ভালো তালিবান এবং শরিয়তসম্মত নারী-স্বাধীনতা

প্রতিভা সরকার

 


প্রাবন্ধিক, গল্পকার, শিক্ষক, সমাজকর্মী

 

 

 

নারীপুরুষ নির্বিশেষে আফগানিস্তানের নাগরিকেরা পশ্চিমি দেশগুলির এবং তাদের মদতপুষ্ট ধর্মীয় সংগঠনের দাবাখেলার ঘুঁটি। তবে মেয়েদের অবস্থা বেশি খারাপ, কারণ তাদের যে গবাদি পশুর পর্যায়ভুক্ত করা যায় সে আমরা আগের তালিবান জমানায় দেখে নিয়েছি। এবারও তালিবানের ঘোষণা অনুযায়ী মেয়েদের ঠিক ততটুকুই স্বাধীনতা দেওয়া হবে, যেটুকু শরিয়তে বলা আছে। মুশকিল হল শরিয়তি আইনকানুন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এটি চিরপরির্তনশীল, এবং সে পরিবর্তন সাধারণত হয়ে থাকে মেয়েদের বিপক্ষে। অতএব আফগান মেয়েদের হাতে এখন রয়েছে একটি সোনার পাথরবাটি। শরিয়তি স্বাধীনতা।

কিন্তু ‘ভালো’ তালিবানেরা আফগান নারীকে এই শরিয়তি স্বাধীনতা অকাতরে দিয়ে দিলেও তা আজকের মেয়েদের পক্ষে যথেষ্ট কিনা, সেই স্বাধীনতা পেয়ে তারা তুষ্ট থাকবেন কিনা, এসব প্রশ্ন উঠবেই।

কেউ মনে করতেই পারে ‘যথেষ্ট’, ‘তুষ্ট’, এইসব কথার কোনও মানে নেই আফগান মেয়েদের ক্ষেত্রে, কারণ তারা বৃহত্তর ক্ষেত্রে চিরকালই স্বাধীনতার অভাবে ভুগেছে। কেউ তফাত করতেই পারে ভালো তালিবান, খারাপ তালিবানের মধ্যে, ভাবতেই পারে মেয়েদের ধর্মীয় টেক্সট অনুযায়ী যেটুকু স্বাধীনতা দেওয়া আছে তাই ঢের। কিন্তু কেউই একথা অস্বীকার করতে পারবে না যে আফগানিস্তানে সমস্ত রাষ্ট্রবিপ্লবে বেশিরভাগ সময়েই মেয়েদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, আর কী আশ্চর্য সেটা করেছে যুযুধান উভয়পক্ষই, এমনকি বিজয়ী এবং বিজিত নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও।

এই দাবার ঘুঁটি হওয়ার ব্যাপারটা দেখে নিয়ে তারপর ব্যাখ্যা করা যাক শরিয়তি নারীস্বাধীনতা কাকে বলে। তবে সবার প্রথমে দেখা দরকার আফগান মেয়েরা সত্যিই কখনও স্বাধীন ছিল কিনা।

ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সঙ্গে যুদ্ধের সময় দুর্গম আফগানিস্তানে দুর্ধর্ষ পাহাড়ি কৌম উপজাতির একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল। তখন হয়তো মেয়েদের জন্য প্রথাগত এবং পিতৃতান্ত্রিক সম্মানের কিছু বন্দোবস্ত থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতা কতটা ছিল সে সম্বন্ধে কোনও তথ্যপ্রমাণ আজ আর অবশিষ্ট নেই। ১৯১৯ থেকে রাজা আমানুল্লা খান, যিনি ছিলেন কামাল আতাতুর্কের অনুসারী, আফিগানিস্তানে খুব দ্রুত পশ্চিমি সভ্যতার ধারা নিয়ে আসবার চেষ্টা করেন। তার সংস্কারের অনেকটাই ছিল নারীকেন্দ্রিক। নতুন সংবিধানে নারীপুরুষের অধিকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হল, বহুবিবাহ, ধর্মীয় অনুশাসনের রমরমা কমিয়ে আনবার চেষ্টা হতে লাগল। রানি সুরাইয়া অবগুণ্ঠনমুক্ত অবস্থায় ইউরোপ ভ্রমণে গেলেন, কাবুলে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট পর্দাপ্রথা তুলে দেওয়া হল।

মেয়েদের এত রমরমা এবং অচেনা আধুনিকায়ন উপজাতীয় সর্দারদের সইবে কেন! বিদ্রোহ হল, রাজা আমানুল্লাকে সরিয়ে দিয়ে রাজা হলেন মহম্মদ নাদির শাহ। তিনি পূর্বসূরির এইসব প্রচেষ্টা শিকেয় তুলে রাখলেও, তারপরে যিনি সিংহাসনে বসলেন, সেই জাহির শাহ মেয়েদের ভোটাধিকার দিলেন, ঘরের বাইরের পৃথিবীতে কাজের অধিকারের ব্যবস্থা করলেন। তার মানে এই নয়, যে মেয়েদের জন্য কোনও স্বর্গীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল বা উপজাতিরা একেবারে রাজার বশে চলে এসেছিল। তবে আফগান নারীর নিজের অধিকারের জন্য অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের সেই শুরু। এখনও, ‘ভালো’ তালিবানের আফগানিস্তানেও তারা যা অকুতোভয়ে করে চলেছে।

এরপর রাজতন্ত্রের কাল শেষ হয়ে গেলে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রত্যক্ষ উপস্থিতির কারণে আফগান মেয়েরা সমস্ত ক্ষেত্রেই অকুতোভয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে এগিয়ে এসেছে। ধর্মগুরু এবং ঐতিহ্যবাদীদের বিরোধিতার চোরকাঁটা ভালোমতো বিছানো থাকলেও অন্তত শহরগুলোতে নারীস্বাধীনতার পথে তেমন প্রতিবন্ধকতা মাথা উঁচু করেনি। মেয়েরা ডাক্তার নার্স, শিক্ষক, প্রশাসক, সমস্ত পদেই ছিলেন। নির্বাচনে লড়তেও বাধা ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনেও আইনি সাহায্য অপ্রতুল ছিল না। তবে গ্রামগঞ্জে, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা মেয়েলি জীবন কতটা মানুষের জীবন হয়ে উঠতে পেরেছে সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই গেছে। তবে সে তো আমাদের দেশেও, নারীমুক্তি, নারী-স্বাধীনতা যতটা শহরকেন্দ্রিক, ততটা সর্বজনীন নয়। কিন্তু আফগানিস্তানে ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল ধর্মীয় মৌলবাদ, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আমেরিকার একান্ত অবদান কমিউনিস্টদের প্রতি ঘৃণা এবং আফগানদের নিজের দেশকে বৈদেশিক প্রভাবমুক্ত দেখবার অভিপ্রায়। দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, ঐতিহ্যবাদী উপজাতীয়রা কখনও কারও বশ্যতা মানেনি, এবারও মানল না। এর সঙ্গে যুক্ত হল আমেরিকান প্রশাসনের ওসামা বিন লাদেন নামে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরির কাণ্ডকারখানা। শুধু বিপুল অর্থসাহায্য নয়, অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে মুজাহিদদের সোভিয়েত বিরোধিতায় মদত দিয়েছিল আমেরিকা। এই ভূখণ্ডকে আফিম ও ড্রাগ পাচারের স্বর্গরাজ্য এবং অপরাধের মুক্তাঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দায় মূলত তার। গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত আফগানিস্তানকে মুজাহিদদের হাতে রেখে সোভিয়েত ট্রুপ যেদিন দেশটা ছাড়ল, সেদিনই আফগানি নারীমুক্তির কফিনের ডালায় শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়েছিল।

তারপরের ইতিহাস (১৯৯০-২০০১) আফগান নারীর লাঞ্ছনার ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হয় না। ঠিক কথা, তালিবানের অনুশাসনের বিরুদ্ধে যে গেছে, সে নারীই হোক বা পুরুষ, তার কপালেই জুটেছে চরম শারীরিক লাঞ্ছনা, মৃত্যু, কিন্তু সমস্ত মানবিক অধিকার হরণ করে মানুষকে, এখানে পড়তে হবে নারীদের, কিভাবে গরু-ছাগলের পর্যায়ভুক্ত করা যায় তা তালিবানরা পৃথিবীকে ভালোই দেখিয়েছে আফগানিস্তানে তাদের প্রথম রাজত্বকালে।

আফগানিস্তানে যতবার ব্যাপক যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে, বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে মসনদটি দখল করা বা মসনদ থেকে হটিয়ে দেওয়া, যাইই হোক না কেন, ততবারই এই নারী-স্বাধীনতার ব্যাপারটা বেশ সুস্বাদু ভোজ্যের মতো লোকের পাতে দেওয়া গেছে এবং লোকে সেটা খেয়েওছে। তালিবান জমানার আগে আফগান নারীরা কত এগিয়েছিল, সেটা প্রমাণ করবার জন্য গোটা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে আধুনিক এবং হ্রস্ব পোশাক পরা আফগান নারীর ছবি ঘুরে বেড়াল। যদিও সেটা কোনওভাবেই বোরখা মুক্তি অভিযান বা নারীর পোশাক পরিবর্তন অভিযান ছিল না। তার থেকেও অনেক বেশি কিছু ছিল। অনেকদিন পর, জীবনে প্রথম অন্তত দু প্রজন্মের মেয়েরা আধুনিকতার আলো পেয়েছিল। শিক্ষা চেতনা, উন্মুক্ত কর্মক্ষেত্র, সর্বত্র সে প্রমাণ করতে পেরেছিল নিজের যোগ্যতা। তবে সে পরিবর্তন ছিল আবারও শহরকেন্দ্রিক, পাহাড়ি গ্রামগুলোতে সে আলোর কতটা পৌঁছেছিল দুর্ধর্ষ কৌমপ্রভুদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে, সেই তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া দায়।

সোভিয়েত পরবর্তী তালিবান অভ্যুত্থানে মেয়েদের ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল অশিক্ষা অনুশাসনের অন্ধকার কন্দরে। কারণ ধর্মীয় মৌলবাদ সবসময়ই যাবতীয় অনাসৃষ্টির জন্য নারীদের দায়ী করে এবং সেই অছিলায় তাকে কেবলমাত্র যৌনদাসীতে পর্যবসিত করতে চায়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির সবারই এই প্রবণতা আছে, কারও বেশি, কারও কম, এইমাত্র। আফগানিস্তানের মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, কাজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হল, কয়েক তলা আছে এমন বাড়ির একতলা, দোতলা আগাপাশতলা নিরন্ধ্র মুড়ে দেওয়া হল, যাতে ঘরের মেয়েদের বাইরের লোক দেখতে না পায়, কিংবা উল্টোটা। নেইল পলিশে নখ রাঙিয়েছিল বলে যে মেয়েটির আঙুলগুলো কেটে নেওয়া হয়েছিল, কিংবা ব্যভিচারের দায়ে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা হয়েছিল যে নারীকে, তাদের আর্তি ইউটিউব খুঁজলেই শুনতে পাওয়া যাবে। স্কুলকলেজ থেকে মেয়েদের নির্বাসন দেওয়া হল, প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি তো দূরের কথা, বাড়ি থেকে বেরোতে হলেই একজন পুরুষ আত্মীয়কে সঙ্গী হতে হবে। যেন পৃথিবীতে এমন সংসার নেই, যেখানে সব সদস্যই মহিলা! এমন বোরখা মেয়েদের পরতে বাধ্য করা হল যাতে আধ ইঞ্চি ত্বকও কেউ দেখতে না পায়। তাহলেই নাকি ভগবানের পবিত্র বাচ্চাদের চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দিতে পারে!

অসুস্থ হলে ভর্তি হতে হবে শুধু স্ত্রী-চিকিৎসার হাসপাতালে পাছে পুরুষ ডাক্তার নারী রোগীকে দেখে ফেলে পাপের ভাগী হয়! যদি মেয়েদের ঘর থেকে বারই হতে না দেওয়া হয়, লেখাপড়া শেখা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে মহিলা ডাক্তার আবির্ভূত হবে কোথা থেকে কে জানে! অর্থাৎ মেয়েরা মরল কি বাঁচল, তাতে কারও কিছু যায় আসে না।

এসব না মানলে বরাদ্দ হবে প্রকাশ্যে চাবুক মারা, পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা, ইত্যাদি।

আজ বিশ বছর বাদে সেই তালিবান চিত্তশুদ্ধি করে ফিরেছে এ কথা বিশ্বাস করে মেয়েদেরকে তালিবান জমানায় নিঃশঙ্ক থাকতে বলে যারা তারা কারা? ধর্মের অনাচারের দোহাই দিয়ে এবার তালিবান মেয়েদের অন্ধকারে ঠেলে দেবে না এই গ্যারান্টি যারা না চাইতেই দিচ্ছে, তারা ‘ভালো’ তালিবানের দেশে সপরিবারে বাস করতে চাইবে তো?

সারা পৃথিবী জুড়েই খুব সঠিক কারণেই আফগান নারীর এই অমানবিক অবস্থায় হায় হায় রব উঠল এবং রঙ্গমঞ্চে সদর্পে আমেরিকার প্রত্যক্ষ প্রবেশ হল। তার মুখেও কিন্তু ঐ একই ইস্যু, চোখে নারীর অবদমনের কারণে কুম্ভীরাশ্রু। আসলে মুখে নারীস্বাধীনতার বুলি কপচেছে তারা, নজর রেখেছে ড্রাগ, আফিম, গ্যাসের পাইপলাইন ইত্যাদির ওপর। অর্বুদ অর্বুদ ডলার সৈন্যদের পেছনে খরচ হয়েছে কিন্তু আফগান নারীর অবস্থা কসমেটিক চেঞ্জের বাইরে যায়নি কখনও। তাও সেই পরিবর্তন একান্তভাবেই কাবুল-কেন্দ্রিক।

৯/১১-র পর আমেরিকার ফার্স্ট লেডি লরা বুশ হঠাত ফুকারি উঠে বললেন, “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই এক অর্থে নারী-স্বাধীনতার জন্য লড়াই।” এটা বুঝতে একটা ৯/১১-র দরকার হল! রেগান যখন তালিবানদের নিয়ে হোয়াইট হাউজে মিটিং করছিলেন কিংবা ওসামা বিন লাদেনকে কয়েকশো কোটি ডলারের পৈতৃক ব্যবসা জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে মদত দিচ্ছিলেন তখন তো নারীদের কথা একেবারেই বিস্মৃত হতে এঁদের বাধেনি! ৯/১১-র পরেও আফগানিস্তানের মাটিতে আমেরিকান সৈন্যদের স্বাভাবিক মিত্র হল পূর্বতন মুজাহিদরা যারা তালিবানের বিরোধিতা করলেও তাদের মতোই ভয়াবহভাবে পিতৃতান্ত্রিক। যেমন জেনেরাল রশিদ দোস্তাম, যার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের হিউম্যান রাইটস গ্রুপগুলো একমত যে সে এক গণহত্যাকারী, অত্যাচার-অপহরণ-ধর্ষণের অপরাধী।

তালিবান এবং আমেরিকা, দুইই প্রবঞ্চক। আফগান মেয়েদের তারা স্ব স্ব স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তালিবান মুক্তির বদলে নিয়ন্ত্রণ চাপিয়েছে, কারণ ওটাই তাদের কাছে ঐতিহ্যসম্মত এবং ইসলামের র‍্যাডিকাল ব্যাখ্যাসম্মত। আর আমেরিকা আফগান নারীকে ব্যবহার করেছে নির্বিচার বোমাবর্ষণ ও অন্যান্য অত্যাচারকে ন্যায্য প্রমাণ করতে, দুর্নীতিকে আড়াল করতে, যেন তারা এই সবই করছে নারীমুক্তির মহান লক্ষ্যে। নিরীহ মানুষের ওপর নিষ্ঠুর বোমাবর্ষণের ওপর নকল ফেমিনিজমের মিঠে লাবণ্যময় প্রলেপ বুলিয়ে নেওয়ায় তারা একশো পার্সেন্ট সফল।

শরিয়তসম্মত নারী-স্বাধীনতাটি কী বস্তু? উহা কি আদৌ স্বাধীনতা?

আগেই বলা হয়েছে শরিয়ত হচ্ছে ইসলাম ধর্মসম্মত আইনকানুন। সতত পরিবর্তনশীল, কারণ এটি ধর্মগুরুদের ব্যাখ্যানির্ভর। শক্তিমান রাজনীতিকদেরও। এবং তারা কোনওদিনই খুব নারীবান্ধব এরকম অপবাদ শত্রুও দিতে পারবে না। যদি পবিত্র কোরানের উদাহরণ দেখা যায় তাহলে তো নারী-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হচ্ছে তার কোনওটাই ধোপে টেঁকে না। হজরত মহম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজা বিন খুয়েলিদ নিজে সফল ব্যবসায়ী ছিলেন এবং অধীনস্থ কর্মচারীদের দাপটের সঙ্গে পরিচালনা করতেন। অথচ আগেরবার ক্ষমতায় এসে তালিবান পত্রপাঠ আফগান কর্মরতাদের ঘরে ফেরত পাঠিয়েছিল। এবার যদিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, মেয়েদের লেখাপড়া আর কাজকর্ম করবার অধিকার কেড়ে নেবে না, কিন্তু সেটা কতটা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ের জন্য, আর কতটা সত্যবচন তা নিয়ে বিলক্ষণ সন্দেহ আছে।

এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পূর্বতন সরকারে যারা পদাধিকারী ছিল সেই মেয়েদের লাঞ্ছনা। ৫ সেপ্টেম্বর ঘোর প্রদেশে এক অন্তঃসত্তা পুলিশ অফিসারকে পিটিয়ে মারা হয় তার পরিবারের লোক এবং তার সন্তানদের সামনে। গোটা কাবুলে মোট ২৫০ জন মহিলা বিচারক ছিলেন। বেশিরভাগই এখনও দেশে, বাইরে পালাতে পারেননি। তালিবান কাবুলে ঢুকেই প্রথম যে সৎ কার্যটি করেছে তা হল জেল ভেঙে ৫০০০ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া। এই মুক্তিপ্রাপ্তরা এখন মহিলা বিচারকদের খুঁজে তাদের জেলে পাঠানোর বদলা নিতে উদগ্রীব। বাড়ি বাড়ি খানাতল্লাশি চালানো হচ্ছে। ৭০০ মহিলা সাংবাদিক ছিলেন, এখন মেরেকেটে ১০০ দেখা যাচ্ছে। বাকিরা যেন স্রেফ উবে গেছেন। এঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কারও নয়।

মেয়েদের লেখাপড়া কাজকর্মের যে কোনও স্থিরতা থাকবে না, তা সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়। শরিয়তের তালিবানি ব্যাখ্যায় মেয়েরা আট বছর হয়ে গেলেই নিজেদের বিশাল বোরখায় মুড়ে নেবে, বাড়ির বাইরে পা রাখতে হলে সঙ্গে নেবে প্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনও পুরুষ আত্মীয়কে। বারো বছরের বালকের ভরসায় বাজার-হাট করা, শিক্ষা নেওয়া, চাকুরিস্থলে যাওয়া, একজন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন নারীর পক্ষে সম্ভব? আর প্রাপ্তবয়স্ক হোক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক, কোন পুরুষ আত্মীয়ের এত সময়সুযোগ হবে যে সে নারীটির পেছন পেছন সর্বত্র ঘুরে বেড়াবে? ফলে পড়ালেখা, কর্মসংস্থান, প্রত্যেক পদে বাধাপ্রাপ্ত হবে তাতে আর সন্দেহ কী!

আরও আছে। ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়তে পারবে না, নারী শিক্ষক ছাড়া চলবে না। ইউনিভার্সিটি আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারলে তবেই উচ্চশিক্ষা সম্ভব। খুব হাস্যকর একটি কথা বলেছে ‘ভালো’ তালিবানেরা। যদি বৃদ্ধ এবং ‘ভালো চরিত্রের’ কোনও শিক্ষক পাওয়া যায়, তখন তারা ভেবে দেখবে। বার্ধক্য এবং চরিত্রের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে নাকি? আমাদের দেশে যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া সব ধর্মগুরুই তো বৃদ্ধ!

মেয়েরা বোরখা পরবে নিজের পরিবারের লোকের সামনেও। উন্মোচন হবে শুধু নিভৃতে স্বামীর সামনে, পুরুষটির রূপতৃষ্ণা বা অন্য চাহিদা মেটাতে। রূপের কথাই যদি উঠল, তাহলে বলি এবার কাবুল প্রবেশের পর তালিবান আর একটি মহান কাজ সেরে ফেলেছে। সেটি হল বিউটি পার্লারগুলিতে ভাঙচুর করা। পোস্টারের সুন্দর মুখগুলোতে কালি লেপে দিয়ে তারা এই বার্তা দিয়েছে যে মেক-আপ বন্ধ। এমনকি নখরঞ্জনীও চলবে না।

মেয়েরা হাইহিল পরবে না। কারণ তাদের উচ্চকিত পদশব্দ যেন কোনও পুরুষের কানে না ঢোকে। কথা বলবে এমন মৃদু কণ্ঠে, যেন কোনও অপরিচিত তার কণ্ঠস্বর না শুনতে পায়।

গানবাজনা, মডেলিং, অভিনয়, সবই শরিয়তবিরোধী। ফলে সেই পেশায় থাকা মেয়েদের গা-ঢাকা না দিয়ে উপায় নেই। আফগানি মহিলা ফুটবলার, ক্রিকেটাররা একই অবস্থায়৷

এই পরিস্থিতিতে যে পরিবারগুলো পারছে, ঘরের মেয়েদের বিদেশে পাঠিয়ে বাঁচাতে চাইছে। ট্রানজিট ক্যাম্পে ইভ্যাকুয়েশনের যোগ্য অচেনা পুরুষের সঙ্গে অনেক ডলারের বিনিময়ে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে স্নেহপুত্তলিটির। তার পরের ভবিষ্যৎ কারও জানা নেই।

আর যারা তা পারছে না, তাদের ঘরের মেয়ে বৌ-রা প্রস্তুত হচ্ছে চূড়ান্ত লাঞ্ছনার জন্য, যন্ত্রণাময় জীবন ও মৃত্যুর জন্য। যেন তারা ফাঁসির আসামি, যে কোনওদিন টেনেহিঁচড়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া যায়। যদি কোনও আফগান পিতা কন্যাসন্তান না জন্মাবার প্রার্থনা করে, তা কি খুব অযৌক্তিক হবে?

তবু আফগান মেয়েরা লড়ছে। কাবুলে, হিরাটে তারা কাজের দাবি, শিক্ষার দাবিতে পথে নেমেছে। কিন্তু অসম যুদ্ধের ফল কী হবে সকলেই জানে। তালিবানের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স নেমে গেছে এই মেয়েদের জব্দ করতে। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের সামনে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে বন্দুকের কুঁদো, পিপার স্প্রে আর কাঁদানে গ্যাস। বহু অ্যাকটিভিস্ট রক্তাক্ত, বিপর্যস্ত। তাদের অক্লান্ত চেষ্টায় মেয়েদের জন্য যেটুকু কাজ এগিয়েছিল তা যেন আবার একটি বৃহৎ শূন্যে পর্যবসিত হল।

আফগানিস্তানের মেয়েরা এখন চূড়ান্ত বিপদের সম্মুখীন। তাদের নিগ্রহ করার অনেক অছিলাই এখন খুঁজে বার করা হতে থাকবে। কোরান পোড়ানোর মিথ্যা অভিযোগে খোদ রাজধানীতে পিটিয়ে মারা হয়েছিল যাকে সেই ফারকুন্দা মালিকজাদা অনেক অনেক লাশ হয়ে আমাদের স্মৃতিতে হানা দিতেই থাকবে।

আফগানি মেয়েদের দোহাই, ভালো তালিবানের জয়ধ্বনি দেওয়ার সময় আমরা যেন এই মেয়েদের কথাও ভাবি!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. সোভিয়েত শাসনকে এত মহান করে দেখানোর কী হল? ওরাও তো দখলদারই ছিল!!

    • কারণ সোভিয়েত শাসনে আফগান মহিলারা প্রকৃত মুক্তির সাধ পেয়েছিল। বিপুল সংখ্যায় তাঁরা স্কুলে, কলেজে , য়ুনিভার্সিটিতে, আদালতে,মেডিকেল কলেজে , ব্যবসায় লিপ্ত হন। সোভিয়েত-রা দখলদারি হলেও এটাই বাস্তব। তা মেনে নিতে কুণ্ঠা কেন? অন্ধ কম্যুনিস্ট বিরোধিতা? বিখ্যাত লেখক খালিদ হসেইনি’র বইতে এই কথার অকপট স্বীকারক্তি রয়েছে।

1 Trackback / Pingback

  1. নিউ লক্ষ্মী স্টোর্স, কিংবা, নীতাদের চটির ফিতে কেন বারবার ছিঁড়ে যায় – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply to ক.ব. Cancel reply