাতে পারেনি। আশফাক গোয়েন্দা হতে চাইত। আশুর সঙ্গে কথা বলে লোকটা বুঝেছিল ও কেস পেলে কেমন মগ্ন হয়ে যায়। ওর বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রখর। পরিশ্রমে ছুটে যেতে পারে অক্লান্ত। তবু কেস থাকত না আশফাকউল্লার হাতে। আশফাকউল্লা ইমেজ থেকে বেরোতে আশু ছটফট করত। শেকড় অস্বীকারের, ইমেজ প্রত্যাখ্যানের অমন ছটফটানি শান্ত করতে চেয়েছিল লোকটা। পারল কই? আশু নিজের একটা গোয়েন্দাঅফিস খোলার জন্য আর একজন মাসমাইনে দেওয়া সহকারী রাখার জন্য টাকা জমাচ্ছিল। এই টাকাটা ওকেই দিয়ে আসবে? ৫/৩/এইচ নাকিবুল্লা লেন। ইমেজ না-বদলাতে পারা ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ? আশফাকউল্লা নিশ্চয়ই লুটি সহরার মতো হারিয়ে যায়নি।

 

চার.

গতকাল রাত নটা নাগাদ অশ্বিনী মুখার্জি এসেছিল। এই পুরনো তিনতলা বাড়ির একতলা ভাড়া দেয় আর সুদে টাকা খাটায়। ছেলে আর বৌ নিয়ে তিনতলায় থাকে। দোতলার দুটো ঘরে তালা। একটা ভাঁড়ার। আরেকটায় আধা-বিবাহিত বোন। বিয়ের চার বছরের মধ্যে চলে এসেছিল। শ্বশুরবাড়ি খোঁজ নেয়নি। পরে ডিসট্যান্সে মাস্টার্স করে। এমফিলের প্রপোজাল তৈরি করার সময় একটা সেমিনারে অধ্যাপক রীতেশ মুখার্জির সঙ্গে আলাপ। বাড়িতে ডেকেছিল। প্রথম দিনের অস্বস্তির পরেও দ্বিতীয় দিন কেন যে গেছিল! কেন গেছিল? নিজের একটা আইডেন্টিটি দরকার। রীতেশের চেনাজানা বিশাল পরিধি জুড়ে। সেই ক্ষেত্রফলের একটা বিন্দু হতে পারলে, সেই বিন্দুটা বাকি সমাজের চোখে অনেক বড় দেখাবে। ঘরভাঙা মদ্দা যুবতী, বরের ঘর থেকে পালিয়ে আসা মেয়েছেলে, শ্বশুরবাড়িতে না-নেওয়া হতচ্ছাড়ি, নিশ্চয়ই কিছু দোষ ছিল তাই টিঁকতে পারেনি ন্না ন্না তাড়িয়ে দিয়েছে— এই ইমেজগুলো পাল্টানো যাবে। দূরের শহরের কোনও ইউনিভার্সিটিতে এমফিল পেয়ে গেলেই। দ্বিতীয় দিন রীতেশের হাত মুচড়ে কোনও রকমে পালিয়ে এসেছিল। এরই নাকি বাইরের ইমেজ অমন আগুনখোর? নারীর অধিকার, আদিবাসীর অধিকারের জন্য নিজের প্রিভিলেজ ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান রাখে? রীতেশের নাম সোশ্যাল মিডিয়ায় ছ্যা-ছ্যা বয়ানে ছড়িয়ে পড়তে দেখে ভেবেছিল ও নিজেও কিছু লিখবে। এমফিল ভর্তি হওয়া হয়নি। কিছুই তেমন হওয়া হয়নি। ‘পরিচয় জানাতে অনিচ্ছুক’ বয়ানে লিখলেও ফাঁস হয়ে যেতেই পারে নাম। তখন? এখনও যেটুকু সম্মান ওর টিঁকে আছে, সেটুকুও চলে গেলে? দাদার ইমেজ নষ্ট হয়ে গেলে বাপের বাড়ির বাস উঠে যাবে। দাদা— অশ্বিনী মুখার্জি। পাড়ায় উপদ্রব নেই। নিয়মিত চাঁদা দেয়। ভাড়াটেরাও হুজ্জুতে না। মাঝেমাঝে চাপা গলার বাওয়াল আসে দোতলা থেকে। থেমে যায়। বোনের যত্ন নিচ্ছে তো এত বছর। কজন নেয় এই যুগে? সজ্জন লোক। তাছাড়া কত বড় বংশ।

একতলায় লোকটা ভাড়া এল। যেভাবে পোড়োবাড়ির দেয়ালের ফাটলে নতুন চারা জন্মায়। গলির কানা স্ট্রিটলাইট সারিয়ে দিয়ে যায়। লকআউট হওয়া কারখানায় হঠাৎ সাইরেন বাজে। বহুদিন, না বহুবছর পরে, কবিতা লিখেছিল মেয়েটি। ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করে করে খাতায় প্রিয় গান লিখে রাখত। ফিল্মস্টারের ছবি খাতার মধ্যে যত্নে লুকোনো। খাতাটা হারিয়ে গেছিল অনেকদিন। ভাঁড়ারের ঝুলমাখা কোণে রাখা বাতিল কাগজ-ভরা সুটকেস থেকে সেসবও ফিরে এল। নিছক সমাপতন? দত্যিমহলের ভেতর থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করার কথা। রাজপুত্তুর তখন ছদ্মবেশে। তাকে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। আরজি কর হাসপাতালের পেছনে তারক বোস লেনের এই গলিঘুপচির মধ্যে পাতালপুরি। কত ভাল ভাল স্মৃতি দেয়ালের পলেস্তারার সঙ্গে খসে গেছে। লোকটার মধ্যে কী যেন একটা আছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কী যেন খুঁজছে— মুখের রেখায় তার ছাপ। হঠাৎ বিপর্যয়ে পালাতে হয়েছে, এখন পরিচিতি লুকিয়ে রেখেছে। পরে ঠিক সময় বুঝে রাজ্যোদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সময়কে ঠিকঠাক পড়া গেলে, লোকটাকেও পড়া যাবে। হয়তো।

***

 

অশ্বিনীবাবু বোনের গায়ে হাত তুলত। বাবু? ছোঃ। বদ বংশ। অশ্বিনীর মা বিষ খেয়েছিল, মনে নেই? ওর বাপটাও এক চিজ্‌ ছিল। বাপের রোগটাই পেয়েছে। মেয়েটার হায়া শরম কিচ্ছু নেই গা? নিজের বর শ্বশুরঘর ফেলে রেখে এখানে ধিঙ্গিপনা করত। কোথাকার কে একটা জাত-বেজাতের ঠিক নেই লোক, তার সঙ্গে পালিয়ে গেল? পাড়ায় কিছু করলে ছেড়ে দিতাম নাকি আমরা? ভদ্র পাড়া, এখানে বাজে লুল্লুড়ি চলবে না, হুঁ হুঁ। কোথায় গেল, কিছু খোঁজ পেলি টকাই? ওই যে পান্তু বলছিল ওদের নাকি শ্যামবাজারের দিকে যেতে দেখেছে। হ্যাঁ রে, মেয়েটা গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়েছে? ধুর্‌, সে তো ওর হকের গয়না, নেবে না কেন? দোষ অশ্বিনীর। আমরা শুনতুম তো রাত্তিরে কী ঝগড়া, মারামারি, সত্যি বলছি! ওদের পারিবারিক ব্যাপার, তাই আর নাক গলাইনি, সত্যিই। অশ্বিনী রোজ মদ খায় তো, পেঁচো মাতাল। এবার কেলাবের ব্যাপারে কিছু বলতে আসুক না, ধুদ্ধুড়ি নেড়ে দেব পুরো। হারামির হাতবাক্স মালটা। শোন, এর পরে ভাড়াটে বসাতে হলে কেলাবের পারমিশন নিতে হবে ওকে, বুইলি?

অশ্বিনী মুখার্জি তিনতলার ঘরের দরজা বন্ধ করে ফুঁসছিল তখন। ইজ্জতের ফালুদা। অপোগণ্ড বাপের ইমেজ ভুলিয়ে দিয়ে নিজের একটা ইমেজ তৈরি করেছিল। ব্যবসার কাজে হেল্প হত তাতে। শাল্লা। ফুঁসছিল অশ্বিনী। আর, পরশু রাতের কথোপকথনটা ফাটা রেকর্ডের মতো কানে বাজছিল।

—ঘর ছাড়বি কালই। তোর মতো একা লোককে আর না। ফ্যামিলিকে দেব।
—আর কটা দিন। অন্য একটা বাড়ি পেলেই…
—না। কালই। আমি কিছু বুঝি না ভেবেছিস? ঠিক আছে, পরশু সকালের পরে না দেখি যেন।

লোকটা হেসেছিল।

 

লোকটা আর মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে এতক্ষণে শ্যামবাজার। ভোর আরেকটু খোলতাই হবে। ভোরের বাসের হেডলাইট হালকা কুয়াশা কাটিয়ে দিয়ে ওদের কাছে আসবে। ঘুমচোখো ড্রাইভাররা ট্যাক্সির গতি কমাবে কাছে এসে। মেয়েটির হাত আঁকড়ে ধরে থাকবে লোকটা। কোন পাড়ায় যাবে, ভাবছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4718 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...