এমাসের কবি: বর্ণালী কোলে

বর্ণালী কোলের কবিতা

 

পিপাসা

একপশলা
দুপশলা
বোনের মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছে তিথিদি

দেখি
ভয় লাগে

তোমাকে তোমার বোন
গর্জন করে বলে উঠবে না তো…
“ছুঁবি না তুই আমার মেয়েকে!”

বৃষ্টি এক পশলা
দুপশলা

দূরে তুমি, স্নেহ থেকে দূরে

 

দুই বন্ধু

আগামীজন্ম বলে যদি কিছু থাকে আমি যেন
পাখি হই…
এইটুকু বলার পরই হাসি…
আগামী জন্ম বলে যদি কিছু থাকে আমি যেন
ফুল হই…
ও প্রান্তেও হাসি…
যদি বা মানুষ হই এই লোকজনদের কাছাকাছি
যেন না আসি…
আমিও তাই রে…
দেখ, এই সাঁইত্রিশে পোঁছে আমরা একসঙ্গে বড় হচ্ছি –
হাসি
তোদের জানালা থেকে আকাশ দেখা যায়?
দেখা যায়…
রামধনু?
বৃষ্টি?
সব সব দেখা যায়

 

অপরাহ্ণ

জানালার সিট
শাড়ি পরে তুমি বসে
কাঁধ অবধি চুল
পাশে লেখার খাতা

তখনও নৈঃশব্দ, তখনও গাছেদের ছায়া

 

প্রত্যাঘাত

মাথার মধ্যে থেকে, বুকের মধ্যে থেকে
হাতের মধ্যে থেকে উঠে আসছে তীর…
বিষ মাখানো বিদ্বেষ

তোমাদের দেওয়া তীরগুলো সব যত্নে রেখেছি
রেখেছি শান্তিনিকেতনী ব্যাগে…

শরতের আলোয় একদিন উড়িয়ে দেব
তারপর ওরা সাদা সাদা পায়রা, শান্তির

 

নবদ্বীপ

সকাল দশটা। ছিটে বেড়া দেওয়া উঠোন। গাছের ছায়া।
কয়েকটা পাড়ার কুকুরকে বিস্কুট ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে শিবুদা।

এই দৃশ্যটুকু নিয়ে, রোদটুকু নিয়ে চলেছে সেই –
উত্তোলিত দু-হাত, সেই চরণ

কপালের সেই তিলক

 

মা

মনে পড়ে ঘর

বাড়ি ফিরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি
দরজার পাশ দিয়ে
চলে যাচ্ছে উদাসীন পা
আত্মীয়দের

মাথার কাছে শুধু তুমি বসে

 

নিদ্রাহীন

আকাশে মোটা মোটা দাগ
যেন যন্ত্রণায় দপদপ করা শিরা
তারা নেই একটিও, হাওয়া বইছে

যেন বধ হতে যাওয়া পশুদের চিৎকার

 

শনিবার

স্কুল থেকে দুপুর নিয়ে বাড়ি ফিরি
বাগানের গাছেরা মায়ায় ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে

দরজা খুলে দেখি
চৌকিতে মায়ের পাশে লীনা ঘুমোচ্ছে

থমকে দাঁড়াই

মৃদু মৃদু নিঃশ্বাস
যেন এক নক্সী কাঁথা…

 

দূত

বাড়ি নেই, ঘর নেই
আজ কান্নার মতো ছড়িয়ে জোছনা

পৃথিবী আজ বধ্যভূমি

কর্কটরোগাক্রান্ত কৃষ্ণাদিকে এইমাত্র ধরে ফেলল মৃত্যু

 

সন্ধ্যা

বাড়ি ফিরে আলো নিভিয়ে দিই –
জানালার পর্দা একটু সরিয়ে রাখি
সামনের ফ্ল্যাটের ওপরের আকাশ
কী যে শান্তি এনে দেয়…

ফ্ল্যাটবাড়ির আলো এসে পড়ে
লেখার পাতায়

ছুঁয়ে দিই শঙ্খধ্বনি

 

সুখ দুঃখের আকাশ

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

ও আর সুন্দর ফ্রক নয়
মাথায় পরা
প্রজাপতি দেওয়া হেয়ারব্যান্ড নয়
নয় কাজল, কাজলের বড় টিপ
হাতের ছোট ছোট চুড়ি
ও শিশুকন্যা
মেয়ে
নারীচিহ্ন
আগলে রাখো
বুক দিয়ে আগলে রাখো

(ঈশ্বরের বাগান)

জিজ্ঞাসা করনি মাথায় যন্ত্রণা করছে কিনা। জিজ্ঞাসা করনি জ্বর আছে কিনা।
জিজ্ঞাসা করনি কী কী বই কিনেছি। শুধু একটাই কথা – কোথায় এখন?
ভয় পেয়েছিলে আমার সঙ্গে নতুন ছেলেটি আছে কি?

(ঈর্ষা)

পুব আকাশ পশ্চিম আকাশ
উত্তর আকাশ, দক্ষিণ আকাশ
শূন্য
ঝাঁঝরা গাছের পাতা
আধপোড়া দিগন্ত
মাটিতে শোয়ানো পরপর লাশ

(বন্দুক)

নান্দনিকতারও রিভার্স ইমেজ আছে একখানা। যেমন আছে লক্ষ্মী সরস্বতী কিংবা দুর্গাপ্রতিমার রোলমডেলকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া বিকল্প জীবন। বর্ণালী কোলে। খুব বেশিদিন হল লিখতে আসেননি। দিগন্তে ফোটে কত নাম-না-জানা রঙের উদ্ভাস। আর, রহস্যময়তা। আকাশের স্লেটে যেমন মুছেটুছে দিয়ে, বর্ণালীর একটি কবিতা বইয়ের নাম, আধপোড়া দিগন্ত। পাবলো নেরুদা তাঁর মেমোয়ার্সে সেসব লিখেছেন, এইসময় লিখতে বসে ভূতেদের ছায়া নড়ে-ওঠা ছাড়া কোন মুগ্ধতার কথাই-বা লিখে ওঠা যায় আর, তেমনই ভেবেছেন, সম্ভবত বর্ণালীও।

ওঁর কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছি এ-লেখা। কবিতাগুলো পড়ে যাচ্ছি পরপর আর দেখছি, সম্পূর্ণ ন্যারেটিভকে উনি প্রকাশ্যে আনেননি কোথাও, একটু ইশারা, সামান্য সঙ্কেত, সুখদুঃখের মোটিফ রেখে-রেখে এগোচ্ছেন। নির্মাণে বুঝি একটু বেশিমাত্রায় সংযত। তা’ বলে সমসময়কে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ দিয়ে, প্রেম ও অভিমান দিয়ে মেলে ধরায় অসম্পূর্ণতা আসেনি এতটুকু।

গদ্যের ঢঙে লেখা। কিন্তু অক্ষরবৃত্তের চোরাটান আছে। শব্দ ব্যবহার, কুশলতা অবাক করেছে আমাকে। কী অনায়াসে কয়েকটা আঁচড়ে নারীবিশ্ব উঠে আসে। ‘কীভাবে/ কীভাবে/ কাটা পড়ল আমার দুই ডানা?/ মনে পড়ে/ আমিও ছিলাম একদিন প্রজাপতি/ ছিলাম ভোর’— দু’টি লাইনের ভাঁজে লুকিয়ে থাকছে কতশত অর্থবহ বাস্তব, যাদুবাস্তবতা। একইসঙ্গে মায়াবী ও কঠিন। বৈতালিকের গান যেমন, তেমনই সকালের বিশুদ্ধ সুর মেখে বর্ণালী কোলে-র লেখাগুলি এগিয়ে চলে। যথারীতি, কবি তো গজদন্তমিনারবাসিনী নন, তাই ধুলোবালি আর সুখদুঃখ মেখে-মেখে আধপোড়া দিগন্তে মিশে যায় ওরা। হ্যাঁ, মিশে যায়, কিন্তু রেশ রেখে যায়, দগদগে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.