একটি ইস্তেহারের জন্য

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

 

গুটিকয় কমিনিস্ট ও একটি চা দোকান  

অনুপমদের পাড়ার মিঠুন সাহা সম্প্রতি একটি বামদলে যোগ দিয়েছে। এই খবরটি অনুপমের জানা ছিল না। সেই বামদল একদিন বিকেলে পাড়ার মধ্যে গোটা কুড়ি মানুষকে নিয়ে একটি ছোট মিছিল বের করেছিল ভিন রাজ্যে লেনিনমূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে। আগে এই ধরনের মিছিল বামদল বের করলে তার ল্যাজামুড়ো দেখা যেত না। এখন কড় গুনে বলা যায় কতজন হাজির!

যাইহোক, অনুপম তো সেই মিছিলে মিঠুনকে দেখে থ! সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাতে বাজারের ব্যাগ। অনেকেই সেই ছোট মিছিলকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে; অথচ এককালে বামদলের মিছিল বেরোনো মানে সকলে তটস্থ হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিত। বীরদর্পে, গর্জন করতে করতে মিছিল যেত রাস্তার মাঝখান দিয়ে।

মিঠুন কি মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে অনুপমকে দেখে নিল একঝলক? অনুপমের মনে হল যেন। কিন্তু সে সোজাসুজি অনুপমের দিকে তাকাল না। প্রতিবাদী হাত আকাশের দিকে ছুঁড়ে লেনিনমূর্তি ভাঙার অপরাধীদের শাস্তি দাবি করতে থাকল। মিঠুনকে সে এইরূপে কখনও দেখেনি। মিঠুন কবিতা লেখে, গান লিখছে ইদানীং; তাদের পাড়ার এক ছেলে তাতে সুর দিয়ে গান বানিয়ে ইউটিউবে ছাড়ছে— এর মাঝে মিঠুন সাহার এই  প্রতিবাদীর রূপ মেলানো মুশকিল। বিশেষত যখন বামদল ক্ষমতায়, মিঠুন সমানে তাদের মুন্ডুপাত করে গেছে সেই চা দোকানে বসে। কে শুনল আর কে শুনল না— তাতে মিঠুনের কিছু এসে যেত না। কোদালকে কোদাল বলতে মিঠুন সাহা কখনও পিছপা হয়নি।

সেই মিঠুন বামদলে? অনুপম পিছন ঘুরে দেখল সেই মিছিল। রাস্তার ধার দিয়ে চলা সেই মিছিল কেমন যেন মিইয়ে আছে। সবই আছে। সেই লাল পতাকা, তেমনই দৃঢ মুষ্ঠিবদ্ধ হাত; কিন্তু কোথাও যেন আগের সেই তীব্র ঝাঁঝ অনুপস্থিত। অনুপম ভাবল, ক্ষমতা থেকে বিতারিত হলে কি এমনি হয়?

দিন কয়েক পর এক রোববারের সকালে চা দোকানের মাচায় মিঠুন সাহা যথারীতি উপস্থিত। অনুপম পাশে গিয়ে বসল। আড়চোখে দোকানের ভেতরটা দেখে নিল। মিঠুন তখন ছোট ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল। বলল, বোস। শ্যামলদা, অনুপমকে একটা চা দাও।

বসল অনুপম। কিন্তু কিছু বলল না। রূপসা দোকানের ভেতরে। গোল্ডেন কালারের একটা চুড়িদার পরেছে। মুখের সামনে এক গুচ্ছ সুন্দর চুল ঝুলছে। ভেতরে পাতা চৌকিতে বসে ও হামানদিস্তায় মশলা পিষছে। দিনদিন সে আরও সুন্দরী হয়ে উঠছে। তার প্রতি অনেকের লোভ।

শ্যামল চা হাতে ধরিয়ে দোকানে ঢুকে গেল। এই দোকানটা মোটামুটিভাবে কমরেডদের জন্য নির্দিষ্ট। এখনও। বহু প্রাচীন কমরেড এখানে বসে চা খায় ও বিপ্লবের নানা গল্পগুজব করে। এখানে বসেই মিঠুন সমানে বামবিরোধী কথা কপচে গেছে। তখন কি কম কমরেড এখানে উপস্থিত থাকত? তারা থাকত। কিন্তু মিঠুন সাহার কথার কোনও প্রতিবাদ করত না। মুখে হাসি ঝুলিয়ে চুপ করে মাচায় বসে থাকত আর তাদের ছায়া দিত একটা বেঁটে বট। এক স্বচ্ছ দিঘির পারে অবস্থিত সেই চা দোকান, সামনে বট। আগে শ্যামলের ছেলে নন্দু এই ছোট দিঘিতে কিছু তেলাপিয়ার বাচ্চা ছেড়েছিল ছিপ ফেলে মাছ ধরবে বলে। কমরেডরা আধখাওয়া বিস্কুট যেমন সামনে লেজ নাড়া কুকুরকে দিত, তেমনই ছুড়ে দিত জলের উপর মুখ উঁচিয়ে ‘কুবকুব’ করতে থাকা তেলাপিয়ার ঝাঁককে।

কিন্তু এখন জল একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এই দোকান ছাড়িয়ে কিছু দূরে পরপর কয়েকটা খাটাল আছে। তারা খাটালের গোবর ফেলে খোলা নর্দমায়। তার সঙ্গে যোগ আছে এই দিঘির। আগে যার জল ছিল কাকচক্ষুর সমান, বাতাসে ঢেউ খেলত; বিহারী শ্রমিকেরা যার জলে স্নান সারত; আবার দূর পাল্লার বাস থামলে অনেকে মুখ, হাত ধুয়ে নিত— সেই জল ক্রমে উধাও হয়ে যেতে থাকল ও তার স্থলে ভরে যেতে থাকল সর্বগ্রাসী গোবর। সেটাকে এখন আর চেনার উপায় নেই; এত বড় ঘড় ঘাস ও বন্য লতা জন্মেছে সেখানে। মাঝে মাঝে বাতাস ঘুরে গেলে সেখান থেকে বদখৎ গন্ধ উঠে আসে।

খা—।

এই যে।

নিজের ভাঁড়টা গোবরের ঝিলে ছুঁড়ে মিঠুন সাহা বলল, বল কী খবর।

এখন খবর একটাই। মিঠুন সাহা এখন শ্রীশ্রী কমরেড মিঠুন সাহা।

মিঠুন সাহা মাচায় বসেই একটু দুলে নিল। বোঝা গেল, কমরেড বলায় খুশি হয়েছে। বলল, হুঁ।

তোমার কাছে আমার প্রশ্ন একটাই। তুমি ডুবন্ত একটা নৌকায় উঠতে গেলে কেন?

এবার মিঠুন হেসে ফেলল। বলল, ডুববে কেন? ভাসছে তো।

ঠিক। ভাসছে। কিন্তু সেটা একটা ভাঙা নৌকা। চুঁইয়ে জল ঢুকছে। তলিয়ে যেতে আর বেশি দেরি নেই।

মিঠুন বলল, প্রতিবাদ তো করতেই হবে, তাই না?

তাহলে এই হাইরোডের ধারে প্রাচীন সব গাছ কাটা, পুকুর নষ্ট নিয়ে তোমরা কেন কোনও প্রতিবাদ করছ না? এখানে তোমাদের কোন রাজনৈতিক সমীকরণ লুকিয়ে আছে?

মিঠুন মাচায় পা তুলে বসল। বলল, কাউন্সিলরকে বলেছিস?

বলেছি।
কী বললে?
বললে, হাইরোড কি কেবল আমাদের পুরসভা এলাকার মধ্যে পড়ে? কতদূর চলে গেছে রোড—। এর মধ্যে কত পুরসভা, পঞ্চায়েত আছে। সকলে এককাট্টা না হলে কিছু হবে না।
হুম! শুনে তুই কী বললি?
এরপর আর কী বলা যায়? চলে এলাম।

ঘাড় নেড়ে মিঠুন সাহা বললে, ঠিক। এরপর চলেই আসতে হয়। আর ঠিক এই কারণে আমি বামদলে নাম লিখিয়েছি। কারণ বর্তমান সমাজব্যবস্থায় একা প্রতিবাদ করা যায় না। ঠিক ছবি করে দেবে। হাতে না পারলে ভাতে মারবে।

কথাটা খারাপ বলোনি। আবার এটাও ঠিক, কথাটা নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে হলে ব্যক্তিকে কোনও রাজনৈতিক দলেই বা নাম লেখাতে হবে কেন?
এখন এটাই ভবিতব্য রে! কতশত প্রতিবাদী একাকী প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে। তার আগে দশ পনেরো দিন কোমায়। এই জন্যে তখন বললুম, লাঠির জোর। তুই তো একজন সমাজ সচেতন নাগরিক। হাফ বুদ্ধিজীবী। দেখছিস বুঝছিস তো সব। চল, একটু হাঁটি। অনেকদিন পর তোর সঙ্গে জমিয়ে একটু আড্ডা মারি। এখানে সেটা ঠিকঠিক হবে না।

অনুপমও সেটাই চাইছিল। কারণ ইতিমধ্যেই একজন চোরাগোপ্তা কমরেড উপস্থিত হয়েছে। এখন ওদের সময়। বাজার সেরে চা দোকানে কমরেডদের জমায়েত হবার মরশুম শুরু হল। সাড়ে বারোটা থেকে তাদের ভিড় পাতলা হতে শুরু করবে। একটায় দোকান ফাঁকা। তখন শ্যামল দোকানের ঝাঁপ নামাবে। সে অনুপমকে তেরছা চোখে দেখে মিঠুন সাহার দিকে একটি হাসি ছুঁড়ল।

রূপসা তখন নূপূর পায়ে আলতো চলনে দোকানে ঘুরছে।

 

চারজন প্রলেতারিয়েত ও একটি ইস্তেহার

মিঠুন সাহা ও অনুপম চৌধুরী কথা বলতে বলতে মাচা থেকে নেমে পড়ল। মিঠুন নেমে পয়সা মিটিয়ে দিল। রূপসার দিকে আলগোছে চেয়ে নিয়ে অনুপম হাঁটতে থাকে। মূল ছাড়া থেকে নিচু দিকে একটা সরু পথ নেমে গেছে। পথের উপর ইট ফেলা। তাই সাবধানে হাঁটতে হয়। পথের একদিকে কোনওটা ইট, কোনওটা দরমার দোকান। কেবল চা দোকান নয়; আছে মুরগির একটি দোকান, মাছের দোকান দুইটি। ছোট মুদিখানাও দুটি। একটিতে আবার ল্যুজ আচার মেলে। সেটি চালায় এক বাঙাল বউ। এছাড়া একজন বিহারি ইস্ত্রিওয়ালা আছে। একটি সেলুন আছে। সেও বিহারি। আর আছে মোবাইলে গান ও মাচার নাচ ভরার ভোজপুরীওয়ালার দোকান। আর শ্যামলের চা দোকান। কেবল চা নয়; সকালে ও বিকালে সে হাতে গড়া রুটি ও সবজি করে। কোনওদিন ছোলার ডাল, কুচি কুচি করে আলু কেটে। তাছাড়া কমরেডদের জন্য অতি-অত্যাবশ্যক মামলেটেরও ব্যবস্থা আছে।

রাস্তার ধার দিয়ে যেতে যেতে মিঠুন সাহা বলল, শ্যামলের ছেলেটা মরত না জানিস! প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেল! মেডিকেলে যদি আরও আগে নিয়ে যেত, হয়ত বাঁচত। কিন্তু এরাও গা করল না। কী কেস হল কিছুই বুঝলাম না। মেডিকেলে সাতদিন ছিল, ওর বউটাও ছিল। আমি একদিন দেখতে গেছিলাম। দেখি, অবাক কাণ্ড। রূপসা ছাড়া আর কেউ নেই!

অনুপম চুপ করে থাকে। সে নন্দুর অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে জানে। এদিকের অনেকেই শুনেছে। মদ খেয়ে হাইরোডের ধার দিয়ে ফেরার সময় একটি লরির সাইডের সঙ্গে ওর মাথার সাইডের টক্কর হয়। লোকাল ছেলেরা স্থানীয় একটি ছোট নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেয়। সেখানে প্রাইমারি চিকিৎসা করে ছেড়ে দেয়। কিন্তু তার মাথার ভেতর যে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে, সে খবর কারও কাছে ছিল না। পাঁচদিন পর তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় মেডিকেলে ভর্তি করে দেয় শ্যামল ও পার্টির লোক। সেখানেই সাত দিন পর মারা যায়।

মিঠুন সাহা বলে চলে, সারাক্ষণ কেবল মদ আর মদ। দিন রাত অমন রূপসী বউটাকে ধরে ধরে মারত। ওর মা কবে ওদের ছেড়ে অন্য লোকের সঙ্গে ভেগে গেছে; শ্যামলদা ছেলেমেয়ে দুটিকে আঁকড়ে বড় করলে। মেয়েটা তবু লেখাপড়া শিখেছে; আর ছেলেটা— কোত্থেকে একটা সুন্দরী মেয়ে ধরে বিয়ে করে আনল। নন্দু যখন মারা যায়, কী আশ্চর্যের কথা জানিস— রূপসার বাড়ি থেকে কেউ আসেনি! না বাবা, না বোন বা ভাই। ওর কি কেউ নেই? অ্যাদ্দিনে তা জানতেও পারলাম না! ও মরেছে, বউটা বেঁচেছে!

অনুপম এবারও চুপ।

একদিন আমার সঙ্গে নন্দুর জোর ক্যাচাল বেঁধেছিল, জানিস?

কীরকম? অনুপম এবার কৌতূহলী হয়।

মিঠুন সাহা জোর গলায় উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকল, একদিন দোকানে বসে চা খাচ্ছি, আমার সঙ্গে আরও তিনজন ছিল। তখন দেখি, মাল খেয়ে শ্যামলদার উপর তড়পাচ্ছে। সেদিন আমার কী হয়েছিল; শালা মটকা গরম ছিল, দিয়েছি এক চাপড়। হাঁউমাউ করে মাটিতে বসে পড়ল। তেড়ে গিয়ে বললুম, বাঞ্চোত, তোর বাপ আর এই দোকানের জন্য খেতে পাস। বউটা খেটে খেটে পাগলা হয়ে গেল, আর তুই মাল খেয়ে…। আমরা তোর দোকানে এসে বসি বলেই তুই ভাত পাস। আর কোনওদিন দোকানে ঝামেলা করলে গুছিয়ে কেলাব।

অনুপম বলল, আগে শুনিনি তো!

তুই তো আর বেরোস না, জানবি কোত্থেকে?
আচ্ছা, তারপর?
শালা, কুত্তা জানিস! তখন পায়ের কাছে শুয়ে কুঁইকুঁই করছে। খুব রেগে আছি, বুঝতে পারছি চোখ-মুখ আমার লাল হয়ে গেছে। গরম হয়ে গেছে কান। মনে হল, দিই শালা এক সপাটে লাথি। মাজা ভেঙে দিই। তুমুল খিস্তি করছি; বউটা দোকানের ভেতর চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে; নন্দু কেঁদেকেটে তখন বললে, ক্ষমা করে দাও মিঠুনদা, তোমার একশো টাকা দিতে পারিনি। আমি বললুম, টাকা তুই দিতে পারবি না জানি। জেনেই দিয়েছিলুম। ভেবেছিলুম তুই শোধরাবি। কিন্তু সে বান্দা তুই নোস।
হুম! ধার বুঝি?
হ্যাঁ। কত একশো যে নিয়েছে। আজ দেব কাল দেব করে দেয়নি। তোর কিছু গেছে নাকি?
না। চেয়েছিল। দিইনি।
সেই তো। তুই কোথায় পাবি, চাকরি বাকরি নেই। গ্রুপ ডি-র পরীক্ষা দিলি?
দিয়েছি।

মিঠুন সাহা যেন প্রশ্ন করতে হয় তাই করা, তাই সে প্রসঙ্গ থেকে সরে আবার গাছেদের কাছে ফিরে গেল। বলল, হাইরোড যখন সম্প্রসারণ হয়, এইসব দোকান রাস্তার ধার থেকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ওদের পুনর্বাসন দেয় এই ছোট ঝিলের পাশে। ওরাই কলপাড়ে ইটফেলা রাস্তা করেছে, বট ও অশ্বত্থের গাছ করেছে। রূপসা পুঁতেছে একটি রাবার গাছ। মোটা পাতা তার ভালোলাগে। তাতে কিছু পাখি এসে বসে। কিন্তু এই কয়টি গাছে কয়টি পাখিই বা ধরবে?

এইসব গাছ যা হয়েছে বা যা আছে তা আছে; কিন্তু হাইরোডের ধারে পরপর সব প্রাচীন নিম বট অশ্বত্থ— সব সাফ করে দিয়েছে। সেখানের পাখিরা উড়ে আসে এই অনুপমের বাড়ি। অনুপম বলে, আমি সকালের আহার দিই। ঘরে ফেরার আগে আবার পাখিরা আসে। সন্ধের আগে দানা ছড়িয়ে দিই। পাখিরা খুঁটে খায়।

বাঃ। খুব ভালো কাজ। চালিয়ে যা।
কিন্তু এবারে যেন বড় উৎপাত শুরু হয়েছে এই পাখিদের আনাগোনায়। আগে পাখিরা ছিল গুটিকয়; এবারে তারা সংখ্যায় হাজার হাজার। অত গাছ কেটে ফেললে পাখিরা যাবেই বা কোথায়, খাবে কী?

অনুপম ও মিঠুন সেখানে এসে দাঁড়ায় যেখান থেকে রাস্তার দুই ধারে কোনও গাছ নেই।

মিঠুন সাহা আবার গাছ থেকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় প্রসঙ্গ পালটায়। বলে, রূপসাকে দেখলি?

হুঁ।
দেখে কেমন মনে হল?
এমনিই।
এমনিই কীরে? আগের চেয়ে দেখতে ভালো হয়েছে না?
তা হয়েছে।
স্বামী মরে গিয়ে মেয়েটা কি খুশি হয়েছে?
আমি কী করে বলব।
রূপে এত জুলুস কেন? এমনি ঠারেঠোরে পা ফেলে কেন?
ফিরে গিয়ে জিগেস করব?
মারব শালা এক থাবড়া। ইয়ার্কি হচ্ছে?
এর মধ্যে থাবড়া আসে কোত্থেকে? আমি সম্ভাবনার কথা বলেছি মাত্র।

মিঠুন সাহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ওর পেছনে ছেলে লেগে গেছে, জানিস। এমন কিছু ছেলে আছে, যারা এইসব মেয়েদের খোঁজে। স্বামী নেই, বিধবা, ডিভোর্সি। তেমন কেউ জুটে যাবে অচিরেই। হয়ত গেছেও। দেখিস না সব সময় কানে ফোন গুঁজে আছে, সাজের ঘটা, লকস কাটা চুল। নন্দু বেঁচে থাকতে এসব ছিল? মারের ভয়ে আর অশান্তিতে জড়সড় হয়ে ছিল। এখন চেহারাতেও খোলতাই এসেছে। ওর বাপের ঘরের বোধহয় তেমন অবস্থা নয়। নন্দু মরে গেল, কেউ এল না। মেয়েটাও একদিনও বাপের ভিটেতে যায় না। এর যে কী রহস্য, তা জিগেস করাও যায় না! আমি আর পার্টির ছেলেরাই কাঁধ দিয়েছিলুম। সেও তো একবছর হয়ে গেল। এখন ফোনে এমন ফিসফিস করে কথা বলে যে পাশে থেকেও শোনাই যায় না। কোনদিন দেখবি পাখি ফুড়ুৎ!

ওকে নিয়ে তুমি অত ভাবছ কেন?
মুশকিল কী বলত, এরা এখন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা ভুল হবে। কারণ ভালো বাড়ির ছেলে বা ভালো ছেলে এরা পায় না সাধারণত। আর বিপদ সেখানেই। নইলে মেয়েটা কিন্তু খারাপ নয়।

হাহা ছুটে গেছে রাস্তা; আগের মত ছায়া নেই, গাছেদের ছবি নেই। ছায়া সুশীতল পথ মুছে হয়ে আছে ঢালাই কংক্রিট। আপ ডাউনে হু হু গাড়ি ছুটছে।  মিঠুন সাহা দুদিকে মাথা নেড়ে বললে, গাছ কেটেছে জানি; এমন হাল—দেখিনি কোনদিন। আজ তুই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলি। খুব খারাপ অবস্থা!

বড় রাস্তার ধারে সরকার কোনও গাছ রাখবে না। গাছ নাকি দুর্ঘটনা ঘটায়। মাঝে যশোর রোডে গাছকাটা নিয়ে ঝামেলা হল, পড়োনি কাগজে?
সেটা জানি। ওখানে ঝামেলা করার লোক আছে। এখানে নেই। তাই নীরবে হাজার হাজার বৃক্ষ নিধন হয়ে চলেছে।
কত কোটি টাকা বল তো? কার কার পকেটে ঢুকল?

বলে মিঠুন সাহা সেখানে ঘোরাফেরা করতে করতে বলল, এইসব গাছে কত পাখি বাস করত। তারাই সকলে তোর বাড়িতে গিয়ে ঝামেলা করে। কারণ তুই খেতে দিস।

কিন্তু সব আমার বাড়িতেই বা কেন? আমার কী এমন ক্ষমতা যে এত পাখিদের দুবেলা পেট পুরে খেতে দেব? তুমি সরকারি চাকরি করো, ব্যাঙ্কের লোক—; হুহু করে মাইনে বাড়ছে— তোমার ঘরে ওরা যেতে পারে।
হু! এমন বললি যেন রোজ আমাদের মাইনে বাড়ে আর মাস গেলে যেন কোটি টাকা মাইনে পাই!
তুমি জানো না মিঠুনদা, ওরা আমার ঘরদোরের কী অবস্থা করে রেখেছে! চারিদিকে বিষ্ঠায় ভর্তি। বাস করা দায় হয়েছে এমন দুর্গন্ধ! আগে পাখিরা আমাদের একটু হলেও ভয় পেত। এখন দিব্যি ঘরের এদিক ওদিক করে। পছন্দমত জায়গা খুঁজে গুছিয়ে বাসাও করে ফেলছে।
খুব ভালো, খুব ভালো। পদ্মশ্রী তোর বাঁধা।
বাজে বোকো না। আগে নিজে বাঁচি, তারপর না হয় পুরস্কারের কথা ভাবা যাবে। কি না কি রোগ হয় পাখিদের শরীর থেকে তার ঠিক কী? আমার জিনা হারাম হয়ে যাচ্ছে মিঠুনদা।
তোর উন্নতি হোক।

এবার যেন রেগে গেল অনুপম। হাত পা নেড়ে বলতে থাকল, এই তোমার কমরেডি? রাশিয়াতেও লেনিনের মূর্তি ভেঙে তার মাথার উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একজন— আমি কাগজে ছবি দেখেছি। আমি পাখিদের বলে দেব তোমার বাড়ির কথা। দেখবে ওরা কিভাবে তোমাকে সেখান থেকে উৎখাত করে।

ওরা আমার বাড়ি খুঁজেই পাবে না।

এই সময় এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল যেন। চারজন প্রোলেতারিয়েত তাদের সামনে যেন সেই শূন্য মাটি ফুঁড়ে উঠে এল। মিঠুন সাহা নির্বিকার গলায় বললে, তুই ওদেরও তোর ঘরে নিয়ে যা। দেখছিস না ওদের কোনও ঘর নেই। তুই ওদের আশ্রয় দে কাজ দে।

তুমি একজন নিষ্ঠাবান কমরেড; ওরা তোমার সম্পত্তি, তাই তুমি নিয়ে যাও।
ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। কমরেড হলেই সব হয় না। এই ফ্যাসিবাদী জমানায় ওদের লুকিয়ে থাকতে হবে। আর সেটা তোর বাড়িতেই সম্ভব কারণ তোর ঘরে পাখি বাস করে।
তার মানে?

মিঠুন সাহা তার চশমা ভুরু অবধি ঠেলে দিয়ে বলল, আরে এই প্রোলেতারিয়েত থেকেই পুনরায় বিপ্লব আরম্ভ হবে। কিন্তু এখনও সেই সময় আসেনি। তুই ওদের তোর ঘরে লুকিয়ে রাখ। ওরা পাখির সঙ্গে মিশে পাখি হয়ে থাকবে, কেউ টের পাবে না। সময় এলেই এদেরকে সামনে রেখে আমরা আবার নতুন এক যুগের সন্ধানে নামব। তুই আমাদের দলে চলে আসবি। দুজনে মিলে নতুন ইস্তেহার লিখব। পাখিরা যা খায় তাই ওদের খেতে দিস। পিঁপড়ের ডিম, ঘাস দানা, মাঠের ইঁদুর— এই সব।

 

কমরেড মিঠুন সাহাবিপ্লবী কবিতা

বাড়ি ফিরল অনুপম। ওরা চারজন নীরবে তার পিছুপিছু ঘরে ঢুকে পাখি হয়ে রয়ে গেল। পনেরো দিন পর স্থানীয় কাউন্সিলর ছেলেদের নিয়ে তার ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই বলল, আপনি কবিতাটা ভালোই লেখেন।

অনুপম অবাক হল। তিনি চেয়ারে বসে বলে চলেন, আমাদের এখান থেকে যে সাপ্তাহিক চারপাতার ট্যাবলয়েট পত্রিকা বেরোয়, এই কী নাম রে কাগজটার? পাশ থেকে একজন নাম বলে দিল। তিনি তখন বললেন, হ্যাঁ, জাগরণ। তাতে আপনার কবিতা পড়লুম। খুব ভালো। কবিতার নাম, ‘একজন প্রোলেতারিয়েত’।

সে নীরস গলায় বলল, আমি কবিতা লিখি না।

ও। তবে ওটা কার কবিতা ছিল?
মিঠুন সাহা। পাখিদের নিয়ে কিছু ভাবলেন?
হ্যাঁ। এটা একটা সমস্যা। তবে আমরা চেষ্টা করছি। হাইরোডের এরিয়া ছাড়িয়ে যেখানে সরকারি জমি ও খাস জমি বে-ফালতু পড়ে আছে, সেখানে আমরা গাছ বসানোর পরিকল্পনা করেছি। বলতে পারেন আপনার উৎসাহেই তা সম্ভব হল। এজন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আগামীতে আপনার এই চিন্তাভাবনার কথা আমরা জনগণকে জানাব সভা সমিতির মাধ্যমে। আপনি আমাদের পাশে থাকবেন।
গাছ বড় হতে সময় লাগবে।
সে তো বটেই।
সব গাছ নাও হতে পারে।
সে তো একশোবার।
কিছু গাছ ছাগলে মুড়িয়ে দিতে পারে।
যদিও সব বেড়া দেওয়া আছে, তবে এটা হতে পারে।
সব গাছ আবার গাছ নয়।
মানে?
সব পাখি যেমন পাখি নয়।
অর্থাৎ?
সব ভোট যেমন ভোট নয়। ততদিন কি পাখিরা এখানেই থাকবে?
দেখুন, আমরা সকলেই জানি আপনি কারও সাতেপাঁচেও থাকেন না, চাকরিবাকরি করেন না— পাখি ভালোবাসেন। সেই নিয়েই আপনার দিন কেটে যায়। গাছ বড় না হওয়া অবধি পাখিরা আপনার কাছেই থাকুক। আমরা ওদের জন্য কিছু রেশনের ব্যবস্থা করা যায় কিনা— সেটা দেখছি।… আর ওই যে চারজন লোক—। হ্যাঁ। ওরা কারা? এলাকায় আগে তো দেখিনি!
ওরা পাখিদের দেখভাল করে। বিষ্ঠা ফেলে। আমি ওদের দুবেলা খেতে দিই। কিন্তু সেও বোধহয় অসম্ভব হয়ে আসছে।
না না, এসব আপনি করবেন কেন? সরকার করবে। গরীর মানুষের সব দায় সরকারের। নইলে সরকার আছে কেন? কিন্তু ওরা কারা? ওদের পরিচয় কী? ওদের সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর না নিয়ে ওদের বহাল করা আপনার উচিত হয়নি। বারবার একথা আপনাকে কেন বলছি বলুন তো? এখন কোনও অচেনা লোককে বিশ্বাস করে বাড়িতে তুলবেন না বাড়ি ভাড়া দেবেন না। ওদের পরিচয়পত্রর কপি নিয়েছেন?
না।
ওরা কারা?
জানি না।
ওরা চারজন প্রলেতারিয়েত। আমাদের কাছ গতকাল খবর এসেছে চারজন প্রলেতারিয়েত এই এলাকায় এসেছে। আর এই বিষয়ে আমরা পাকা খবর পেয়েছি মিঠুন সাহার ওই কবিতাটা থেকে। কবিতাটা পড়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম। যাইহোক, এটাকে আমরা নিষিদ্ধ করব।
দেখুন, কবিতাটা আমি পড়িনি। কারণ ওই পত্রিকাটি আমি রাখি না। আর এ বিষয়ে মিঠুনদার কাছেও আমি এই কবিতা বিষয়ে কিছু শুনিনি। যা আপনার কাছে শুনলাম, মনে হয় এতে আপনাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখা নেই।
তিনি যা করেছেন লেখাতে, তা হল এক নতুন পৃথিবীর সন্ধানে মার্ক্সবাদের আশ্চর্য যাত্রা। এক নতুন ম্যানিফেস্টোর খোঁজ। আর এখানেই আমাদের আপত্তি। ওরা এখন অচল পয়সা। যখনই তারা কোনও দেশে ক্ষমতায় এসেছে, শাসক হয়ে গেছে একনায়ক।
শোষণহীন সমাজ কোনওদিনও সম্ভব নয়।
এর জন্য আমরা আছি। আমরাই আন্দোলন করব। আমরাই বিপ্লব আনব। ওরা অনেকদিন চেয়ারে বসে ঘুমিয়েছে, এবার ঘরে ঢুকে ঘুমাক। এই তোমরা চারজন প্রলেতারিয়েত, সীমান্ত পেরিয়ে এসেছ? এদিকে এসো। নাম কী তোমাদের?

ওরা চুপ।

অনুপম বলল, ওরা কথা বলতে পারে না। ওদের জিভ কাটা।

কেন?
জানি না।
ওরা তবে এখানে কী করে এল?
ওরা এসেছে পাখিদের সঙ্গে।
মানে?
ওরা উড়তে পারে। ওদের সকলের দুটি করে ডানা আছে। ওরা আসলে এক একটি পাখি— দেশ থেকে দেশান্তরে যায়— আর কিছু নয়।

কাউন্সিলর ও তার ছেলেরা প্রথমে নীরব হল; তারপর মৃদুমন্দ হাসতে লাগল।

যাবার আগে কাউন্সিলর বলে গেলেন, আপনি একটি ইস্তেহার লিখুন পাখিদের নিয়ে। এই যে, আপনি আর তাদের বহন করতে পারছেন না। তাই এদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকার নিক— ওক্কে?

 

একটি ইস্তেহারের জন্য

শুনে মিঠুন সাহা বললে, তুই লিখতে রাজি হলি কেন?

কী করব?
মুখের উপর না বলতে বাঁধছিল?
তা নয়। ভাবলাম তোমার মত লেখা একটি যদি লিখতে পারি।
কবিতাটা তুই তো পড়িসনি। জাগরণের সব কপি ওরা কিনে নিয়েছে। সারারাত জেগে কবিতাটা শেষ করলুম। ফেসবুকে দিতেই হইহই। জাগরণের সম্পাদক বললে, ডক ফাইল পাঠাও, এখুনি ছেপে দিচ্ছি। ছাপা হল। কবিতাটা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ফেসবুক থেকেও উধাও! প্রতিবাদী সব লেখাকে এইভাবেই চুপ করিয়ে দিতে হয়।
মিঠুনদা, মানুষ পাঁচ হাজার বছর আগে শাসক যেমন ছিল এখনও তাই আছে। সকলেই সিস্টেমের দাস। মানুষের নেচারে এই সিস্টেম ঢুকে আছে। চেয়ারে বসলেই একনায়ক হবার সাধ। আমরা পুরানো ইস্তেহারকে দেখছি পুরানো চোখেই। নতুন দৃষ্টিতে দেখলে তা নতুন লাগবে, তখন আর নতুন করে কিছু লিখতে হবে না।

মিঠুন অনুপমের পিঠ চাপড়ে বলল, ভালো বলেছিস।

পাখিদের নিয়ে আমি কিছু ভেবেছি মিঠুনদা। এখানে হবে না। বাইরে চলো।

মিঠুন বলল, শ্যামলদা, আজ কত হল?

শ্যামল কিছু বলার আগেই বললাম, আজ আমি দাম দেব। কত?

মিঠুন হাহা করে বলল, আরে তুই দিবি কী? একটা চাকরিবাকরি পা— তারপর দিবি।

পেয়েছি তো।
মানে? এতক্ষণ বলিসনি তো!
এমন কিছু কাজ নয়, একটি কারখানায়—। আপাতত একজন লেবারের কাজ।
বাঃ। তুই একজন শ্রমিক। কীভাবে কী হল, কোথায় তোর কারখানা— সব খুলে বল।
বলব বলেই বাইরে যাচ্ছি—।

শ্যামলদা দোকানের ভেতর ব্যস্ত ছিল। সামনে ছিল রূপসা। সে চোখ তুলে চাইতেই পারছে না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে টাকা নিল।

 

রাজারামের অরণ্য  

অনুপমরা সেখানে এসে দাঁড়ায় যেখানে কয়জন প্রলেতারিয়েত তাদের সঙ্গে দেখা করেছিল। অনুপম বলে, মিঠুনদা, আমি আর থাকছি না এখানে; চলে যাচ্ছি কর্মস্থলে। কারখানাটা এই হাইরোডের ধারেই— কিন্তু অনেকটা উজিয়ে যেতে হবে। এখান থেকে ঘণ্টা চারেক দূরত্ব— জায়গার নাম আপাতত বলছি না; মাইনে কম, তাই যাতায়াত খরচ কুলিয়ে উঠতে পারব না। আর আমার সঙ্গে রূপসা যাবে। যাকে তুমি শ্যামলের বউমা হিসেবে চেন।

দারুণ উত্তেজিত হয়ে মিঠুন বলতে লাগল, তুই কী বলছিস?

অনুপম শান্ত স্বরে বলল, আমরা বিয়ে করছি মিঠুনদা। সব ঠিক হয়ে গেছে।

মানে! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। শ্যামল জানে?
না।
লোকটাকে বিপদে ফেলে তোরা চলে যাবি?
আপাতত এছাড়া আর কোনও পথ নেই। শ্যামলদাকে তুমি সামলিও। আর আমাদের সঙ্গে পাখিরাও যাবে।

অবাক হয়ে মিঠুন বলে, মানে?

ওখানে একটা বুড়ো থাকে মিঠুনদা। তার নাম রাজারাম। হাইরোড ছাড়িয়ে একটু গেলেই একটা ভাঙা মন্দির— লোকে সেখানে পুজো না হওয়া কার্তিকঠাকুর ফেলে যায়। সেখানে লোকটা থাকে আর গাছ লাগায়।

একটা ছায়া খুঁজে বসে পড়ে মিঠুন সাহা বলে, কীরকম?

ও যখন আসে সেখানে একটা ছোট বটগাছ ছিল। তার পাশেই আপনাআপ একটা অশ্বত্থের চারা জন্মায়। গাছদুটি খানিক বড় হলে রাজারাম তাদের বিয়ে দেয়। সেখানে বাস করে গুটিকয় শ্রমিকের পরিবার। তারা সেই বিয়েতে নিমন্ত্রিত ছিল। সেদিন তারা তাকে বলে, এই ধূধূ প্রান্তরে আমরা একা— আমাদের কিছু সাথী দরকার— ছায়া দরকার। তুমি আরও গাছ লাগাও। আমরা তাতে জল দেব। তখন সে নানা গাছের চারা লাগাতে শুরু করে। জায়গাটা এখন ছোটখাট বনাঞ্চল। শ্রমিকেরা বলে, রাজারামের অরণ্য। সেই থেকে মুখে মুখে সেই নামটাই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। একদিন রূপসা সেখানে গিয়ে একটা চাঁপাগাছ লাগিয়ে এসেছে। বট-অথত্থের মাঝে একটি মাত্র নরম ফুলের গাছ। গাছ বড় হচ্ছে। তার সামনে আমরা একটি ঘর গড়েছি। ইটের ঘর, টালির চাল। কাল থেকে আমরা ওখানেই গিয়ে উঠব। ভাঙা মন্দিরে, ফেলা দেওয়া দেবতাদের সামনে আমরা বিয়ে করব। কারখানা খুলতে দশদিন দেরি আছে। তার আগে একটু গুছিয়ে নিই। তারপর তুমি যাবে। ওখানে বসে তুমি কবিতা লিখবে।
এ সব তো এক আধদিনের কাজ নয়। তুই এইসব সামলালি কী করে?
আমি কিছু করিনি গো মিঠুনদা। যা করার সব করেছে ঐ চারজন প্রোলেতারিয়েত। আসলে ওরা তো পরিযায়ী পাখি। পাখি হয়েই ওরা উড়ে যেত সেই রাজারামের অরণ্যে। এই যে গাছের কাটা গুঁড়ি, মাটিতে ঢুকে থাকা শিকড়, এরাই বাতাস বাহিত হয়ে, মাটির তলায় তলায় আমাকে প্রথম খবর দেয় রাজারামের অরণ্যর। তারপর ওই চারজন আমার ঘরে আসে। ওরা সেই অরণ্যর কাহিনি শুনে বলে, বিপ্লবের কাল তবে এসে গেছে, কমরেড। বিপ্লব শুরু হোক বৃক্ষরোপণ দিয়ে।

মিঠুন সাহা অবাক হয়ে অনুপমকে দেখে। বলে, তারপর?

গাছ কিন্তু একা নয় মিঠুনদা। গাছেদের পরিবার আছে, মেলামেশা আছে; শত্রুমিত্র আছে, পাড়া-প্রতিবেশী আছে। তারাও বিপদে পড়লে একে অপরকে সাহায্য করে। পাখিরা, পোকামাকড়েরাও এইসব বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে গাছেদের কাছ থেকে। আমি একটু একটু করে এইসব জেনেছি বুঝলে। এই যে এই সকল গাছ কেটে ফেলা হল, গাছেরা কি জানত না? নাকি পাখিরা বুঝত না তাদের সামনে বিপদ আসছে? শিকড়বাহিত হয়ে সেই সব খবর পৌঁছে গেছে নিকট থেকে দূরবর্তী গাছদের কাছে। এইভাবেই পাখিরা খবর পেয়েছে রাজারামের অরণ্যর। জানি না শুধু আমরা, হতভাগ্য মানুষেরা। হয়ত তাই আমরা পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি।

মিঠুন সাহা শ্বাস বন্ধ করে বলে, তারপর?

ঠিক করি, ওখানেই বাস করব। রূপসাকে বলি। ও রাজি। ঐ শ্রমিকরাই আমাদের ঘর তৈরি করে দেয়। ওরা উদয়াস্ত খাটে। তখন বাকি থাকে পাখিদের কথা। ওরা সকলেই প্রায় চলে গেছে প্রোলেতারিয়েতদের পিছুপিছু। নিজের নিজের গাছ বেছে নিয়েছে। প্রকৃতির বিপ্লব সেখানে আরম্ভ হয়ে গেছে মিঠুনদা। রূপসা বলেছে, ওখানে তো কেবল বট আর অশ্বত্থের মেলা; ও ওখানে গিয়ে ফুলের গাছ লাগাবে। রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, শিউলি, টগর, পলাশ ফুলের গাছ করবে। নইলে পাখিরা গান করবে কেন? তাদের ভালোই বা লাগবে কেন? আর ওর প্রিয় চাঁপাফুলের গাছ ও রবার গাছ তো আছেই। ও হ্যাঁ, এই বাড়িতেও বেশ কিছু পাখি থাকবে; তারা হল কিছু চড়ুই।

মুখ বুজে সব শুনল মিঠুন। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এখন আমার কী মনে পড়ছে বলত? শ্যমলের দোকানের সামনে সেই কুঁজো বটগাছের কথা। তুই সেদিন আমাকে একটা পাখির বাসা দেখিয়েছিলি না? সেটা ছিল শালিকের বাসা। ওই গাছে দু তিন বছর আগে, একটা টিয়াপাখি বাসা বেঁধেছিল। এক রাত্রে এক বিহারি সেই গাছে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে ধাড়ি পাখিটাকে ধরে নেয়। পাখিটাকে ধরে সে কী করল জানিস? রান্না করে খেয়ে নিল! কারণ ওর ছেলে সেটা খেতে চেয়েছিল। সেটা জেনে রূপসা কেঁদেছিল খুব। সেই পাখিটিকে যদি পাঠাতে পারতাম রাজারামের অরণ্যে!

তোকে যত দেখছি, অবাক হয়ে যাচ্ছি, জানিস। রূপসার ব্যাপারে তুই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস, আমার চোখে খুব ভালো। কারণ এইসব ক্ষেত্রে হয় কি, মেয়েটির পরিণতি আরও খারাপ হয়। কারণ সে তখন নিজের ভবিষ্যত দেখতে গিয়ে ভুল গাছের ডাল ধরে। এক্ষেত্রে মেয়েটা তোর মতন ছেলে পেয়েছে, ওর ভালো হল; কারণ এ ডাল পলকা নয়; ভাঙবে না। তুই চলে যা ওকে নিয়ে। তোদের ভালো হবে। আর এদিকে আমিও যদি পারি, রাস্তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে কিছু গাছ লাগাব। তাদের মধ্যে অন্তত একটা বট বা অশ্বত্থ বাঁচুক। সেদিন তোরা দুজন আসবি। তোদের সামনে গাছদের বিয়ে দেওয়া হবে। আর সেটা নিয়ে লেখা হবে নতুন ইস্তেহার।
আসব মিঠুনদা। আর পারলে একবার রাজারামের অরণ্যে এসো।

মিঠুন সাহা বললে, একা নয়, সকলকে নিয়েই যাব। বেঁচে থাকা কী একা হয় রে, পাগলা?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5413 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.